আউটসোর্সিং ঠিকাদার প্রথা বাতিল করে বিভিন্ন সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও দপ্তর-অধিদপ্তরে কর্মরত আউটসোর্সিং, দৈনিক মজুরিভিত্তিক ও প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ীকরণ এবং শ্রমিকদের চাকরির অনিশ্চয়তা দূর করার দাবি জানানো হয়েছে।
‘আউটসোর্সিং ঠিকাদার প্রথা বাতিলপূর্বক স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আউটসোর্সিংসহ সকল অস্থায়ী কর্মচারীদের স্থায়ীকরণের মাধ্যমে শ্রমিকদের চাকরির অনিশ্চয়তা দূরীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা, শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও শ্রম আইন বাস্তবায়নে সরকারের দায়িত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে এ দাবি জানানো হয়।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেল ৪টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে বাংলাদেশ আউটসোর্সিং কর্মচারী ঐক্য পরিষদ এ সেমিনারের আয়োজন করে। কে এম জান্নাতুল নাঈমের সঞ্চালনায় এবং বাংলাদেশ আউটসোর্সিং কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী ও পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। বিশেষ অতিথি ছিলেন নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম হেলালী। প্রধান আলোচক ছিলেন সাবেক শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, শ্রমিক-কর্মচারীরা দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও আউটসোর্সিং ও অস্থায়ী কর্মচারীদের চাকরির নিশ্চয়তা না থাকা কোনোভাবেই শ্রমিকবান্ধব ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ঠিকাদার পরিবর্তন বা নতুন টেন্ডারের কারণে একজন অভিজ্ঞ কর্মচারী যেন চাকরি হারিয়ে না ফেলেন, সে বিষয়ে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই ধরনের কাজ করা কর্মীদের মধ্যে বৈষম্য দূর করে ন্যায়সংগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় শ্রম আইন ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকা জরুরি।
শিমুল বিশ্বাস আরও বলেন, শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা রেখে কোনো কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। যারা বছরের পর বছর স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি মানবিক ও বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আউটসোর্সিং কর্মচারীদের ন্যায্য দাবিগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল তাদের পাশে থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে প্রধান আলোচক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যায্য কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শ্রমের ধরন ও প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী ধরনের কাজ করে আসা কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সুপারিশের কথা শ্রম সংস্কার কমিশনের আলোচনাতেও উঠে এসেছে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় কর্মরত অনেক শ্রমিক একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করলেও ঠিকাদার পরিবর্তন, টেন্ডার ও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন। এ ধরনের অনিশ্চয়তা দূর করতে ঠিকাদারনির্ভর নিয়োগব্যবস্থার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি জানান তারা। এ দাবিগুলো নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে সংগঠনটি চাকরির নিশ্চয়তা, সরাসরি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ এবং অভিজ্ঞ কর্মীদের নতুন টেন্ডারের কারণে ছাঁটাই না করার দাবি জানিয়েছে।
আউটসোর্সিং কর্মচারীদের প্রধান দাবিসমূহ
সেমিনারে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের পক্ষ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, দপ্তর, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরে আউটসোর্সিং ঠিকাদার প্রথা বাতিল করতে হবে।
২. একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত আউটসোর্সিং, দৈনিক মজুরিভিত্তিক ও প্রকল্পভিত্তিক কর্মচারীদের স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চাকরির নিশ্চয়তা ও স্থায়ীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. নতুন টেন্ডার বা ঠিকাদার পরিবর্তনের অজুহাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মীদের বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করা যাবে না
৪. একই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে কর্মীদের মধ্যে বৈষম্য দূর করে সমান কাজের জন্য ন্যায্য বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. কর্মরতদের বকেয়া বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে এবং নিয়মিত বেতন প্রদানের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
৬. অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত কর্মচারীদের পুনর্বহাল করতে হবে।
৭. নির্ধারিত কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ এবং ছুটির দিনে দায়িত্ব পালন করালে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে।
৮. কর্মীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন ও অন্যান্য শ্রমিক কল্যাণমূলক সুবিধা** কার্যকর করতে হবে। আউটসোর্সিং নীতিমালা-২০২৫-এ কর্মীদের সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার নির্দেশনার কথাও সংগঠনের পক্ষ থেকে পূর্বে তুলে ধরা হয়েছে।
৯. শ্রম সংস্কার কমিশনের শ্রমিকবান্ধব সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং শ্রম আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা কর্মীদের বারবার টেন্ডার ও ঠিকাদার পরিবর্তনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা হলে তাদের পরিবার ও সামাজিক জীবনে স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপির) শ্রম বিষয়ক সহ সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান,কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের অর্থ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাবেক সভাপতি খন্দকার জুলফিকার মতিন, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক সুমন ভুইয়া,জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব ও সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের মহাসচিব বদরুল আলম সবুজ, সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















