ফ্যাসিস্টবিরোধী কোনো আন্দোলনে দৃশ্যমান ভূমিকা না থাকা ড্যাব (ডক্টরস্ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) নেতা ডা. নজরুল ইসলাম সেলিমের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে বরিশালের স্বাস্থ্য বিভাগ। এই অভিযোগ শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সিভিল সার্জন অফিস ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরে কর্মরত একাধিক চিকিৎসকের। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে ডাক্তার পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতির পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছেন এই চিকিৎসক নেতা। তার ইচ্ছার বাইরে কাউকে পদায়ন করা হলে যোগদানে বাধা দেন তিনি। যে কারণে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বদলি হওয়ার পরও কর্মস্থলে যোগ দিতে এসে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ফিরে যান বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান শাহিন। জোর করে তাকে দপ্তর থেকে বের করে দেন সেলিম। ফ্যাসিস্টের দোসর বলে অভিযোগ তোলা হয় তার বিরুদ্ধে। অথচ ছাত্রজীবনে একাধিকবার ছাত্রদলের পদধারী নেতা ছিলেন এই শাহিন।
পছন্দ না হওয়ায় শাহিনকে যোগদানে বাধা দেওয়া হলেও ভিন্ন ঘটনা ঘটে ওএসডি থেকে বরিশালের সিভিল সার্জন পদে বদলি হওয়া আরেক চিকিৎসক ডা. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। বরিশালের গৌরনদীতে চাকরিরত অবস্থায় স্বাচিপ’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই মনিরুজ্জামান। স্বাচিপের সম্মেলনে যোগ দেওয়াসহ ফ্যাসিস্টের হয়ে নানা কর্মকাণ্ড করার বহু প্রমাণও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মনিরুজ্জামানের পদায়নের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলনে নেমেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা, সিভিল সার্জন দপ্তরে তালাসহ জেলা
একেবারে চুপ ডা. সেলিম। একইভাবে তিনি কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাননি পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে বদলি হওয়া ডা. জিয়াউল করিমের ক্ষেত্রে। অথচ এই জিয়াউলও জড়িত ছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থনে চলা নানা কর্মসূচিতে। আওয়ামী লীগের সময়ে এখানে যখন বদলি-হয়রানিসহ নানা দুর্ভোগে ড্যাবের নেতারা তখন শেবাচিমে নির্বিঘ্নে চাকরি করেছেন ৫ আগস্টের পর হঠাৎ বিপ্লবী সাজা ডা. সেলিম। ২০২৩ সালে অবসরেও গেছেন এই হাসপাতাল থেকে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরিরত ড্যাবের একাধিক নেতা বলেন, ফ্যাসিস্টের ১৭ বছর এভাবে নিরুপদ্রবে থাকার ক্ষেত্রে তিনি সুবিধা পেয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বিএমএ’র জেলা সভাপতি ডা. ইস্তিয়াক আহম্মেদের কাছ থেকে। এই ইস্তিয়াক আবার স্বাচিপের জেলা সভাপতি। একসময় বরিশাল অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় ড্যাবের সাবেক এক নেতা বলেন, ছাত্রজীবনে জাসদ ছাত্রলীগ করতেন সেলিম। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর যোগ দেন ড্যাবে। দল ক্ষমতায় থাকলেই কেবল সক্রিয় হতে দেখা যায় তাকে। ক্ষমতার বাইরে থাকলে সমঝোতা করে চলেন স্বাচিপ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে।
বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে আত্মীয়তার বিষয়টি স্বীকার করে ডা. ইস্তিয়াক আহম্মেদ বলেন, কেবল সেলিম নয়, বিএমএ’র সভাপতি হিসাবে আমি চেষ্টা করেছি কোনো চিকিৎসকই যাতে হয়রানির শিকার না হয়। সেলিমও সেভাবেই আমার সহযোগিতা পেয়েছে।
