ঢাকা ০১:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি নিয়ন্ত্রণ, বাজেট অপচয় ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১২ কোটির যন্ত্র কেনা হচ্ছে ২০ কোটিতে বসিলা ঘাট থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু, দৈনিক চলবে ৬ লঞ্চ মন্ত্রীর স্বস্তির আশ্বাস, বাস্তবে বাস-ট্রেনে চরম ভোগান্তি সাত দিনের ছুটি শুরু স্বস্তির আশায় গাবতলী-কল্যাণপুরে ঘরমুখো মানুষের জটলা, বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে একই পরিবারের ৩ জন নিহত ঘরমুখো মানুষের স্রোত, নির্ধারিত সময়ে ছাড়ছে ট্রেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের উপ-ব্যবস্থাপক আহম্মদুল্লাহর নামে/বেনামে শতশত কোটি টাকার সম্পদ ভারতের কাছে ৩ ট্যাংকার জাহাজ ফেরত চাইল ইরান
গণপূর্তে সিন্ডিকেটের দখলে প্রকল্প বরাদ্দ

ঠিকাদার চক্র ও কমিশন বাণিজ্যের অদৃশ্য কারখানা

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এখন প্রকল্প বরাদ্দ, টেন্ডার, এমনকি বিল পাসের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে—যেখানে প্রতি কোটি টাকায় ১৫ু২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। দপ্তরের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, “দুর্নীতির এই যন্ত্রটা এতটাই শক্তিশালী যে, প্রশাসনের অনুমোদন থাকলেও প্রকল্প এগোয় না সিন্ডিকেটের সম্মতি ছাড়া।”
আদালতে মামলা, কিন্তু অগ্রগতি নেই : ঢাকার বিজ্ঞ সিএমএম আদালতে দায়ের হওয়া সিআর মামলা নং-১১৮/২০২৫ (ধারা: ১৪৭/১৪৮/৩২৬/৩০৭/৫০৬/৩৪) অনুসারে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রভাবশালী ২৫ জনেরও বেশি কর্মকর্তা অভিযুক্ত হয়েছেন।
তৈমুর আলম- সিআর মামলা নং-১১৮/২০২৫ এ নাম উল্লেখ আছে; অভিযোগে টেন্ডার কারচুপি ও প্রকল্প বরাদ্দে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।
মোয়াজ্জেম হোসেন- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (শেরেবাংলা নগর-১); মামলায় টেন্ডার ও প্রকল্প পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এ.এন. মাজাহারুল ইসলাম- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প-৫); মামলা সূত্রে প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় ও অর্থের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
মো. মিজানুর রহমান- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (প্লাম্বিং ইউনিট-২); মামলায় টেন্ডার-সংক্রান্ত অনিয়ম ও অর্থহানির অভিযোগ আছে।
মোর্শেদ ইকবাল- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী; মামলা দায়েরকালে তার নাম আছে এবং অভিযোগে অনিয়মের উল্লেখ।
মো. আবুল খায়ের- সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রংপুর জোন); মামলায় প্রকল্পের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।
মো. জাহাঙ্গীর আলম- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী; অভিযোগে টেন্ডার বরাদ্দে প্রভাব বিস্তার করার কথা বলা হয়েছে।
মো. সোলায়মান হোসেন- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম বিভাগ-১১); মামলায় প্রকল্প ও টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ থাকার কথা উল্লেখ আছে।
আব্দুল হালিম- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম বিভাগ-১১); অভিযোগে প্রশাসনিক ভূমিকা ব্যবহার করে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।
শরীফ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম বিভাগ-১১); মামলায় তার নাম থাকায় টেন্ডার-সংক্রান্ত অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
