লাখো মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম দেশের নৌপথ। এই নৌপথকে নিরাপদ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নিয়মের মধ্যে পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের। তবে এই বিভাগের প্রধান পরিচালক মো. আলমগীর কবীরকে ঘিরে উঠেছে নানা অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রভাবেই রুটপারমিট ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ, স্পিডবোট এবং বাল্কহেড দেশের বিভিন্ন নৌপথে অবাধে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে।
নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা এই বিভাগেই নিয়ম-নীতির ব্যত্যয় ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ অনুযায়ী, লাইসেন্স নবায়নে অনিয়ম, অবৈধ নৌযানকে বিশেষ সুবিধা প্রদান এবং মাসোহারা আদায়ের মাধ্যমে একটি অনিয়মের কাঠামো তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় নৌনিরাপত্তা বিভাগ এবং বিশেষ করে পরিচালক মো. আলমগীর কবীরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি লঞ্চ মালিকদের পক্ষে রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, আইন অনুযায়ী ফিটনেস সনদ ও রুটপারমিট ছাড়া কোনো নৌযান চলাচলের অনুমতি পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু নৌনিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক মো. আলমগীর কবীরের মৌখিক নির্দেশ এবং বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে অন্তত দুই শতাধিক অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন নৌযান নিয়মিত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সদরঘাট ও নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, ইলিশা ও বরিশালগামী বিভিন্ন রুটে ‘এমভি সোনারগাঁও-৩’, ‘এমভি মেঘনা ডলফিন’, ‘এমভি জলপরী-১’, ‘এমভি রাজহাঁস-৭’ এবং ‘এমভি সুরভী-২’ নামের কয়েকটি লঞ্চ চলাচল করছে, যেগুলোর রুটপারমিটের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এরপরও এসব নৌযানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিশেষ ট্রিপ বা ‘স্পেশাল সার্ভিস’ চালানোর মৌখিক অনুমতি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি কিছু নৌযানের নিবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ট্রাফিক ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে বলে বিআইডব্লিউটিএ’র কয়েকজন কর্মচারী অভিযোগ করেছেন।
নৌপথের আরেক বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অবৈধ স্পিডবোট ও বাল্কহেড চলাচলকে। অভিযোগ অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গা, মেঘনা, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীতে লাইফ জ্যাকেট ও বৈধ সনদ ছাড়াই ‘ঝড়-১’, ‘তুফান-২’, ‘গতি-৫’, ‘সী-স্পিড-৯’ ও ‘স্পিড কিং-১২’সহ অন্তত তিন শতাধিক স্পিডবোট যাত্রী পারাপার করছে।
একইভাবে রুটপারমিটবিহীন বাল্কহেডও অবাধে চলাচল করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ‘এমবি আল-মদিনা-৪’, ‘এমবি মেঘনা ট্রাডার্স’, ‘এমবি বাবা ভান্ডারী’, ‘এমবি সততা ড্রেজিং-১’ এবং ‘এমবি মায়ের দোয়া-৮’ নামের কয়েকটি বাল্কহেডের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে চলাচলকারী প্রায় ৬০ শতাংশ বাল্কহেডের বৈধ নথিপত্র বা যোগ্যতাসম্পন্ন মাস্টার নেই। অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ নৌযানের একটি বড় অংশ জরিমানা এড়াতে বিআইডব্লিউটিএ’র নৌনিরাপত্তা বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে নিয়মিত অনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকে।
মো. আলমগীর কবীরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো—তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজের মতো করে ব্যবহার করেন এবং তদারকি কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধা দেন। তার একক সিদ্ধান্তের কারণে বিভাগের অনেক কর্মকর্তা চাপের মধ্যে রয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নৌনিরাপত্তা বিভাগের এক উপ-পরিচালক বলেন, অনেক সময় অবৈধ লঞ্চ বা ফিটনেসবিহীন স্পিডবোটের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট কিংবা অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিচালকের কার্যালয় থেকে ফোন করে অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো নৌযানের কাগজপত্রে বড় ধরনের ভুল বা জালিয়াতি থাকলেও পরিচালকের মৌখিক অনুমোদন থাকলে ফাইল ছাড়তে বাধ্য হতে হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেন, মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তারা তদারকি করলেও নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিয়মের বাইরে কোনো নির্দেশনা এলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। রুটপারমিট ছাড়া লঞ্চ কিংবা অবৈধ স্পিডবোটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে অনেক সময় ওপর মহল থেকে চাপ আসে বলেও তারা জানান।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মো. আলমগীর কবীর। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিআইডব্লিউটিএ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এখানে কোনো ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে পরিচালনার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, রুটপারমিট ছাড়া কোনো লঞ্চ বা ফিটনেসবিহীন স্পিডবোট যাতে চলতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে লোকবল সংকটের কারণে সব নৌযান সবসময় শতভাগ তদারকি করা সম্ভব হয় না। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো পরিচালক বা কর্মকর্তা রুটপারমিটহীন লঞ্চ, স্পিডবোট কিংবা বাল্কহেড চলাচলে সহযোগিতা করলে তা গুরুতর প্রশাসনিক অপরাধ। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নৌনিরাপত্তা বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নৌনিরাপত্তা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোনো একক কর্মকর্তার ইচ্ছেমতো পরিচালনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতি থাকলে অবৈধ নৌযান চলাচল বন্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি নৌনিরাপত্তা বিভাগের স্বাধীন অডিট এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবি জানান।
নদী রক্ষা আন্দোলন ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রতিনিধিরাও অভিযোগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, নৌনিরাপত্তা বিভাগের অনিয়মের কারণে অবৈধ নৌযান চলাচল বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে। তারা অবিলম্বে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং নৌপথে কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।
নোঙর বাংলাদেশের এক শীর্ষ নেতা অভিযোগ করেন, রুটপারমিটহীন লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচলের পেছনে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে। তার দাবি, এই ব্যবস্থার সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ’র কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা জড়িত। তিনি নৌনিরাপত্তা বিভাগের পরিচালকের পরিবর্তনসহ অবৈধ নৌযান চলাচল বন্ধের দাবি জানান।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও নদী-পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, নৌপথের নিরাপত্তা নির্ভর করে সঠিক ফিটনেস যাচাই, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর নজরদারির ওপর। তার মতে, দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ যদি আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হয়, তাহলে নৌদুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি নৌখাতে ডিজিটাইজেশন ও সার্বক্ষণিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, দেশের নৌদুর্ঘটনার বড় অংশের পেছনে রয়েছে ফিটনেসবিহীন নৌযান, অযোগ্য চালক এবং অবৈধ চলাচল। তার মতে, রুটপারমিট ছাড়া কোনো নৌযান চলা মানে তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরকার অনুমোদিত নয়। তাই রুটপারমিট ও ট্রাফিক ছাড়পত্র প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় করা জরুরি, যাতে কোনো ব্যক্তি এককভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে না পারেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















