হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার বক্তারপুর আবুল খায়ের উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. কামাল হোসেন জনপ্রশাসন সচিব বরাবর এক চাঞ্চল্যকর আবেদনপত্র দাখিল করেছেন। এতে তিনি অভিযোগ করেছেন— শিক্ষা প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহল পরিকল্পিতভাবে জেলার ১৩১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত করেছে। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতনভাতা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
চিঠিতে অধ্যক্ষ কামাল হোসেন ২০২০ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু করে বকেয়া ইনক্রিমেন্ট, উৎসবভাতা, অর্ধেক খোরাকি ভাতা ও প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “সরকারি বিধি ও হাইকোর্টের আদেশ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে এসব ভাতা বন্ধ রাখা অন্যায় ও প্রশাসনিক অবহেলার স্পষ্ট প্রমাণ।”
আদালতের রায় উপেক্ষা, পরিপত্র বাস্তবায়নে গাফিলতি : অধ্যক্ষ কামাল হোসেন তাঁর আবেদনে উল্লেখ করেন, হাইকোর্টের ৩৬৫৭/২০১৫ নম্বর মামলার রায় অনুযায়ী বকেয়া ইনক্রিমেন্ট ও ভাতা প্রদানের নির্দেশনা স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে মাউশি (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর) কর্তৃক ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ৮ আগস্ট ২০২৪ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখের বিভিন্ন আদেশ জারি হয়, কিন্তু এসব নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি দাবি করেন, “বিগত তিন বছরে ২৪ বার আবেদন ও প্রতিবেদন দাখিল করেছি। এমনকি বৃন্দাবন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষকে দিয়ে তদন্তও সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট অংশ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের প্রভাবে প্রতিবেদন কার্যকর করা হয়নি।”
হবিগঞ্জের ১৩১ প্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত : চিঠিতে অধ্যক্ষ কামাল হোসেন অভিযোগ করেন, হবিগঞ্জ জেলার ১৩১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও হঠাৎ স্থগিত করার পেছনে রয়েছে একটি সংগঠিত চক্র। তাদের মধ্যে সাবেক জেলা শিক্ষা অফিসার মো. রুহুল্লাহ, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার চৌধুরী, কলেজ পরিদর্শক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, বিদ্যালয় পরিদর্শক মো. মঈনুল ইসলাম, অডিটর নীহার কান্তি রায়সহ মাউশির আঞ্চলিক পরিচালক, সহকারী পরিচালক ও উপ-পরিচালকের নাম উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, “এই কর্মকর্তারা প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অজুহাত তৈরি করে ১৩১টি প্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত করে দিয়েছেন, যার ফলে হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী তাদের বৈধ বেতন থেকে বঞ্চিত।”
“২০০ হাজার কোটি টাকার লুটপাট” : অধ্যক্ষের চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০০ হাজার কোটি টাকার লুটপাট সংঘটিত হয়েছে। এই লুটপাটে জেলা প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। চিঠিতে নাম এসেছে সাবেক জেলা প্রশাসক ড. মো. ফরিদুর রহমানের নেতৃত্বে “বাংলা শিক্ষা পরিবার”, “দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি” ও “হবিগঞ্জ স্কাউট সমিতি”-র কিছু সদস্যের। অধ্যক্ষের দাবি, এই সংগঠনগুলো প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে সরকারি অনুদান, উন্নয়ন প্রকল্প ও এমপিও ভাতা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে। তিনি বলেন, “সিলেট বিভাগে ৩৪৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হরিলুট চলছে। এমনকি উপজেলা থেকে মাউশি পর্যন্ত কোনো ফাইল টাকা ছাড়া অগ্রসর হয় না। শিক্ষা প্রশাসন আজ দুর্নীতির কবলে বন্দি।”
‘মিথ্যা মামলা’ ও হয়রানির অভিযোগ : চিঠিতে অধ্যক্ষ কামাল হোসেন ব্যক্তিগতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে করা মিথ্যা মামলা নং ৯০/২০২২-এরও প্রতিবাদ জানান। তিনি দাবি করেন, “আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় প্রতিহিংসার শিকার হয়েছি। আমাকে হয়রানি করতে গড়ে তোলা হয়েছে ভিত্তিহীন মামলা ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা।” তিনি বলেন, “আমি ২৪ বার আবেদন করেছি, প্রতিটি আবেদনে প্রমাণপত্র ও নথি সংযুক্ত করেছি। কিন্তু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের প্রভাবে এখনো পর্যন্ত কোনো ন্যায়বিচার পাইনি।”
শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর দুর্নীতির চিত্র
অধ্যক্ষ কামাল হোসেন বলেন, “উপজেলা থেকে শুরু করে মাউশি পর্যন্ত টাকাবিহীন কোনো ফাইল অগ্রসর হয় না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতির সংস্কৃতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আইন, বিধি, জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করলে এসব অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব।”
তিনি ১৯৭৯ সালের চাকরি বিধি ১১ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
জনপ্রশাসন সচিবের প্রতি আহ্বান
চিঠিতে জনপ্রশাসন সচিব বরাবর আবেদন জানিয়ে অধ্যক্ষ কামাল হোসেন অনুরোধ করেন—
১. জুলাই ২০২০ থেকে বন্ধ থাকা ইনক্রিমেন্ট, উৎসব ও খোরাকি ভাতা অবিলম্বে চালু করতে;
২. হবিগঞ্জ জেলার ১৩১টি প্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিতাদেশ বাতিল করে শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে;
৩. এবং দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে।
তিনি আরও বলেন, “জুলাই চেতনার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে হবিগঞ্জ জেলার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















