ঢাকা ০৯:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার কবিরের অনিয়ম-দূর্নীতি

জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনিক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি—এমন অভিযোগের মধ্যেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগকে ঘিরে সামনে এসেছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। আর এসব প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবির। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে টেন্ডার পদ্ধতি পরিবর্তন, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশনভিত্তিক বাণিজ্য, টেন্ডার ও পোস্টিং সিন্ডিকেট পরিচালনা, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিশ্চিত করতে অর্থ লেনদেন এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের মতো একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কাজগুলোতে লিমিটেড টেন্ডার মেথড বা এলটিএম অনুসরণের কথা থাকলেও ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে তিনি ওপেন টেন্ডার মেথড বা ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ওটিএম পদ্ধতি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক হলেও বাস্তবে এমনভাবে দরপত্র পরিচালনা করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট কিছু পছন্দের ঠিকাদার সুবিধা পান এবং অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে।
অন্তত ৬০টির বেশি দরপত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব দরপত্রের মধ্যে রয়েছে ১০৬০৬৮৯, ১০৭০৫৪৬, ১০৬৬৫৯৪, ১০৬৭৭২৪, ১০৬৬৬০২, ১০৬৭৭২১, ১০৭০৫৪৩, ১০৭০৫৪৫, ১০৬৭৭২৭, ১০৬৭৭২৬, ১০৬৭৭২৫, ১০৬৭৭২৩, ১০৭০৫৪০, ১০৭০৫৪৮, ১০৬৬৫৮৯, ১০৫৮০৭৮, ১০৪৫৫৪৩, ১০৪৫৫৫০, ১০৫৮৪৯৯, ১০৫৮৫০০, ১০৫৮০৮১, ১০৫৮০৮৪, ১০৬০০৮৪, ১০৪৫৫১৫, ১০৪৫৫১৮, ১০৪৫৫২১, ১০৪৫৫২২, ১০৪৫৫২৩, ১০৪৫৫২৫, ১০৪৫৫২৬, ১০৪৫৫২৭, ১০৪৫৫৩১, ১০৪৫৫৪১, ১০৪৫৫৪৬, ১০৬০০৭৭, ১০৫৮১২৪, ১০৪৩৩৫২, ১০৪৩৩৬১, ১০৪৩৩৬৭, ১০৪৩৩৭৩, ১০৪৩৪১০, ১০৪৩৪১৪, ১০৪৩৫১৫, ১০৪৩৪১৭, ১০৪৩৪১৮, ১০৪৩৪১৯, ১০৪৩৪২০, ১০৪৩৪২১, ১০৪৩৪২২, ১০৪৩৪২৪, ১০৪৩৪২৬, ১০৪৩৪২৭, ১০৪৩৪২৯, ১০৪৩৪৩০, ১০৪৩৫৩১, ১০৪৩৪৩২, ১০৪৩৪৩৩, ১০৪৩৪৩৪, ১০৪৩৪৩৫, ১০৪৩৪৩৮, ১০৪৩৪৪০, ১০৪৩৪৪১ ও ১০৪৩৪৪৩।
অভিযোগের ধরন শুধু টেন্ডার পদ্ধতি পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এসব কাজের ক্ষেত্রে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। কাজের ধরন ও মূল্য অনুযায়ী কমিশনের অঙ্ক কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এসব টেন্ডারের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। রাজধানীর সরকারি ভবন, সরকারি বাসভবন, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ এই বিভাগের আওতাভুক্ত। প্রতি বছর এখানে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের কাজ বরাদ্দ হয়। ফলে এ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর হাতে টেন্ডার, কাজের অনুমোদন, ঠিকাদার নির্বাচন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, কায়সার কবির এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিভাগের টেন্ডার কার্যক্রমে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, কায়সার কবির সরাসরি সবকিছু পরিচালনা না করে তাঁর আস্থাভাজন কিছু অধস্তন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে বিভাগের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন। বদলি, দায়িত্ব বণ্টন, কাজ অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব ছিল বলে কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে বিরোধে জড়ানো বা তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, বদলি কিংবা প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পোস্টিং, বদলি ও বার্ষিক মূল্যায়নের মতো বিষয়েও তাঁর প্রভাবের কারণে অনেক কর্মকর্তা মুখ খুলতে চান না।
কায়সার কবিরের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। সাভার সার্কেলে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। আব্দুল কাদের চৌধুরী পরবর্তীতে জিকে শামীম-সংশ্লিষ্ট ক্যাসিনো কাণ্ড ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচিত হন এবং পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগে পদাবনতির মুখে পড়েছিলেন । অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, সাভারে থাকাকালেই কায়সার কবির সরকারি টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের কৌশল রপ্ত করেন।
পরবর্তীতে কায়সার কবির জামালপুরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজম এমপি এবং তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ উঠে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলীর e-GP সিস্টেমের পাসওয়ার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে দরপত্র প্রক্রিয়া এককভাবে প্রভাবিত করতেন। এই অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি ই-প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করে।
ঢাকায় ফিরে কায়সার কবির আজিমপুর, গুলশানসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সাব-ডিভিশনে দায়িত্ব পালন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পোস্টিং নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। জানা যায় পাবনা জেলার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের মাধ্যমে অর্থ দিয়ে আজিমপুরে নিজের পছন্দের পোস্টিং নিশ্চিত করেন তিনি। একই প্রক্রিয়ায় তাঁর ঘনিষ্ঠ ইলিয়াস আহমেদ ও মাহাবুব নামের আরও দুই প্রকৌশলী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল হন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব পাওয়ার পর ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে তাঁর পোস্টিং নিয়েও বড় অঙ্কের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, সাজিন কন্সট্রাকশন লিমিটেডের কর্ণধারের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারকে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে তিনি ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে পোস্টিং নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপরই ব্যাপকভাবে টেন্ডার বাণিজ্য শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যে যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে। সাবেক মন্ত্রী র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মুসার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মুসার মাধ্যমে আন্তঃজেলা ভ্রমণ, নগদ অর্থ লেনদেন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অর্থায়ন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, এমনকি শেখ কামালের জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল।
কায়সার কবিরের ব্যক্তিগত সম্পদ ও জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রাজধানীতে তাঁর বসবাস, গাড়ি ব্যবহার এবং পারিবারিক ব্যয়ের ধরন তাঁর ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। বিভিন্ন সূত্র তাঁর সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থান ও ছাত্র-জনতার আন্দোলন সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন বা হত্যাকাণ্ডে তিনি প্রত্যক্ষভাবে অর্থায়ন করেছেন।
কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক ভয়ের পরিবেশ। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, পোস্টিং, বদলি, দায়িত্ব বণ্টন ও বার্ষিক মূল্যায়নে তাঁর প্রভাব থাকায় কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না। তাঁর সঙ্গে বিরোধে গেলে প্রশাসনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
কায়সার কবিরের যোগাযোগ করা হলে তিনি “মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, টেন্ডারের আইডি যাচাই না করে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। প্রকাশিত অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করলে কায়সার কবিরকে ঘিরে মূলত তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি সামনে আসে—টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পোস্টিং-বদলি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ এবং এসব প্রভাবের মাধ্যমে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ। এর সঙ্গে e-GP নিয়ন্ত্রণ, পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য, প্রশাসনিক চাপ এবং সম্পদ বৃদ্ধির প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

খালি পেটে সকালে কলা খাওয়া কতটা উপকারী?

নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার কবিরের অনিয়ম-দূর্নীতি

আপডেট সময় ০৮:২২:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনিক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি—এমন অভিযোগের মধ্যেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগকে ঘিরে সামনে এসেছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। আর এসব প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবির। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে টেন্ডার পদ্ধতি পরিবর্তন, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশনভিত্তিক বাণিজ্য, টেন্ডার ও পোস্টিং সিন্ডিকেট পরিচালনা, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিশ্চিত করতে অর্থ লেনদেন এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের মতো একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কাজগুলোতে লিমিটেড টেন্ডার মেথড বা এলটিএম অনুসরণের কথা থাকলেও ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে তিনি ওপেন টেন্ডার মেথড বা ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ওটিএম পদ্ধতি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক হলেও বাস্তবে এমনভাবে দরপত্র পরিচালনা করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট কিছু পছন্দের ঠিকাদার সুবিধা পান এবং অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে।
অন্তত ৬০টির বেশি দরপত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব দরপত্রের মধ্যে রয়েছে ১০৬০৬৮৯, ১০৭০৫৪৬, ১০৬৬৫৯৪, ১০৬৭৭২৪, ১০৬৬৬০২, ১০৬৭৭২১, ১০৭০৫৪৩, ১০৭০৫৪৫, ১০৬৭৭২৭, ১০৬৭৭২৬, ১০৬৭৭২৫, ১০৬৭৭২৩, ১০৭০৫৪০, ১০৭০৫৪৮, ১০৬৬৫৮৯, ১০৫৮০৭৮, ১০৪৫৫৪৩, ১০৪৫৫৫০, ১০৫৮৪৯৯, ১০৫৮৫০০, ১০৫৮০৮১, ১০৫৮০৮৪, ১০৬০০৮৪, ১০৪৫৫১৫, ১০৪৫৫১৮, ১০৪৫৫২১, ১০৪৫৫২২, ১০৪৫৫২৩, ১০৪৫৫২৫, ১০৪৫৫২৬, ১০৪৫৫২৭, ১০৪৫৫৩১, ১০৪৫৫৪১, ১০৪৫৫৪৬, ১০৬০০৭৭, ১০৫৮১২৪, ১০৪৩৩৫২, ১০৪৩৩৬১, ১০৪৩৩৬৭, ১০৪৩৩৭৩, ১০৪৩৪১০, ১০৪৩৪১৪, ১০৪৩৫১৫, ১০৪৩৪১৭, ১০৪৩৪১৮, ১০৪৩৪১৯, ১০৪৩৪২০, ১০৪৩৪২১, ১০৪৩৪২২, ১০৪৩৪২৪, ১০৪৩৪২৬, ১০৪৩৪২৭, ১০৪৩৪২৯, ১০৪৩৪৩০, ১০৪৩৫৩১, ১০৪৩৪৩২, ১০৪৩৪৩৩, ১০৪৩৪৩৪, ১০৪৩৪৩৫, ১০৪৩৪৩৮, ১০৪৩৪৪০, ১০৪৩৪৪১ ও ১০৪৩৪৪৩।
