বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল। প্রতিদিন হাজার হাজার টন পণ্য এখানে এসে জমা হয়, সেগুলো ক্লিয়ারেন্স হয়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় পাঠানো হয়। দেশের রপ্তানি–আমদানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে এই বন্দরটির ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এ বছরের শুরু থেকে বন্দরের ভেতরে এক অস্বাভাবিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে— বেনাপোল কাস্টমসে দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তা সনজু মিয়া প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফাইল আটকে রাখা, স্বাক্ষর না করা, অকারণ জটিলতা সৃষ্টি করা— এসবের মাধ্যমে তিনি আমদানিকারকদের নানাভাবে হয়রানি করছেন বলে বহু ব্যবসায়ী অভিযোগ তুলেছেন। তারা বলছেন, টাকা ছাড়া যেন কোনো কাজই হয় না। নথিতে স্বাক্ষর করতে গেলে কয়েক হাজার টাকার দাবি, আর বড় পণ্য ছাড়ের ক্ষেত্রে দাবি নাকি কয়েক দশক গুণে বেড়ে যাচ্ছে। যার ফলে আমদানিকারকেরা ক্রমে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, সনজু মিয়ার কাছে একটি ফাইল উঠলে ধরে নিতে হয় যে অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে। কোনো ফাইলের সামান্য সংশোধন, নথির মিল দেখা বা ভেরিফিকেশন— এসবের জন্যও তিনি কিছু ‘মোটিভেশন’ দাবি করেন। অনেকে দাবি করছেন, আগে যেখানে ৫০০ বা ১ হাজার টাকায় কাজ সারা সম্ভব হতো, এখন সেই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায়। আর যদি বিষয়টি আমদানি-সংক্রান্ত কোনো বড় ফাইল হয়, তাহলে সনজু মিয়া নাকি খোলাখুলিভাবে ২৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করে বসেন। এ কারণে বহু আমদানিকারক বাধ্য হচ্ছেন টাকা দিতে, অন্যথায় দিনের পর দিন ফাইল আটকে থাকে, যার ফলে বন্দরেই পণ্য পড়ে থেকে অতিরিক্ত ডিমারেজ চার্জ গুণতে হয়।
ঘুষ না দিলে যে কী ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়, ব্যবসায়ীদের বর্ণনায় সেটি আরও স্পষ্ট। অনেকে বলেছেন, সনজু মিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্যকে “অপর্যাপ্ত নথি” বা “সন্দেহজনক কাঁচামাল” হিসেবে দেখিয়ে পুনরায় ল্যাব টেস্টে পাঠিয়ে দেন। এতে কাজ বিলম্বিত হয় কয়েক দিন নয়, কখনো কখনো কয়েক সপ্তাহ। আর এ বিলম্বের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন চক্র হুমকির মুখে পড়ে। অনেক কারখানাকে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়, শ্রমিকদের বাড়তি সময় দিতে হয় অথবা কারখানার অন্য অংশের কাজ থমকে যায়। দেশের শিল্পখাত যেখানে এ সময় নানা সংকটে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, সেখানে বেনাপোল বন্দরের এই অনিয়ম উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বহু ব্যবসায়ী বেনাপোল বন্দর এড়িয়ে ভোমরা, সোনামসজিদ বা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আনার দিকে ঝুঁকছেন। যদিও এসব বন্দর দিয়ে আমদানি করা আরো ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ, তবুও ব্যবসায়ীরা বাধ্য হচ্ছেন হবে না এমন অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে। কারণ তাদের বক্তব্য— বেনাপোলের হয়রানির চেয়ে অতিরিক্ত খরচ ভালো। এর ফলে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দরের ওপর আস্থা কমছে, পণ্য প্রবাহ কমে যাচ্ছে, এবং সরকারের রাজস্বও ঠিকমতো আসছে না। এমন গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ক্রমে ব্যবসায়ীদের কাছে ভীতি ও অনিশ্চয়তার জায়গায় পরিণত হচ্ছে।
এ অভিযোগ নতুন নয়। গত ৬ অক্টোবর একই কাস্টমস হাউসের আরেক রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তার ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার সহযোগীকেও এর আগে আটক করা হয় অর্থসহ। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একের পর এক কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হলেও দুর্নীতি কমছে না, বরং তা যেন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এতে বোঝা যায় সমস্যাটি কোনো ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির গভীর শেকড়-গাঁথা চক্র। কর্মকর্তারা একের পর এক বদলি হয়ে আসলেও নিয়মতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাবে একই ধরনের কর্মপদ্ধতি থেকে যাচ্ছে।
আমদানিকারকদের দাবি, বেনাপোল কাস্টমসে কাজ করতে গেলে এখন সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হচ্ছে “ঘুষ দিতে সক্ষম হওয়া”। তারা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তারা আমদানির প্রতিটি ধাপে এমনভাবে কৃত্রিম জটিলতা তৈরি করেছেন যে কোন ব্যবসায়ী যদি ঘুষ দিতে না চান, তবে তাকে হয়রানির মাত্রা এমনভাবে বাড়ানো হয়— যাতে সে শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে টাকা দিতে রাজি হয়। কেউ কেউ আরও অভিযোগ করেছেন, সনজু মিয়া সরাসরি ইঙ্গিত দেন যে, “ফাইল দ্রুত দরকার হলে ব্যবস্থা করতে হবে।” এমন বক্তব্যের অর্থ ব্যবসায়ীরা খুব ভালোভাবেই জানেন।