ঢাকা ০১:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বন বিভাগে চাকরি করেই কোটি টাকার মালিক

অভিযোগের কেন্দ্রে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম সাজ্জাদ হোসেন ও ক্যাশিয়ার মোঃ মামুনুর রহমান

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০৪:২৯:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৫৬২ বার পড়া হয়েছে

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগ রাঙামাটির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এস এম সাজ্জাদ হোসেন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ক্যাশিয়ার ও ফরেস্ট রেঞ্জার মোঃ মামুনুর রহমানের বিরুদ্ধে জমেছে ভয়াবহ অভিযোগ। নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ লেনদেন, অনিয়ম-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তৃত অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। বন বিভাগের মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগে দায়িত্ব পালন করেই তারা নাকি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছেন—এমনটাই অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সরেজমিন অনুসন্ধান, স্থানীয়দের বক্তব্য এবং প্রাপ্ত নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, বন কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন সরকারি চাকরিজীবী হয়েও অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। কথিত আছে, বন বিভাগে নিয়োগ, বদলি, কন্ট্রাক্ট, অনুমোদন ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে ঘুষ নেওয়া ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি একটি বিশাল অঙ্কের অনিয়মিত অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। আর তারই সহযোগী বা ‘ফ্রন্টম্যান’ হিসেবে কাজ করছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের ক্যাশিয়ার মোঃ মামুনুর রহমান।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সাজ্জাদ হোসেন শুধুই প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করেন না, বরং তার চারপাশে তৈরি করেছেন একটি শক্তিশালী প্রভাব-বলয়। অভিযোগ ওঠে, আর্থিক লেনদেনের বেশিরভাগটাই তিনি মামুনুর রহমানের মাধ্যমে করে থাকেন। চাকরি দিতে হলে, কাজ পাইয়ে দিতে হলে কিংবা কোনো ফাইল এগিয়ে নিতে হলে—এসব সবকিছুর জন্যই রেঞ্জার মামুনুর ছিলেন ‘মূল লিঙ্কম্যান’।

এসবের বিনিময়ে যে বিপুল পরিমাণ ঘুষ ও কমিশন সংগ্রহ হয়েছে—তা দিয়ে সাজ্জাদ হোসেন নিজের গ্রামের বাড়িতে ছয় তলা বিশিষ্ট একটি বিশাল ভবনের নির্মাণ কাজ হাতে নিয়েছেন। শাহজাদপুর উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের মাদল–কাদাই গ্রামে তার পুরনো বাড়ির পাশে ছয়তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ভবনটির নির্মাণ চলছে। ইতোমধ্যে ভবনের প্রথম তলার কাজ শেষ হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি চাকরির সাধারণ বেতন দিয়ে এত বড় নির্মাণ প্রকল্প করা সম্ভব নয়; আর এ কারণেই তাদের অভিযোগ, এসব অর্থ এসেছে অবৈধ উৎস থেকে।

ভবন নির্মাণ ছাড়াও সাজ্জাদ হোসেন ঢাকার উত্তরায় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ফ্ল্যাটও কিনেছেন। সেখানে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে নিয়মিত বসবাস করেন। গ্রামে এলে তিনি নির্মাণাধীন ভবনেই অবস্থান করেন।

তার গ্রামের মানুষ জানিয়েছেন, সাজ্জাদ হোসেন সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার মহাখালী বন ভবনে সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এবং একইসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগ রাঙামাটিতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বৈত দায়িত্বের বিষয়টিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, একই সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার সুযোগকে তিনি ব্যবহার করেছেন প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য।

এক স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান—“গ্রামের ছেলেরা চাকরির জন্য তার কাছে গেলে তিনি সাহায্য করেন না। মনে করেন, গ্রামের লোকেরা তার চাহিদামতো টাকা দিতে পারবে না। অথচ দেশের বিভিন্ন জেলার লোকদের তিনি চাকরি দিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু কেউ বিনা টাকায় চাকরি পায়নি বলে শুনেছি।” তিনি আরও বলেন, “সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে রেঞ্জার মামুনুর রহমান নামে একজন সবসময় থাকে। সবাই জানে, টাকা দিতে হলে তার কাছেই দিতে হয়।”

