থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককের একটি মিউজিক বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩০ জনে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। ব্যাঙ্কক মেট্রোপলিটন প্রশাসনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৪ জনের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।
‘রং বিয়ার না লাডপ্রাও’ নামের বারে রবিবার গভীর রাতে আগুন লাগে। ব্যাঙ্ককের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এই বারের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকলকর্মীদের প্রায় আধা ঘণ্টা সময় লাগে।
কর্মকর্তাদের মতে, এটি গত ১৭ বছরের মধ্যে ব্যাঙ্ককের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ড। ব্যাঙ্ককের গভর্নর চাদচার্ট সিট্টিপুন্ট বলেন, নিহতদের বেশির ভাগই ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এদিকে আহতদের মধ্যে অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অগ্নিকাণ্ডের পর সোমবার ভোরে বারটি ঘিরে ফেলে তদন্ত শুরু করে কর্তৃপক্ষ।
কয়েক ডজন ফরেনসিক কর্মকর্তা আগুন লাগার কারণ খুঁজতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। আগুনে বারের সামনের জানালাগুলো ভেঙে যায়। বাইরে ফুটপাতে পোড়া টেলিভিশন, স্পিকার, ইলেকট্রিক গিটারসহ নানা ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিল। ভেতরে পোড়া টেবিলের ওপর এখনো খালি বিয়ারের বোতল দেখা যায়।
বার কর্তৃপক্ষের দাবি, সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৬০০ জন গ্রাহক বসতে পারতেন।
তবে আগুন লাগার সময় ঠিক কতজন উপস্থিত ছিলেন, তা এখনো জানা যায়নি। ব্যাঙ্ককের ইরাওয়ান জরুরি পরিষেবা কেন্দ্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় ৭৩ জন আহত হয়েছে। মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে সামান্য পার্থক্য থাকলেও প্রাণহানির সংখ্যা ৩০ জনের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
জাতীয় পুলিশ প্রধান কিথারাথ পুনপেচ বলেন, অধিকাংশ মরদেহ জানালাবিহীন একটি বাথরুমের কাছে পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগুন থেকে বাঁচতে অনেকেই সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু বের হতে না পেরে আটকা পড়েন। তিনি জানান, ওই নির্গমন পথটি নিয়মিত ব্যবহৃত হতো না। সেখানে রাখা টেবিল বা অন্যান্য সামগ্রীর কারণে পথ বাধাগ্রস্ত ছিল। এ ছাড়া ধোঁয়া ও অন্ধকারের কারণে অনেকেই বের হওয়ার পথ খুঁজে পাননি।
পুলিশ আরো জানিয়েছে, রান্নাঘরের পাশের আরেকটি জরুরি নির্গমন পথও তাক ও লকারের কারণে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে যে, কয়েকটি জরুরি নির্গমন দরজা সম্ভবত তালাবদ্ধ ছিল।
তদন্তকারীরা আগুনের উৎস খুঁজতে মঞ্চের ওপরের ছাদ অংশে বিশেষভাবে নজর দিচ্ছেন। সেখানে এমন কিছু উপকরণ পাওয়া গেছে, যা সাজসজ্জার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ খতিয়ে দেখছে, ভবনের ভেতরে দাহ্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না এবং বৈদ্যুতিক তারগুলো কিভাবে স্থাপন করা হয়েছিল।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল জানান, বারে পারফর্ম করা এক সংগীতশিল্পী তাকে বলেছেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগে তিনি মঞ্চের কাছে একটি সার্কিট ব্রেকার থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখেছিলেন। এরপর একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একতলা ভবনটি থেকে আগুনের শিখা বের হচ্ছে এবং কালো ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। এ সময় আতঙ্কিত মানুষজন দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
এদিকে সোমবার বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ঘটনাস্থলে এসে নিহতদের জন্য প্রার্থনা করেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীরা ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাব থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে ফেস মাস্ক বিতরণ করেন। নিখোঁজ বা আহত স্বজনদের খোঁজে আসা পরিবারের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহের জন্য ঘটনাস্থলে একটি নিবন্ধন কেন্দ্রও খোলা হয়েছে।
গায়িকা সুকন্যা ওংওংওয়াই জানান, তিনি কাছাকাছি একটি অনুষ্ঠানে গান গাইছিলেন। আগুনের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান, কারণ তার ব্যান্ডের কয়েকজন সদস্য ওই বারে পারফর্ম করছিলেন। তিনি বলেন, তার ব্যান্ডের একজন সদস্য মারা গেছেন, তিনজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং একজনকে প্রথমে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে ফেসবুকে ব্যান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিখোঁজ সদস্যকে হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় পাওয়া গেছে।
সুকন্যা বলেন, ‘ভেতরে যারা ছিলেন, তাদের কাছ থেকে শুনেছি যে হঠাৎ সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়। বিদ্যুৎ চলে যায় এবং চারদিকে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কেউ কাউকে দেখতে বা খুঁজে পেতে পারছিলেন না।’ এদিকে ফেসবুকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বার কর্তৃপক্ষ নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে এবং ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বারের মালিক গুরুতর আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যদিকে, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে স্বজনরা ব্যাঙ্ককের ফরেনসিক মেডিসিন ইনস্টিটিউটে জড়ো হন। সেখানে ২৪ বছর বয়সী কেও উদোন পাউংপানি তার ছোট ভাইয়ের মরদেহ শনাক্ত করতে আসেন। লাওস থেকে আসা এই দুই অভিবাসী শ্রমিক আগুন লাগার সময় ওই বারে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছিলেন।
২৪ বছর বয়সী কেও উদোন পাউংপানি জানান, আগুন লাগার সময় তিনি বারের বাইরে একটি শৌচাগারে ছিলেন। তিনি বলেন, বারের দিকে ফিরে আসার সময় দেখেন, আতঙ্কিত মানুষজন আগুন থেকে বাঁচতে দৌড়ে বেরিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে তিনি বিস্ফোরণের মতো জোরালো শব্দও শুনতে পান।
পাউংপানি জানান, বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি তার ছোট ভাইকে ডাকতে থাকেন। কিন্তু আগুনের তীব্র তাপের কারণে তিনি আর ভেতরে ঢুকতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘তাপ এতোটাই বেশি ছিল যে আমি ভেতরে ফিরতে পারিনি।’
শোকাহত এই যুবক বলেন, ‘এখন আমি শুধু আমার ছোট ভাইয়ের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই। আমি তাকে বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই। তারা অপেক্ষা করছিলেন, দুই ছেলে আবার একসঙ্গে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু এখন একজন আর নেই।’
থাইল্যান্ডে এর আগেও বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে দেশটির পূর্বাঞ্চলের একটি মিউজিক বারে আগুন লেগে ১৪ জন নিহত হন। এরও আগে, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি ব্যাংককের সান্তিকা নাইটক্লাবে নববর্ষ উদযাপনের সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬৭ জন নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হন। তদন্তে ধারণা করা হয়, ক্লাবের ভেতরে আতশবাজি প্রদর্শনের সময় ওই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 























