অধীনস্থ সংস্থা থেকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, সহকারী একান্ত সচিব নিয়েছেন একাধিক গাড়ি। দামি পাজেরো স্পোর্ট ও আউটল্যান্ডার জিপও রয়েছে সেই তালিকায়। দপ্তরের দামি গাড়িতে ভাগ বসানোর সুযোগ হাতছাড়া করেননি গণপূর্ত সচিবের একান্ত সচিব এবং জনসংযোগ কর্মকর্তাও। অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে বাছাই করে ৭টি গাড়ি নিয়েছেন প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিরা। রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের এসব পাজেরো স্পোর্ট ও আউটল্যান্ডার জিপ সরকার গঠনের পরপরই ভাগ বসিয়ে ব্যবহার করছেন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা। এমনকি সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করার ঘোষণা দেওয়া প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের জন্যও নেওয়া হয়েছে রাজউকের একাধিক গাড়ি।
শুধু দাপ্তরিক কাজে নয়, সরকারি সংস্থার গাড়ি শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক কাজে ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে এমন কর্মকর্তাও রয়েছেন, যারা নিজস্ব গাড়ি কেনার জন্য সরকারের কাছ থেকে সুদমুক্ত ঋণ এবং গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ও চালকের বেতন বাবদ মাসিক সুবিধা পাচ্ছেন। বিধিমতে তাদের সরকারি গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ নেই।
সূত্র জানায়, এসব গাড়ির চালক, জ্বালানি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহন করছে রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। ফলে সরকারি সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারের বদলে এক সংস্থার গাড়ি অন্য দপ্তরের কাজে ব্যবহারের মাধ্যমে বাড়ছে সরকারি ব্যয়। প্রশ্ন উঠেছে, যেসব কর্মকর্তা গাড়ি কেনার জন্য আগেই সরকারি সুবিধা পেয়েছেন, তারা আবার কেন সংস্থা বা প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছেন।
প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে রাজউক ও পূর্তের ৩ দামি গাড়ি
গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুরের দপ্তরের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে রাজউকের মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার জিপ। ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৪৩৩৩৫ নম্বরের গাড়িটির চালক মো. ইয়াসিন মল্লিক।
এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (উপসচিব) মোশারফ হোসেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি ধূসর রঙের হুন্দাই এসইউভি ব্যবহার করছেন। ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৬২২৫৯ নম্বরের গাড়িটির বর্তমান চালক বাবলু। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটি আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সমন্বয়) ব্যবহার করতেন।
অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হুমায়ুন রশিদ ব্যবহার করছেন নগর গণপূর্ত বিভাগের মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার জিপ, যার নম্বর ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-৭২৩৫।
প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোশারফ হোসেন বলেন, ‘কে কোন গাড়ি ব্যবহার করবেন তা মন্ত্রণালয়ের সচিব ঠিক করে দেন। এখানে আমাদের ব্যক্তিগত কিছু নেই।’
প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘এটা মন্ত্রণালয়ের গাড়ি। আমি দাপ্তরিক কাজের জন্য ব্যবহার করছি।’
রাজউকের গাড়ির পাশাপাশি নগর গণপূর্ত বিভাগের মিতসুবিশি পাজেরো স্পোর্ট ও মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার জিপও এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর একান্ত সচিব ও সহকারী সচিব ব্যবহার করছেন। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-৯৩৮০ নম্বরের পাজেরো স্পোর্ট দেওয়া হয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রীর একান্ত সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশক্রমে গাড়িটি এই কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তিনি আগে গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ সুবিধাও পেয়েছিলেন। এ কর্মকর্তা সিলেটে জেলা প্রশাসক থাকাকালীন ভোলাগঞ্জ পাথর কাণ্ডে প্রত্যাহার হয়েছেন বলে জানা যায়।
এ ছাড়া ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৮-৪২৯৭ নম্বরের আরেকটি পাজেরো স্পোর্ট ব্যবহার করছেন গণপূর্ত মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মো. মোয়াজ্জেম হোসেন।
জানতে চাইলে গণপূর্ত মন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, ‘আমি আগেও গাড়ি কেনার জন্য আর্থিক সুবিধা পেয়েছিলাম। তবে গণপূর্তের পাজেরো স্পোর্ট শুধু অফিসে আসা-যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি আমার ২৪ ঘণ্টার জন্য বরাদ্দ নয়। যদি ২৪ ঘণ্টার জন্য বরাদ্দ হতো ভাড়া বাবদ আমার বেতন থেকে অর্থ কেটে নেওয়া হতো।’
মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মো. মোয়াজ্জেম হোসেন কল্লোল বলেন, ‘পূর্তের গাড়ি ব্যবহার করা যাবে কিনা এই নিয়ম সম্পর্কে আমার জানা নেই। এই গাড়িটি সাধারণত মন্ত্রী মহোদয় ব্যবহার করেন। আমি তার সঙ্গে দপ্তরে আসি, আবার তার সঙ্গে বের হয়ে যাই।’
সচিবের দপ্তরেও সংস্থার গাড়ি
গণপূর্ত সচিবের একান্ত সচিব (উপসচিব) বশির আহম্মদ ব্যবহার করছেন ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-২৮৮৩ নম্বরের ডিজেলচালিত পাজেরো স্পোর্ট। এটির চালক মো. শহিদুল ইসলাম।
অন্যদিকে ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-১৯৭৯ নম্বরের আউটল্যান্ডারটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আলগীর হোসেনের জন্য রয়েছে।
গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে আমরা গাড়ি ব্যবহার করে থাকি। যেমন কোনো জায়গায় মিটিং যাওয়ার জন্য গাড়ি ব্যবহার করতে হয়।’
জ্বালানি ভাতার বিধান
১৯৯১ সালে জারিকৃত এক আদেশে উপ-রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সমপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের গাড়ির জ্বালানি ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। যেখানে নির্দিষ্ট ভাতার পরিবর্তে দৈনিক ২০ লিটার জ্বালানির মূল্যের সমপরিমাণ টাকা প্রদান করা হয়। যা তাদের বেতনের সঙ্গে যুক্ত হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতা আসার পর একটি পরিপত্রের মাধ্যমে জ্বালানি ভাতা কমানো হয়। জ্বালানি খাতে বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ ব্যয় করা যাবে অর্থাৎ ৩০ শতাংশ সাশ্রয় করতে হবে। বাকি ৭০ শতাংশ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















