ঢাকা ০৮:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় কোরআন খতম ও এতিমদের মাঝে খাবার বিতরণ রোকেয়া দিবসের মেলা কমিটিতে অভিজ্ঞদের বাদ, কৃষক দলের নাম ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক ভূমি কর্মকর্তার জহুরুল হকের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ বাঞ্ছারামপুরে ইউপি সদস্য আবু মুসা হত্যা মামলার প্রধান আসামি সায়েম মিয়া গ্রেপ্তার দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনায় পাবনায় দোয়া মাহফিল শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন নেভানোর মহড়া অনুষ্ঠিত শুরুর আগেই এশিয়া কাপ শেষ বাংলাদেশি তারকার সিলেটে ৪টি আসনে নতুন করে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন যারা টানা ৪ মাস কমলো দেশের পণ্য রপ্তানি বগুড়ার শেরপুরে খরের পালা পুরে ছাই
ভিডব্লিউবির প্রায় ১০ হাজার বস্তা চাল গুদামে আটকে

আবু বেলাল ছিদ্দিকের তালিকা বদল ও স্বেচ্ছাচারিতায় চার মাস ধরে বন্ধ বিতরণ

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কার্যক্রমের আওতায় দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য বরাদ্দ করা প্রায় ১০ হাজার বস্তা চাল গত চার মাস ধরে উপজেলা খাদ্যগুদামে পড়ে আছে, কিন্তু বিতরণ শুরু হয়নি। এর জন্য মূলত দায়ী করা হচ্ছে উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আবু বেলাল ছিদ্দিককে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে একই পদে থেকে নানা অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত।
সুবিধাভোগীরা প্রতিদিন ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ফিরে আসছেন খালি হাতে। খাদ্যগুদাম কর্তৃপক্ষ চাপের মুখে পড়েছে অতিরিক্ত মজুত নিয়ে। ইউএনওর বারবার নির্দেশ সত্ত্বেও চাল বিতরণ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে-একজন কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারিতা কি পুরো সরকারি কার্যক্রমকে অচল করে দিতে পারে?
চার মাসের চাল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্যভাবে আটকে রাখা : বালিয়াডাঙ্গী খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা শাখাওয়াৎ হোসেন জানান, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসের জন্য ৩০ কেজি করে ৯ হাজার ৮৩২ বস্তা চাল তাদের গুদামে জমা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদন এলেই এসব চাল সরাসরি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদে পাঠানো উচিত ছিল।
তিনি বলেন, “আমরা বারবার মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছি চাল বিতরণ প্রক্রিয়া শুরু করতে। কিন্তু তিনি কোনো উদ্যোগ নেননি। নভেম্বর মাসের চালও এখন যোগ হলে গুদামে জায়গা সংকট দেখা দেবে।”
গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ চাল গুদামে পড়ে থাকায় খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বিব্রত। তবে তারা নিয়ম অনুসারে মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ছাড়াই বিতরণ করতে পারছেন না।
ইউএনওর নির্দেশ উপেক্ষা : লটারির মাধ্যমে সুবিধাভোগী তালিকা প্রস্তুত করে পূর্বের ইউএনও পলাশ কুমার দেবনাথ জুলাই মাসে তালিকা অনুমোদন করেন। পরবর্তীতে নতুন ইউএনও মফিজুর রহমান দায়িত্ব নিয়ে একই তালিকার ভিত্তিতে চাল বিতরণের অনুমোদন দেন।
কিন্তু অভিযোগ হলো- মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আবু বেলাল ছিদ্দিক ইউএনওর সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে বিতরণ স্থগিত রাখেন।
ইউএনও মফিজুর রহমান বলেন, “বিতরণের জন্য আনা চাল গুদামে ফেলে রাখার কোনো সুযোগ নেই। বারবার বলেছি চাল বিতরণ করতে। কিন্তু তিনি (মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা) কোনো পদক্ষেপ নেননি। এটি দায়িত্বহীনতা ও অনিয়ম।”
ইউএনওর নির্দেশ অমান্য করে একজন কর্মকর্তা কীভাবে চার মাস ধরে পুরো সরকারি কর্মকাণ্ডকে আটকে রাখতে পারেন, তা নিয়েও প্রশাসনে ক্ষোভ রয়েছে।
যোগ্য নারী বাদ, নতুন ‘পছন্দের’ নাম যোগের চেষ্টা : উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আবু বেলাল ছিদ্দিক তালিকা থেকে প্রায় ২৫০ জনের নাম বাদ দিয়ে নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।” দুওসুও, ধনতলা ও চাড়োল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সচিবরা এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন ইউএনওর কাছে। তাদের দাবি, লটারিতে নাম ওঠা নারীরা প্রতিদিন ইউনিয়ন পরিষদে এসে জানতে চান কখন চাল দেওয়া হবে। কিন্তু মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা তালিকা পরিবর্তনের চেষ্টা করতে গিয়ে সবকিছু আটকে দিয়েছেন।