মোসলেহ উদ্দিন- সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী; মিরপুর, আজিমপুর ও মতিঝিলের ফ্ল্যাট প্রকল্পে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ মামলায় উল্লেখিত।
আবুল কালাম আজাদ- গণপূর্ত কর্মকর্তা (বিভাগ-৩); মামলায় তার নাম উল্লেখ আছে এবং প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মো. মেহেদী হাসান- সাবেক (মহাখালী) গণপূর্ত বিভাগ-৩; মামলায় টেন্ডার ও প্রকল্প পরিচালনায় অস্বাভাবিকতা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
মো. এনামুল হক এনাম- উচ্চমান সহকারী/বড়বাবু (১১তলা); অভিযুক্ত তালিকায় থাকা কারণে মামলায় তার বিরুদ্ধে হিসাব-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
পবিত্র কুমার দাস- গণপূর্ত অধিদপ্তর; মামলায় নাম থাকায় তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
মো. ইউসুফ- ইএম কারখানা বিভাগের আওয়ামী লীগ নেতা; মামলায় তার নাম আছে এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগ বিশ্লেষণে দেখা যায়।
আজমল হক মনু- সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ঢাকা উপ-বিভাগ-১); অভিযোগে বদলি/নিয়োগ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের উল্লেখ রয়েছে।
মো. শামসুল ইসলাম- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (বিভাগ-৪); মামলায় টেন্ডার ও প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ আছে।
সতীনাথ বসাক- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (সার্কেল-২); মামলায় তার নাম উচ্চারিত এবং প্রকল্প-অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
মো. মনিরুজ্জামান- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী; অভিযোগে টেন্ডার বরাদ্দ ও আর্থিক অপব্যবহারের উল্লেখ আছে।
মো. শহিদুল আলম- সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী; মামলায় তার নাম থাকায় সংশ্লিষ্ট অভিযোগ উল্লেখিত।
মো. ইলিয়াছ আহমেদ- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (আজিমপুর বিভাগ); মামলায় টেন্ডার ও অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগ আছে।
মো. ফজলুল হক- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (রাজশাহী সার্কেল); অভিযোগে প্রকল্পে অনিয়ম ও আর্থিক অস্বাভাবিকতার কথা বলা হয়েছে।
উৎপল কুমার দে- সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (বরিশাল জোন); মামলায় নাম থাকায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
শেখর চন্দ্র বিশ্বাস- সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী; মামলায় টেন্ডার-সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য তার নাম রয়েছে।
মোরশেদ ইকবাল- তালিকাভুক্ত থাকায় উপরে উল্লেখিত অনুযায়ী মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রকল্প দুর্নীতি ও টেন্ডার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্প মানেই কমিশনের ভাগাভাগি : অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি বড় প্রকল্পে ৩ু৪ স্তরের কমিশন ধারা চালু আছে
১. উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন কমিশন (৫-৭%) টেন্ডার অনুমোদনের আগে সিন্ডিকেটের সিনিয়র সদস্যদের জন্য।
২. ফিল্ড পর্যায়ের কমিশন (৩-৫%) প্রকৌশলীদের মাঠ পর্যায়ের অনুমোদন ও বিল পাসে।
৩. রাজনৈতিক কমিশন (৩-৫%) সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও মধ্যস্থদের জন্য।
৪. অফিস কমিশন (২-৩%)- বিল রেকর্ড ও কন্ট্রোল শাখায় কার্য সম্পন্নের বিনিময়ে।
এই কমিশন বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ঢাকার গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম ও সিভিল বিভাগ, যেখানে বহু কর্মকর্তা অবসরের পরও প্রভাব ধরে রেখেছেন।