স্থানীয়দের দাবি, গ্রামে সাজ্জাদ হোসেনের প্রভাব ও ক্ষমতা এতটাই বেড়েছে যে, গ্রামে রাস্তা না থাকা সত্ত্বেও তিনি সরকারি তহবিল থেকে কোটি টাকার রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প পাস করিয়ে নিয়েছেন। তার বাড়ির সংযোগ সড়কটি এখন নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে। অভিযোগ, এই প্রকল্প বাস্তবায়নেও অনিয়মের ছাপ রয়েছে, এবং প্রকল্পটি মূলত তার ব্যক্তিগত বাড়িতে সহজে যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই গ্রহণ করা হয়েছে।

গ্রামের আরেক বাসিন্দা বলেন—“তিনি গ্রামে আসলে রাজকীয় হালে চলাফেরা করেন। তার সঙ্গে বেশ কিছু লোক থাকে, এবং তিনি গ্রামের মসজিদ, মাদরাসায় দান করেন ঠিকই, কিন্তু গ্রামবাসীর ব্যক্তিগত সমস্যা বা চাকরির বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেন না। সবকিছুতেই তার ‘টাকার শর্ত’ থাকে।”

পরিবারের ভেতরেও নাকি অসন্তোষ রয়েছে। তার বড় ভাই পাপ্পু মাস্টার, যিনি স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক, জানান—“বাড়ির ছয়তলা ভবন নির্মাণের সময় কথা ছিল পাঁচ ভাইয়ের প্রত্যেকের জন্য আলাদা তলা থাকবে। কিন্তু ভবনটি এমনভাবে ডিজাইন করেছে যে আমাদের কেউই বাস্তবে কোনো তলা ব্যবহার করতে পারব না। পুরো ভবনটি এখন তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের মতোই।”

তিনি আরও বলেন—“আমরা ভাই হয়েও তার কাছে চাকরি বা কোনো কাজের সুপারিশ করতে পারি না। কারণ আমরা নাকি টাকা দেব না বা কম দেব! ফলে সে সরাসরি বলে দেয়—এই ধরনের তদবির তার পক্ষে করা সম্ভব নয়। তবে অন্যরা যদি চাকরি বা কাজ করাতে চায়, তাহলে রেঞ্জার মামুনুরের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলে। আমরা গ্রামের মানুষ হিসেবেই জানি, অনেকেই মামুনুরের মাধ্যমে টাকা দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছে।”

বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান—“স্যার ভালো মানুষ, কিন্তু কাজে পয়সার বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার পছন্দসই পরিমাণ টাকা হলে কাজ এগিয়ে দেন। রেঞ্জার মামুনুরই এসব টাকার পুরো সমন্বয় করেন।”

বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ কিছু সূত্র জানায়, নিয়োগ থেকে শুরু করে কাঠ জব্দ, গাড়ি ছাড়, কন্ট্রাক্ট অনুমোদন, টেন্ডার সুপারিশ—এসব ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ বহুদিন ধরেই রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় কাঠ পরিবহন ও পাহাড় কাটার ঘটনায় বন বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর এই সুযোগকেই নাকি ব্যবহার করেছেন অভিযুক্তরা।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাজ্জাদ হোসেনের আর্থিক লেনদেনের বেশ কিছু অস্বাভাবিক দিক রয়েছে। তার নামে বা পরিবারের নামে কি পরিমাণ ব্যাংক লেনদেন, সম্পদের উৎস, জমি ক্রয়-বিক্রয়ের নথি রয়েছে—এসব বিষয়ে তদন্ত করলে আরও অনেক কিছু বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। বর্তমানে যে ছয়তলা ভবন নির্মাণ করছেন তার ব্যয়, নির্মাণ সামগ্রীর উৎস এবং ঠিকাদারী বিষয়গুলোও তদন্তের দাবি জানাচ্ছে স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার জানান—“সাজ্জাদ স্যার যখন গ্রামে কোনো কাজ করান, তখন বাজেট বা হিসাব সবই তার নির্দেশে করতে হয়। সরকারি প্রকল্প হলেও, কাগজে-কলমে যেভাবে হয়, বাস্তবে অনেক কিছুই ভিন্নভাবে করতে হয়।” তিনি বলেন—“রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে কী পরিমাণ বাজেট ছিল, কী পরিমাণ কাজ হয়েছে—এসব নিয়ে গ্রামেই প্রশ্ন আছে।”