একজন ইউপি সচিব বলেন, “আমরা তো জনগণের মুখোমুখি হচ্ছি প্রতিদিন। মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার অফিস থেকে কোনো নির্দেশনা না আসায় মানুষের অভিযোগ শুনে নিরুপায় হয়ে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।”
‘আমার কিছু করার নেই’-অভিযোগে নির্লিপ্ত মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা : তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। কিন্তু কেন চার মাস ধরে চাল গুদামে আটকে রাখা হলো-এ প্রশ্নে তিনি মন্তব্য করেন, “নতুন তালিকায় স্বাক্ষর হলেই বিতরণ শুরু হবে। আমার কিছু করার নেই।” তার এই বক্তব্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রতি দায়িত্বহীনতার পরিচয় বলে মনে করছেন জনপ্রতিনিধিরা। একজন ইউপি চেয়ারম্যান বলেন,
“এ ধরনের বক্তব্য একটি সরকারি কর্মকর্তার মুখে মানায় না। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়া আটকে রেখেছেন।”
৮ বছরে সাত ইউএনও বদলি-তিনি বহাল তবিয়তে : আবু বেলাল ছিদ্দিক ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর বালিয়াডাঙ্গীতে যোগদান করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহির অভাব এবং তালিকা পরিবর্তনের চেষ্টার মতো নানা ঘটনায় তিনি একাধিকবার আলোচনায় আসেন। গত আট বছরে সাতজন ইউএনও বদলি হলেও তিনি একই পদে বহাল রয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি রাণীশংকৈল উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, “একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকলে এমন ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পদে বহাল থাকা আরও বড় প্রশ্ন তুলে।”
ভিডব্লিউবি কার্ডধারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। লটারিতে নাম ওঠার পর তারা মনে করেছিলেন নিয়ম মতো চাল পাবেন। কিন্তু বাস্তবে তারা চার মাস ধরে হয়রানি ও দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন। দুওসুও ইউনিয়নের এক সুবিধাভোগী নারী বলেন, “প্রতিবার গিয়ে বলছে, ‘চাল আসেনি’ বা ‘কাগজ আসে নাই’। গরিবের চাল গুদামে পড়ে থাকে, আর আমরা ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত।”
আরেকজন বলেন, “লটারিতে নাম ওঠার পরও কেন চাল পাই না? আমাদের নাম কি কেটে দিছে?” জরুরি খাদ্য সহায়তার এই কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ায় অনেকে ঋণ, ধারুদেনা ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
সাবেক ইউএনও পলাশ কুমার দেবনাথ জানান, “লটারিতে যাদের নাম উঠেছে তারাই সুবিধাভোগী। কাউকে বাদ দিয়ে বা পূর্বের তারিখ দিয়ে নতুন তালিকা তৈরির কোনো সুযোগ নেই। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি।” তিনি আরও বলেন, “আমি বদলি হওয়ার আগে সব প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করে গিয়েছিলাম।”
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবদ্ধতার অংশ হিসেবে ভিডব্লিউবি প্রকল্পটি দরিদ্র নারীদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু বালিয়াডাঙ্গীতে এই প্রকল্প কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ-মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আবু বেলাল ছিদ্দিকের বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক অভিযোগ। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, “তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।” জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, “সমস্ত সমস্যার মূলে একজন ব্যক্তি। তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত করছেন।”
আইন অনুযায়ী, সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের খাদ্যসামগ্রী বিতরণে বিলম্ব, অনিয়ম বা ইচ্ছাকৃত আটকে রাখার বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা প্রশাসনিক তদন্তের আওতাভুক্ত হতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, “একজন কর্মকর্তা যদি তালিকা পরিবর্তন করে নিজের পছন্দমতো সুবিধাভোগী যুক্ত করার চেষ্টা করেন এবং এ কারণে চাল বিতরণ ব্যাহত হয়, এটি দুর্নীতির শামিল।”
