ঢাকা ০৬:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
‘আজকের শিশুরাই আগামীর রাষ্ট্রনায়ক : হাফিজ ইব্রাহিম দিনাজপুর বীরগঞ্জে মডেল প্রেসক্লাবের প্রথম ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নাটোরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চারা বিতরণ ভোলাহাটে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটিসহ বিভিন্ন সভা অনুষ্ঠিত! আগামী সপ্তাহ থেকে কিছুটা গ্যাস সংকট কেটে যাবে : জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ভারতজুড়ে এখন একটিই স্লোগান ‘এবার মোদির পালা’ চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৯ বিজিবির উদ্যোগে যুবকদের মোবাইল সার্ভিসিং প্রশিক্ষণের উদ্বোধন বিমানের ওভারটাইমে ‘ওভার’ অনিয়মের অভিযোগ সিলেট সীমান্তে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চোরাচালান চক্র নওগাঁয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে স্বামীর ছুরিকাঘাতে স্ত্রীর মৃত্যু
জৈন্তাপুরে গডফাদার স্টেলিন তারিয়াং

সিলেট সীমান্তে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চোরাচালান চক্র

সিলেটের গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ আগে ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে। শেখ হাসিনার পতনের পর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিএনপি নেতাদের হাতে। তাদের গডফাদার হিসাবে কাজ করছেন জেলা বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক স্টেলিন তারিয়াং। স্টেলিনের ওপর বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতার আশীর্বাদ রয়েছে বলে এলাকায় প্রচার আছে। স্টেলিনের সহযোগী হিসাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রশিদ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম-আহ্বায়ক টিটন মল্লিক, স্থানীয় তারিকুল, ফারহান, মনসুর মেম্বার এবং কালা ওরফে কালুসহ অনেকেই। অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা যায়।

রোববার এক অনুষ্ঠানে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চোরাচালন সিন্ডিকেট, স্টেলিং তারিয়াং বা তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চোরাচালন-এমনটা মানতে রাজি নন জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী জাবের সাদেক। তিনি বলেন, ‘চোরাচালান যে চলছে, তাতে সন্দেহ নেই। আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করছি। শতভাগ বন্ধ করা আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়।’ সম্প্রতি সিলেটে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, চোরাচালানচক্রকে আর ছাড় নয়। জুলাইয়ের মধ্যে যারা ঠিক হবেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ ছাড় পাবে না।

চোরাচালান পণ্য বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনায় দুই দেশের খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত। তাদের সঙ্গে দুই দেশের সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তাদেরই একজন সিলেটের স্টেলিন তারিয়াং। তিনি গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের সীমান্তসংলগ্ন সংগ্রামপুঞ্জি এলাকার বাসিন্দা। প্রভাবশালী এই খাসিয়া তরুণ চোরাচালানচক্র, সীমান্ত অপরাধ এবং জাফলং নদীর অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনে জড়িত। একাধিকবার গ্রেফতারও হয়েছেন। স্টেলিনের মা নিরোলা থমসন ওই অঞ্চলের খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নারী ব্যক্তিত্ব। তাকে স্থানীয় বাসিন্দারা সম্মানসূচক ‘খাসিয়া রানি’ বলে ডাকে। এই পরিবারের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি থাকার কথা জানা গেছে। শুধু ওপার থেকে আসা অবৈধ অস্ত্রসহ অন্য পণ্যসামগ্রী চোরাচালানই নয়, জাফলং নদী থেকে রাতের আঁধারে কোটি টাকার অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনের যে শক্ত সিন্ডিকেট আছে, তার অন্যতম হোতা এই স্টেলিন তারিয়াং।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক মেঘালয়ের শিলংয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মেঘালয় অংশে আত্মীয়তা ও শক্তিশালী আদিবাসী সামাজিক নেটওয়ার্কের কারণে ওই সময় স্টেলিন ও তার পরিবার ওই রাজনীতিকের সঙ্গে বাংলাদেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেটিকে কাজে লাগিয়ে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন স্টেলিন। প্রভাব খাটিয়ে এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করে গড়ে তোলেন চোরাচালান সিন্ডিকেট।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, স্টেলিন যখনই বাংলাদেশে কোনো ঝামেলায় পড়েন, তখন খুব সহজেই সীমান্ত পার হয়ে মেঘালয়ে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি ‘দ্বৈত নাগরিক’ বা দুই পারের বাসিন্দা হিসাবে পরিচিত। সূত্র জানিয়েছে, ওপারে শক্তিশালী পারিবারিক নেটওয়ার্ক ও সম্পদ থাকায় স্টেলিন ও তার সহযোগীরা দুই দেশের সীমান্তকেই নিজেদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছেন। ভারতের মেঘালয়ে খাসিয়াদের জন্য বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত শাসনব্যবস্থা রয়েছে, যা তাদের (খাসিয়া সম্প্রদায়) একধরনের বাড়তি সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা দিচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্টেলিন তারিয়াং বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলোর ভিত্তি নেই। আমার ঘরের বা এলাকার আশপাশেই চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড হয়। কিন্তু আমি কখনোই সেগুলোর সঙ্গে জড়াই না বা কাউকে শেল্টার (আশ্রয়) দিই না। আমাদের পারিবারিক একটা সুনাম ও অবস্থান আছে, যা এই এলাকার মানুষ ভালো করেই জানেন। অনেকেই হয়তো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আমার নাম ভাঙিয়ে বা নাম বিক্রি করে এসব অপকর্ম করতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, সিলেট সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমি সব সময়ই ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছি।

