বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ঘিরে বিতর্ক যেন থামছেই না। ব্যাংকটির অতীত পর্ষদ, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের ধারাবাহিকতার মধ্যেই এবার আরও এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে একজন বহুল বিতর্কিত ব্যক্তিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের উদ্যোগ। ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞজন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার দাবিতে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের বর্তমান পর্ষদ অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলী জারিয়াব নামের এক বিতর্কিত কর্মকর্তাকে নতুন এমডি পদে বসানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে এবং সেই নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে চূড়ান্ত অনুমোদনের নথিও পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে পুরো ব্যাংকিং খাতজুড়ে। সংশ্লিষ্টদের মত, যে দেশে ব্যাংকিং খাত আগে থেকেই অনিয়ম, লুটপাট ও খেলাপির দোষে জর্জরিত; সেখানে বহুবিধ অভিযোগে অভিযুক্ত একজন কর্মকর্তাকে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে বসানো হলে তা পুরো খাতের জন্য অত্যন্ত অশুভ সংকেত হতে পারে।
মোহাম্মদ আলী জারিয়াবের অতীত কর্মজীবন নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে দেখা যায়, তিনি প্রিমিয়ার ব্যাংক, পদ্মা (ফারমার্স) ব্যাংক এবং সর্বশেষ ফারইস্ট ফাইন্যান্সে দায়িত্ব পালনকালে বহুবিধ অনিয়ম, দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, অফিস আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং বিভিন্ন অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এসব অভিযোগের কারণে অতীতে তাকে এসব প্রতিষ্ঠানেই নানাবিধ বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে দাবি করেন তার সহকর্মীরা। এমনকি ফারইস্ট ফাইন্যান্সের শেয়ারহোল্ডার ও সাধারণ ডিপোজিটরদের অভিযোগের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছর তার পুনঃনিয়োগের সুপারিশও বাতিল করে দেয়। সেই অতীত থাকা সত্ত্বেও এবার তাকে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে, যা মূলত পর্ষদের একটি বিশেষ অংশের তৎপরতার ফল বলে ব্যাংকটির ভেতরের কিছু কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন।
ব্যাংক সূত্র মতে, জারিয়াব ব্যাংকিং খাতে ‘ইভিনিং ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দাবি করা হয়, তিনি নিয়মিত অফিস শুরু করতেন দুপুর ১টার পরে এবং অফিস করতেন রাত ১০টা পর্যন্ত। তার এই অস্বাভাবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। অভিযোগকারীরা বলেন, তিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি, বরং শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছেন। আবার ছোট ডিপোজিটরদের বকেয়া অর্থ পরিশোধে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ফারইস্ট ফাইন্যান্সে তার পাঁচ বছর মেয়াদী দায়িত্বকালকে অভিযোগকারীরা ‘ব্যক্তিগত লাভবান’-এর সময়কাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
জারিয়াবের নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক আরও প্রকট হয়েছে, তার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে পর্ষদের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান আতাউর রহমান এবং নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান মহসিন মিয়ার বিরুদ্ধে আগেও সুরুজ মিয়া স্পিনিং মিলস নামক একটি খেলাপি প্রতিষ্ঠানের ঋণ সুবিধা আদায়ের ব্যাপারে অস্বচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। চলতি বছরের জুলাই মাসে ব্যাংকের তখনকার এমডি মো. মোশারফ হোসেন পদত্যাগ করেন ওই প্রতিষ্ঠানের ৪৮ কোটি টাকার সুদ মওকুফে চাপ প্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর পর। মোশারফের সেই পদত্যাগ নিয়ে তখনো ব্যাংকিং খাতে তীব্র সমালোচনা হয়—যেখানে অভিযোগ ছিল, পর্ষদের বিশেষ একটি অংশ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ব্যাংকের স্বার্থকে গৌণ করে দেখেছে। কিন্তু সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংক এমডিকে সুরক্ষা না দিয়ে উল্টো পর্ষদের পক্ষে থেকেছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়। সেই বিতর্ক এখনো থিতু হয়নি, তার মধ্যেই আবারো পর্ষদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বিতর্কিত একজন কর্মকর্তাকে এমডি পদে বসানোর চেষ্টা চোখে পড়ায় আরও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম বারবার উঠে এসেছে—আজমত রহমান। অভিযোগ রয়েছে, আজমত রহমান ও তার পরিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে সখ্যতা তৈরির মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন এবং বিদেশে টাকা পাচারে যুক্ত থেকেছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার একাধিক নারী সঙ্গী রয়েছে এবং তাদেরকেই অর্থ পাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, তার গ্রুপের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিপোজিট বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে আটকে রয়েছে, এবং সেই অর্থ ছাড় করানোর জন্যই তিনি মোহাম্মদ আলী জারিয়াবকে এমডি করার জন্য নানা পর্যায়ে লবিং করছেন। এসব অভিযোগ সত্য হলে, তা ব্যাংকের সার্বিক নিরাপত্তা, সুশাসন এবং আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তার প্রশ্নে একটি অত্যন্ত গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জারিয়াবকে নিয়ে বিতর্কের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—তার বিরুদ্ধে অতীতে নারী সহকর্মীদের অভিযোগে যৌন হয়রানির মামলা, একাধিক থানায় সাধারণ ডায়েরি এবং মাদকাসক্তির অভিযোগ ছিল। এসবের কিছু মামলা এখনো চলমান বলে জানা যায়। তার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে করা রিট পিটিশনের নম্বর—১১৬৫/২০২২। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতসব চলমান অভিযোগ তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় তাকে রাষ্ট্রীয় একটি ব্যাংকের এমডি পদে বসানোর উদ্যোগ কেবল অযৌক্তিকই নয়, বরং ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি বিপজ্জনক বার্তা।