প্রভাবশালী ঠিকাদারদের গোপন চুক্তি : একজন সিনিয়র প্রকৌশলীর (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, “দপ্তরের টেন্ডারে যারা নিয়মিত কাজ পায়, তাদের ৭০ শতাংশই একই গ্রুপের। এরা সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরাসরি আর্থিক যোগসাজশে যুক্ত। নির্দিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেই টেন্ডার নিশ্চিত।”
এমনকি অনেকে সরকারি টেন্ডার জমা দেওয়ার আগেই ‘অফ দ্য রেকর্ড’ আলোচনায় প্রকল্পের কাজ ভাগ করে নেয়—যাকে বলা হয় “অভ্যন্তরীণ সমঝোতা বাজার”।
অবসরপ্রাপ্তদের প্রভাব এখনও অটুট : তালিকাভুক্ত একাধিক সাবেক প্রকৌশলী যেমন- মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, মো. সোলায়মান হোসেন, মো. আবুল খায়ের, মো. জাহাঙ্গীর আলম, ও আজমল হক মনু — বর্তমানে বিভিন্ন প্রাইভেট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা বা পরিচালক পদে রয়েছেন। তাদের নাম না থাকলেও, প্রকল্প অনুমোদনের আগে ‘প্রভাব খাটানো’ এখনও তাদের নিয়মিত কাজ।
এক কর্মকর্তা বলেন, “এদের ফোন এলে অনেক সময় প্রধান প্রকৌশলীর অনুমতি ছাড়াই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। কারণ, এদের পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয় আছে।”
সূত্র জানায়, বর্তমানে সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব তিন ভাগে বিভক্ত:
সিভিল শাখা সিন্ডিকেট: বিল পাস ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে।
ই/এম সিন্ডিকেট: বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক ও প্লাম্বিং ইউনিটের প্রকল্পে প্রভাব রাখে।
প্রশাসনিক সিন্ডিকেট: বদলি, পদোন্নতি ও অফিস অর্ডার নিয়ন্ত্রণ করে।
এ তিনটি গ্রুপ একে অপরের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করে এবং কমিশনের নির্দিষ্ট ভাগ নিশ্চিত করে। ফলে, প্রকল্পে স্বচ্ছতা বা ন্যায়বিচার কার্যত অনুপস্থিত।
দপ্তরের নিজস্ব কর্মকর্তারাই জানান, টেন্ডার আহ্বানের পর ন্যূনতম তিনটি বিড বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুটি বিড একই ঠিকাদার গ্রুপের মাধ্যমে জমা পড়ে। এতে প্রতিযোগিতা কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।
অনুমোদনের আগে ‘অ্যাডভান্স কমিশন’ হিসেবে নগদ অর্থ হাতবদল হয়—যা কোনো হিসাবেই ধরা পড়ে না।
এক সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “প্রকল্পের নকশা তৈরি থেকে বিল পাস পর্যন্ত অন্তত আটটি ধাপে ঘুষ চলে। এই চক্র ভাঙা না গেলে গণপূর্তের সংস্কার কাগজেই সীমিত থাকবে।”
প্রধান কার্যালয়ে অদৃশ্য টেবিল সিন্ডিকেট প্রতিদিন বিকেলে ১১ তলার করিডোরে বসে সিন্ডিকেটের অঘোষিত বৈঠক—যেখানে প্রকল্প বণ্টন, ঠিকাদার বাছাই, এমনকি কার বদলি হবে, তা পর্যন্ত ঠিক হয়। এই বৈঠককে দপ্তরের ভেতরে অনেকে বলেন ‘টেবিল কমিটি’।
একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন “যে টেবিলে চা খাওয়া হয়, সেই টেবিলেই কোটি টাকার ভাগ ঠিক হয়।”
বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার দপ্তরে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করলেও, সিন্ডিকেটের চাপে তা কার্যত থমকে গেছে।
অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি বদলি আদেশ সিন্ডিকেটের আপত্তিতে স্থগিত হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক সহযোগিতা না পেলে মামলা টিকিয়ে রাখা কঠিন।” তাদের মতে, প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত করেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিন্ডিকেট কেবল সরকারি অর্থ নয়, উন্নয়নের ভাবনাকেও লুট করছে। এই চক্রের হাতে প্রকল্প মানে এখন ‘লাভের খেলা’—যেখানে জনগণের টাকায় দুর্নীতির উৎসব চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে। স্বচ্ছতা ও সংস্কারের নামে যত প্রজ্ঞাপনই জারি হোক না কেন, যতদিন সিন্ডিকেটের মেরুদণ্ড ভাঙা না যায়, ততদিন গণপূর্তের প্রকল্প মানে হবে দুর্নীতির স্থায়ী প্রতিষ্ঠান।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি নিয়ন্ত্রণ, বাজেট অপচয় ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