চোরাচালান সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম-আহ্বায়ক টিটন মল্লিক। কয়েক মাস আগে বিপুল পরিমাণ চোরাচালান পণ্য এবং অস্ত্রসহ তিনি গ্রেফতার হন। গুরুতর অপরাধে গ্রেফতার হওয়ার পরও আইনি ফাঁকফোকর এবং দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তারা আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে। তিনি তার চোরাচালান সিন্ডিকেট সচল করেছেন। জানতে চাইলে টিটন মল্লিক জানিয়েছেন, তার বহিষ্কারাদেশ এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। তবে তিনি নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি মহল চক্রান্ত করে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করিয়েছে। আর যে ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ সাজানো।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে-বাংলাদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে ভারতে মানব পাচার হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত থেকেও অবৈধভাবে মানুষ বাংলাদেশে ঢুকছে। এই সিন্ডিকেটের হোতা হিসাবে মনসুর মেম্বারসহ কয়েকজনের নাম বেরিয়ে এসেছে। এ বিষয়ে মনসুর মেম্বার বলেন, এগুলোর (চোরচালান) সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। প্রতিপক্ষের লোকজন আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদের বাড়ির ভেতরে বিশাল জায়গাজুড়ে বাউন্ডারি করা গোপন আস্তানা রয়েছে। প্রতিরাতে চোরাই চিনি, জিরা ও কসমেটিকসবোঝাই বড় বড় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ওই বাড়ির ভেতরে ঢোকে। সেখানে পুলিশ অভিযানে যাওয়ার সাহস পায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে ঢুকলেই মুহূর্তের মধ্যে ৫০০ থেকে ১০০০ স্থানীয় কর্মী বাহিনী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়। গত বছর ২৬ মার্চ গভীর রাতে ভারতীয় গরু-মহিষসহ চোরাচালানের মাল আটকানোকে কেন্দ্র করে সেখানে সেনাবাহিনীর ওপর ব্যাপক হামলার ঘটনাও ঘটে। হামলার ঘটনায় করা মামলায় আব্দুর রশিদ প্রধান আসামি। ওই মামলায় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। তাতে বেশ কয়েকজন সেনাসদস্য আহত হন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। রশিদ চেয়ারম্যানের আস্তানা রক্ষায় বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আব্দুর রশিদ বলেন, ‘চোরাচালান বন্ধে আমরা আমাদের মতো করে চেষ্টা করছি। আপনারা আপনাদের মতো করে চেষ্টা করুন।’ রশিদ চেয়ারম্যানের সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী কালা বলেন, ‘আমি রশিদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে কাজ করি। এক মাস ধরে তার লাইন বন্ধ আছে। এ কারণে অনেকটা বেকার হয়ে গেছি। ইতোমধ্যে বালুর ব্যবসায় যোগ দিয়েছি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘আজকের শিশুরাই আগামীর রাষ্ট্রনায়ক : হাফিজ ইব্রাহিম

