ঢাকা ০১:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করতে বেশি সময় লাগবে না : ট্রাম্প কেন্দ্রীয় চুক্তিতে যে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ভারত পিএসএলে নিরাপত্তা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্বেগ, যা বলছে পিসিবি যমুনায় সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী পাটুরিয়ায় যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, পারাপারে চলছে ১৮টি লঞ্চ চট্টগ্রামে ডিসির নির্দেশে যন্ত্রপাতি বিক্রি করে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ মন্ত্রী-এমপিরা কে কোথায় ঈদ করবেন? ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন শরীয়তপুর জেলা বি এন পি সাংগঠনিক সম্পাদক ও সখিপুর থানা বি এন পির আহ্বায়ক এস এম এ হামিদ ঈশ্বরদী থেকে এলো উদ্ধারকারী ট্রেন, সৈয়দপুর থেকে আসছে আরেকটি রূহানীনগর এর পক্ষ থেকে সম্মানিত ইমাম-মুয়াজ্জিনগণকে  হাদিয়া প্রদান
কেউ বিদেশে, কেউ মাতৃত্বকালীন ছুটিতে, তবু তোলা হয়েছে সম্মানী

সিদ্ধেশ্বরী কলেজ অধ্যক্ষ শেখ জুলহাস উদ্দিনের দূর্নীতি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০২:৫৩:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ৬৫৫ বার পড়া হয়েছে

বিদেশে থাকা শিক্ষক, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা শিক্ষক ও অচেনা ব্যক্তির নামে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাবশালীদের স্বেচ্ছাচারিতার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে রাজধানীর মগবাজারের সিদ্ধেশ্বরী কলেজে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে যে কেলেঙ্কারির তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা একেবারেই বিস্ময়কর। এখানে পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন না করা, অবসরপ্রাপ্ত, বিদেশে থাকা বা মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা শিক্ষকদের নাম কক্ষ পরিদর্শকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি বরাদ্দকৃত সম্মানীর টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে—এই অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছেন কলেজটির অধ্যক্ষ সেখ জুলহাস উদ্দিন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষক।
এই প্রতিবেদনে আমরা অনুসন্ধান করে দেখব কীভাবে এই কেলেঙ্কারি ঘটেছে, কারা এতে জড়িত, কত টাকার কারসাজি হয়েছে এবং এর প্রভাব কী হতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর।
২০২৫ সালের ৮ আগস্ট নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের কার্যালয়ে বিভিন্ন পদে কর্মচারী নিয়োগের এমসিকিউ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর মগবাজারের সিদ্ধেশ্বরী কলেজ এই পরীক্ষার একটি কেন্দ্র ছিল।
পরীক্ষার্থী আসন সংখ্যা: ২,৫২০ জন
কক্ষ সংখ্যা: ৩৫টি
পরীক্ষার সময়: ১ ঘণ্টা
ইসির নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি কক্ষে একজন কক্ষ পরিদর্শক ও সহায়ক কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাঁদের সম্মানীর জন্য বরাদ্দ থাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা। সিদ্ধেশ্বরী কলেজের ক্ষেত্রে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা (কর বাদে)। এর মধ্যে প্রতি কক্ষ পরিদর্শকের জন্য সম্মানী বরাদ্দ করা হয়েছিল ১,৩৫০ টাকা। কলেজ কর্তৃপক্ষ ইসিতে ১০১ জন কক্ষ পরিদর্শকের তালিকা জমা দেয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইসিতে জমা দেওয়া তালিকায় অন্তত ১৭টি ভুয়া নাম রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-মর্জিয়া নাজনীন, নাতাশা সরকার, সাবিনা মিতা, মুনিরজাদী শাহিদা আলম।
বিদেশে থাকা শিক্ষক-সমাপ্তি মৃধা, নাজিয়া হোসেন।
মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা শিক্ষক-সাদিয়া জামাল।
দায়িত্ব পালন না করা শিক্ষক-গোলাম মো. ফেরদৌস ভূঁইয়া, শামসাদ আলম স্বর্ণা।
অচেনা ব্যক্তি-রইচ মিয়া, কৌশিকুর রহমান টিটু।
এই নামগুলোর কিছু শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করেন। মর্জিয়া নাজনীন, যিনি বহু বছর আগে অবসর নিয়েছেন, জানান :“আমি অবসরে গিয়েছি অনেক আগেই। আমার নাম পরীক্ষার তালিকায় কীভাবে গেল, বুঝতে পারছি না।”
অন্যদিকে বিদেশে থাকা দুই শিক্ষক সমাপ্তি মৃধা ও নাজিয়া হোসেনের উপস্থিতি তালিকায় প্রমাণ করে যে এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া নাম ঢোকানো হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ সেখ জুলহাস উদ্দিন। তিনি ওই পরীক্ষার কেন্দ্রসচিবও ছিলেন। ১৪ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন
“এমন তালিকা আমরা সব সময় করি। বরাদ্দের পুরো টাকা সমন্বয় করতেই এভাবে তালিকা করা হয়। পরে শিক্ষকেরা সেই টাকা ভাগাভাগি করে নেন।”
অর্থাৎ, অধ্যক্ষ নিজেই স্বীকার করেছেন যে ভুয়া নামের তালিকা তৈরি করা হয়েছে অর্থ সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে। তবে তালিকায় অচেনা লোকজনের নাম কিভাবে গেল, সে ব্যাপারে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন“এটা আমি জানি না।”
কলেজের অভ্যন্তরে এই অনিয়ম নিয়ে শিক্ষক মহলে ব্যাপক বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে।
এ কে এম গিয়াসউদ্দিন (ইংরেজি বিভাগের প্রধান ও পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক) সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে অধ্যক্ষ ইসির টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তিনি লিখিতভাবে নির্বাচন কমিশনে তদন্ত চেয়েছেন।
আমিনুল ইসলাম (মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান) জানিয়েছেন, ভুয়া তালিকার প্রতিবাদ করায় তাঁকে অধ্যক্ষপন্থী শিক্ষকরা হুমকি দিচ্ছেন, মানসিকভাবে হয়রানি করছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
আর্থিক কারসাজি
ইসির নথি অনুযায়ী:
মোট কক্ষ পরিদর্শক: ১০১ জন
প্রতি জনের সম্মানী: ১,৩৫০ টাকা
সম্মানীর মোট বরাদ্দ: প্রায় ১,৩৬,৩৫০ টাকা
সহায়ক কর্মচারীদের বরাদ্দসহ মোট খরচ: প্রায় ১,৮২,০০০ টাকা
তালিকার অন্তত ১৭ জন ভুয়া নাম হলে, শুধু কক্ষ পরিদর্শকের সম্মানী বাবদ আত্মসাৎ হয়েছে প্রায় ২৩,০০০ টাকা। সহায়ক কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে কলেজে বাস্তবে সেই সংখ্যক কর্মচারী নেই। অর্থাৎ, আসল আত্মসাতের অঙ্ক আরও অনেক বেশি হতে পারে।
ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন-“আমরা একটি অভিযোগ পেয়েছি। সেটি তদন্ত করে দেখছি।”
অর্থাৎ, বিষয়টি এখন ইসির নজরে আছে, তবে চূড়ান্ত পদক্ষেপের জন্য তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এই ঘটনার মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে
অধ্যক্ষের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি কেন্দ্রসচিব হয়ে সরাসরি ভুয়া তালিকা অনুমোদন করেছেন।
অনিয়মের প্রতিবাদকারী শিক্ষকরা ভয়ভীতি ও অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন।
‘পুরো বরাদ্দ সমন্বয় করার’ নামে ভুয়া নাম যুক্ত করা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সরকারি কোষাগারের টাকা শিক্ষার্থীদের কল্যাণ বা শিক্ষা উন্নয়নে না গিয়ে কয়েকজনের পকেটে যাচ্ছে।