কৃষক সমাজের কয়েকজন সদস্য জানায়—“আমরা কোনোদিন ভাবিনি আমাদের গ্রামের একজন ছেলে এত ক্ষমতাবান হবে। কিন্তু এই ক্ষমতা গ্রামের মানুষের উপকারে তেমন কাজে লাগছে না। দান-পুণ্য করেন, সেটা তার ইচ্ছা। কিন্তু গ্রামের ছেলেদের চাকরির আশা নিয়ে বারবার ফিরিয়ে দেন। কারণ আমরা তার কাছে অন্য জেলার লোকদের মতো লাখ লাখ টাকা দিতে পারব না।”

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম সাজ্জাদ হোসেনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বার্তা পাঠিয়েও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়রা আরও জানান—“তার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু নিয়োগ বাণিজ্য নয়। কর্মস্থলে বদলি, শাস্তিমূলক আদেশ প্রত্যাহার, চাঁদা আদায়, কাঠ জব্দের মামলা নিষ্পত্তি—এমন সব ক্ষেত্রেই লেনদেনের কথা শোনা যায়।”

বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ কমিটি বা দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরদারি বাড়লে এই কর্মকর্তার সম্পদ ও লেনদেনের বিষয়ে আরও বিস্তৃত তদন্তের প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

এদিকে সাজ্জাদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ মহল দাবি করছে—তিনি নাকি একজন দক্ষ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোরতার কারণে অনেকেই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তাদের দাবি, তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন এবং গ্রামের বাড়িতে ভবন নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কেনা তার ব্যক্তিগত বিষয়।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা, বনবিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা, এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য মিলিয়ে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—সরকারি চাকরির বেতন-সুবিধার ভিত্তিতে এত অল্প সময়ে এ পরিমাণ সম্পদ অর্জন কীভাবে সম্ভব হলো?

আরেক গ্রামের ব্যক্তি বলেন—“আমরা দেখেছি, আগে সাদামাটা জীবন ছিল তাদের। কিন্তু এখন এত বড় বিল্ডিং, এত দামি গাড়ি, এত সম্পদ—এ সব কোথা থেকে এলো? সরকার বা দুর্নীতি দমন কমিশন যদি তদন্ত করে, তাহলে সত্য সবই বেরিয়ে আসবে।”

এ বিষয়ে বন বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন—“বন বিভাগে অনিয়ম আছে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কিছু করা যায় না। অভিযোগ থাকলে বিভাগীয় তদন্ত বা দপ্তরের পরিদর্শন সম্ভব।”

সাজ্জাদ হোসেনের গ্রামের বাড়ি ঘুরে দেখা যায়, নির্মিতব্য ছয়তলা ভবনের এলাকাজুড়ে কর্মীদের যাতায়াত। ভবনটি শুধু বড় নয়, তার ব্যয়ও বিশাল। স্থানীয়রা বলছেন—“এই বাড়ির নির্মাণের টাকা যদি বৈধভাবে আয় করা হতো, তাহলে স্যার নিজেই বলতেন। কিন্তু তিনি কখনো বিষয়টি খোলাসা করতে চান না।”

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও সাজ্জাদ হোসেনের পক্ষে একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মোবাইলে কল ধরেননি, বার্তা পাঠানোর পরও কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

সব মিলিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ রাঙামাটির এই কর্মকর্তা ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফরেস্ট রেঞ্জার মামুনুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখন এলাকাজুড়ে আলোচনার বিষয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা—অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং দুর্নীতির প্রমাণ মিললে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

