ঢাকা ০৯:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
আইইউবিতে মঞ্চস্থ হলো ইবসেনের কালজয়ী নাটকের আধুনিক রূপ নির্বাচনের পর পদত্যাগ করতে চান রাষ্ট্রপতি : রয়টার্স স্থানীয় সরকারে আদিলুর, তথ্যে রিজওয়ানা, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পেলেন আসিফ নজরুল ঢাকা-২০ আসনে এনসিপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদ নিয়ম ভাঙলেই এক্রিডিটেশন বাতিল, হুঁশিয়ারি বিসিবির ৩২ ঘণ্টায়ও সন্ধান মেলেনি শিশু সাজিদের, হাল ছাড়ছে না ফায়ার সার্ভিস দাফনের সময় কবরে পড়ে যায় মোবাইল, এক রাত পর মাটি সরিয়ে উদ্ধার তারাগঞ্জে গোপন নিয়োগ ও সাংবাদিক হেনস্তার অভিযোগে মানববন্ধন মেসির সঙ্গে নিজ থেকেই দেখা করবেন শাহরুখ সংবর্ধনা পাচ্ছেন হকি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা আমিরুল
কুতুবদিয়ায় ১৪৩ প্রকল্পের বরাদ্দে কমিশন বাণিজ্য

ইউএনও ক্যথোয়াইপ্রু মারমা এবং পিআইও কাউছার আহমেদের ৪৬ লাখ টাকা লুটপাটের অভিযোগ

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে কুতুবদিয়ায় চাল ও গম বরাদ্দের মাধ্যমে বাস্তবায়িত ১৪৩টি প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে ইউএনও ক্যথোয়াইপ্রু মারমা এবং পিআইও কাউছার আহমেদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরাদ্দের প্রতিটি প্রকল্প থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ কমিশন আদায় করে এই দুই কর্মকর্তা মোট ৪৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা নিজেদের পকেটে ভরেছেন।
দুর্নীতি ও অনিয়মের এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে স্থানীয়রা মনে করছেন, শুধু সরকারি তহবিলের ক্ষতি হচ্ছে না, বরং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও ধ্বংস হচ্ছে। প্রকল্পগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন না হওয়া, বরাদ্দের অংশ কমিশন হিসেবে নেওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে নামে বেনামে অনুমোদন নেওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের কাছে নিয়মিত অভিযোগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্প বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন : সরকারি বরাদ্দের তথ্য অনুযায়ী, কুতুবদিয়ায় টিআর কাবিখা-কাবিটা প্রকল্পের জন্য মোট ৩ কোটি ৬০ লাখ ৫৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দের মধ্যে প্রথম কিস্তিতে ৯৩ লাখ ৭৩ হাজার ৯৮০ টাকা, দ্বিতীয় কিস্তিতে ১ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার ১১৯ টাকা এবং তৃতীয় কিস্তিতে ৯৭ লাখ ৫২ হাজার টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। এছাড়াও প্রথম ও তৃতীয় কিস্তিতে যথাক্রমে ৭২ মেট্রিক টন এবং ২৮ মেট্রিক টন চাল ও গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বরাদ্দ অনুযায়ী প্রকল্পগুলোকে বিভিন্ন কিস্তিতে বিভক্ত করে বাস্তবায়ন করা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির টিআর বরাদ্দ থেকে ৪৭টি প্রকল্প, নগদ বরাদ্দ থেকে ২৫টি প্রকল্প, চাল বরাদ্দ থেকে ৭টি প্রকল্প এবং গম বরাদ্দ থেকে ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। তৃতীয় কিস্তিতে টিআর বরাদ্দে ৩০টি প্রকল্প, কাবিটা বরাদ্দে ১০টি প্রকল্প, কাবিখা বরাদ্দে ৭টি প্রকল্প এবং গম বরাদ্দে ৭টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
এই হিসাব অনুযায়ী, মোট ১৪৩টি প্রকল্প কুতুবদিয়ায় বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এই প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দের যথেষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে ইউএনও ও পিআইও গ্রহণ করেছেন।