জেলা ড্যাবের একাধিক নেতা বলেন, ২০১৪-১৫ সালে ২ বছর মেয়াদে শেবাচিম ড্যাবের সভাপতি হওয়া সেলিম আরও ৩ বছর আগে গেছেন অবসরে। তার কমিটির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে ১০ বছর আগে। বহু বছর ধরে ঢাকায় চাকরি করছেন এই কমিটির সাধারণ সম্পাদক। ড্যাবের ভেতরে যারা তার অনুসারী নয়, তাদেরও নানাভাবে হেনস্তা করেন সেলিম। পদায়ন-বদলিতে দিচ্ছেন বাধা।
শেবাচিম ড্যাবের সাবেক এক সভাপতি বলেন, এখানে ড্যাব দুই গ্রুপে বিভক্ত। সেলিমের বিপক্ষে যে গ্রুপটি রয়েছে তাদের অনুসারী বা ঘনিষ্ঠ কেউ এলেই যোগদানে বাধা দেন সেলিম। যেমনটা হয়েছে ডা. শাহিনের ক্ষেত্রে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ডা. শাহিনের পদায়ন
বাতিলের পর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক পদে যাকে পদায়ন করা হয়েছে সেই ডা. রেফায়েতুল হায়দারও সরাসরি জড়িত ছিলেন স্বাচিপের সঙ্গে। অথচ এ ব্যাপারে চুপ ডা. সেলিম। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ৫ আগস্টের পর বরিশালে সিএ, রেজিস্ট্রার, আইএমও, আরএস, আরএফসহ চিকিৎসকের নানা পদে পদায়ন পেয়েছে ৩৫-৪০ জন ডাক্তার। এদের প্রায় সবাইকেই কর্মস্থলে যোগ দিতে হয়েছে সেলিমকে রাজি করিয়ে। যারা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসেছেন তারাই পড়েছেন বিপদে। তাকে ম্যানেজ করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে কারও কারও ৮-১০ দিন পর্যন্ত লেগেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বদলি-পদায়নে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করার কথা অস্বীকার করেন ডা. সেলিম। মব করে পরিচালকের যোগদানে বাধা দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছাত্রজীবনে ছাত্রদল করলেও সরকারি চাকরির সময় ফ্যাসিস্টদের সহায়তা করেছেন ডা. শাহিন। যে কারণে বাধা দেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও ডা. মনিরুজ্জামান, ডা. জিয়াউল করিম ও ডা. রেফায়েতুল হায়দারের ব্যাপারে আপনি চুপ কেন-জিজ্ঞেস করলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। আওয়ামী আমলের ১৭বছর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্বিঘ্নে চাকরি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার ওপর অনেক অবিচার হয়েছে। ২-৩ বার বদলি করা হয়েছে। প্রাপ্য প্রমোশন দেওয়া হয়নি। নানাভাবে হয়রানি করেছে ফ্যাসিস্ট সরকার। স্বাচিপ নেতা ডা. ইস্তিয়াক আহম্মেদের সঙ্গে আত্মীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, আত্মীয় হলেও আমাকে কোনোরকম ছাড় দেননি ইস্তিয়াক।
সিভিল সার্জনের যোগদান ঠেকাতে স্মারকলিপি অনিয়ম,
দুর্নীতিসহ আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. মনিরুজ্জামানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। সোমবার দুপুরে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে এ স্মারকলিপি দেন সচেতন নাগরিক, সাধারণ ছাত্র-জনতা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এ সময় তারা ডা. মনিরুজ্জামানের অপসারণসহ চার দফা দাবি জানান। এর আগে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শেষে তার কক্ষের দরজায় প্রতীকীভাবে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা।
সংবাদ শিরোনাম ::
বরিশালের স্বাস্থ্য বিভাগে ড্যাব নেতা সেলিমের আধিপত্য
-
বরিশাল প্রতিনিধি - আপডেট সময় ১২:৩৫:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
- ৫১৩ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