বন বিভাগে চাকরি করেই কোটি টাকার মালিক

অভিযোগের কেন্দ্রে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম সাজ্জাদ হোসেন ও ক্যাশিয়ার মোঃ মামুনুর রহমান

আপডেট সময় ০৪:২৯:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগ রাঙামাটির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এস এম সাজ্জাদ হোসেন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ক্যাশিয়ার ও ফরেস্ট রেঞ্জার মোঃ মামুনুর রহমানের বিরুদ্ধে জমেছে ভয়াবহ অভিযোগ। নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ লেনদেন, অনিয়ম-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তৃত অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। বন বিভাগের মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগে দায়িত্ব পালন করেই তারা নাকি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছেন—এমনটাই অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সরেজমিন অনুসন্ধান, স্থানীয়দের বক্তব্য এবং প্রাপ্ত নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, বন কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন সরকারি চাকরিজীবী হয়েও অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। কথিত আছে, বন বিভাগে নিয়োগ, বদলি, কন্ট্রাক্ট, অনুমোদন ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে ঘুষ নেওয়া ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি একটি বিশাল অঙ্কের অনিয়মিত অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। আর তারই সহযোগী বা ‘ফ্রন্টম্যান’ হিসেবে কাজ করছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের ক্যাশিয়ার মোঃ মামুনুর রহমান।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সাজ্জাদ হোসেন শুধুই প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করেন না, বরং তার চারপাশে তৈরি করেছেন একটি শক্তিশালী প্রভাব-বলয়। অভিযোগ ওঠে, আর্থিক লেনদেনের বেশিরভাগটাই তিনি মামুনুর রহমানের মাধ্যমে করে থাকেন। চাকরি দিতে হলে, কাজ পাইয়ে দিতে হলে কিংবা কোনো ফাইল এগিয়ে নিতে হলে—এসব সবকিছুর জন্যই রেঞ্জার মামুনুর ছিলেন ‘মূল লিঙ্কম্যান’।

এসবের বিনিময়ে যে বিপুল পরিমাণ ঘুষ ও কমিশন সংগ্রহ হয়েছে—তা দিয়ে সাজ্জাদ হোসেন নিজের গ্রামের বাড়িতে ছয় তলা বিশিষ্ট একটি বিশাল ভবনের নির্মাণ কাজ হাতে নিয়েছেন। শাহজাদপুর উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের মাদল–কাদাই গ্রামে তার পুরনো বাড়ির পাশে ছয়তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ভবনটির নির্মাণ চলছে। ইতোমধ্যে ভবনের প্রথম তলার কাজ শেষ হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি চাকরির সাধারণ বেতন দিয়ে এত বড় নির্মাণ প্রকল্প করা সম্ভব নয়; আর এ কারণেই তাদের অভিযোগ, এসব অর্থ এসেছে অবৈধ উৎস থেকে।

ভবন নির্মাণ ছাড়াও সাজ্জাদ হোসেন ঢাকার উত্তরায় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ফ্ল্যাটও কিনেছেন। সেখানে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে নিয়মিত বসবাস করেন। গ্রামে এলে তিনি নির্মাণাধীন ভবনেই অবস্থান করেন।

তার গ্রামের মানুষ জানিয়েছেন, সাজ্জাদ হোসেন সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার মহাখালী বন ভবনে সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এবং একইসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগ রাঙামাটিতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বৈত দায়িত্বের বিষয়টিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, একই সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার সুযোগকে তিনি ব্যবহার করেছেন প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য।

এক স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান—“গ্রামের ছেলেরা চাকরির জন্য তার কাছে গেলে তিনি সাহায্য করেন না। মনে করেন, গ্রামের লোকেরা তার চাহিদামতো টাকা দিতে পারবে না। অথচ দেশের বিভিন্ন জেলার লোকদের তিনি চাকরি দিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু কেউ বিনা টাকায় চাকরি পায়নি বলে শুনেছি।” তিনি আরও বলেন, “সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে রেঞ্জার মামুনুর রহমান নামে একজন সবসময় থাকে। সবাই জানে, টাকা দিতে হলে তার কাছেই দিতে হয়।”