কমিশন বাণিজ্যের চিত্র : স্থানীয় ইউপি সদস্য ও প্রকল্প সভাপতির সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, পিআইও অফিস থেকে বরাদ্দ প্রাপ্তির পর প্রকল্পের মূল বরাদ্দ থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ হারে ভ্যাট ও আয়কর কেটে নেওয়া হয়। স্থানীয়রা বলছেন, যদি এই টাকা না দেওয়া হয়, তবে অফিসের কার্য সহকারী মনিরুজ্জামান রাগারাগি করে। এতে বাধ্য হয়ে প্রকল্প সভাপতিদের কমিশন পরিশোধ করতে হয়।
এক ইউপি সদস্য বলেন, “প্রতি প্রকল্পের মূল বরাদ্দ থেকে এই টাকা কেটে নেওয়া হয়। কখনও কখনও আমাদের কাছে পুরো প্রকল্প বরাদ্দ পৌঁছায় না। বাধ্য হয়ে আমরা কমিশন পরিশোধ করি, না হলে অফিসে সমস্যা হয়।”
অন্য একজন প্রকল্প সভাপতি জানান, “আমরা প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো করি, কিন্তু বরাদ্দ আসার সময় যে পরিমাণ টাকা পাওয়া উচিত, তার একটি বড় অংশ অফিসে থেকেই কেটে নেওয়া হয়। ইউএনও এবং পিআইও এই কার্যক্রমে সরাসরি জড়িত।”
সরকারি বরাদ্দ ও প্রকল্প অনুমোদন : বরাদ্দের কাগজে দেখা যায়, ৫ মার্চ কক্সবাজারের সাবেক জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে কুতুবদিয়া উপজেলার জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির অনুকূলে যথাক্রমে ৯৩ লাখ ৭৩ হাজার ৯৮০ টাকা এবং ১ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার ১১৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া প্রথম কিস্তিতে ৭২ মেট্রিক টন চাল (যার বাজার মূল্য ২৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা) ও ৭২ মেট্রিক টন গম (যার বাজার মূল্য ২১ লাখ ১৬ হাজার টাকা) বরাদ্দ করা হয়। তৃতীয় কিস্তিতে ৯৭ লাখ ৫২ হাজার টাকা এবং ২৮ মেট্রিক টন চাল ও ২৮ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বুধবার পর্যন্ত স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, বরাদ্দের প্রতিটি কিস্তি থেকে প্রকল্প অনুমোদন নেওয়া হয় এবং বরাদ্দের একটি অংশ কমিশন হিসেবে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প নামের পাশে শুধু অনুমোদন দেওয়া হয়, প্রকৃত কাজ হয় না, তবে বরাদ্দ অফিসে যাচাই ছাড়াই কেটে নেওয়া হয়।
তদন্তের স্থিতি : ইতোমধ্যে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে ‘বরাদ্দের অর্ধকোটি টাকা লোপাট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদের সত্যতা যাচাই করার জন্য ১২ অক্টোবর কুতুবদিয়া এলাকায় সরেজমিন তদন্তে যান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপসচিব কাজী মো. বদরুজ্জামান।
তদন্তে এক মাস পার হলেও এখনও কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন, প্রকল্প বরাদ্দ ও কমিশন বাণিজ্যের বিষয়টি গোপন রাখা হচ্ছে এবং প্রকল্পের বরাদ্দ লুটপাটের দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
একজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, “তদন্ত হিমঘরে রাখার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। মানুষ মনে করছেন, সরকারি বরাদ্দের পুরো অংশ কিছু কর্মকর্তার পকেটে চলে যাচ্ছে।”
স্থানীয় ইউপি সদস্যরা অভিযোগ করছেন, প্রকল্প বরাদ্দে কমিশন নেওয়া না হলে প্রকল্পের কাজে নানা জটিলতা তৈরি হয়। অফিসের কর্মকর্তারা চাপে রাখে এবং প্রকল্প সভাপতিদের মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়।
এক ইউপি সদস্য বলেন, “প্রকল্প বরাদ্দ আমাদের কাজের জন্য আসে, কিন্তু প্রকৃত বরাদ্দ আমাদের কাছে আসে না। সবসময় কমিশন কেটে নেওয়া হয়। এটি স্থানীয় উন্নয়নের জন্য খুবই ক্ষতিকর।”
