ঢাকা ১১:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
স্কুলমুখী করতে সাড়ে তিন লাখ শিশুকে স্কুল ড্রেস দেবে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী ফতুল্লায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের তুমুল সংঘর্ষ, আহত ৮ চাঁদাবাজির অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর কাফির বিরুদ্ধে মামলা সারা বাংলাদেশের ২০২৫ এবং ২০২৬ এর টিসিবি ডিলারদের মানববন্ধন অনুষ্ঠিত সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আটক তনু হত্যা মামলায় আরও ২ সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের জাতীয় পর্ব শুরু, খেলাধুলাই পারে জাতিকে এক সুতোয় গাঁথতে: প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক  হোসেনপুর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ি জব্দ স্বপ্নভঙ্গের মূল্য: ব্রুনাই থেকে ফিরে আসা শ্রমিকদের মানবিক বেদনা, রাষ্ট্রের দায় ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রশ্ন

বাজারদর যাচাই ছাড়াই ৬ হাজার কোটির গ্রিড প্রকল্পে ২,২১৫ কোটির চুক্তি

প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ঢাকা এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিড সঞ্চালন প্রকল্পে বাজারদর যাচাই না করেই বড় অঙ্কের চুক্তি করা হয়েছে। কোনো দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়াই সাতটি আন্তর্জাতিক প্যাকেজের আওতায় ২ হাজার ২১৪ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকার এই চুক্তি সম্পন্ন হয়।

সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী, দরপত্র আহ্বানের আগে প্রাক্কলন বাধ্যতামূলক হলেও এ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র।

এই মেগা প্রকল্পে তীব্র জনবল সংকটও দেখা দিয়েছে। অনুমোদিত ৮৭টি পদের মধ্যে ৫২টি এখন শূন্য। বিশেষ করে প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের ৫৯ শতাংশ পদ খালি।

এমন বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ের তদারকি থমকে গেছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঠিকাদারের ব্যর্থতায় সরকারের শত শত কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বড় ধরনের কারিগরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে জাতীয় গ্রিড।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। এটি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান। ৫ হাজার ৯৪৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার এই প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে ১ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা।

বাকি অর্থের মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ঋণ দিচ্ছে ৪ হাজার ২১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া পিজিসিবি নিজস্ব তহবিল থেকে ৩২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয় করবে।

প্রকল্পের মূল বাস্তবায়ন মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

প্রাক্কলন ছাড়াই বড় অঙ্কের চুক্তি
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হয়েছে কেনাকাটায়। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) অনুযায়ী, দরপত্র আহ্বানের আগে বাজারদর যাচাই করে দাপ্তরিক প্রাক্কলন বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেটি ছাড়াই সাতটি আন্তর্জাতিক প্যাকেজের আওতায় ২ হাজার ২১৪ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকার চুক্তি হয়েছে।

দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়া ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সরাসরি পিপিআরের লঙ্ঘন। প্রাক্কলন না থাকায় প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে কাজ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি।

সরকারের গচ্চা ৫৪৮ কোটি টাকা
প্রকল্পের অধীনে উপকেন্দ্র নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্যাকেজ-৮। ৫২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকার এই প্যাকেজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনার্জিপ্যাক-সিএসইপিডিআই কনসোর্টিয়ামের ব্যর্থতার কারণে চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয় পিজিসিবি। বাতিল কাজের জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হলে ব্যয় ১০৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

অর্থাৎ অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে একটি প্যাকেজেই সরকারের অতিরিক্ত ৫৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। এই প্যাকেজের কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় প্যাকেজ-৪ এর আওতায় নির্মিত সঞ্চালন লাইনগুলোও চালু করা যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঞ্চালন লাইন দীর্ঘ সময় চার্জ না করে অব্যবহৃত রাখলে সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

পরীক্ষা ছাড়াই ৪৬ কোটি টাকার বিল পরিশোধ
বিদ্যুৎ সঞ্চালন সরঞ্জাম সংবেদনশীল হওয়ায় কারিগরি মান নিশ্চিতে ‘ফ্যাক্টরি একসেপ্টেন্স টেস্ট’ বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ঠিকাদারকে ৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এমন ঘটনা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মতো কারিগরি প্রকল্পে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পরীক্ষা ছাড়া সংবেদনশীল সরঞ্জাম গ্রিডে যুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে যান্ত্রিক ত্রুটি বা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থাকে, যা পুরো গ্রিড ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিতে পারে। নিম্নমানের বা ভেজাল ট্রান্সফরমার অয়েল ব্যবহারের ফলে ট্রান্সফরমারে বিস্ফোরণও ঘটতে পারে।

উড্ডয়ন অনুমতি ছাড়াই কেনা হয় ড্রোন
প্রকল্পে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ড্রোন কেনা হলেও তা ব্যবহারের কোনো বৈধতা নেই। নিয়ম অনুযায়ী, ড্রোন রেজিস্ট্রেশন ও উড্ডয়ন অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও তা না মেনে এগুলো কেনা হয়। ফলে এগুলো ব্যবহারে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া চুক্তিতে উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত মালামাল আমদানি করে আরও ৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে।