স্থানীয়দের দাবি, গ্রামে সাজ্জাদ হোসেনের প্রভাব ও ক্ষমতা এতটাই বেড়েছে যে, গ্রামে রাস্তা না থাকা সত্ত্বেও তিনি সরকারি তহবিল থেকে কোটি টাকার রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প পাস করিয়ে নিয়েছেন। তার বাড়ির সংযোগ সড়কটি এখন নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে। অভিযোগ, এই প্রকল্প বাস্তবায়নেও অনিয়মের ছাপ রয়েছে, এবং প্রকল্পটি মূলত তার ব্যক্তিগত বাড়িতে সহজে যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই গ্রহণ করা হয়েছে।

গ্রামের আরেক বাসিন্দা বলেন—“তিনি গ্রামে আসলে রাজকীয় হালে চলাফেরা করেন। তার সঙ্গে বেশ কিছু লোক থাকে, এবং তিনি গ্রামের মসজিদ, মাদরাসায় দান করেন ঠিকই, কিন্তু গ্রামবাসীর ব্যক্তিগত সমস্যা বা চাকরির বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেন না। সবকিছুতেই তার ‘টাকার শর্ত’ থাকে।”

পরিবারের ভেতরেও নাকি অসন্তোষ রয়েছে। তার বড় ভাই পাপ্পু মাস্টার, যিনি স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক, জানান—“বাড়ির ছয়তলা ভবন নির্মাণের সময় কথা ছিল পাঁচ ভাইয়ের প্রত্যেকের জন্য আলাদা তলা থাকবে। কিন্তু ভবনটি এমনভাবে ডিজাইন করেছে যে আমাদের কেউই বাস্তবে কোনো তলা ব্যবহার করতে পারব না। পুরো ভবনটি এখন তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের মতোই।”

তিনি আরও বলেন—“আমরা ভাই হয়েও তার কাছে চাকরি বা কোনো কাজের সুপারিশ করতে পারি না। কারণ আমরা নাকি টাকা দেব না বা কম দেব! ফলে সে সরাসরি বলে দেয়—এই ধরনের তদবির তার পক্ষে করা সম্ভব নয়। তবে অন্যরা যদি চাকরি বা কাজ করাতে চায়, তাহলে রেঞ্জার মামুনুরের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলে। আমরা গ্রামের মানুষ হিসেবেই জানি, অনেকেই মামুনুরের মাধ্যমে টাকা দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছে।”

বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান—“স্যার ভালো মানুষ, কিন্তু কাজে পয়সার বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার পছন্দসই পরিমাণ টাকা হলে কাজ এগিয়ে দেন। রেঞ্জার মামুনুরই এসব টাকার পুরো সমন্বয় করেন।”

বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ কিছু সূত্র জানায়, নিয়োগ থেকে শুরু করে কাঠ জব্দ, গাড়ি ছাড়, কন্ট্রাক্ট অনুমোদন, টেন্ডার সুপারিশ—এসব ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ বহুদিন ধরেই রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় কাঠ পরিবহন ও পাহাড় কাটার ঘটনায় বন বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর এই সুযোগকেই নাকি ব্যবহার করেছেন অভিযুক্তরা।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাজ্জাদ হোসেনের আর্থিক লেনদেনের বেশ কিছু অস্বাভাবিক দিক রয়েছে। তার নামে বা পরিবারের নামে কি পরিমাণ ব্যাংক লেনদেন, সম্পদের উৎস, জমি ক্রয়-বিক্রয়ের নথি রয়েছে—এসব বিষয়ে তদন্ত করলে আরও অনেক কিছু বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। বর্তমানে যে ছয়তলা ভবন নির্মাণ করছেন তার ব্যয়, নির্মাণ সামগ্রীর উৎস এবং ঠিকাদারী বিষয়গুলোও তদন্তের দাবি জানাচ্ছে স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার জানান—“সাজ্জাদ স্যার যখন গ্রামে কোনো কাজ করান, তখন বাজেট বা হিসাব সবই তার নির্দেশে করতে হয়। সরকারি প্রকল্প হলেও, কাগজে-কলমে যেভাবে হয়, বাস্তবে অনেক কিছুই ভিন্নভাবে করতে হয়।” তিনি বলেন—“রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে কী পরিমাণ বাজেট ছিল, কী পরিমাণ কাজ হয়েছে—এসব নিয়ে গ্রামেই প্রশ্ন আছে।”

