স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক অশোক কুমার সাহার বিরুদ্ধে ভেজাল, নিম্নমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ দুগ্ধজাত পণ্য বিপণন এবং আমদানির গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এনজিএস ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের নামে এসব প্রতারণা করেন তিনি। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) যৌথ টাস্কফোর্স অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ভেজাল খাবার সরবরাহের সত্যতা পাওয়া যায়। এতে জরিমানার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান সিলগালাও করা হয়। আলামত হিসাবে জব্দ করা হয় ৩৭ হাজার কেজি গুঁড়াদুধ। পাশাপাশি ভেজাল খাবার সরবরাহে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে একটি প্রতিষ্ঠান। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। জামিনেও মুক্তি পান। তবে এসব অনিয়মের তথ্য গোপন রেখে ব্যাংকের পরিচালক পদে এখনও দিব্যি বহাল তবিয়তে আছেন অশোক কুমার সাহা। ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি মামলার আসামি কোনো ব্যাংকের পরিচালক থাকতে পারেন না। যদিও অশোক কুমার সাহা ২০০৯ সাল থেকে এখনও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক। এমন ভেজাল ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তির হাতে ব্যাংকের আমানত কতটা নিরাপদ- সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এ বিষয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বৃহস্পতিবার বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, তা অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ।
অপরাধের নির্ভরযোগ্য তথ্যও আছে। এজন্য তাকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। শাস্তি পেলে বা বিচার নিশ্চিত করা হলে, তার ব্যাংকে পরিচালক পদে বহাল রাখার যৌক্তিকতা থাকবে না। এছাড়া যেহেতু তার বিরুদ্ধে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, সেহেতু তার বিরুদ্ধে বিচারের রায় যাই হোক না কেন, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক যদি গ্রাহকদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে এ ধরনের ব্যক্তিকে ব্যাংক থেকে অপসারণ করা উচিত। ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্বপ্রণোদিতভাবে এটা করা উচিত বলে আমি মনে করি। এছাড়া ব্যাংক এমনও অবস্থান নিতে পারে- যতদিন পর্যন্ত অভিযোগের তদন্ত চলছে এবং তার বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এ পদে তিনি বহাল থাকবেন না। সাময়িকভাবে বরখাস্ত থাকবেন। ব্যাংকের পক্ষ থেকে এমনটাও করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
যে কারণে ৪ লাখ টাকা জরিমানা : প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে এনজিএস ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম। মেয়াদোত্তীর্ণের নতুন তারিখের জাল লেবেল লাগিয়ে গুঁড়া দুধ বিক্রির অপরাধে এই জরিমানা করা হয়।
গুদাম সিলগালা: বিদেশ থেকে কোনো দুধ আমদানি না করেও নিউজিল্যান্ডের প্রোডাক্ট ঘোষণা দিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছিল
এনজিএস গুঁড়াদুধ। আটা ও দুধের ঘোল মিশিয়ে তৈরি করা হতো এসব গুঁড়াদুধ। ডানো ব্র্যান্ডের গুঁড়াদুধের ব্যবহৃত প্যাকেট পুনরায় ব্যবহার করেও বাজারে ছাড়া হতো শিশুখাদ্য। ভেজাল ও নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়াদুধ এবং কেমিক্যাল মিশিয়ে এনজিএস ফুল ক্রিম ও ফেয়ারলাইফ মিল্ক পাউডার নামে দুধ মোড়কজাত করে বাজারে বিক্রি করত এনজিএস ফুড প্রোডাক্টস নামের কোম্পানি। ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বিএসটিআই এনজিএস ফুড প্রোডাক্টসের অপকর্ম ও জোচ্চুরি উদঘাটন করে। তখন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে কারখানার দায়িত্বে থাকা এনজিএস ফুড প্রোডাক্টসকে ২ লাখ টাকা জরিমানা এবং এক কর্মকর্তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে সাড়ে ৩৭হাজার কেজি গুঁড়াদুধসহ কারখানাটির গুদাম সিলগালা করে দেওয়া হয়। ওই সময় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বিএসটিআই জানায়, এনজিএস ফুড প্রোডাক্টস নামের কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে দুধ বাজারজাত করলেও তাদের দুধের গুণগত মান নিয়ে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। বিদেশ থেকে দুধ আমদানি করে বাজারজাত করছে বলে প্রচারণা থাকলেও দুধের মান যাচ্ছেতাই হওয়ায় সন্দেহ হচ্ছিল। ফুল ক্রিম গুঁড়াদুধসহ শিশুখাদ্য হিসাবে বিক্রীত দুধের মান নিয়ে ভোক্তাদের কাছ থেকে ব্যাপক অভিযোগ আসার পর জেলা প্রশাসন ও বিএসটিআই যৌথভাবে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এনজিএস ফুড প্রোডাক্টস কারখানায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ফৌজদারি মামলা: শিশুদের জন্য নির্ধারিত দুগ্ধজাত পণ্যে ভেজাল ও নিম্নমানের উপাদান সরবরাহের অভিযোগে গত ১৬ জুলাই ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদপুর আমলি আদালতে একটি মামলা দায়ের করে ঢাকার বসিলা এলাকার প্রতিষ্ঠান মেসার্স আর এন ইন্টারন্যাশনালের প্রোপ্রাইটর মো. শরিফুল ইসলাম। মামলায় এনজিএস ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অশোক কুমার সাহা ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার লিটন শাহাকে আসামি করা
হয়। পরবর্তীতে এ মামলায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে অশোক কুমার সাহা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনে মুক্তি পান। আদালত এ মামলার অভিযোগগুলোকে প্রাথমিকভাবে ‘গুরুতর ও বিশ্বাসযোগ্য’ বলে বিবেচনা করে। জানতে চাইলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ভেজাল খাবার সরবরাহ বড় ধরনের অপরাধ। যে বা যারা এই কাজ করে, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা উচিত। আর এনজিএস ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক অশোক কুমার সাহার বিরুদ্ধে ভেজাল খাবার সরবরাহের যে অভিযোগ, তা অনেক ঘৃণিত কাজ। তিনি একজন ব্যাংকের পরিচালক। তা সত্ত্বেও এমন জঘন্য কাজ করেছেন। প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া এমন একজন ব্যাংক পরিচালকের হাতে গ্রাহকদের আমানত কতটা সুরক্ষা পাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
এদিকে এ ঘটনায় জনমনে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের নৈতিকতা, সততা, আইনানুগ আচরণ এবং ব্যাংকের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে ন্যায়ত প্রশ্ন উঠেছে। একজন ব্যাংক পরিচালকের বিরুদ্ধে শিশু খাদ্যে ভেজাল মেশানো, ভোক্তা প্রতারণা এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক অপরাধের অভিযোগ নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম, গ্রাহক আস্থা, করপোরেট গভর্ন্যান্স ও সার্বিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক অশোক কুমার সাহার সঙ্গে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া না দিয়ে কল কেটে দেন। এরপর ফোন করার কারণ উল্লেখ করে ওইদিন হোয়াটস অ্যাপে তার অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে বক্তব্য চাওয়া হয়। তবুও তার কোনো জবাব মেলেনি। শুক্রবারও তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।
এমএ
নিজস্ব প্রতিবেদক 