এদিকে, ব্যাংকটির কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পর্ষদের ভেতরের একটি গোষ্ঠী সব ধরনের নিয়ম-নীতিকে উপেক্ষা করে যেভাবে জারিয়াবকে নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে তা ব্যাংকটির সুশাসনকে আরও দুর্বল করে দেবে। অভিযোগ রয়েছে, পর্ষদের কিছু সদস্য জারিয়াবকে বসানোর বিনিময়ে নানাবিধ আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত, যা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মতিউর রহমান অবশ্য এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সার্চ কমিটি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জারিয়াবকে নির্বাচিত করেছে এবং তাদের সুপারিশেই তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, পর্ষদ বা ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্ররোচনা বা লবিং করা হয়নি। তবে তিনি এটাও জানান যে, সার্চ কমিটি জারিয়াবের বিরুদ্ধে থাকা এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতেন না। এই বক্তব্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—যদি সার্চ কমিটি এত গুরুতর অভিযোগ সম্পর্কে অবগত না থাকে, তাহলে তারা কীভাবে প্রার্থী মূল্যায়ন করল, আর যদি জানতেই না পারে তাহলে তাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া কতটা শক্তিশালী ছিল?
অন্যদিকে, ক্ষুব্ধ শেয়ারহোল্ডার ও ডিপোজিটররা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং এতে সাধারণ ডিপোজিটরদের বিশ্বাস আরও ক্ষুণ্ণ হবে। কিছু শেয়ারহোল্ডার বলছেন, ‘যে ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানে অভিযোগের কারণে টিকতে পারেননি, যার বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণ, মাদক সেবন, আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে—তাকে যদি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে বসানো হয়—তাহলে এর দায় কে নেবে?’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক গত কয়েক বছরে নানা অস্থিরতা, ঋণখেলাপি সমস্যা, পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এবং ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে একটি চ্যালেঞ্জিং অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকটির সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন বহুবার উঠেছে এবং আমানতকারীরা অনেক সময়ই হতাশ হন ব্যাংকের সার্বিক কাঠামো দেখে। সেই পরিস্থিতিতে আরও একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ব্যাংকটির ভবিষ্যৎকে গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন যে, বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই বিতর্কিত নিয়োগ হলো কি না। তবে যেভাবে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার নানা প্রশ্ন এবং নথিপত্রবিহীন প্রভাব খাটানোর কথা সামনে এসেছে—তা মনে করিয়ে দেয় ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থার বাস্তব চিত্র। ব্যাংকটি যে নতুন করে সুশাসনের পথে ফিরবে—এমন আশা যতক্ষণ না স্বচ্ছ তদন্ত, নিরপেক্ষ ব্যবস্থা এবং যথাযথ নীতির প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে—ততক্ষণ সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। আর জারিয়াবের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানোর উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও সংকটে ফেলবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও জানা যায়, এই নিয়োগ ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তথ্যসহকারে চিঠি পাঠানো হয়েছে কয়েকজন বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীর পক্ষ থেকে। তারা দাবি করেছেন, জারিয়াবকে নিয়োগ দেওয়া হলে ব্যাংকের ক্ষতি হবে এবং তারা আইনগত প্রতিকার পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই সিদ্ধান্ত কতটা দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের স্বচ্ছতা ও সুশাসনকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়।
যদিও জারিয়াব নিজে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন—তবু অভিযোগের পরিমাণ, প্রকৃতি এবং অতীতের কর্মকাণ্ড বিবেচনা করলে সেই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এখন সবার দৃষ্টি বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে, কারণ সেটাই নির্ধারণ করবে দেশের ব্যাংকিং খাত আরেকটি বিতর্কিত নিয়োগের বোঝা বইবে, নাকি কিছুটা হলেও স্বচ্ছতার পথে ফিরবে।
সংবাদ শিরোনাম ::
মহাবিতর্কিত জারিয়াবকে এমডি করা নিয়ে কমার্স ব্যাংকে ঝড়
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১১:৩৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫
- ৫৪৯ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ





