কৃষক সমাজের কয়েকজন সদস্য জানায়—“আমরা কোনোদিন ভাবিনি আমাদের গ্রামের একজন ছেলে এত ক্ষমতাবান হবে। কিন্তু এই ক্ষমতা গ্রামের মানুষের উপকারে তেমন কাজে লাগছে না। দান-পুণ্য করেন, সেটা তার ইচ্ছা। কিন্তু গ্রামের ছেলেদের চাকরির আশা নিয়ে বারবার ফিরিয়ে দেন। কারণ আমরা তার কাছে অন্য জেলার লোকদের মতো লাখ লাখ টাকা দিতে পারব না।”

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম সাজ্জাদ হোসেনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বার্তা পাঠিয়েও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়রা আরও জানান—“তার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু নিয়োগ বাণিজ্য নয়। কর্মস্থলে বদলি, শাস্তিমূলক আদেশ প্রত্যাহার, চাঁদা আদায়, কাঠ জব্দের মামলা নিষ্পত্তি—এমন সব ক্ষেত্রেই লেনদেনের কথা শোনা যায়।”

বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ কমিটি বা দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরদারি বাড়লে এই কর্মকর্তার সম্পদ ও লেনদেনের বিষয়ে আরও বিস্তৃত তদন্তের প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

এদিকে সাজ্জাদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ মহল দাবি করছে—তিনি নাকি একজন দক্ষ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোরতার কারণে অনেকেই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তাদের দাবি, তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন এবং গ্রামের বাড়িতে ভবন নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কেনা তার ব্যক্তিগত বিষয়।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা, বনবিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা, এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য মিলিয়ে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—সরকারি চাকরির বেতন-সুবিধার ভিত্তিতে এত অল্প সময়ে এ পরিমাণ সম্পদ অর্জন কীভাবে সম্ভব হলো?

আরেক গ্রামের ব্যক্তি বলেন—“আমরা দেখেছি, আগে সাদামাটা জীবন ছিল তাদের। কিন্তু এখন এত বড় বিল্ডিং, এত দামি গাড়ি, এত সম্পদ—এ সব কোথা থেকে এলো? সরকার বা দুর্নীতি দমন কমিশন যদি তদন্ত করে, তাহলে সত্য সবই বেরিয়ে আসবে।”

এ বিষয়ে বন বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন—“বন বিভাগে অনিয়ম আছে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কিছু করা যায় না। অভিযোগ থাকলে বিভাগীয় তদন্ত বা দপ্তরের পরিদর্শন সম্ভব।”

সাজ্জাদ হোসেনের গ্রামের বাড়ি ঘুরে দেখা যায়, নির্মিতব্য ছয়তলা ভবনের এলাকাজুড়ে কর্মীদের যাতায়াত। ভবনটি শুধু বড় নয়, তার ব্যয়ও বিশাল। স্থানীয়রা বলছেন—“এই বাড়ির নির্মাণের টাকা যদি বৈধভাবে আয় করা হতো, তাহলে স্যার নিজেই বলতেন। কিন্তু তিনি কখনো বিষয়টি খোলাসা করতে চান না।”

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও সাজ্জাদ হোসেনের পক্ষে একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মোবাইলে কল ধরেননি, বার্তা পাঠানোর পরও কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

সব মিলিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ রাঙামাটির এই কর্মকর্তা ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফরেস্ট রেঞ্জার মামুনুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখন এলাকাজুড়ে আলোচনার বিষয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা—অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং দুর্নীতির প্রমাণ মিললে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।