অন্য একজন প্রকল্প সভাপতি জানান, “আমরা কাজ করি, কিন্তু প্রকল্পের বরাদ্দ আসে না। বরাদ্দের টাকা অফিসে গিয়ে হয়তো কমিশন হিসেবে নেওয়া হয়। প্রকল্পের কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না।”
সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা : দুর্নীতি ও বরাদ্দ লুটপাটের বিষয়ে স্থানীয়রা দাবি করছেন, সরকারের উচিত অবিলম্বে তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অনেক স্থানীয় নেতার মতে, প্রকল্প বরাদ্দের এই ধারা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এবং এখন এর কোনো সমাধান করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, সরকারি বরাদ্দ লুটপাট ও কমিশন বাণিজ্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে না, বরং স্থানীয় মানুষের মধ্যে ভ্রষ্টাচারের সংস্কৃতি গড়ে তুলছে। প্রকল্পের বরাদ্দের এই অনিয়ম স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বারবার অনুরোধেও কর্মকর্তারা বক্তব্য দিতে রাজি নয় : এ বিষয়ে জানতে কুতুবদিয়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কাউছার আহমেদের মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে টেক্সট পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। একইভাবে ইউএনও ক্যথোয়াইপ্রু মারমার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, কর্মকর্তারা অভিযোগে মুখ খুলতে অনিচ্ছুক। এতে সরকারের উদ্যোগ ও নিয়ন্ত্রণহীনতা স্পষ্ট হয়। প্রকল্প বরাদ্দের অস্বচ্ছতা ও কমিশন বাণিজ্যের ঘটনা তাদের আরও উদ্বিগ্ন করছে।
কুতুবদিয়ায় ১৪৩ প্রকল্প বরাদ্দের এই ঘটনা শুধু একটি জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের সমস্যা নয়। এটি বাংলাদেশের দুর্নীতি, প্রকল্প বরাদ্দ লুটপাট এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমের অস্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত।
স্থানীয়রা আশা করছেন, সরকারের উচিত দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রকল্প বরাদ্দের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল করা। প্রকল্প বরাদ্দের এই ধরনের কমিশন বাণিজ্য বন্ধ না হলে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাবে এবং সরকারি তহবিলের ক্ষতি অব্যাহত থাকবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

আইইউবিতে মঞ্চস্থ হলো ইবসেনের কালজয়ী নাটকের আধুনিক রূপ

কুতুবদিয়ায় ১৪৩ প্রকল্পের বরাদ্দে কমিশন বাণিজ্য

ইউএনও ক্যথোয়াইপ্রু মারমা এবং পিআইও কাউছার আহমেদের ৪৬ লাখ টাকা লুটপাটের অভিযোগ

আপডেট সময় ০১:৩৮:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে কুতুবদিয়ায় চাল ও গম বরাদ্দের মাধ্যমে বাস্তবায়িত ১৪৩টি প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে ইউএনও ক্যথোয়াইপ্রু মারমা এবং পিআইও কাউছার আহমেদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরাদ্দের প্রতিটি প্রকল্প থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ কমিশন আদায় করে এই দুই কর্মকর্তা মোট ৪৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা নিজেদের পকেটে ভরেছেন।
দুর্নীতি ও অনিয়মের এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে স্থানীয়রা মনে করছেন, শুধু সরকারি তহবিলের ক্ষতি হচ্ছে না, বরং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও ধ্বংস হচ্ছে। প্রকল্পগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন না হওয়া, বরাদ্দের অংশ কমিশন হিসেবে নেওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে নামে বেনামে অনুমোদন নেওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের কাছে নিয়মিত অভিযোগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্প বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন : সরকারি বরাদ্দের তথ্য অনুযায়ী, কুতুবদিয়ায় টিআর কাবিখা-কাবিটা প্রকল্পের জন্য মোট ৩ কোটি ৬০ লাখ ৫৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দের মধ্যে প্রথম কিস্তিতে ৯৩ লাখ ৭৩ হাজার ৯৮০ টাকা, দ্বিতীয় কিস্তিতে ১ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার ১১৯ টাকা এবং তৃতীয় কিস্তিতে ৯৭ লাখ ৫২ হাজার টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। এছাড়াও প্রথম ও তৃতীয় কিস্তিতে যথাক্রমে ৭২ মেট্রিক টন এবং ২৮ মেট্রিক টন চাল ও গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বরাদ্দ অনুযায়ী প্রকল্পগুলোকে বিভিন্ন কিস্তিতে বিভক্ত করে বাস্তবায়ন করা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির টিআর বরাদ্দ থেকে ৪৭টি প্রকল্প, নগদ বরাদ্দ থেকে ২৫টি প্রকল্প, চাল বরাদ্দ থেকে ৭টি প্রকল্প এবং গম বরাদ্দ থেকে ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। তৃতীয় কিস্তিতে টিআর বরাদ্দে ৩০টি প্রকল্প, কাবিটা বরাদ্দে ১০টি প্রকল্প, কাবিখা বরাদ্দে ৭টি প্রকল্প এবং গম বরাদ্দে ৭টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
এই হিসাব অনুযায়ী, মোট ১৪৩টি প্রকল্প কুতুবদিয়ায় বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এই প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দের যথেষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে ইউএনও ও পিআইও গ্রহণ করেছেন।
কমিশন বাণিজ্যের চিত্র : স্থানীয় ইউপি সদস্য ও প্রকল্প সভাপতির সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, পিআইও অফিস থেকে বরাদ্দ প্রাপ্তির পর প্রকল্পের মূল বরাদ্দ থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ হারে ভ্যাট ও আয়কর কেটে নেওয়া হয়। স্থানীয়রা বলছেন, যদি এই টাকা না দেওয়া হয়, তবে অফিসের কার্য সহকারী মনিরুজ্জামান রাগারাগি করে। এতে বাধ্য হয়ে প্রকল্প সভাপতিদের কমিশন পরিশোধ করতে হয়।
এক ইউপি সদস্য বলেন, “প্রতি প্রকল্পের মূল বরাদ্দ থেকে এই টাকা কেটে নেওয়া হয়। কখনও কখনও আমাদের কাছে পুরো প্রকল্প বরাদ্দ পৌঁছায় না। বাধ্য হয়ে আমরা কমিশন পরিশোধ করি, না হলে অফিসে সমস্যা হয়।”
অন্য একজন প্রকল্প সভাপতি জানান, “আমরা প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো করি, কিন্তু বরাদ্দ আসার সময় যে পরিমাণ টাকা পাওয়া উচিত, তার একটি বড় অংশ অফিসে থেকেই কেটে নেওয়া হয়। ইউএনও এবং পিআইও এই কার্যক্রমে সরাসরি জড়িত।”
সরকারি বরাদ্দ ও প্রকল্প অনুমোদন : বরাদ্দের কাগজে দেখা যায়, ৫ মার্চ কক্সবাজারের সাবেক জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে কুতুবদিয়া উপজেলার জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির অনুকূলে যথাক্রমে ৯৩ লাখ ৭৩ হাজার ৯৮০ টাকা এবং ১ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার ১১৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া প্রথম কিস্তিতে ৭২ মেট্রিক টন চাল (যার বাজার মূল্য ২৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা) ও ৭২ মেট্রিক টন গম (যার বাজার মূল্য ২১ লাখ ১৬ হাজার টাকা) বরাদ্দ করা হয়। তৃতীয় কিস্তিতে ৯৭ লাখ ৫২ হাজার টাকা এবং ২৮ মেট্রিক টন চাল ও ২৮ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বুধবার পর্যন্ত স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, বরাদ্দের প্রতিটি কিস্তি থেকে প্রকল্প অনুমোদন নেওয়া হয় এবং বরাদ্দের একটি অংশ কমিশন হিসেবে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প নামের পাশে শুধু অনুমোদন দেওয়া হয়, প্রকৃত কাজ হয় না, তবে বরাদ্দ অফিসে যাচাই ছাড়াই কেটে নেওয়া হয়।