গণপূর্তে সিন্ডিকেটের দখলে প্রকল্প বরাদ্দ

ঠিকাদার চক্র ও কমিশন বাণিজ্যের অদৃশ্য কারখানা

আপডেট সময় ০৪:৪৫:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ অক্টোবর ২০২৫

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এখন প্রকল্প বরাদ্দ, টেন্ডার, এমনকি বিল পাসের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে—যেখানে প্রতি কোটি টাকায় ১৫ু২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। দপ্তরের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, “দুর্নীতির এই যন্ত্রটা এতটাই শক্তিশালী যে, প্রশাসনের অনুমোদন থাকলেও প্রকল্প এগোয় না সিন্ডিকেটের সম্মতি ছাড়া।”
আদালতে মামলা, কিন্তু অগ্রগতি নেই : ঢাকার বিজ্ঞ সিএমএম আদালতে দায়ের হওয়া সিআর মামলা নং-১১৮/২০২৫ (ধারা: ১৪৭/১৪৮/৩২৬/৩০৭/৫০৬/৩৪) অনুসারে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রভাবশালী ২৫ জনেরও বেশি কর্মকর্তা অভিযুক্ত হয়েছেন।
তৈমুর আলম- সিআর মামলা নং-১১৮/২০২৫ এ নাম উল্লেখ আছে; অভিযোগে টেন্ডার কারচুপি ও প্রকল্প বরাদ্দে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।
মোয়াজ্জেম হোসেন- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (শেরেবাংলা নগর-১); মামলায় টেন্ডার ও প্রকল্প পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এ.এন. মাজাহারুল ইসলাম- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প-৫); মামলা সূত্রে প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় ও অর্থের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
মো. মিজানুর রহমান- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (প্লাম্বিং ইউনিট-২); মামলায় টেন্ডার-সংক্রান্ত অনিয়ম ও অর্থহানির অভিযোগ আছে।
মোর্শেদ ইকবাল- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী; মামলা দায়েরকালে তার নাম আছে এবং অভিযোগে অনিয়মের উল্লেখ।
মো. আবুল খায়ের- সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রংপুর জোন); মামলায় প্রকল্পের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।
মো. জাহাঙ্গীর আলম- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী; অভিযোগে টেন্ডার বরাদ্দে প্রভাব বিস্তার করার কথা বলা হয়েছে।
মো. সোলায়মান হোসেন- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম বিভাগ-১১); মামলায় প্রকল্প ও টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ থাকার কথা উল্লেখ আছে।
আব্দুল হালিম- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম বিভাগ-১১); অভিযোগে প্রশাসনিক ভূমিকা ব্যবহার করে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।
শরীফ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম বিভাগ-১১); মামলায় তার নাম থাকায় টেন্ডার-সংক্রান্ত অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
মোসলেহ উদ্দিন- সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী; মিরপুর, আজিমপুর ও মতিঝিলের ফ্ল্যাট প্রকল্পে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ মামলায় উল্লেখিত।