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার প্রায় আড়াই হাজার দরিদ্র নারী চার মাস ধরে চালের অপেক্ষায়। কিন্তু মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার অনীহা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং তালিকা পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় তাদের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। ইউএনওর নির্দেশও কার্যকর হচ্ছে নাএটি স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দ্রুত তদন্ত, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় কোরআন খতম ও এতিমদের মাঝে খাবার বিতরণ

ভিডব্লিউবির প্রায় ১০ হাজার বস্তা চাল গুদামে আটকে

আবু বেলাল ছিদ্দিকের তালিকা বদল ও স্বেচ্ছাচারিতায় চার মাস ধরে বন্ধ বিতরণ

আপডেট সময় ০১:০৬:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কার্যক্রমের আওতায় দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য বরাদ্দ করা প্রায় ১০ হাজার বস্তা চাল গত চার মাস ধরে উপজেলা খাদ্যগুদামে পড়ে আছে, কিন্তু বিতরণ শুরু হয়নি। এর জন্য মূলত দায়ী করা হচ্ছে উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আবু বেলাল ছিদ্দিককে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে একই পদে থেকে নানা অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত।
সুবিধাভোগীরা প্রতিদিন ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ফিরে আসছেন খালি হাতে। খাদ্যগুদাম কর্তৃপক্ষ চাপের মুখে পড়েছে অতিরিক্ত মজুত নিয়ে। ইউএনওর বারবার নির্দেশ সত্ত্বেও চাল বিতরণ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে-একজন কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারিতা কি পুরো সরকারি কার্যক্রমকে অচল করে দিতে পারে?
চার মাসের চাল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্যভাবে আটকে রাখা : বালিয়াডাঙ্গী খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা শাখাওয়াৎ হোসেন জানান, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসের জন্য ৩০ কেজি করে ৯ হাজার ৮৩২ বস্তা চাল তাদের গুদামে জমা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদন এলেই এসব চাল সরাসরি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদে পাঠানো উচিত ছিল।
তিনি বলেন, “আমরা বারবার মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছি চাল বিতরণ প্রক্রিয়া শুরু করতে। কিন্তু তিনি কোনো উদ্যোগ নেননি। নভেম্বর মাসের চালও এখন যোগ হলে গুদামে জায়গা সংকট দেখা দেবে।”
গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ চাল গুদামে পড়ে থাকায় খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বিব্রত। তবে তারা নিয়ম অনুসারে মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ছাড়াই বিতরণ করতে পারছেন না।
ইউএনওর নির্দেশ উপেক্ষা : লটারির মাধ্যমে সুবিধাভোগী তালিকা প্রস্তুত করে পূর্বের ইউএনও পলাশ কুমার দেবনাথ জুলাই মাসে তালিকা অনুমোদন করেন। পরবর্তীতে নতুন ইউএনও মফিজুর রহমান দায়িত্ব নিয়ে একই তালিকার ভিত্তিতে চাল বিতরণের অনুমোদন দেন।
কিন্তু অভিযোগ হলো- মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আবু বেলাল ছিদ্দিক ইউএনওর সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে বিতরণ স্থগিত রাখেন।
ইউএনও মফিজুর রহমান বলেন, “বিতরণের জন্য আনা চাল গুদামে ফেলে রাখার কোনো সুযোগ নেই। বারবার বলেছি চাল বিতরণ করতে। কিন্তু তিনি (মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা) কোনো পদক্ষেপ নেননি। এটি দায়িত্বহীনতা ও অনিয়ম।”
ইউএনওর নির্দেশ অমান্য করে একজন কর্মকর্তা কীভাবে চার মাস ধরে পুরো সরকারি কর্মকাণ্ডকে আটকে রাখতে পারেন, তা নিয়েও প্রশাসনে ক্ষোভ রয়েছে।
যোগ্য নারী বাদ, নতুন ‘পছন্দের’ নাম যোগের চেষ্টা : উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আবু বেলাল ছিদ্দিক তালিকা থেকে প্রায় ২৫০ জনের নাম বাদ দিয়ে নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।” দুওসুও, ধনতলা ও চাড়োল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সচিবরা এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন ইউএনওর কাছে। তাদের দাবি, লটারিতে নাম ওঠা নারীরা প্রতিদিন ইউনিয়ন পরিষদে এসে জানতে চান কখন চাল দেওয়া হবে। কিন্তু মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা তালিকা পরিবর্তনের চেষ্টা করতে গিয়ে সবকিছু আটকে দিয়েছেন।
একজন ইউপি সচিব বলেন, “আমরা তো জনগণের মুখোমুখি হচ্ছি প্রতিদিন। মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার অফিস থেকে কোনো নির্দেশনা না আসায় মানুষের অভিযোগ শুনে নিরুপায় হয়ে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।”