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন সংগঠন যৌথভাবে অভিযোগ করেছে যে, সনজু মিয়া কর্তৃক চালানো এই ঘুষবাণিজ্য দেশের শিল্পখাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমদানিকারকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ থাকলেও অনেকে চান না প্রকাশ্যে কথা বলতে। কারণ তারা আশঙ্কা করেন, নাম প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে আরও হয়রানির শিকার হতে হবে। ফলে অনেকে নীরবে ক্ষতির বোঝা বয়ে চলেছেন। এতে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষতি নয় বরং দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শিল্পকারখানার ওপর প্রভাবও গভীর। কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় না পৌঁছালে উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে শ্রমিকদের বেতন, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচসহ নানা খাতে ক্ষতি হয়। বিশেষ করে পণ্যের মূল কাঁচামাল আটকে গেলে উৎপাদন চক্র পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি করতে পারে না, ফলে বিদেশি ক্রেতারা অসন্তুষ্ট হন। সব মিলিয়ে দেশে রপ্তানি আয়ও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এ ধরনের দুর্নীতির আরও একটি বড় প্রভাব হলো বাজারদর বৃদ্ধি। আমদানিকারকরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ঘুষ, অতিরিক্ত ডিমারেজ চার্জ, অতিরিক্ত পরিবহন খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করেন। ফলে শেষমেশ ভোক্তাদেরই বেশি দাম দিয়ে সেই পণ্য কিনতে হয়। সরাসরি বা পরোক্ষভাবে— বেনাপোলের দুর্নীতি দেশের সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যদিও তারা জানেনই না কেন কোনও পণ্যের দাম হঠাৎ বাড়ছে।
ব্যবসায়ীদের মূল দাবি এখন একটাই— স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। তারা চান সনজু মিয়াকে অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তদন্ত শুরু করা হোক। শুধু তাই নয়, তারা চায় বন্দরের সার্বিক পরিবেশ ঢেলে সাজাতে। তাদের মতে, প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ানো, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা, কর্মকর্তাদের ঘন ঘন রদবদল করা ও দুর্নীতিতে জড়িতদের কঠোর শাস্তি দেওয়া ছাড়া এই বন্দরকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীদের মতে, যদি বেনাপোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দর দুর্নীতির কবল থেকে মুক্তি না পায়, তবে দেশের উৎপাদন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান— সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বহু অর্থনীতিবিদও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একমত। তাদের বক্তব্য— আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া যত জটিল হবে, বেআইনি আর্থিক চাপ যত বাড়বে, ব্যবসা তত দুর্বল হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কারণ একটি দেশের শিল্পকারখানার কর্মক্ষমতা নির্ভর করে স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও কাস্টমস কার্যক্রমের গতিশীলতার ওপর। যদি সেই ব্যবস্থাই হয়রানি ও দুর্নীতির কারণে ভেঙে পড়ে, তবে অর্থনীতি কখনোই টেকসই হতে পারে না।
একই সঙ্গে অভিযোগ আছে— বেনাপোল কাস্টমসের অনেক স্থানে এখনও বহু কাজ ম্যানুয়ালি হয়, যার সুযোগ নিয়ে অসাধু কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব সৃষ্টি করেন। ফাইল অগ্রগতির জন্য ঘুষ দাবি করার ক্ষেত্র তৈরি হয় এখানেই। ব্যবসায়ীদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড করা হলে অনেক কর্মকর্তা নিজেদের ইচ্ছামতো ফাইল আটকে রাখা বা অসংলগ্ন আপত্তি তোলার সুযোগ পাবে না।
এদিকে বেনাপোলের এই অচলাবস্থা শুধু দেশে নয়, ভারতের রপ্তানিকারকদের মাঝেও উদ্বেগ তৈরি করছে। তারা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের আমদানিকারকদের পণ্য আটকে থাকলে তাদের ব্যবসায়ও ক্ষতি হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্থলবন্দরের সুনাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো বন্দর দুর্নীতিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত হয়ে যায়, তাহলে সেটির ওপর নির্ভরশীলতা কমে যায়। এতে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কও নষ্ট হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী মহল, সিএন্ডএফ এজেন্ট, বন্দর সংশ্লিষ্ট সংগঠন, এমনকি অনেক সচেতন নাগরিকও জরুরি ভিত্তিতে সরকারি পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন। তাদের মতে— একাধিক অভিযোগ, পূর্বের গ্রেপ্তার, এবং চলমান হয়রানির প্রেক্ষাপটে এবার কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া বিকল্প নেই। তারা বলছেন, তদন্ত দ্রুত হওয়া উচিত এবং যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে উদাহরণস্বরূপ শাস্তি দিতে হবে। তবেই অন্যান্য কর্মকর্তাদের জন্যও এটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
সব মিলিয়ে বেনাপোল কাস্টমসে ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, শিল্পখাত এবং ভোক্তাস্তর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী একটি গভীর সংকট। সনজু মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি তাই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা জরুরি। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর যদি দুর্নীতিমুক্ত না হয়, তাহলে আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। ব্যবসায়ীদের কণ্ঠে যে আতঙ্ক, যে ক্ষোভ— তা শুধু একজন কর্মকর্তার কারণেই নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি অব্যাহত অনিয়মের প্রতিচ্ছবি। এখন প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ— স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি, এবং বন্দরকে সত্যিকার অর্থে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে রূপান্তরিত করা। দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে এটি আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়।
সংবাদ শিরোনাম ::
বেনাপোল কাস্টমসে সনজু মিয়ার ঘুষ–বাণিজ্যের অভিযোগে তোলপাড়
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০১:৩০:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
- ৫৫১ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

