আবুল কালাম আজাদ- গণপূর্ত কর্মকর্তা (বিভাগ-৩); মামলায় তার নাম উল্লেখ আছে এবং প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মো. মেহেদী হাসান- সাবেক (মহাখালী) গণপূর্ত বিভাগ-৩; মামলায় টেন্ডার ও প্রকল্প পরিচালনায় অস্বাভাবিকতা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
মো. এনামুল হক এনাম- উচ্চমান সহকারী/বড়বাবু (১১তলা); অভিযুক্ত তালিকায় থাকা কারণে মামলায় তার বিরুদ্ধে হিসাব-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
পবিত্র কুমার দাস- গণপূর্ত অধিদপ্তর; মামলায় নাম থাকায় তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
মো. ইউসুফ- ইএম কারখানা বিভাগের আওয়ামী লীগ নেতা; মামলায় তার নাম আছে এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগ বিশ্লেষণে দেখা যায়।
আজমল হক মনু- সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ঢাকা উপ-বিভাগ-১); অভিযোগে বদলি/নিয়োগ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের উল্লেখ রয়েছে।
মো. শামসুল ইসলাম- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (বিভাগ-৪); মামলায় টেন্ডার ও প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ আছে।
সতীনাথ বসাক- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (সার্কেল-২); মামলায় তার নাম উচ্চারিত এবং প্রকল্প-অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
মো. মনিরুজ্জামান- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী; অভিযোগে টেন্ডার বরাদ্দ ও আর্থিক অপব্যবহারের উল্লেখ আছে।
মো. শহিদুল আলম- সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী; মামলায় তার নাম থাকায় সংশ্লিষ্ট অভিযোগ উল্লেখিত।
মো. ইলিয়াছ আহমেদ- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (আজিমপুর বিভাগ); মামলায় টেন্ডার ও অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগ আছে।
মো. ফজলুল হক- সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (রাজশাহী সার্কেল); অভিযোগে প্রকল্পে অনিয়ম ও আর্থিক অস্বাভাবিকতার কথা বলা হয়েছে।
উৎপল কুমার দে- সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (বরিশাল জোন); মামলায় নাম থাকায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
শেখর চন্দ্র বিশ্বাস- সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী; মামলায় টেন্ডার-সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য তার নাম রয়েছে।
মোরশেদ ইকবাল- তালিকাভুক্ত থাকায় উপরে উল্লেখিত অনুযায়ী মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রকল্প দুর্নীতি ও টেন্ডার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্প মানেই কমিশনের ভাগাভাগি : অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি বড় প্রকল্পে ৩ু৪ স্তরের কমিশন ধারা চালু আছে
১. উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন কমিশন (৫-৭%) টেন্ডার অনুমোদনের আগে সিন্ডিকেটের সিনিয়র সদস্যদের জন্য।
২. ফিল্ড পর্যায়ের কমিশন (৩-৫%) প্রকৌশলীদের মাঠ পর্যায়ের অনুমোদন ও বিল পাসে।
৩. রাজনৈতিক কমিশন (৩-৫%) সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও মধ্যস্থদের জন্য।
৪. অফিস কমিশন (২-৩%)- বিল রেকর্ড ও কন্ট্রোল শাখায় কার্য সম্পন্নের বিনিময়ে।
এই কমিশন বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ঢাকার গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম ও সিভিল বিভাগ, যেখানে বহু কর্মকর্তা অবসরের পরও প্রভাব ধরে রেখেছেন।
প্রভাবশালী ঠিকাদারদের গোপন চুক্তি : একজন সিনিয়র প্রকৌশলীর (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, “দপ্তরের টেন্ডারে যারা নিয়মিত কাজ পায়, তাদের ৭০ শতাংশই একই গ্রুপের। এরা সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরাসরি আর্থিক যোগসাজশে যুক্ত। নির্দিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেই টেন্ডার নিশ্চিত।”