জৈন্তাপুরে গডফাদার স্টেলিন তারিয়াং

সিলেট সীমান্তে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চোরাচালান চক্র

আপডেট সময় ০৫:০১:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

সিলেটের গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ আগে ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে। শেখ হাসিনার পতনের পর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিএনপি নেতাদের হাতে। তাদের গডফাদার হিসাবে কাজ করছেন জেলা বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক স্টেলিন তারিয়াং। স্টেলিনের ওপর বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতার আশীর্বাদ রয়েছে বলে এলাকায় প্রচার আছে। স্টেলিনের সহযোগী হিসাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রশিদ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম-আহ্বায়ক টিটন মল্লিক, স্থানীয় তারিকুল, ফারহান, মনসুর মেম্বার এবং কালা ওরফে কালুসহ অনেকেই। অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা যায়।

রোববার এক অনুষ্ঠানে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চোরাচালন সিন্ডিকেট, স্টেলিং তারিয়াং বা তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চোরাচালন-এমনটা মানতে রাজি নন জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী জাবের সাদেক। তিনি বলেন, ‘চোরাচালান যে চলছে, তাতে সন্দেহ নেই। আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করছি। শতভাগ বন্ধ করা আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়।’ সম্প্রতি সিলেটে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, চোরাচালানচক্রকে আর ছাড় নয়। জুলাইয়ের মধ্যে যারা ঠিক হবেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ ছাড় পাবে না।

চোরাচালান পণ্য বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনায় দুই দেশের খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত। তাদের সঙ্গে দুই দেশের সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তাদেরই একজন সিলেটের স্টেলিন তারিয়াং। তিনি গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের সীমান্তসংলগ্ন সংগ্রামপুঞ্জি এলাকার বাসিন্দা। প্রভাবশালী এই খাসিয়া তরুণ চোরাচালানচক্র, সীমান্ত অপরাধ এবং জাফলং নদীর অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনে জড়িত। একাধিকবার গ্রেফতারও হয়েছেন। স্টেলিনের মা নিরোলা থমসন ওই অঞ্চলের খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নারী ব্যক্তিত্ব। তাকে স্থানীয় বাসিন্দারা সম্মানসূচক ‘খাসিয়া রানি’ বলে ডাকে। এই পরিবারের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি থাকার কথা জানা গেছে। শুধু ওপার থেকে আসা অবৈধ অস্ত্রসহ অন্য পণ্যসামগ্রী চোরাচালানই নয়, জাফলং নদী থেকে রাতের আঁধারে কোটি টাকার অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনের যে শক্ত সিন্ডিকেট আছে, তার অন্যতম হোতা এই স্টেলিন তারিয়াং।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক মেঘালয়ের শিলংয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মেঘালয় অংশে আত্মীয়তা ও শক্তিশালী আদিবাসী সামাজিক নেটওয়ার্কের কারণে ওই সময় স্টেলিন ও তার পরিবার ওই রাজনীতিকের সঙ্গে বাংলাদেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেটিকে কাজে লাগিয়ে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন স্টেলিন। প্রভাব খাটিয়ে এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করে গড়ে তোলেন চোরাচালান সিন্ডিকেট।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, স্টেলিন যখনই বাংলাদেশে কোনো ঝামেলায় পড়েন, তখন খুব সহজেই সীমান্ত পার হয়ে মেঘালয়ে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি ‘দ্বৈত নাগরিক’ বা দুই পারের বাসিন্দা হিসাবে পরিচিত। সূত্র জানিয়েছে, ওপারে শক্তিশালী পারিবারিক নেটওয়ার্ক ও সম্পদ থাকায় স্টেলিন ও তার সহযোগীরা দুই দেশের সীমান্তকেই নিজেদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছেন। ভারতের মেঘালয়ে খাসিয়াদের জন্য বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত শাসনব্যবস্থা রয়েছে, যা তাদের (খাসিয়া সম্প্রদায়) একধরনের বাড়তি সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা দিচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্টেলিন তারিয়াং বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলোর ভিত্তি নেই। আমার ঘরের বা এলাকার আশপাশেই চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড হয়। কিন্তু আমি কখনোই সেগুলোর সঙ্গে জড়াই না বা কাউকে শেল্টার (আশ্রয়) দিই না। আমাদের পারিবারিক একটা সুনাম ও অবস্থান আছে, যা এই এলাকার মানুষ ভালো করেই জানেন। অনেকেই হয়তো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আমার নাম ভাঙিয়ে বা নাম বিক্রি করে এসব অপকর্ম করতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, সিলেট সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমি সব সময়ই ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছি।

