শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীর পিআরএল বা অবসর-উত্তর ছুটি ঘনিয়ে আসার আগেই সংস্থাটির শীর্ষ পদ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। গোপালগঞ্জে টানা পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন বিতর্কের জেরে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর প্রধান প্রকৌশলীর পদটি দখলে নিতে একাধিক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে ইইডির অভ্যন্তরে এখন পাল্টাপাল্টি প্রচার, কুৎসা রটনা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার এই লড়াইয়ে প্রশাসনিক পরিবেশও ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে।
এই দৌড়ঝাঁপে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন রংপুর সার্কেলের চলতি দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জাহেদুল করীম। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রধান প্রকৌশলীর পদকে কেন্দ্র করে চলমান অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে সংবাদ বা তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরিতে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে সক্রিয় রয়েছেন। এমনকি একজন কর্মকর্তাকে ওএসডি করানোর নেপথ্যেও ওই সিন্ডিকেটের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
আওয়ামী আমলের সংগঠনে নেতৃত্বের ইতিহাস
ইইডির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মো. জাহেদুল করীমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে তাঁর অতীত সাংগঠনিক পরিচয় ঘিরেও। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী প্রকৌশলী সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৭ জুলাই গঠিত সংগঠনটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটিতে তিনি কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। সে সময় তিনি ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরে ২০২৩ সালের ২ আগস্ট গঠিত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শাখার সর্বশেষ কমিটিতে তিনি সদস্যসচিবের দায়িত্ব পান।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কীভাবে আগের প্রভাববলয়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পদায়নের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছেন?
পছন্দের ঠিকাদার ও বিল পরিশোধ নিয়ে অভিযোগ
মো. জাহেদুল করীমের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ শেষ হওয়ার আগেই পুরো বিল বা অগ্রিম বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি ইইডির প্রধান কার্যালয়ের এক হিসাব সহকারীর মালিকানাধীন বলে অভিযোগ ওঠা ‘সাঈদ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়াকে কেন্দ্র করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর মালিকানাধীন বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানের কাজের সম্পর্ক থাকলে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি, মালিকানা কাঠামো, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং বিল পরিশোধের বৈধতা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাঈদ এন্টারপ্রাইজ ১১টি বিলে মোট ২ কোটি ৮০ লাখ ৫৫ হাজার ৭৬০ টাকা উত্তোলন করে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই অর্থের একটি বড় অংশ অনৈতিকভাবে মো. জাহেদুল করীমসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ হয়েছে।
পদ না থাকলেও পদোন্নতি ও পদায়নের প্রশ্ন
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এলেও ইইডির পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে বিতর্ক থামেনি।
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ইইডির পাঁচজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই পদোন্নতির সময় অনুমোদিত পদ না থাকা সত্ত্বেও মো. জাহেদুল করীম কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতির তালিকায় চতুর্থ স্থানে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করান এবং পরে রংপুর সার্কেলে পদায়ন বাগিয়ে নেন।
ইইডিতে মোট ১২টি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এর মধ্যে প্রধান কার্যালয় ও নয়টি সার্কেলের অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে পদোন্নতি ও পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনিক কাঠামো, শূন্যপদ এবং জ্যেষ্ঠতার নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—সে বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
শীর্ষ পদকে কেন্দ্র করে নতুন অস্থিরতা
এখন প্রধান প্রকৌশলীর পদ নিয়ে নতুন করে শুরু হওয়া প্রতিযোগিতায় পুরোনো অভিযোগগুলো আবার সামনে আসছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে তথ্য ছড়াচ্ছে, আবার প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রশাসনিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
ইইডির একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশাসনিক যোগ্যতা এবং অতীত কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এই অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
তাঁদের মতে, পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত বিতর্ক, ঠিকাদারি কাজের অভিযোগ, বিল পরিশোধের অনিয়ম এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব—সবগুলো বিষয়ই স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ, শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থার শীর্ষ পদ যদি কেবল অভ্যন্তরীণ প্রভাব, লবিং ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের লড়াইয়ে পরিণত হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















