কিছু গল্পের শেষটা সত্যিই হৃদয়বিদারক। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পরিবারের সন্ধান মিলেছে, কিন্তু সেই মানুষটি আর বেঁচে নেই। ১৫–১৬ বছর ধরে নিখোঁজ এক যুবককে খুঁজতে খুঁজতে স্বজনদের চোখের জল শুকিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর সন্ধান মিলেছে ভোলাহাটে—তবে জীবিত অবস্থায় নয়, একটি নিথর মরদেহ হিসেবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে কয়েকদিন আগে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় ঘোরাফেরা করছিলেন এক অসহায় ব্যক্তি। স্থানীয়দের কাছে নিজের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাঁর কথাবার্তা ছিল অনেকটাই অসংলগ্ন। ফলে তাঁর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তবে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ভোলাহাটের বীরেশ্বরপুর ইসলামিক মিডিয়ার কয়েকজন যুবক। তাঁরা অসহায় ওই ব্যক্তির চুল-দাড়ি কেটে দেন, গোসল করিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন এবং নতুন পোশাক পরিয়ে দেন। সে সময় তিনি নিজের সম্পর্কে কিছু তথ্যও দিয়েছিলেন। যদিও কথাগুলো ছিল এলোমেলো, পরবর্তীতে সেই অস্পষ্ট তথ্যই তাঁর পরিচয় শনাক্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে দাঁড়ায়।
দুঃখজনকভাবে গত ২৩ আগস্ট ২০২৬ দিবাগত রাতে ভোলাহাটে ওই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। পরে ভোলাহাট থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাঁর মরদেহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়।
এরপর শুরু হয় তাঁর পরিচয় ও পরিবারের সন্ধানে এক মানবিক অনুসন্ধান। ভোলাহাটের সাংবাদিকগণ, ভোলাহাট থানা পুলিশ, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী টিম, স্থানীয় সুধীজন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি সিআইডি টিমসহ সংশ্লিষ্টরা পরিচয় শনাক্তে দিনভর নানা চেষ্টা চালান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পাশাপাশি টাঙ্গাইলসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার ফেসবুক গ্রুপে তাঁর ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যোগাযোগ করা হয় প্রায় ৮ থেকে ১০টি থানায়। একের পর এক সম্ভাব্য সূত্র যাচাই করা হলেও কোনোভাবেই পরিবারের সন্ধান মিলছিল না।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সোমবার (২৪ আগস্ট২০২৬) দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে। মধুপুরের তাঁর বোন নাসরীনের মাধ্যমে শনাক্ত হয় ওই অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয়।
তিনি হলেন—মোঃ বাবুল হোসেন (৩৫)। পিতা মৃত মোনশের আলী, মাতা হাদিজা বেগম। তাঁর বাড়ি উত্তর গাংগাই (কাশিনাথপাড়া), আলোকদিয়া ইউনিয়ন, মধুপুর থানা, টাঙ্গাইল জেলা।
বাবুল হোসেনের চাচাতো ভাই মিজানুর রহমান জানান, বাবুল দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রায় ১৫–১৬ বছর আগে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। এরপর পরিবারের সদস্যরা বছরের পর বছর বিভিন্ন স্থানে তাঁকে খুঁজেছেন। কিন্তু কোনোভাবেই তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এই দীর্ঘ সময়ে বাবুলের বাবা মৃত্যুবরণ করেছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও প্রিয় মানুষটির ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে যখন বাবুলের সন্ধান মিলল, তখন স্বজনদের সামনে পড়ে রইল তাঁর নিথর দেহ।
একদিকে ১৫–১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান, অন্যদিকে আপনজনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার বদলে নিথর দেহ গ্রহণ—একটি পরিবারের জন্য এর চেয়ে নির্মম বাস্তবতা আর কী হতে পারে!
বাবুলের পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে ভোলাহাটের বীরেশ্বরপুর ইসলামিক মিডিয়ার সদস্যদের মানবিক উদ্যোগও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চুল-দাড়ি কাটানো, গোসল করানো ও নতুন পোশাক পরানোর সময় বাবুল নিজের সম্পর্কে যেসব তথ্য দিয়েছিলেন, সেগুলো তখন অসংলগ্ন মনে হলেও পরবর্তীতে সেই তথ্যই তাঁর পরিবারের সন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজে আসে।
আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট ২০২৬) দুপুর ১২টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে বাবুল হোসেনের মরদেহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৫–১৬ বছর পর পরিবারের কাছে ফিরলেন বাবুল—তবে জীবনের স্পন্দন নিয়ে নয়, শেষবারের মতো নিথর দেহ হয়ে।
এই ঘটনায় মানবিক সহযোগিতার জন্য ভোলাহাট থানা পুলিশ, সাংবাদিক সমাজ, বীরেশ্বরপুর ইসলামিক মিডিয়ার সদস্য, স্বেচ্ছাসেবী টিম, সিআইডি টিম এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
মরহুম বাবুল হোসেনের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ যেন তাঁর জীবনের সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং দীর্ঘদিন পর স্বজনকে হারানোর এই গভীর শোক সইবার তাওফিক তাঁর পরিবারকে দান করেন।
ছবিক্যাপশন: ভোলাহাটে কিছুদিন অবস্থানের পর অবশেষে পরিবারের সন্ধান মিললেও জীবিত নয়—নিথর মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরলো বাবুল। ছবিতে চুল-দাড়ি কাটানো ও গোসল করানোর পর বাবুলের ছবি এবং তাঁর নিথর দেহ।
এম. এস. আই শরীফ, ভোলাহাট (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি 




