শিক্ষা-গবেষকরা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা কেবল আর্থিক দুর্নীতির উদাহরণ নয়, বরং এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করছে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাছে আদর্শ হওয়ার বদলে আর্থিক কারসাজিতে যুক্ত হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সিদ্ধেশ্বরী কলেজে নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই সম্মানী কেলেঙ্কারি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়; বরং এটি গোটা শিক্ষাঙ্গনে চলমান দুর্নীতির একটি প্রতিচ্ছবি। সরকারি টাকায় পরিচালিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে ভুয়া নামের তালিকা সব সময় করা হয়—এমন বক্তব্য শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে নষ্ট করে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করতে বেশি সময় লাগবে না : ট্রাম্প

কেউ বিদেশে, কেউ মাতৃত্বকালীন ছুটিতে, তবু তোলা হয়েছে সম্মানী

সিদ্ধেশ্বরী কলেজ অধ্যক্ষ শেখ জুলহাস উদ্দিনের দূর্নীতি

আপডেট সময় ০২:৫৩:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বিদেশে থাকা শিক্ষক, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা শিক্ষক ও অচেনা ব্যক্তির নামে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাবশালীদের স্বেচ্ছাচারিতার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে রাজধানীর মগবাজারের সিদ্ধেশ্বরী কলেজে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে যে কেলেঙ্কারির তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা একেবারেই বিস্ময়কর। এখানে পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন না করা, অবসরপ্রাপ্ত, বিদেশে থাকা বা মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা শিক্ষকদের নাম কক্ষ পরিদর্শকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি বরাদ্দকৃত সম্মানীর টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে—এই অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছেন কলেজটির অধ্যক্ষ সেখ জুলহাস উদ্দিন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষক।
এই প্রতিবেদনে আমরা অনুসন্ধান করে দেখব কীভাবে এই কেলেঙ্কারি ঘটেছে, কারা এতে জড়িত, কত টাকার কারসাজি হয়েছে এবং এর প্রভাব কী হতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর।
২০২৫ সালের ৮ আগস্ট নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের কার্যালয়ে বিভিন্ন পদে কর্মচারী নিয়োগের এমসিকিউ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর মগবাজারের সিদ্ধেশ্বরী কলেজ এই পরীক্ষার একটি কেন্দ্র ছিল।
পরীক্ষার্থী আসন সংখ্যা: ২,৫২০ জন
কক্ষ সংখ্যা: ৩৫টি
পরীক্ষার সময়: ১ ঘণ্টা
ইসির নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি কক্ষে একজন কক্ষ পরিদর্শক ও সহায়ক কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাঁদের সম্মানীর জন্য বরাদ্দ থাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা। সিদ্ধেশ্বরী কলেজের ক্ষেত্রে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা (কর বাদে)। এর মধ্যে প্রতি কক্ষ পরিদর্শকের জন্য সম্মানী বরাদ্দ করা হয়েছিল ১,৩৫০ টাকা। কলেজ কর্তৃপক্ষ ইসিতে ১০১ জন কক্ষ পরিদর্শকের তালিকা জমা দেয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইসিতে জমা দেওয়া তালিকায় অন্তত ১৭টি ভুয়া নাম রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-মর্জিয়া নাজনীন, নাতাশা সরকার, সাবিনা মিতা, মুনিরজাদী শাহিদা আলম।
বিদেশে থাকা শিক্ষক-সমাপ্তি মৃধা, নাজিয়া হোসেন।
মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা শিক্ষক-সাদিয়া জামাল।
দায়িত্ব পালন না করা শিক্ষক-গোলাম মো. ফেরদৌস ভূঁইয়া, শামসাদ আলম স্বর্ণা।
অচেনা ব্যক্তি-রইচ মিয়া, কৌশিকুর রহমান টিটু।
এই নামগুলোর কিছু শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করেন। মর্জিয়া নাজনীন, যিনি বহু বছর আগে অবসর নিয়েছেন, জানান :“আমি অবসরে গিয়েছি অনেক আগেই। আমার নাম পরীক্ষার তালিকায় কীভাবে গেল, বুঝতে পারছি না।”