তদন্তের স্থিতি : ইতোমধ্যে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে ‘বরাদ্দের অর্ধকোটি টাকা লোপাট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদের সত্যতা যাচাই করার জন্য ১২ অক্টোবর কুতুবদিয়া এলাকায় সরেজমিন তদন্তে যান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপসচিব কাজী মো. বদরুজ্জামান।
তদন্তে এক মাস পার হলেও এখনও কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন, প্রকল্প বরাদ্দ ও কমিশন বাণিজ্যের বিষয়টি গোপন রাখা হচ্ছে এবং প্রকল্পের বরাদ্দ লুটপাটের দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
একজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, “তদন্ত হিমঘরে রাখার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। মানুষ মনে করছেন, সরকারি বরাদ্দের পুরো অংশ কিছু কর্মকর্তার পকেটে চলে যাচ্ছে।”
স্থানীয় ইউপি সদস্যরা অভিযোগ করছেন, প্রকল্প বরাদ্দে কমিশন নেওয়া না হলে প্রকল্পের কাজে নানা জটিলতা তৈরি হয়। অফিসের কর্মকর্তারা চাপে রাখে এবং প্রকল্প সভাপতিদের মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়।
এক ইউপি সদস্য বলেন, “প্রকল্প বরাদ্দ আমাদের কাজের জন্য আসে, কিন্তু প্রকৃত বরাদ্দ আমাদের কাছে আসে না। সবসময় কমিশন কেটে নেওয়া হয়। এটি স্থানীয় উন্নয়নের জন্য খুবই ক্ষতিকর।”
অন্য একজন প্রকল্প সভাপতি জানান, “আমরা কাজ করি, কিন্তু প্রকল্পের বরাদ্দ আসে না। বরাদ্দের টাকা অফিসে গিয়ে হয়তো কমিশন হিসেবে নেওয়া হয়। প্রকল্পের কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না।”
সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা : দুর্নীতি ও বরাদ্দ লুটপাটের বিষয়ে স্থানীয়রা দাবি করছেন, সরকারের উচিত অবিলম্বে তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অনেক স্থানীয় নেতার মতে, প্রকল্প বরাদ্দের এই ধারা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এবং এখন এর কোনো সমাধান করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, সরকারি বরাদ্দ লুটপাট ও কমিশন বাণিজ্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে না, বরং স্থানীয় মানুষের মধ্যে ভ্রষ্টাচারের সংস্কৃতি গড়ে তুলছে। প্রকল্পের বরাদ্দের এই অনিয়ম স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বারবার অনুরোধেও কর্মকর্তারা বক্তব্য দিতে রাজি নয় : এ বিষয়ে জানতে কুতুবদিয়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কাউছার আহমেদের মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে টেক্সট পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। একইভাবে ইউএনও ক্যথোয়াইপ্রু মারমার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, কর্মকর্তারা অভিযোগে মুখ খুলতে অনিচ্ছুক। এতে সরকারের উদ্যোগ ও নিয়ন্ত্রণহীনতা স্পষ্ট হয়। প্রকল্প বরাদ্দের অস্বচ্ছতা ও কমিশন বাণিজ্যের ঘটনা তাদের আরও উদ্বিগ্ন করছে।
কুতুবদিয়ায় ১৪৩ প্রকল্প বরাদ্দের এই ঘটনা শুধু একটি জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের সমস্যা নয়। এটি বাংলাদেশের দুর্নীতি, প্রকল্প বরাদ্দ লুটপাট এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমের অস্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত।
স্থানীয়রা আশা করছেন, সরকারের উচিত দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রকল্প বরাদ্দের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল করা। প্রকল্প বরাদ্দের এই ধরনের কমিশন বাণিজ্য বন্ধ না হলে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাবে এবং সরকারি তহবিলের ক্ষতি অব্যাহত থাকবে।