এমনকি অনেকে সরকারি টেন্ডার জমা দেওয়ার আগেই ‘অফ দ্য রেকর্ড’ আলোচনায় প্রকল্পের কাজ ভাগ করে নেয়—যাকে বলা হয় “অভ্যন্তরীণ সমঝোতা বাজার”।
অবসরপ্রাপ্তদের প্রভাব এখনও অটুট : তালিকাভুক্ত একাধিক সাবেক প্রকৌশলী যেমন- মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, মো. সোলায়মান হোসেন, মো. আবুল খায়ের, মো. জাহাঙ্গীর আলম, ও আজমল হক মনু — বর্তমানে বিভিন্ন প্রাইভেট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা বা পরিচালক পদে রয়েছেন। তাদের নাম না থাকলেও, প্রকল্প অনুমোদনের আগে ‘প্রভাব খাটানো’ এখনও তাদের নিয়মিত কাজ।
এক কর্মকর্তা বলেন, “এদের ফোন এলে অনেক সময় প্রধান প্রকৌশলীর অনুমতি ছাড়াই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। কারণ, এদের পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয় আছে।”
সূত্র জানায়, বর্তমানে সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব তিন ভাগে বিভক্ত:
সিভিল শাখা সিন্ডিকেট: বিল পাস ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে।
ই/এম সিন্ডিকেট: বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক ও প্লাম্বিং ইউনিটের প্রকল্পে প্রভাব রাখে।
প্রশাসনিক সিন্ডিকেট: বদলি, পদোন্নতি ও অফিস অর্ডার নিয়ন্ত্রণ করে।
এ তিনটি গ্রুপ একে অপরের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করে এবং কমিশনের নির্দিষ্ট ভাগ নিশ্চিত করে। ফলে, প্রকল্পে স্বচ্ছতা বা ন্যায়বিচার কার্যত অনুপস্থিত।
দপ্তরের নিজস্ব কর্মকর্তারাই জানান, টেন্ডার আহ্বানের পর ন্যূনতম তিনটি বিড বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুটি বিড একই ঠিকাদার গ্রুপের মাধ্যমে জমা পড়ে। এতে প্রতিযোগিতা কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।
অনুমোদনের আগে ‘অ্যাডভান্স কমিশন’ হিসেবে নগদ অর্থ হাতবদল হয়—যা কোনো হিসাবেই ধরা পড়ে না।
এক সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “প্রকল্পের নকশা তৈরি থেকে বিল পাস পর্যন্ত অন্তত আটটি ধাপে ঘুষ চলে। এই চক্র ভাঙা না গেলে গণপূর্তের সংস্কার কাগজেই সীমিত থাকবে।”
প্রধান কার্যালয়ে অদৃশ্য টেবিল সিন্ডিকেট প্রতিদিন বিকেলে ১১ তলার করিডোরে বসে সিন্ডিকেটের অঘোষিত বৈঠক—যেখানে প্রকল্প বণ্টন, ঠিকাদার বাছাই, এমনকি কার বদলি হবে, তা পর্যন্ত ঠিক হয়। এই বৈঠককে দপ্তরের ভেতরে অনেকে বলেন ‘টেবিল কমিটি’।
একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন “যে টেবিলে চা খাওয়া হয়, সেই টেবিলেই কোটি টাকার ভাগ ঠিক হয়।”
বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার দপ্তরে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করলেও, সিন্ডিকেটের চাপে তা কার্যত থমকে গেছে।
অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি বদলি আদেশ সিন্ডিকেটের আপত্তিতে স্থগিত হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক সহযোগিতা না পেলে মামলা টিকিয়ে রাখা কঠিন।” তাদের মতে, প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত করেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিন্ডিকেট কেবল সরকারি অর্থ নয়, উন্নয়নের ভাবনাকেও লুট করছে। এই চক্রের হাতে প্রকল্প মানে এখন ‘লাভের খেলা’—যেখানে জনগণের টাকায় দুর্নীতির উৎসব চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে। স্বচ্ছতা ও সংস্কারের নামে যত প্রজ্ঞাপনই জারি হোক না কেন, যতদিন সিন্ডিকেটের মেরুদণ্ড ভাঙা না যায়, ততদিন গণপূর্তের প্রকল্প মানে হবে দুর্নীতির স্থায়ী প্রতিষ্ঠান।