অন্যদিকে বিদেশে থাকা দুই শিক্ষক সমাপ্তি মৃধা ও নাজিয়া হোসেনের উপস্থিতি তালিকায় প্রমাণ করে যে এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া নাম ঢোকানো হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ সেখ জুলহাস উদ্দিন। তিনি ওই পরীক্ষার কেন্দ্রসচিবও ছিলেন। ১৪ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন
“এমন তালিকা আমরা সব সময় করি। বরাদ্দের পুরো টাকা সমন্বয় করতেই এভাবে তালিকা করা হয়। পরে শিক্ষকেরা সেই টাকা ভাগাভাগি করে নেন।”
অর্থাৎ, অধ্যক্ষ নিজেই স্বীকার করেছেন যে ভুয়া নামের তালিকা তৈরি করা হয়েছে অর্থ সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে। তবে তালিকায় অচেনা লোকজনের নাম কিভাবে গেল, সে ব্যাপারে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন“এটা আমি জানি না।”
কলেজের অভ্যন্তরে এই অনিয়ম নিয়ে শিক্ষক মহলে ব্যাপক বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে।
এ কে এম গিয়াসউদ্দিন (ইংরেজি বিভাগের প্রধান ও পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক) সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে অধ্যক্ষ ইসির টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তিনি লিখিতভাবে নির্বাচন কমিশনে তদন্ত চেয়েছেন।
আমিনুল ইসলাম (মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান) জানিয়েছেন, ভুয়া তালিকার প্রতিবাদ করায় তাঁকে অধ্যক্ষপন্থী শিক্ষকরা হুমকি দিচ্ছেন, মানসিকভাবে হয়রানি করছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
আর্থিক কারসাজি
ইসির নথি অনুযায়ী:
মোট কক্ষ পরিদর্শক: ১০১ জন
প্রতি জনের সম্মানী: ১,৩৫০ টাকা
সম্মানীর মোট বরাদ্দ: প্রায় ১,৩৬,৩৫০ টাকা
সহায়ক কর্মচারীদের বরাদ্দসহ মোট খরচ: প্রায় ১,৮২,০০০ টাকা
তালিকার অন্তত ১৭ জন ভুয়া নাম হলে, শুধু কক্ষ পরিদর্শকের সম্মানী বাবদ আত্মসাৎ হয়েছে প্রায় ২৩,০০০ টাকা। সহায়ক কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে কলেজে বাস্তবে সেই সংখ্যক কর্মচারী নেই। অর্থাৎ, আসল আত্মসাতের অঙ্ক আরও অনেক বেশি হতে পারে।
ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন-“আমরা একটি অভিযোগ পেয়েছি। সেটি তদন্ত করে দেখছি।”
অর্থাৎ, বিষয়টি এখন ইসির নজরে আছে, তবে চূড়ান্ত পদক্ষেপের জন্য তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এই ঘটনার মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে
অধ্যক্ষের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি কেন্দ্রসচিব হয়ে সরাসরি ভুয়া তালিকা অনুমোদন করেছেন।
অনিয়মের প্রতিবাদকারী শিক্ষকরা ভয়ভীতি ও অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন।
‘পুরো বরাদ্দ সমন্বয় করার’ নামে ভুয়া নাম যুক্ত করা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সরকারি কোষাগারের টাকা শিক্ষার্থীদের কল্যাণ বা শিক্ষা উন্নয়নে না গিয়ে কয়েকজনের পকেটে যাচ্ছে।
শিক্ষা-গবেষকরা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা কেবল আর্থিক দুর্নীতির উদাহরণ নয়, বরং এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করছে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাছে আদর্শ হওয়ার বদলে আর্থিক কারসাজিতে যুক্ত হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সিদ্ধেশ্বরী কলেজে নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই সম্মানী কেলেঙ্কারি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়; বরং এটি গোটা শিক্ষাঙ্গনে চলমান দুর্নীতির একটি প্রতিচ্ছবি। সরকারি টাকায় পরিচালিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে ভুয়া নামের তালিকা সব সময় করা হয়—এমন বক্তব্য শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে নষ্ট করে।