চোরাচালান সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম-আহ্বায়ক টিটন মল্লিক। কয়েক মাস আগে বিপুল পরিমাণ চোরাচালান পণ্য এবং অস্ত্রসহ তিনি গ্রেফতার হন। গুরুতর অপরাধে গ্রেফতার হওয়ার পরও আইনি ফাঁকফোকর এবং দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তারা আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে। তিনি তার চোরাচালান সিন্ডিকেট সচল করেছেন। জানতে চাইলে টিটন মল্লিক জানিয়েছেন, তার বহিষ্কারাদেশ এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। তবে তিনি নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি মহল চক্রান্ত করে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করিয়েছে। আর যে ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ সাজানো।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে-বাংলাদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে ভারতে মানব পাচার হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত থেকেও অবৈধভাবে মানুষ বাংলাদেশে ঢুকছে। এই সিন্ডিকেটের হোতা হিসাবে মনসুর মেম্বারসহ কয়েকজনের নাম বেরিয়ে এসেছে। এ বিষয়ে মনসুর মেম্বার বলেন, এগুলোর (চোরচালান) সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। প্রতিপক্ষের লোকজন আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদের বাড়ির ভেতরে বিশাল জায়গাজুড়ে বাউন্ডারি করা গোপন আস্তানা রয়েছে। প্রতিরাতে চোরাই চিনি, জিরা ও কসমেটিকসবোঝাই বড় বড় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ওই বাড়ির ভেতরে ঢোকে। সেখানে পুলিশ অভিযানে যাওয়ার সাহস পায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে ঢুকলেই মুহূর্তের মধ্যে ৫০০ থেকে ১০০০ স্থানীয় কর্মী বাহিনী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়। গত বছর ২৬ মার্চ গভীর রাতে ভারতীয় গরু-মহিষসহ চোরাচালানের মাল আটকানোকে কেন্দ্র করে সেখানে সেনাবাহিনীর ওপর ব্যাপক হামলার ঘটনাও ঘটে। হামলার ঘটনায় করা মামলায় আব্দুর রশিদ প্রধান আসামি। ওই মামলায় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। তাতে বেশ কয়েকজন সেনাসদস্য আহত হন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। রশিদ চেয়ারম্যানের আস্তানা রক্ষায় বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আব্দুর রশিদ বলেন, ‘চোরাচালান বন্ধে আমরা আমাদের মতো করে চেষ্টা করছি। আপনারা আপনাদের মতো করে চেষ্টা করুন।’ রশিদ চেয়ারম্যানের সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী কালা বলেন, ‘আমি রশিদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে কাজ করি। এক মাস ধরে তার লাইন বন্ধ আছে। এ কারণে অনেকটা বেকার হয়ে গেছি। ইতোমধ্যে বালুর ব্যবসায় যোগ দিয়েছি।