অভিযোগের ধরন শুধু টেন্ডার পদ্ধতি পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এসব কাজের ক্ষেত্রে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। কাজের ধরন ও মূল্য অনুযায়ী কমিশনের অঙ্ক কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এসব টেন্ডারের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। রাজধানীর সরকারি ভবন, সরকারি বাসভবন, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ এই বিভাগের আওতাভুক্ত। প্রতি বছর এখানে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের কাজ বরাদ্দ হয়। ফলে এ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর হাতে টেন্ডার, কাজের অনুমোদন, ঠিকাদার নির্বাচন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, কায়সার কবির এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিভাগের টেন্ডার কার্যক্রমে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, কায়সার কবির সরাসরি সবকিছু পরিচালনা না করে তাঁর আস্থাভাজন কিছু অধস্তন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে বিভাগের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন। বদলি, দায়িত্ব বণ্টন, কাজ অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব ছিল বলে কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে বিরোধে জড়ানো বা তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, বদলি কিংবা প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পোস্টিং, বদলি ও বার্ষিক মূল্যায়নের মতো বিষয়েও তাঁর প্রভাবের কারণে অনেক কর্মকর্তা মুখ খুলতে চান না।
কায়সার কবিরের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। সাভার সার্কেলে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। আব্দুল কাদের চৌধুরী পরবর্তীতে জিকে শামীম-সংশ্লিষ্ট ক্যাসিনো কাণ্ড ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচিত হন এবং পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগে পদাবনতির মুখে পড়েছিলেন । অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, সাভারে থাকাকালেই কায়সার কবির সরকারি টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের কৌশল রপ্ত করেন।
পরবর্তীতে কায়সার কবির জামালপুরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজম এমপি এবং তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ উঠে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলীর e-GP সিস্টেমের পাসওয়ার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে দরপত্র প্রক্রিয়া এককভাবে প্রভাবিত করতেন। এই অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি ই-প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করে।
ঢাকায় ফিরে কায়সার কবির আজিমপুর, গুলশানসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সাব-ডিভিশনে দায়িত্ব পালন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পোস্টিং নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। জানা যায় পাবনা জেলার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের মাধ্যমে অর্থ দিয়ে আজিমপুরে নিজের পছন্দের পোস্টিং নিশ্চিত করেন তিনি। একই প্রক্রিয়ায় তাঁর ঘনিষ্ঠ ইলিয়াস আহমেদ ও মাহাবুব নামের আরও দুই প্রকৌশলী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল হন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব পাওয়ার পর ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে তাঁর পোস্টিং নিয়েও বড় অঙ্কের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, সাজিন কন্সট্রাকশন লিমিটেডের কর্ণধারের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারকে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে তিনি ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে পোস্টিং নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপরই ব্যাপকভাবে টেন্ডার বাণিজ্য শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যে যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে। সাবেক মন্ত্রী র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মুসার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মুসার মাধ্যমে আন্তঃজেলা ভ্রমণ, নগদ অর্থ লেনদেন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অর্থায়ন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, এমনকি শেখ কামালের জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল।
কায়সার কবিরের ব্যক্তিগত সম্পদ ও জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রাজধানীতে তাঁর বসবাস, গাড়ি ব্যবহার এবং পারিবারিক ব্যয়ের ধরন তাঁর ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। বিভিন্ন সূত্র তাঁর সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থান ও ছাত্র-জনতার আন্দোলন সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন বা হত্যাকাণ্ডে তিনি প্রত্যক্ষভাবে অর্থায়ন করেছেন।
কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক ভয়ের পরিবেশ। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, পোস্টিং, বদলি, দায়িত্ব বণ্টন ও বার্ষিক মূল্যায়নে তাঁর প্রভাব থাকায় কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না। তাঁর সঙ্গে বিরোধে গেলে প্রশাসনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
কায়সার কবিরের যোগাযোগ করা হলে তিনি “মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, টেন্ডারের আইডি যাচাই না করে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। প্রকাশিত অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করলে কায়সার কবিরকে ঘিরে মূলত তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি সামনে আসে—টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পোস্টিং-বদলি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ এবং এসব প্রভাবের মাধ্যমে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ। এর সঙ্গে e-GP নিয়ন্ত্রণ, পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য, প্রশাসনিক চাপ এবং সম্পদ বৃদ্ধির প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে।