* পদোন্নতিতে অনিয়ম, জ্যেষ্ঠতার তালিকা ভঙ্গ
* আউটসোর্সিং নিয়োগ বাণিজ্য
* বদলি-বাণিজ্য: টেবিল থেকে টাকার লেনদেন
* সরকারি সম্পদের ব্যক্তিগত ব্যবহার
* দুর্নীতির টাকায় ফ্ল্যাট ক্রয়
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন (এনপিডিএফ) মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ঘুন ধরেছে। আর সেই ঘুন ধরার নেপথ্যে বারবার উঠে আসছে একই দুই নাম—সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জিয়াসমিন আক্তার।
প্রথম পর্বে তাদের নানা অনিয়ম, বিধি ভঙ্গ ও সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগ প্রকাশ পেয়েছিল। এবার দ্বিতীয় পর্বে আরও স্পষ্ট হয়েছে—এই দম্পতি শুধু প্রশাসনিক কারসাজিই করছেন না, বরং ফাউন্ডেশনের অর্থনৈতিক খাতকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে পদোন্নতির জন্য সুস্পষ্ট বিধান থাকলেও, জিয়াসমিন আক্তার নিয়মিত চেষ্টা করছেন তা ভঙ্গ করতে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা তালিকাকে পাশ কাটিয়ে নিজের নাম তালিকার উপরে তুলতে নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। এমনকি অনেকে বলছেন, পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করতে মোটা অংকের ঘুষ লেনদেন করেছেন তিনি।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন— “আমরা দীর্ঘদিনের চাকরি ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির আশা করি। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে যিনি নিয়ম অনুযায়ী প্রার্থীই নন, তিনিই বিভিন্ন উপায়ে নিজের নাম এগিয়ে রাখছেন। এর পেছনে কী ধরনের শক্তি কাজ করছে সেটা আমরা সবাই বুঝি, কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে পারি না।”
ফাউন্ডেশনের সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণ এখন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। অভিযোগ অনুযায়ী, কে চাকরি পাবেন আর কে পাবেন না—সব সিদ্ধান্তই মূলত মফিজুল ইসলাম ও জিয়াসমিন আক্তারের হাতে। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে তাদের ঘনিষ্ঠতা বা অর্থ প্রদানের ক্ষমতাই নিয়োগের প্রধান শর্তে পরিণত হয়েছে।
একজন ভুক্তভোগী জানান— “আমরা লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও শেষ পর্যন্ত টিকতে পারিনি। পরে জানতে পারলাম যাদের নাম চূড়ান্ত হয়েছে তারা সবাই মোটা টাকা দিয়ে পাস করেছেন। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে ফাউন্ডেশনে যোগ্য মানুষ কখনোই আসতে পারবে না।”
১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বদলি নিয়ন্ত্রণও করছে এই দম্পতি। অভিযোগ রয়েছে, বদলির প্রতিটি নথি প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মফিজুল ইসলামের টেবিলে আসে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় টাকার হিসাব-নিকাশ।
একজন কর্মকর্তা বলেন— “আমরা বদলির জন্য আবেদন করলে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে টাকা চাওয়া হয়। টাকা দিলে বদলি হবে, না হলে ফাইল আটকে থাকবে। সবাই জানে এই টাকা কোথায় যায়।” এভাবে বদলি প্রক্রিয়া ফাউন্ডেশনের ভেতরে এক ধরনের অঘোষিত ব্যবসায় রূপ নিয়েছে।
প্রথম পর্বে উঠে এসেছিল সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার ঘটনা। দ্বিতীয় পর্বে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু যাতায়াত নয়, ঈদের সময় গরুর হাটে যাওয়া থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজনদের বহন পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করেছেন জিয়াসমিন আক্তার।
একজন কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন— “যে অ্যাম্বুলেন্সটা প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ রোগীদের পরিবহনের জন্য বরাদ্দ, সেই গাড়িতে গরু আনা হয়েছে। এটি শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নয়, মানবিক অপরাধও।”
প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিজয় কৃষ্ণ দেবনাথ সচিবালয়ে নিজের কাজ শেষ করে মাঝে মাঝে ফাউন্ডেশনে আসেন। এই সুযোগেই পুরো দপ্তরকে নিজেদের মতো চালাচ্ছেন মফিজুল ইসলাম ও জিয়াসমিন আক্তার।
বিজয় কৃষ্ণ দেবনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন— “আমি নিয়মিত সেখানে যাই না। বিস্তারিত না জেনে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। কয়েকদিনের মধ্যে গিয়ে খোঁজ নিয়ে বলতে পারব।”
তবে এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার পক্ষ থেকে আর কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব রয়েছেন নাকি সত্যিই অবহিত নন?
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুরের ইব্রাহিমপুরে “খান মঞ্জিল” নামের একটি বহুতল ভবনের অষ্টম তলায় নিজেদের নামে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন মফিজ-জিয়াসমিন দম্পতি। সরকারি চাকরি থেকে প্রাপ্ত বেতনের বাইরে এই ফ্ল্যাট কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছে—সেই প্রশ্ন এখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে-বাইরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ফাউন্ডেশনের ভেতরে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। অনেকেই সাংবাদিকের কাছে নাম গোপন রাখার শর্তে অভিযোগ জানিয়েছেন।
একজন কর্মকর্তা বলেন— “তারা জানলে আমার চাকরি থাকবে না, জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাই দয়া করে আমার নাম কোথাও প্রকাশ করবেন না। তবে আমি যা বলছি সব সত্য।”
এই ভয়ের সংস্কৃতি পুরো দপ্তরের কর্মপরিবেশকে ভেঙে দিয়েছে। ফলে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা একধরনের অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের মূল কাজ হলো দেশের প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ প্রতিবন্ধীর উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানেই যদি দুর্নীতি ও অনিয়ম এমন পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে? প্রতিবন্ধীরা কীভাবে তাদের প্রকৃত সুবিধা পাবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাউন্ডেশনের ভেতরে এ ধরনের দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সাথে সরকারের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এই সমস্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ফাউন্ডেশনের অভ্যন্তরে ও বাইরের সংশ্লিষ্ট মহল জোরালো তদন্তের দাবি তুলেছে। তারা মনে করছেন, বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের সাথে সম্পর্কিত।
একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন— “যদি এখনই উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত না হয়, তাহলে ফাউন্ডেশন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী।”
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যার লক্ষ্য প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই স্বামী-স্ত্রী মফিজুল ইসলাম ও জিয়াসমিন আক্তার ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। বদলি বাণিজ্য, আউটসোর্সিং নিয়োগে অনিয়ম, পদোন্নতিতে ঘুষ, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার—সবকিছুর যোগফল এখন একটাই: ফাউন্ডেশন জিম্মি হয়ে আছে এই দম্পতির হাতে।
তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত না হলে, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ চলতেই থাকবে ব্যক্তিস্বার্থে অপব্যবহার হয়ে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ আর নেই।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