‘আমার কিছু করার নেই’-অভিযোগে নির্লিপ্ত মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা : তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। কিন্তু কেন চার মাস ধরে চাল গুদামে আটকে রাখা হলো-এ প্রশ্নে তিনি মন্তব্য করেন, “নতুন তালিকায় স্বাক্ষর হলেই বিতরণ শুরু হবে। আমার কিছু করার নেই।” তার এই বক্তব্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রতি দায়িত্বহীনতার পরিচয় বলে মনে করছেন জনপ্রতিনিধিরা। একজন ইউপি চেয়ারম্যান বলেন,
“এ ধরনের বক্তব্য একটি সরকারি কর্মকর্তার মুখে মানায় না। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়া আটকে রেখেছেন।”
৮ বছরে সাত ইউএনও বদলি-তিনি বহাল তবিয়তে : আবু বেলাল ছিদ্দিক ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর বালিয়াডাঙ্গীতে যোগদান করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহির অভাব এবং তালিকা পরিবর্তনের চেষ্টার মতো নানা ঘটনায় তিনি একাধিকবার আলোচনায় আসেন। গত আট বছরে সাতজন ইউএনও বদলি হলেও তিনি একই পদে বহাল রয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি রাণীশংকৈল উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, “একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকলে এমন ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পদে বহাল থাকা আরও বড় প্রশ্ন তুলে।”
ভিডব্লিউবি কার্ডধারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। লটারিতে নাম ওঠার পর তারা মনে করেছিলেন নিয়ম মতো চাল পাবেন। কিন্তু বাস্তবে তারা চার মাস ধরে হয়রানি ও দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন। দুওসুও ইউনিয়নের এক সুবিধাভোগী নারী বলেন, “প্রতিবার গিয়ে বলছে, ‘চাল আসেনি’ বা ‘কাগজ আসে নাই’। গরিবের চাল গুদামে পড়ে থাকে, আর আমরা ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত।”
আরেকজন বলেন, “লটারিতে নাম ওঠার পরও কেন চাল পাই না? আমাদের নাম কি কেটে দিছে?” জরুরি খাদ্য সহায়তার এই কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ায় অনেকে ঋণ, ধারুদেনা ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
সাবেক ইউএনও পলাশ কুমার দেবনাথ জানান, “লটারিতে যাদের নাম উঠেছে তারাই সুবিধাভোগী। কাউকে বাদ দিয়ে বা পূর্বের তারিখ দিয়ে নতুন তালিকা তৈরির কোনো সুযোগ নেই। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি।” তিনি আরও বলেন, “আমি বদলি হওয়ার আগে সব প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করে গিয়েছিলাম।”
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবদ্ধতার অংশ হিসেবে ভিডব্লিউবি প্রকল্পটি দরিদ্র নারীদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু বালিয়াডাঙ্গীতে এই প্রকল্প কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ-মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আবু বেলাল ছিদ্দিকের বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক অভিযোগ। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, “তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।” জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, “সমস্ত সমস্যার মূলে একজন ব্যক্তি। তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত করছেন।”
আইন অনুযায়ী, সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের খাদ্যসামগ্রী বিতরণে বিলম্ব, অনিয়ম বা ইচ্ছাকৃত আটকে রাখার বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা প্রশাসনিক তদন্তের আওতাভুক্ত হতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, “একজন কর্মকর্তা যদি তালিকা পরিবর্তন করে নিজের পছন্দমতো সুবিধাভোগী যুক্ত করার চেষ্টা করেন এবং এ কারণে চাল বিতরণ ব্যাহত হয়, এটি দুর্নীতির শামিল।”
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার প্রায় আড়াই হাজার দরিদ্র নারী চার মাস ধরে চালের অপেক্ষায়। কিন্তু মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার অনীহা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং তালিকা পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় তাদের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। ইউএনওর নির্দেশও কার্যকর হচ্ছে নাএটি স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দ্রুত তদন্ত, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ।