মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ প্রশাসনে একটি জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়ার পর জেলা পুলিশের ড্রাইভার কনস্টেবল মো. ওসমান গনিকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি গভীরভাবে তদন্ত করে দেখার পাশাপাশি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ প্রশাসন। গত ১৩ অক্টোবর, মঙ্গলবার বিকেলে সংবাদমাধ্যমের কাছে এই বরখাস্তকরণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্য ওসমান গনি ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার সাহাবেলীশ্বর এলাকার আঃ কুদ্দুছের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশে ড্রাইভার কনস্টেবল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তবে গত বেশ কিছুদিন ধরে ওই কনস্টেবলের শারীরিক ও মানসিক আচরণ এবং চলাফেরায় নানাবিধ অস্বাভাবিকতা প্রত্যক্ষ করেন জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বিষয়টি নজরে আসার পরপরই বাহিনীর গোপনীয়তা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাকে নিবিড় নজরদারির (Surveillance) আওতায় নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে তার বিষয়ে সন্দেহ তীব্র হলে এবং বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তার ডোপ টেস্ট (মাদক পরীক্ষা) করানোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ অক্টোবর সকালে তাকে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল ডোপ টেস্ট করানো হয়। পরীক্ষার ফলাফলে কনস্টেবল ওসমান গনির নমুনায় মাদকদ্রব্যের উপস্থিতি পজিটিভ বলে নিশ্চিত করেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা। হাসপাতালের লিখিত ডোপ টেস্ট প্রতিবেদন জেলা পুলিশ কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের নির্দেশ জারি করা হয়।
ঘটনার পরপরই জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ড্রাইভার কনস্টেবল ওসমান গনি সুনির্দিষ্টভাবে কোন ধরনের মাদক গ্রহণ করেছিলেন, কীভাবে এবং কাদের কাছ থেকে এই মাদক সংগ্রহ করতেন—এসব বিস্তারিত বিষয় উদ্ঘাটনে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিকে অতি দ্রুত বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রতিবেদন জেলা পুলিশ সুপারের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আইনি ও নীতিগত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “ডোপ টেস্টে রিপোর্ট পজিটিভ আসায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিক বরখাস্তসহ আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশে মাদকের বিষয়ে আমাদের অবস্থান সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা)। এই নীতি সাধারণ জনগণের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রয়োগ করা হবে। এই নীতির কারণেই যাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হচ্ছে, তাদের নিয়মিত ডোপ টেস্টের মুখোমুখি করা হচ্ছে এবং এ ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”
বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নিয়মিত বিরতিতে ডোপ টেস্ট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সরকারি চাকরিবিধি ও পুলিশ প্রবিধানমালা (PRB) অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অবৈধ মাদক সেবনের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা চরম শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রতিটি জেলা ও ইউনিটে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। কোনো সদস্যের ডোপ টেস্টের ফলাফল পজিটিভ এলে তাকে বিভাগীয় মামলা ও চাকরিচ্যুতির মুখোমুখি হতে হয়। রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিজেদের মাদকমুক্ত রাখা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সামাজিক আস্থার অন্যতম প্রধান শর্ত।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিজস্ব কর্মীর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণকে স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিকেরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সাধারণ মানুষের একাংশের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের অনিয়ম ও মাদকাসক্তি দূর না হলে সমাজে মাদকের বিস্তার রোধ করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের এই পদক্ষেপ এবং জিরো টলারেন্স নীতি অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। ডোপ টেস্টের নিয়মিত চর্চা এবং গঠিত তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক উদ্ঘাটন করা সম্ভব হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও জনআস্থা বৃদ্ধি পাবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















