ঢাকা ০২:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজীপুর যেন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য, প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ ও নজরদারি

  • এম এ হোসেন
  • আপডেট সময় ১২:৪৯:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৫
  • ৬৫৭ বার পড়া হয়েছে

অন্ধকার মহাসড়কগুলো যেন ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। গেল কয়েক বছরে সড়ক-মহাসড়কের ব্যাপক উন্নতি নিঃসন্দেহে চোখে পড়ার মতো তবে যথাযথ স্থানে সড়কবাতির অভাবে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে ছিনতাইকারীদের অপকর্মে অতিষ্ঠ পরিবহন চালক-যাত্রী সবাই।

শিল্পনগরী গাজীপুর, যেখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ শ্রমিক নিজেদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চালু রেখেছেন অর্থনীতির চাকা। অথচ এই শিল্পনগরী গাজীপুরেই আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। প্রায়ই ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হচ্ছেন পুলিশ, সাংবাদিকসহ সাধারণ পথচারী। এতে আতঙ্কিত নগরবাসী। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান পুলিশের।

স্থানীয়রা জানান, রাত হলেই গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকাসহ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও এর আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়। ডাকাত ও ছিনতাইকারীরা সাধারণ মানুষের ওপর হামলে পড়ে। রামদা, চাপাতি ও রডসহ বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা, মুঠোফোনসহ অন্যান্য মালামাল। এ সময় আহত হচ্ছেন অনেক যাত্রী। বিভিন্ন সময় খুন হচ্ছেন লোকজন; কিন্তু এসব অপরাধ নির্মূল বা এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থানীয় প্রশাসনের অবস্থান বা ভূমিকা খুবই হতাশাজনক। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকরা যখন প্রতিমাসে ১ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে বেতন পান তখন ছিনতাইকারীদের উৎপাত বেড়ে যায়। অনেক শ্রমিক ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে মাস শেষে বেতনের টাকা বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন না। ছিনিয়ে নেওয়া হয় মোবাইল, ঘড়ি ইত্যাদি।

এদিকে অনুসন্ধানে দেখা যায়, গাজীপুরের প্রবেশপথসহ গভীর রাতে বিভিন্ন মোড় ও গলি হয়ে উঠে অপরাধের স্বর্গরাজ্য। টঙ্গী ও জেলার প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি বস্তি ঘিরে চলে মাদকের জমজমাট ব্যবসা। মাদকসেবীরা টাকা জোগাড় করতে জড়াচ্ছে ছিনতাইয়ে। পুলিশ বলছে, ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যভাগ পর্যন্ত টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত দেড় শতাধিক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। শুধু পুলিশ দিয়েই ছিনতাই ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা যথাযথ না থাকায় সাধারণ মানুষ ও কারখানা শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে গাজীপুরে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য এখনও তেমন কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দিনে চুরি-ডাকাতি, ধর্ষণ, এলাকার মোড়ে মোড়ে মাদকের হাট, কৃষকের গরু চুরি, রাতে অপহরণ এবং কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাথে ঝুট ব্যবসা নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে আছেন শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা। সন্ধ্যার পরই শ্রমিকদের আটকিয়ে মুঠোফোন ও নগদ অর্থ ছিনতাই হচ্ছে। পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় শ্রমিকরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে ভয়ে চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে এবং পুলিশি কার্যক্রমে গতিশীলতা এসেছে। হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। সড়কে কোনো অপরাধ ঘটলেই তারা মামলা নিচ্ছে এবং তদন্ত করছে। অপরাধীরা ধরা পড়লে আইনের আওতায় আসছে। নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। আর গাজীপুর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা প্রতিনিয়তই ছিনতাইকারী ও ডাকাত চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করছে। গত দেড় মাসে প্রায় তিন শতাধিক গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও যেহেতু ঘটনা ঘটছে, তাই অনেকে হতাশ হতেই পারে। তবে তারা অপরাধ নির্মূলে সাধ্যমতো চেষ্টা করছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গাজীপুর যেন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য, প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ ও নজরদারি

আপডেট সময় ১২:৪৯:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৫

অন্ধকার মহাসড়কগুলো যেন ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। গেল কয়েক বছরে সড়ক-মহাসড়কের ব্যাপক উন্নতি নিঃসন্দেহে চোখে পড়ার মতো তবে যথাযথ স্থানে সড়কবাতির অভাবে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে ছিনতাইকারীদের অপকর্মে অতিষ্ঠ পরিবহন চালক-যাত্রী সবাই।

শিল্পনগরী গাজীপুর, যেখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ শ্রমিক নিজেদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চালু রেখেছেন অর্থনীতির চাকা। অথচ এই শিল্পনগরী গাজীপুরেই আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। প্রায়ই ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হচ্ছেন পুলিশ, সাংবাদিকসহ সাধারণ পথচারী। এতে আতঙ্কিত নগরবাসী। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান পুলিশের।

স্থানীয়রা জানান, রাত হলেই গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকাসহ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও এর আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়। ডাকাত ও ছিনতাইকারীরা সাধারণ মানুষের ওপর হামলে পড়ে। রামদা, চাপাতি ও রডসহ বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা, মুঠোফোনসহ অন্যান্য মালামাল। এ সময় আহত হচ্ছেন অনেক যাত্রী। বিভিন্ন সময় খুন হচ্ছেন লোকজন; কিন্তু এসব অপরাধ নির্মূল বা এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থানীয় প্রশাসনের অবস্থান বা ভূমিকা খুবই হতাশাজনক। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকরা যখন প্রতিমাসে ১ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে বেতন পান তখন ছিনতাইকারীদের উৎপাত বেড়ে যায়। অনেক শ্রমিক ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে মাস শেষে বেতনের টাকা বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন না। ছিনিয়ে নেওয়া হয় মোবাইল, ঘড়ি ইত্যাদি।

এদিকে অনুসন্ধানে দেখা যায়, গাজীপুরের প্রবেশপথসহ গভীর রাতে বিভিন্ন মোড় ও গলি হয়ে উঠে অপরাধের স্বর্গরাজ্য। টঙ্গী ও জেলার প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি বস্তি ঘিরে চলে মাদকের জমজমাট ব্যবসা। মাদকসেবীরা টাকা জোগাড় করতে জড়াচ্ছে ছিনতাইয়ে। পুলিশ বলছে, ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যভাগ পর্যন্ত টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত দেড় শতাধিক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। শুধু পুলিশ দিয়েই ছিনতাই ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা যথাযথ না থাকায় সাধারণ মানুষ ও কারখানা শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে গাজীপুরে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য এখনও তেমন কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দিনে চুরি-ডাকাতি, ধর্ষণ, এলাকার মোড়ে মোড়ে মাদকের হাট, কৃষকের গরু চুরি, রাতে অপহরণ এবং কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাথে ঝুট ব্যবসা নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে আছেন শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা। সন্ধ্যার পরই শ্রমিকদের আটকিয়ে মুঠোফোন ও নগদ অর্থ ছিনতাই হচ্ছে। পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় শ্রমিকরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে ভয়ে চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে এবং পুলিশি কার্যক্রমে গতিশীলতা এসেছে। হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। সড়কে কোনো অপরাধ ঘটলেই তারা মামলা নিচ্ছে এবং তদন্ত করছে। অপরাধীরা ধরা পড়লে আইনের আওতায় আসছে। নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। আর গাজীপুর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা প্রতিনিয়তই ছিনতাইকারী ও ডাকাত চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করছে। গত দেড় মাসে প্রায় তিন শতাধিক গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও যেহেতু ঘটনা ঘটছে, তাই অনেকে হতাশ হতেই পারে। তবে তারা অপরাধ নির্মূলে সাধ্যমতো চেষ্টা করছে।