২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ২৫টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ ২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ১২টি গুরুতর আপত্তি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। বাস্তব ব্যয় এবং লোন ফাইন্যান্সিয়াল ইনফরমেশন সিস্টেমে প্রদর্শিত ব্যয়ের মধ্যে ৮৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকার গরমিল রয়েছে।

এ ছাড়া নথিপত্র ছাড়াই অর্থছাড় হয়েছে ৫৬ কোটি ৯১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার। কাজ চলাকালে সুদ বাবদ ৩৮ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ২৫ কোটি ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। বিধি লঙ্ঘন করে ভ্যারিয়েশন অর্ডার ছাড়া ব্যয় হয়েছে ২০ কোটি ৪২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। ভূমি অধিগ্রহণে সমন্বয়হীন অর্থ ব্যয় হয়েছে ১৩ কোটি ৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। পরীক্ষা ছাড়াই ট্রান্সফরমার অয়েল আমদানি ও বিল পরিশোধ বাবদ অনিয়ম হয়েছে ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকার।

রামপুরা-বসুন্ধরা আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল লাইনের কাজ করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান টিবিইএ। সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ করছে ভারতের লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো এবং ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেড। বাতিলকৃত এনার্জিপ্যাক কনসোর্টিয়ামের কাজ এখন পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদারকে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

নীলফামারীর ডোমার উপকেন্দ্রের জমি নিয়ে স্থানীয় জনগণের মামলার কারণে ভূমি হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। সঞ্চালন লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘রাইট অব ওয়ে’ জটিলতায় অনেক জায়গায় কাজ বন্ধ রয়েছে। উপকেন্দ্রের বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও বালু ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।

প্রকল্প শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন হয়েছে চারবার। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ফয়জুল কবিরের আগে আরও তিনজন দায়িত্ব পালন করেছেন। ঘন ঘন পিডি পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা নষ্ট হয়েছে।

২০১৯ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। কাজের ধীরগতির কারণে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। ফলে সময় বেড়েছে ৭৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মে পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল ৭৮ শতাংশ, কিন্তু হয়েছে মাত্র ৬১ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ সময়ে মোট বরাদ্দের মাত্র ৫৫ দশমিক ২৪ শতাংশ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয় ও সময় অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে আইএমইডি। দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তি সম্পাদন এবং কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া বিল পরিশোধের মতো আর্থিক বিচ্যুতির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিতের কথাও বলা হয়েছে।

১২টি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ভবিষ্যতে সরকারি ক্রয় ও আর্থিক বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তির ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘এ ধরনের কিছু হয়নি।’ এর বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশিদ খানকে একাধিকবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলমুখী করতে সাড়ে তিন লাখ শিশুকে স্কুল ড্রেস দেবে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী

বাজারদর যাচাই ছাড়াই ৬ হাজার কোটির গ্রিড প্রকল্পে ২,২১৫ কোটির চুক্তি

আপডেট সময় ০২:৩৬:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ঢাকা এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিড সঞ্চালন প্রকল্পে বাজারদর যাচাই না করেই বড় অঙ্কের চুক্তি করা হয়েছে। কোনো দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়াই সাতটি আন্তর্জাতিক প্যাকেজের আওতায় ২ হাজার ২১৪ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকার এই চুক্তি সম্পন্ন হয়।

সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী, দরপত্র আহ্বানের আগে প্রাক্কলন বাধ্যতামূলক হলেও এ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র।

এই মেগা প্রকল্পে তীব্র জনবল সংকটও দেখা দিয়েছে। অনুমোদিত ৮৭টি পদের মধ্যে ৫২টি এখন শূন্য। বিশেষ করে প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের ৫৯ শতাংশ পদ খালি।

এমন বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ের তদারকি থমকে গেছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঠিকাদারের ব্যর্থতায় সরকারের শত শত কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বড় ধরনের কারিগরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে জাতীয় গ্রিড।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। এটি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান। ৫ হাজার ৯৪৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার এই প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে ১ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা।

বাকি অর্থের মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ঋণ দিচ্ছে ৪ হাজার ২১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া পিজিসিবি নিজস্ব তহবিল থেকে ৩২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয় করবে।

প্রকল্পের মূল বাস্তবায়ন মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

প্রাক্কলন ছাড়াই বড় অঙ্কের চুক্তি
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হয়েছে কেনাকাটায়। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) অনুযায়ী, দরপত্র আহ্বানের আগে বাজারদর যাচাই করে দাপ্তরিক প্রাক্কলন বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেটি ছাড়াই সাতটি আন্তর্জাতিক প্যাকেজের আওতায় ২ হাজার ২১৪ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকার চুক্তি হয়েছে।

দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়া ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সরাসরি পিপিআরের লঙ্ঘন। প্রাক্কলন না থাকায় প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে কাজ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি।

সরকারের গচ্চা ৫৪৮ কোটি টাকা
প্রকল্পের অধীনে উপকেন্দ্র নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্যাকেজ-৮। ৫২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকার এই প্যাকেজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনার্জিপ্যাক-সিএসইপিডিআই কনসোর্টিয়ামের ব্যর্থতার কারণে চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয় পিজিসিবি। বাতিল কাজের জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হলে ব্যয় ১০৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

অর্থাৎ অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে একটি প্যাকেজেই সরকারের অতিরিক্ত ৫৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। এই প্যাকেজের কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় প্যাকেজ-৪ এর আওতায় নির্মিত সঞ্চালন লাইনগুলোও চালু করা যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঞ্চালন লাইন দীর্ঘ সময় চার্জ না করে অব্যবহৃত রাখলে সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

পরীক্ষা ছাড়াই ৪৬ কোটি টাকার বিল পরিশোধ
বিদ্যুৎ সঞ্চালন সরঞ্জাম সংবেদনশীল হওয়ায় কারিগরি মান নিশ্চিতে ‘ফ্যাক্টরি একসেপ্টেন্স টেস্ট’ বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ঠিকাদারকে ৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এমন ঘটনা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মতো কারিগরি প্রকল্পে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পরীক্ষা ছাড়া সংবেদনশীল সরঞ্জাম গ্রিডে যুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে যান্ত্রিক ত্রুটি বা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থাকে, যা পুরো গ্রিড ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিতে পারে। নিম্নমানের বা ভেজাল ট্রান্সফরমার অয়েল ব্যবহারের ফলে ট্রান্সফরমারে বিস্ফোরণও ঘটতে পারে।

উড্ডয়ন অনুমতি ছাড়াই কেনা হয় ড্রোন
প্রকল্পে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ড্রোন কেনা হলেও তা ব্যবহারের কোনো বৈধতা নেই। নিয়ম অনুযায়ী, ড্রোন রেজিস্ট্রেশন ও উড্ডয়ন অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও তা না মেনে এগুলো কেনা হয়। ফলে এগুলো ব্যবহারে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া চুক্তিতে উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত মালামাল আমদানি করে আরও ৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে।

২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ২৫টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ ২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ১২টি গুরুতর আপত্তি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। বাস্তব ব্যয় এবং লোন ফাইন্যান্সিয়াল ইনফরমেশন সিস্টেমে প্রদর্শিত ব্যয়ের মধ্যে ৮৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকার গরমিল রয়েছে।

এ ছাড়া নথিপত্র ছাড়াই অর্থছাড় হয়েছে ৫৬ কোটি ৯১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার। কাজ চলাকালে সুদ বাবদ ৩৮ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ২৫ কোটি ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। বিধি লঙ্ঘন করে ভ্যারিয়েশন অর্ডার ছাড়া ব্যয় হয়েছে ২০ কোটি ৪২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। ভূমি অধিগ্রহণে সমন্বয়হীন অর্থ ব্যয় হয়েছে ১৩ কোটি ৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। পরীক্ষা ছাড়াই ট্রান্সফরমার অয়েল আমদানি ও বিল পরিশোধ বাবদ অনিয়ম হয়েছে ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকার।

রামপুরা-বসুন্ধরা আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল লাইনের কাজ করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান টিবিইএ। সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ করছে ভারতের লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো এবং ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেড। বাতিলকৃত এনার্জিপ্যাক কনসোর্টিয়ামের কাজ এখন পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদারকে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

নীলফামারীর ডোমার উপকেন্দ্রের জমি নিয়ে স্থানীয় জনগণের মামলার কারণে ভূমি হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। সঞ্চালন লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘রাইট অব ওয়ে’ জটিলতায় অনেক জায়গায় কাজ বন্ধ রয়েছে। উপকেন্দ্রের বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও বালু ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।

প্রকল্প শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন হয়েছে চারবার। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ফয়জুল কবিরের আগে আরও তিনজন দায়িত্ব পালন করেছেন। ঘন ঘন পিডি পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা নষ্ট হয়েছে।

২০১৯ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। কাজের ধীরগতির কারণে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। ফলে সময় বেড়েছে ৭৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মে পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল ৭৮ শতাংশ, কিন্তু হয়েছে মাত্র ৬১ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ সময়ে মোট বরাদ্দের মাত্র ৫৫ দশমিক ২৪ শতাংশ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয় ও সময় অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে আইএমইডি। দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তি সম্পাদন এবং কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া বিল পরিশোধের মতো আর্থিক বিচ্যুতির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিতের কথাও বলা হয়েছে।

১২টি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ভবিষ্যতে সরকারি ক্রয় ও আর্থিক বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তির ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘এ ধরনের কিছু হয়নি।’ এর বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশিদ খানকে একাধিকবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি।