সংবাদ শিরোনাম ::
অনুমোদনহীন পণ্য বিক্রির দায়ে জরিমানা গুনল আগোরা এমবাপেকে বর্ণবাদী আক্রমণ প্যারাগুয়ে সিনেটরের, আইনি ব্যবস্থা নেবে ফ্রান্স সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া আকস্মিক পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী টানা ৫ দিন দেশজুড়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা ঢাকাসহ সারা দেশে গ্যাস নিয়ে বড় দুঃসংবাদ আমাদের দেশে উৎপাদিত ওষুধ উচ্চমানের : স্বাস্থ্যমন্ত্রী বরগুনায় গ্রিড সাবস্টেশনে আগুন, প্রায় ৬৭ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অক্টোবরে শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন : তথ্য উপদেষ্টা সাংবাদিকের সঙ্গে প্রেমের গুঞ্জন নিয়ে মুখ খুললেন মেসি ইন্টারপোলের বৈশ্বিক অভিযানে ৫৯ দেশে গ্রেফতার এক হাজারের বেশি

ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ধর্মীয় সাইনবোর্ডের আড়ালে জমি দখলবাজির অভিযোগ

মো. মোহন মিয়া, জীবিকার তাগিদে ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান ইরাকে। এরপর সেখানে যুদ্ধ শুরু হলে চলে যান তুরষ্কে। ১৯৯২ সালে দেশে ফিরে ফের পাড়ি জমান মালয়েশিয়া। ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রবাস জীবন কেটেছে মোহন মিয়ার। দেশে ফিরে দেখেন তার জমিতে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সাইনবোর্ড সাঁটানো। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ১৯৯০ সালে আবু হানিফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে এই জমি ক্রয় দেখিয়ে দখল করে নিয়েছে আবাসন কোম্পানি ইস্টার্ন হাউজিং।

শুধু মোহন মিয়া নন, ইস্টার্ন হাউজিংয়ের প্রতারণার জালে আটকে আছেন হরিচরণ রায় নামে আরেক ব্যক্তি। তার ৯১ শতাংশ জমি (মালিকানা না থাকায় যা পরবর্তী সময়ে ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়) দখল করে বানিয়েছে ১০ তলাবিশিষ্ট বহুতল মার্কেট। বাদ যায়নি শ্মশান, খেলার মাঠ, কবরস্থান। ধর্মীয় এসব স্থান-স্থাপনাসহ অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে সেখানে বহুতল ভবন বানিয়ে ফ্ল্যাট বিক্রি করছে হাউজিং কোম্পানিটি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রীর মেরাদিয়া মৌজায় ঢাকা সিটি জরিপের ৫৯৩৭ দাগের প্রায় ৫ একর ৯২ শতক জমি সরকারি ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত। অথচ সরকারি এই জমির পুরোটাই ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দখলে। এই সিটির ভেতরে আরএস ১৮৭৯ ও ১৮৭৮ দাগে ৯১ শতাংশ জমি রয়েছে। এই জমিটির সিএস দাগ নম্বর ছিল ১০৩১। যেখানে ইস্টার্ন হাউজিং নির্মাণ করেছে ১০ তলা মার্কেট। এই মার্কেটে রয়েছে ২৪০টি ফ্ল্যাট এবং ৫৩০টির মতো দোকান। প্রতি ফ্ল্যাট কোটি টাকার ওপরে এবং প্রতি দোকান অর্ধকোটি টাকায় কেনাবেচা প্রায় সম্পূর্ণ। সরকারি হওয়ায় এখনো জমির মালিকানা পায়নি ইস্টার্ন হাউজিং। তাই দোকান ও ফ্ল্যাট বিক্রি করলেও দলিল করে দিতে পারেননি কোনো গ্রাহককেই। সরকার যে কোনো সময় জমি নিজেদের দখলে নিয়ে যেতে পারে, সেই আতঙ্কে রয়েছেন এখানকার ফ্ল্যাট ও দোকানের ক্রেতারা।

জালিয়াতির ভয়ংকর তথ্য: সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি কীভাবে হাউজিংয়ের দখলে গেল—সেটি খোঁজ করতে গিয়ে মেলে ভয়ংকর জাল-জালিয়াতির তথ্য। ঢাকা মহানগরীতে বিএস খতিয়ানকে সিটি জরিপ বলা হয়। এই সিটি জরিপের আরেক নাম ঢাকা মহানগর জরিপ। এই জরিপের সময়কাল ধরা হয় ১৯৯৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত। এ যাবৎকালে এটিই দেশের সবচেয়ে আধুনিক জরিপ। সিটি জরিপে আরএস ১৮৭৯ ও ১৮৭৮ দাগে ৯১ শতাংশ জমি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ঢাকা জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড। মামলায় ইস্টার্ন হাউজিং দাবি করেছে, সিএস দাগের ১০৩১নং জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন ফতু মুনসি। পরবর্তীকালে এই জমিটি ১৪ ধাপে বিভিন্ন খণ্ডে বিক্রি হয়। এরপর ১৯৯০ সালের ৩১ এপ্রিল আবু তাহেরের কাছ থেকে ০.০৪২৫ একর; ১৯৯৫ সালের ৫ এপ্রিল কে জে মোশারফ আহম্মেদের কাছ থেকে ০.০৮ একর; ১৯৭৯ সালের ২৮ মে আলতাফুর রহমান, জাহানারা বেগম, আলেয়া খানম, আফিফা খানম, আলফা খানম, সালেহা খানম, রাফিয়া খানম, আয়েশা খানম, হাসনা খানমের কাছ থেকে ০.৩৬ একর; ১৯৯১ সালের ১৯ ডিসেম্বর একেএম নিজামুল আলমের কাছ থেকে ০.৩০ একর; ১৯৯৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর আ. জলিল, সাহারা আক্তার, সোলায়মান আহম্মেদের কাছ থেকে ০.১২৭৫ একর জমি ক্রয় করে নেয়। এই পাঁচটি দলিলের মাধ্যমে ইস্টার্ন হাউজিং ৯১ শতাংশ জমির মালিকানা নিজেদের বলে দাবি করে। তবে অনুসন্ধানে এই দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ওই জমির সমস্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করে। এসব নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, আদতে সিএস ১০৩১ জমির মালিক কখনোই ফতু মুনসি নামের কেউ ছিলেন না। এই জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন হরিচরণ রায়। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার পরে জমিজমা ফেলে হরিচরণ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। তার কোনো ওয়ারিশও এই দেশে নেই। ঢাকা সিটি জরিপের সময় জমির মালিক না পাওয়ায় সেটি সরকারি ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়। হরিচরণের জমির পাশে ১০২৯ দাগের ৩৫ শতাংশ জমির মালিক ফতু মুনসি। এই জমি দলিলপত্র বানিয়ে দখল করে নিয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। এই জমি নিয়েও ইস্টার্ন হাউজিংয়ের সঙ্গে ফতু মুনসির ওয়ারিশদের মামলা চলমান রয়েছে। এ ছাড়াও ইস্টার্ন হাউজিং যাদের কাছ থেকে সাফ কবলার মাধ্যমে জমি ক্রয় করেছেন বলে দেখিয়েছেন, তাদের কেউ কখনোই ওই এলাকায় ছিলেন না। স্থানীয়রা তাদের কাউকেই চেনেন না।

এ ছাড়া ১০ তলা মার্কেটের পেছনে মোহন মিয়া নামের আরও এক ব্যক্তির ৩৩ শতক জমি রয়েছে। মোহন মিয়া দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার সুবাদে এই জমিও দখল কিরে নিয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। এখান থেকে মোহন মিয়া শামসুল হক নামের এক ব্যক্তির কাছে সাড়ে ৮ শতক জমি বিক্রি করেছেন। সব কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকার পরেও ওই জমিতে ওই পরিবার কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে পারছে না। ওই জমি দখল করতে গিয়ে বারবার ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ভাড়াটে বাহিনীর হামলা শিকার হয়েছে শামসুল হক ও মোহন মিয়ার পরিবার।

মোহন মিয়া বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলাম। ২০২১ সালে করোনার সময় দেশে এসে দেখি আমার ফসলি জমিতে বালু ভরাট করে সেখানে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সাইনবোর্ড টাঙানো। ত্রিপুল টাঙিয়ে সেখানে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী মসজিদ। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ইস্টার্ন হাউজিং আমার জমি নাকি শাহ আলম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কিনে নিয়েছে। সে নাকি আবার আবু হানিফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে আমমোক্তারনামা নিয়েছে। অথচ এদের কাউকেই আমি চিনি না। তারা কখনো এই এলাকায় ছিলেন বলেও আমার মনে হয় না। স্থানীয় কেউ তাদের চেনেন না।’

মোহন মিয়া আরও বলেন, ‘পরে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের কাছে সব কাগজপত্র নিয়ে যাই। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরেও তারা আমার জমি বুঝিয়ে দিচ্ছে না। নিজের জমি দখল নিতে গেলে তারা ভারাটে বাহিনী দিয়ে আমার ওপর হামলা চালিয়েছে। এখন আমি আমার মায়ের সম্পত্তি ফেরত চাই।’

মোহন মিয়ার বোন হাসনা বানু বলেন, ‘জমির সব কাগজপত্র আমাদের পক্ষে। স্থানীয় এসিল্যান্ডের তদন্ত প্রতিবেদনও আমাদের পক্ষে। তার পরও আমরা আমাদের জমিতে ভবন বানাতে পারছি না। নিজের জমি থাকার পরেও ভাড়া বাসায় পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজউকে আমাদের জমিতে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের লেআউটে দিয়ে দিছে। এখন আমার প্ল্যান পাস করতে পারছি না। ভূমি আপিল বোর্ডে অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। শুধু তারিখের পরে তারিখ আসছে, আর আমাদের ভোগান্তি বাড়ছে।’

আরও বহু মানুষের জমি দখল: গত মাসের শেষ সপ্তাহে দক্ষিণ বনশ্রীর ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ওই প্রজেক্টে যায় এই প্রতিবেদক। সেখানে ঘণ্টাখানেক অবস্থান করতেই সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে অসংখ্য ভুক্তভোগী নিজেদের জমির কাগজপত্র নিয়ে এসে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ করেন। যাদের মধ্যে রয়েছে আবু সাঈদ পরিবারের দুই দাগে ১১২ শতাংশ জমি। মেরাদিয়া মৌজায় যার এসএ দাগ ও সিএস দাগ ২৩৫ ও ২৩৮। ইকবাল পরিবারের দুই দাগে ২৮ শতাংশ। মেরাদিয়া মৌজায় যার এসএ এবং সিএস দাগ নম্বর ৮৮ ও ৯৯। আকবর আলীর বাড্ডা মৌজায় ৩৭৫ শতাংশ জমি। যার এসএ এবং সিএস দাগ নম্বর ২৭২৭। মুনছুর রাসেল মিয়ার নন্দীপাড়া মৌজায় ৮২ শতাংশ। যার এসএ এবং সিএস দাগ নম্বর ২৫২। কাজল পরিবারের উত্তর মেরাদিয়া মৌজায় ৩০ শতক জমি। যার এসএ এবং সিএস দাগ নম্বর ১৫৯। আনিছুর রহমানের ১৬ শতক জমি। যার এসএ এবং সিএস দাগ নম্বর ২৩৩৫। এ ছাড়া মেরাদিয়া মৌজায় সিএস ও এসএ ১৫৬ এবং আরএস ২২৭ ও ২২৮ দাগের জাকির হোসেন পরিবারের ৭৫ শতক জমি দখল করে নিয়েছে হাউজিং কোম্পানিটি।

জাকির হেসেন বলেন, ‘আমার দাদারা চার ভাই ছিল। আমার এক দাদা ইস্টার্ন হাউজিংয়ের কাছে ৩৮ শতক জমি বিক্রি করেছিল। যদিও তিনি ভাগে পাবেন মাত্র ১৮ শতক। এরপর ইস্টার্ন হাউজিং পুরো ৭৫ শতক জমিই দখল করে নিয়েছে।

এ ছাড়া আরএস ৪২০০ দাগের রেহানা বেগমের ৬ শতক ও আরএস ২৮০০ দাগের জোসনা বেগমের ৭ শতক জায়গা দখলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে।

ভূত যখন সর্ষের ভেতরে: জমি দখলের প্রক্রিয়া সম্পর্ক জানতে চাইলে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইস্টার্ন হাউজিং রাজউককে ম্যানেজ করে অন্যের জমি প্লট বানিয়ে ‘লে-আউট’ অনুমোদন নেয়। এরপর জমির মালিক ভবন বানাতে রাজউকে প্ল্যান পাসের জন্য আবেদন করলে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ‘লে-আউটের’ মধ্যে থাকায় সেটি অনুমোদন দেয় না রাজউক। পরে বাধ্য হয়ে স্থানীয় মানুষ ইস্টার্ন হাউজিংয়ের কাছে নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রি করে।’

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘জি ব্লকের ৬ নম্বর রোডে পাশে ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪ এই প্লটের একটা জমিও ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ক্রয় করা না। ২০১৬ সালে নতুন করে নেওয়া লে-আউটে এই জমিগুলো ঢুকিয়ে দেয়। এ ছাড়াও ৪৩ নম্বর প্লট পুরোটাই সরকারি হালটের ওপরে। ৪২ ও ৪৪ নম্বর প্লটও সরকারি হালটের ওপরে আংশিক পড়েছে।’

‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার সেই উপেনের মতো দশা দক্ষিণ বনশ্রী এলাকার অসংখ্য গরিব মানুষের। এলাকাটি একসময় হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পরে অনেক হিন্দু পরিবার তাদের জমিজমা ফেলে দেশ ছেড়ে চলে যায়। এসব জমি দীর্ঘদিন ধরে পতিত থাকায় ইস্টার্ন হাউজিং ভুয়া ও জাল কাগজপত্র বানিয়ে তা দখলে নেয়। যেসব হিন্দু পরিবার এখনো এই এলাকায় রয়ে গেছে, তারাও কোণঠাসা। তাদের জমিও জোরজবরদস্তি করে দখলে নিয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। কিছু জমি ভয়ভীতি দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে দলিল করে নিয়েছে। কোনো জমির ওপরে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের নজর পড়লে রাতের আঁধারে প্রথমে বালু ফেলে ভরাট করা হয়। এরপর সেই জমিতে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা; কখনো ওয়াসার পানির পাম্প বা খেলার মাঠ বা বিভিন্ন বেনামি সমিতির সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে সেসব জমি দখলে নিয়ে নেয়। কেউ জমির দলিল করে দিতে না চাইলে মামলা দিয়ে বছরের পর বছর হয়রানি করা হয়।

রেবা মণ্ডল নামের স্থানীয় এক নারী বলেন, ‘আমাদের এখানে শ্মশান ছিল, মন্দির ছিল, খেলার মাঠ ছিল, পুকুরও ছিল। এখন তো কিছুই নেই। শ্মশান ঘাট, খেলার মাঠ সব বাউন্ডারি করে দখল করে নিয়ে গেছে ইস্টার্ন হাউজিং। এখন কেউ মারা গেলে তার শেষকৃত্যের জন্য রাজারবাগ নিয়ে যেতে হয়।’

মো. গিয়াসউদ্দিন নামের একজন বলেন, ‘এক গরিব বিডি ভিক্ষা করে খাইত। হেই বিডির ২ কাঠা জায়গা ১৫ নম্বর রোডের মাঝখানে। হেই বিডির জায়গাডাও দখল কইলা খাইয়া লাইছে। এই বিডি কাইন্দা-কাইট্টা ঘুইরা কোনো টাকা পায় নাই। ১৩ নম্বর রোডে ৩ কাঠা জায়গা এক লোক বিদেশ থাইকা আইয়া কিনছে। এই জায়গাডাও ইস্টার্ন হাউজিং খাইয়া লাইছে।’

এক চা দোকানি বলেন, ‘এইহানে অনেক বছর ধরে আমি চায়ের দোকান করি। এইহানে দশতলা মার্কেটের সামনে একটা চিতাখোলা ছিল, মন্দির ছিল, খাল ছিল। সব ইস্টার্ন হাউজিং দখল করে নিছে।’

ময়না রানি সরকার নামের আরেক নারী বলেন, ‘আমাগো এহানে জায়গা ছিল, মন্দির ছিল, শ্মশান ঘাট ছিল। আমাগো সব দহল কইরা নিয়া গেছে গা ইস্টার্ন হাউজিং। এহন আমাগো থাকার জায়গাও নাইকা। আমাগো জায়গা জোর কাইরা নিয়া ঘর-বাড়ি তুইলা ওয়াল দিয়া লাইছে। কেউ তাগো ডরে কোনো কথা কয় না।

অশীতিপর গয়া নাথ দাশ বলেন, ‘এখানে আমি ৮০ বছরে ধরে থাকি। এখানে আমাদের একসময় হিন্দুপাড়া ছিল। এখানে আমরা অনেক হিন্দু ছিলাম। অনেকে তাদের জায়গা জমি ফালাই রাইখা চইলা গেছে। এসব জমি ইস্টার্ন হাউজিং সব দখল করে নিয়ে গেছে। হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই, আমরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে মিলেমিশে বসবাস করছি। কিন্তু ইস্টার্ন হাউজিং এসে আমাদের শ্মশান খোলা বিলীন কইরা দিছে; মন্দির, খেলার মাঠ সব দখল করে নিয়ে গেছে।’

ব্যাংকে মর্টগেজ রাখা জমি এনওসি দিয়ে বিক্রি: সোনালী ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় মর্টগেজ রাখা একটি জমি দখল করে তা অনাপত্তি সনদ (এনওসি) দিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। ঋণ খেলাপি হওয়ায় জমি উদ্ধারে মামলা করে ব্যাংক এখন আদালতের বারান্দায় ঘুরছে।

জানা যায়, মেসার্স ইমপ্রেসিভ অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ২০০৯ সালে নন্দীপাড়া মৌজার ২২ শতক জমি বন্ধক রেখে ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা ঋণ নেয়। ওই জমির দাগ নম্বর এসএ-৭৩৮, আরএস-৫৫৯, ঢাকা সিটি জরিপে ৪৬০৯। সেই ঋণ বর্তমানে বেড়ে ২৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের দিলকুশা শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘জমি ব্যাংকে মর্টগেজ রাখা হলেও সেই জমির দালিলিক মালিক ব্যাংক না। তাই ব্যাংক আইন মোতাবেক জমির মালিকানা চেয়ে আদালতের কাছে নাম জারির আবেদনের অনুমতি চেয়েছিল। এরপর আদালত রায়ে ২০২৪ সালের ৬ মে ব্যাংকে নাম জারির অনুমতি দেন। এরপর ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পক্ষ থেকে আদালতে একটি আপিল করা হয়েছে। আমরা আদালতের রায় পেলেই জমির নামজারি করে দখলে যাব।’

প্রবাসীর জমি দখল করে খেলার মাঠ: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সরোয়ার গোলাম চৌধুরীর জমি দখল করে সেখানে ‘দক্ষিণ বনশ্রী খেলার মাঠ’ সাইনবোর্ড সাঁটিয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। যার সিএস ও এসএ দাগ নম্বর ৪৫৬, আরএস ২০১০ এবং সিটি জরিপ ১৬০১ ও ১৬৩৩। ২০২২ সালের ১০ মার্চ দক্ষিণ বনশ্রী প্লট মালিক সমিতিকে ১৬.৩৪ কাঠা জমি বুঝিয়ে দেয় ইস্টার্ন হাউজিং। যেই জমির মধ্যে রয়েছে প্রবাসী সরোয়ার আলমের ১৪ শতকও। ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বুঝিয়ে দেওয়া জমি বর্তমানে সমিতিই দেখাশোনা করছে।

ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ জমির প্রকৃত মালিক আনোয়ারা বেগম নামে এক নারী। ১৯৭৭ সালের ১৬ আগস্ট ২৪০৮৫ নম্বর সাফকবলা দলিলের মাধ্যমে তালেব আলীর কাছ থেকে তিনি ওই জমির মালিকানা পান। এরপর ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ ৩১৭৯/২৩ নম্বর দলিলের মাধ্যমে জমিটি ৮৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকায় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সরোয়ার গোলাম চৌধুরী কিনে নেন।

সরেজমিন ইস্টার্ন হাউজিংয়ের হেড অফিস: ইস্টার্ন হাউজিংয়ের আগ্রাসনে জমি হারানো এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে তার ভাই পরিচয়ে যাওয়া হয় কোম্পানিটির বনানীর লোকমান হোসেন সেন্টারের প্রধান কার্যালয়ে। সেখানে লিফটের আটতলায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে দলিলের স্তূপ। ভাঁজ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন নকশা। সেখানে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে অন্তত কয়েকশ লোককে দেখা যায় যারা তাদের সর্বস্ব হারিয়ে মুখ মলিন করে হাউজিংয়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তারিখের পর তারিখ দিচ্ছেন সেখানকার কর্মরতরা। মাসের পর মাস কেটে যাচ্ছে—কেটে যাচ্ছে বছর। এরপর এ প্রতিবেদকের সঙ্গে থাকা ভুক্তভোগী কথা বলেন, হাউজিংয়ে দায়িত্বরত কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রকৌশলী রবিউল আউয়াল, নাসির ও মাজহার।

কথা বলার এক পর্যায়ে নাসির নামে ওই কর্মকর্তা দম্ভ নিয়েই ভুক্তভোগীকে বলেন, ‘আপনার কাগজপত্র সব ঠিক আছে, আমার কাছে কিছুই নেই। আপনি আদালতে গিয়ে মামলা করবেন, রায় পাবেন। আমি হাইকোর্ট আপিল করব, আপনি আপিলে রায় পেলে আমি দাবিনামা দিয়ে আসব। আদালতে ঘুরতে ঘুরতে আপনার জীবন শেষ হয়ে যাবে। এমনকি আপনার সন্তানও জমি পাবে না। তাই আমরা যা বলি শোনেন, যতটুকু দিই, তা নিয়ে নেন।’

এই বলে তারা ভুক্তভোগীর সাড়ে ৫ কাঠা জমির পরিবর্ত মাত্র আড়াই কাঠা জমি দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে শর্ত—বাকি জমি তাদের দলিল করে দিয়ে আসতে হবে। সরকারি চাকরিজীবী ওই ভুক্তভোগী জমিজমার কাগজপত্র ভালো বোঝায় কথাবার্তার এক পর্যায়ে প্রকৌশলী রবিউল আউয়াল তাকে বলেন, ‘সরকারি চাকরি করে কী করবেন। এসব চাকরি ছেড়ে দেন। আমাদের সঙ্গে এসে কাজ করেন, আপনি জমিজমার ভুয়া দলিল করবেন। দেখবেন অল্পদিনে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে ইন্টার্ন হাউজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রশ্ন শুনে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাকে একটা নম্বর দিতাছি উনার সঙ্গে কথা বলেন।’ এরপরই আবার বলেন, ‘আপনাকে আমি ফোন দিতে বলতেছি।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। এর কিছুক্ষণ পর নির্বাহী মহাব্যবস্থাপক মো. ফরহাদুজ্জামান পরিচয় দিয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন এক ব্যক্তি। তিনি বিস্তারিত শুনে বলেন, ‘সুস্পষ্টভাবে বলি, ইস্টার্ন হাউজিং অন্যের জমি দখল করে না। নিজস্ব প্রকল্পের ভেতরে মানুষের কাছ থেকে জমি নিয়ে সেটি ভরাট করে আমরা হাউজিং প্রকল্প করি।’

তবে ১০ তলা মার্কেটের দোকান ও ফ্ল্যাট বিক্রি করলেও দলিল করে না দিতে পারার বিষয়টি স্বীকার করে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘ইস্টার্ন বনবিথি নিয়ে আপনি যেটা বললেন, এটি একটি বিচারাধীন বিষয়। এটা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে, সম্ভবত নামজারি সংক্রান্ত। সম্ভবত বলছি, কারণ আমি একশ পার্সেন্ট শিওর না। আমাকে একটু জেনে বলতে হবে। নামজারির ওই সমস্যাটা সমাধান হয়ে গেলে আমরা গ্রাহককে দলিল করে দিতে পারব।’

তিনি আরও বলেন, ‘২ নম্বর হচ্ছে হাউজিং প্রজেক্ট বিশাল এলাকা নিয়ে হয়। এখানে বহু লোকের জমি থাকে। এখন ইন্ডিভিজ্যুয়াল জমিগুলো নিয়ে কারও যদি অভিযোগ থাকে যে, তার জমি ইস্টার্ন হাউজিং দখল করেছে—সেটা কাগজপত্র দেখে আমাদের বলতে হবে। এমনকি আমরাও অনেক সময় দেখেছি, আমাদের কেনা জমি অন্যরা দখল করে নিয়েছে। এমনও হয়েছে, আমাদের কেনা জমি ভুলভাবে দাগ থেকে কেটে নিয়ে গেছে অন্য কেউ। জমির ব্যবসায় এ বিষয়টা হয়ে থাকে, যা আমরা সব সময় ফেস করি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অনুমোদনহীন পণ্য বিক্রির দায়ে জরিমানা গুনল আগোরা

ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ধর্মীয় সাইনবোর্ডের আড়ালে জমি দখলবাজির অভিযোগ

আপডেট সময় ১২:৩৩:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

মো. মোহন মিয়া, জীবিকার তাগিদে ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান ইরাকে। এরপর সেখানে যুদ্ধ শুরু হলে চলে যান তুরষ্কে। ১৯৯২ সালে দেশে ফিরে ফের পাড়ি জমান মালয়েশিয়া। ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রবাস জীবন কেটেছে মোহন মিয়ার। দেশে ফিরে দেখেন তার জমিতে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সাইনবোর্ড সাঁটানো। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ১৯৯০ সালে আবু হানিফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে এই জমি ক্রয় দেখিয়ে দখল করে নিয়েছে আবাসন কোম্পানি ইস্টার্ন হাউজিং।

শুধু মোহন মিয়া নন, ইস্টার্ন হাউজিংয়ের প্রতারণার জালে আটকে আছেন হরিচরণ রায় নামে আরেক ব্যক্তি। তার ৯১ শতাংশ জমি (মালিকানা না থাকায় যা পরবর্তী সময়ে ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়) দখল করে বানিয়েছে ১০ তলাবিশিষ্ট বহুতল মার্কেট। বাদ যায়নি শ্মশান, খেলার মাঠ, কবরস্থান। ধর্মীয় এসব স্থান-স্থাপনাসহ অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে সেখানে বহুতল ভবন বানিয়ে ফ্ল্যাট বিক্রি করছে হাউজিং কোম্পানিটি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রীর মেরাদিয়া মৌজায় ঢাকা সিটি জরিপের ৫৯৩৭ দাগের প্রায় ৫ একর ৯২ শতক জমি সরকারি ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত। অথচ সরকারি এই জমির পুরোটাই ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দখলে। এই সিটির ভেতরে আরএস ১৮৭৯ ও ১৮৭৮ দাগে ৯১ শতাংশ জমি রয়েছে। এই জমিটির সিএস দাগ নম্বর ছিল ১০৩১। যেখানে ইস্টার্ন হাউজিং নির্মাণ করেছে ১০ তলা মার্কেট। এই মার্কেটে রয়েছে ২৪০টি ফ্ল্যাট এবং ৫৩০টির মতো দোকান। প্রতি ফ্ল্যাট কোটি টাকার ওপরে এবং প্রতি দোকান অর্ধকোটি টাকায় কেনাবেচা প্রায় সম্পূর্ণ। সরকারি হওয়ায় এখনো জমির মালিকানা পায়নি ইস্টার্ন হাউজিং। তাই দোকান ও ফ্ল্যাট বিক্রি করলেও দলিল করে দিতে পারেননি কোনো গ্রাহককেই। সরকার যে কোনো সময় জমি নিজেদের দখলে নিয়ে যেতে পারে, সেই আতঙ্কে রয়েছেন এখানকার ফ্ল্যাট ও দোকানের ক্রেতারা।

জালিয়াতির ভয়ংকর তথ্য: সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি কীভাবে হাউজিংয়ের দখলে গেল—সেটি খোঁজ করতে গিয়ে মেলে ভয়ংকর জাল-জালিয়াতির তথ্য। ঢাকা মহানগরীতে বিএস খতিয়ানকে সিটি জরিপ বলা হয়। এই সিটি জরিপের আরেক নাম ঢাকা মহানগর জরিপ। এই জরিপের সময়কাল ধরা হয় ১৯৯৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত। এ যাবৎকালে এটিই দেশের সবচেয়ে আধুনিক জরিপ। সিটি জরিপে আরএস ১৮৭৯ ও ১৮৭৮ দাগে ৯১ শতাংশ জমি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ঢাকা জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড। মামলায় ইস্টার্ন হাউজিং দাবি করেছে, সিএস দাগের ১০৩১নং জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন ফতু মুনসি। পরবর্তীকালে এই জমিটি ১৪ ধাপে বিভিন্ন খণ্ডে বিক্রি হয়। এরপর ১৯৯০ সালের ৩১ এপ্রিল আবু তাহেরের কাছ থেকে ০.০৪২৫ একর; ১৯৯৫ সালের ৫ এপ্রিল কে জে মোশারফ আহম্মেদের কাছ থেকে ০.০৮ একর; ১৯৭৯ সালের ২৮ মে আলতাফুর রহমান, জাহানারা বেগম, আলেয়া খানম, আফিফা খানম, আলফা খানম, সালেহা খানম, রাফিয়া খানম, আয়েশা খানম, হাসনা খানমের কাছ থেকে ০.৩৬ একর; ১৯৯১ সালের ১৯ ডিসেম্বর একেএম নিজামুল আলমের কাছ থেকে ০.৩০ একর; ১৯৯৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর আ. জলিল, সাহারা আক্তার, সোলায়মান আহম্মেদের কাছ থেকে ০.১২৭৫ একর জমি ক্রয় করে নেয়। এই পাঁচটি দলিলের মাধ্যমে ইস্টার্ন হাউজিং ৯১ শতাংশ জমির মালিকানা নিজেদের বলে দাবি করে। তবে অনুসন্ধানে এই দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ওই জমির সমস্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করে। এসব নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, আদতে সিএস ১০৩১ জমির মালিক কখনোই ফতু মুনসি নামের কেউ ছিলেন না। এই জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন হরিচরণ রায়। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার পরে জমিজমা ফেলে হরিচরণ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। তার কোনো ওয়ারিশও এই দেশে নেই। ঢাকা সিটি জরিপের সময় জমির মালিক না পাওয়ায় সেটি সরকারি ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়। হরিচরণের জমির পাশে ১০২৯ দাগের ৩৫ শতাংশ জমির মালিক ফতু মুনসি। এই জমি দলিলপত্র বানিয়ে দখল করে নিয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। এই জমি নিয়েও ইস্টার্ন হাউজিংয়ের সঙ্গে ফতু মুনসির ওয়ারিশদের মামলা চলমান রয়েছে। এ ছাড়াও ইস্টার্ন হাউজিং যাদের কাছ থেকে সাফ কবলার মাধ্যমে জমি ক্রয় করেছেন বলে দেখিয়েছেন, তাদের কেউ কখনোই ওই এলাকায় ছিলেন না। স্থানীয়রা তাদের কাউকেই চেনেন না।

এ ছাড়া ১০ তলা মার্কেটের পেছনে মোহন মিয়া নামের আরও এক ব্যক্তির ৩৩ শতক জমি রয়েছে। মোহন মিয়া দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার সুবাদে এই জমিও দখল কিরে নিয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। এখান থেকে মোহন মিয়া শামসুল হক নামের এক ব্যক্তির কাছে সাড়ে ৮ শতক জমি বিক্রি করেছেন। সব কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকার পরেও ওই জমিতে ওই পরিবার কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে পারছে না। ওই জমি দখল করতে গিয়ে বারবার ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ভাড়াটে বাহিনীর হামলা শিকার হয়েছে শামসুল হক ও মোহন মিয়ার পরিবার।

মোহন মিয়া বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলাম। ২০২১ সালে করোনার সময় দেশে এসে দেখি আমার ফসলি জমিতে বালু ভরাট করে সেখানে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সাইনবোর্ড টাঙানো। ত্রিপুল টাঙিয়ে সেখানে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী মসজিদ। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ইস্টার্ন হাউজিং আমার জমি নাকি শাহ আলম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কিনে নিয়েছে। সে নাকি আবার আবু হানিফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে আমমোক্তারনামা নিয়েছে। অথচ এদের কাউকেই আমি চিনি না। তারা কখনো এই এলাকায় ছিলেন বলেও আমার মনে হয় না। স্থানীয় কেউ তাদের চেনেন না।’

মোহন মিয়া আরও বলেন, ‘পরে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের কাছে সব কাগজপত্র নিয়ে যাই। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরেও তারা আমার জমি বুঝিয়ে দিচ্ছে না। নিজের জমি দখল নিতে গেলে তারা ভারাটে বাহিনী দিয়ে আমার ওপর হামলা চালিয়েছে। এখন আমি আমার মায়ের সম্পত্তি ফেরত চাই।’

মোহন মিয়ার বোন হাসনা বানু বলেন, ‘জমির সব কাগজপত্র আমাদের পক্ষে। স্থানীয় এসিল্যান্ডের তদন্ত প্রতিবেদনও আমাদের পক্ষে। তার পরও আমরা আমাদের জমিতে ভবন বানাতে পারছি না। নিজের জমি থাকার পরেও ভাড়া বাসায় পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজউকে আমাদের জমিতে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের লেআউটে দিয়ে দিছে। এখন আমার প্ল্যান পাস করতে পারছি না। ভূমি আপিল বোর্ডে অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। শুধু তারিখের পরে তারিখ আসছে, আর আমাদের ভোগান্তি বাড়ছে।’

আরও বহু মানুষের জমি দখল: গত মাসের শেষ সপ্তাহে দক্ষিণ বনশ্রীর ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ওই প্রজেক্টে যায় এই প্রতিবেদক। সেখানে ঘণ্টাখানেক অবস্থান করতেই সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে অসংখ্য ভুক্তভোগী নিজেদের জমির কাগজপত্র নিয়ে এসে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ করেন। যাদের মধ্যে রয়েছে আবু সাঈদ পরিবারের দুই দাগে ১১২ শতাংশ জমি। মেরাদিয়া মৌজায় যার এসএ দাগ ও সিএস দাগ ২৩৫ ও ২৩৮। ইকবাল পরিবারের দুই দাগে ২৮ শতাংশ। মেরাদিয়া মৌজায় যার এসএ এবং সিএস দাগ নম্বর ৮৮ ও ৯৯। আকবর আলীর বাড্ডা মৌজায় ৩৭৫ শতাংশ জমি। যার এসএ এবং সিএস দাগ নম্বর ২৭২৭। মুনছুর রাসেল মিয়ার নন্দীপাড়া মৌজায় ৮২ শতাংশ। যার এসএ এবং সিএস দাগ নম্বর ২৫২। কাজল পরিবারের উত্তর মেরাদিয়া মৌজায় ৩০ শতক জমি। যার এসএ এবং সিএস দাগ নম্বর ১৫৯। আনিছুর রহমানের ১৬ শতক জমি। যার এসএ এবং সিএস দাগ নম্বর ২৩৩৫। এ ছাড়া মেরাদিয়া মৌজায় সিএস ও এসএ ১৫৬ এবং আরএস ২২৭ ও ২২৮ দাগের জাকির হোসেন পরিবারের ৭৫ শতক জমি দখল করে নিয়েছে হাউজিং কোম্পানিটি।

জাকির হেসেন বলেন, ‘আমার দাদারা চার ভাই ছিল। আমার এক দাদা ইস্টার্ন হাউজিংয়ের কাছে ৩৮ শতক জমি বিক্রি করেছিল। যদিও তিনি ভাগে পাবেন মাত্র ১৮ শতক। এরপর ইস্টার্ন হাউজিং পুরো ৭৫ শতক জমিই দখল করে নিয়েছে।

এ ছাড়া আরএস ৪২০০ দাগের রেহানা বেগমের ৬ শতক ও আরএস ২৮০০ দাগের জোসনা বেগমের ৭ শতক জায়গা দখলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে।

ভূত যখন সর্ষের ভেতরে: জমি দখলের প্রক্রিয়া সম্পর্ক জানতে চাইলে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইস্টার্ন হাউজিং রাজউককে ম্যানেজ করে অন্যের জমি প্লট বানিয়ে ‘লে-আউট’ অনুমোদন নেয়। এরপর জমির মালিক ভবন বানাতে রাজউকে প্ল্যান পাসের জন্য আবেদন করলে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ‘লে-আউটের’ মধ্যে থাকায় সেটি অনুমোদন দেয় না রাজউক। পরে বাধ্য হয়ে স্থানীয় মানুষ ইস্টার্ন হাউজিংয়ের কাছে নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রি করে।’

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘জি ব্লকের ৬ নম্বর রোডে পাশে ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪ এই প্লটের একটা জমিও ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ক্রয় করা না। ২০১৬ সালে নতুন করে নেওয়া লে-আউটে এই জমিগুলো ঢুকিয়ে দেয়। এ ছাড়াও ৪৩ নম্বর প্লট পুরোটাই সরকারি হালটের ওপরে। ৪২ ও ৪৪ নম্বর প্লটও সরকারি হালটের ওপরে আংশিক পড়েছে।’

‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার সেই উপেনের মতো দশা দক্ষিণ বনশ্রী এলাকার অসংখ্য গরিব মানুষের। এলাকাটি একসময় হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পরে অনেক হিন্দু পরিবার তাদের জমিজমা ফেলে দেশ ছেড়ে চলে যায়। এসব জমি দীর্ঘদিন ধরে পতিত থাকায় ইস্টার্ন হাউজিং ভুয়া ও জাল কাগজপত্র বানিয়ে তা দখলে নেয়। যেসব হিন্দু পরিবার এখনো এই এলাকায় রয়ে গেছে, তারাও কোণঠাসা। তাদের জমিও জোরজবরদস্তি করে দখলে নিয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। কিছু জমি ভয়ভীতি দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে দলিল করে নিয়েছে। কোনো জমির ওপরে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের নজর পড়লে রাতের আঁধারে প্রথমে বালু ফেলে ভরাট করা হয়। এরপর সেই জমিতে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা; কখনো ওয়াসার পানির পাম্প বা খেলার মাঠ বা বিভিন্ন বেনামি সমিতির সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে সেসব জমি দখলে নিয়ে নেয়। কেউ জমির দলিল করে দিতে না চাইলে মামলা দিয়ে বছরের পর বছর হয়রানি করা হয়।

রেবা মণ্ডল নামের স্থানীয় এক নারী বলেন, ‘আমাদের এখানে শ্মশান ছিল, মন্দির ছিল, খেলার মাঠ ছিল, পুকুরও ছিল। এখন তো কিছুই নেই। শ্মশান ঘাট, খেলার মাঠ সব বাউন্ডারি করে দখল করে নিয়ে গেছে ইস্টার্ন হাউজিং। এখন কেউ মারা গেলে তার শেষকৃত্যের জন্য রাজারবাগ নিয়ে যেতে হয়।’

মো. গিয়াসউদ্দিন নামের একজন বলেন, ‘এক গরিব বিডি ভিক্ষা করে খাইত। হেই বিডির ২ কাঠা জায়গা ১৫ নম্বর রোডের মাঝখানে। হেই বিডির জায়গাডাও দখল কইলা খাইয়া লাইছে। এই বিডি কাইন্দা-কাইট্টা ঘুইরা কোনো টাকা পায় নাই। ১৩ নম্বর রোডে ৩ কাঠা জায়গা এক লোক বিদেশ থাইকা আইয়া কিনছে। এই জায়গাডাও ইস্টার্ন হাউজিং খাইয়া লাইছে।’

এক চা দোকানি বলেন, ‘এইহানে অনেক বছর ধরে আমি চায়ের দোকান করি। এইহানে দশতলা মার্কেটের সামনে একটা চিতাখোলা ছিল, মন্দির ছিল, খাল ছিল। সব ইস্টার্ন হাউজিং দখল করে নিছে।’

ময়না রানি সরকার নামের আরেক নারী বলেন, ‘আমাগো এহানে জায়গা ছিল, মন্দির ছিল, শ্মশান ঘাট ছিল। আমাগো সব দহল কইরা নিয়া গেছে গা ইস্টার্ন হাউজিং। এহন আমাগো থাকার জায়গাও নাইকা। আমাগো জায়গা জোর কাইরা নিয়া ঘর-বাড়ি তুইলা ওয়াল দিয়া লাইছে। কেউ তাগো ডরে কোনো কথা কয় না।

অশীতিপর গয়া নাথ দাশ বলেন, ‘এখানে আমি ৮০ বছরে ধরে থাকি। এখানে আমাদের একসময় হিন্দুপাড়া ছিল। এখানে আমরা অনেক হিন্দু ছিলাম। অনেকে তাদের জায়গা জমি ফালাই রাইখা চইলা গেছে। এসব জমি ইস্টার্ন হাউজিং সব দখল করে নিয়ে গেছে। হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই, আমরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে মিলেমিশে বসবাস করছি। কিন্তু ইস্টার্ন হাউজিং এসে আমাদের শ্মশান খোলা বিলীন কইরা দিছে; মন্দির, খেলার মাঠ সব দখল করে নিয়ে গেছে।’

ব্যাংকে মর্টগেজ রাখা জমি এনওসি দিয়ে বিক্রি: সোনালী ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় মর্টগেজ রাখা একটি জমি দখল করে তা অনাপত্তি সনদ (এনওসি) দিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। ঋণ খেলাপি হওয়ায় জমি উদ্ধারে মামলা করে ব্যাংক এখন আদালতের বারান্দায় ঘুরছে।

জানা যায়, মেসার্স ইমপ্রেসিভ অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ২০০৯ সালে নন্দীপাড়া মৌজার ২২ শতক জমি বন্ধক রেখে ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা ঋণ নেয়। ওই জমির দাগ নম্বর এসএ-৭৩৮, আরএস-৫৫৯, ঢাকা সিটি জরিপে ৪৬০৯। সেই ঋণ বর্তমানে বেড়ে ২৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের দিলকুশা শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘জমি ব্যাংকে মর্টগেজ রাখা হলেও সেই জমির দালিলিক মালিক ব্যাংক না। তাই ব্যাংক আইন মোতাবেক জমির মালিকানা চেয়ে আদালতের কাছে নাম জারির আবেদনের অনুমতি চেয়েছিল। এরপর আদালত রায়ে ২০২৪ সালের ৬ মে ব্যাংকে নাম জারির অনুমতি দেন। এরপর ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পক্ষ থেকে আদালতে একটি আপিল করা হয়েছে। আমরা আদালতের রায় পেলেই জমির নামজারি করে দখলে যাব।’

প্রবাসীর জমি দখল করে খেলার মাঠ: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সরোয়ার গোলাম চৌধুরীর জমি দখল করে সেখানে ‘দক্ষিণ বনশ্রী খেলার মাঠ’ সাইনবোর্ড সাঁটিয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। যার সিএস ও এসএ দাগ নম্বর ৪৫৬, আরএস ২০১০ এবং সিটি জরিপ ১৬০১ ও ১৬৩৩। ২০২২ সালের ১০ মার্চ দক্ষিণ বনশ্রী প্লট মালিক সমিতিকে ১৬.৩৪ কাঠা জমি বুঝিয়ে দেয় ইস্টার্ন হাউজিং। যেই জমির মধ্যে রয়েছে প্রবাসী সরোয়ার আলমের ১৪ শতকও। ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বুঝিয়ে দেওয়া জমি বর্তমানে সমিতিই দেখাশোনা করছে।

ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ জমির প্রকৃত মালিক আনোয়ারা বেগম নামে এক নারী। ১৯৭৭ সালের ১৬ আগস্ট ২৪০৮৫ নম্বর সাফকবলা দলিলের মাধ্যমে তালেব আলীর কাছ থেকে তিনি ওই জমির মালিকানা পান। এরপর ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ ৩১৭৯/২৩ নম্বর দলিলের মাধ্যমে জমিটি ৮৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকায় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সরোয়ার গোলাম চৌধুরী কিনে নেন।

সরেজমিন ইস্টার্ন হাউজিংয়ের হেড অফিস: ইস্টার্ন হাউজিংয়ের আগ্রাসনে জমি হারানো এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে তার ভাই পরিচয়ে যাওয়া হয় কোম্পানিটির বনানীর লোকমান হোসেন সেন্টারের প্রধান কার্যালয়ে। সেখানে লিফটের আটতলায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে দলিলের স্তূপ। ভাঁজ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন নকশা। সেখানে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে অন্তত কয়েকশ লোককে দেখা যায় যারা তাদের সর্বস্ব হারিয়ে মুখ মলিন করে হাউজিংয়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তারিখের পর তারিখ দিচ্ছেন সেখানকার কর্মরতরা। মাসের পর মাস কেটে যাচ্ছে—কেটে যাচ্ছে বছর। এরপর এ প্রতিবেদকের সঙ্গে থাকা ভুক্তভোগী কথা বলেন, হাউজিংয়ে দায়িত্বরত কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রকৌশলী রবিউল আউয়াল, নাসির ও মাজহার।

কথা বলার এক পর্যায়ে নাসির নামে ওই কর্মকর্তা দম্ভ নিয়েই ভুক্তভোগীকে বলেন, ‘আপনার কাগজপত্র সব ঠিক আছে, আমার কাছে কিছুই নেই। আপনি আদালতে গিয়ে মামলা করবেন, রায় পাবেন। আমি হাইকোর্ট আপিল করব, আপনি আপিলে রায় পেলে আমি দাবিনামা দিয়ে আসব। আদালতে ঘুরতে ঘুরতে আপনার জীবন শেষ হয়ে যাবে। এমনকি আপনার সন্তানও জমি পাবে না। তাই আমরা যা বলি শোনেন, যতটুকু দিই, তা নিয়ে নেন।’

এই বলে তারা ভুক্তভোগীর সাড়ে ৫ কাঠা জমির পরিবর্ত মাত্র আড়াই কাঠা জমি দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে শর্ত—বাকি জমি তাদের দলিল করে দিয়ে আসতে হবে। সরকারি চাকরিজীবী ওই ভুক্তভোগী জমিজমার কাগজপত্র ভালো বোঝায় কথাবার্তার এক পর্যায়ে প্রকৌশলী রবিউল আউয়াল তাকে বলেন, ‘সরকারি চাকরি করে কী করবেন। এসব চাকরি ছেড়ে দেন। আমাদের সঙ্গে এসে কাজ করেন, আপনি জমিজমার ভুয়া দলিল করবেন। দেখবেন অল্পদিনে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে ইন্টার্ন হাউজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রশ্ন শুনে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাকে একটা নম্বর দিতাছি উনার সঙ্গে কথা বলেন।’ এরপরই আবার বলেন, ‘আপনাকে আমি ফোন দিতে বলতেছি।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। এর কিছুক্ষণ পর নির্বাহী মহাব্যবস্থাপক মো. ফরহাদুজ্জামান পরিচয় দিয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন এক ব্যক্তি। তিনি বিস্তারিত শুনে বলেন, ‘সুস্পষ্টভাবে বলি, ইস্টার্ন হাউজিং অন্যের জমি দখল করে না। নিজস্ব প্রকল্পের ভেতরে মানুষের কাছ থেকে জমি নিয়ে সেটি ভরাট করে আমরা হাউজিং প্রকল্প করি।’

তবে ১০ তলা মার্কেটের দোকান ও ফ্ল্যাট বিক্রি করলেও দলিল করে না দিতে পারার বিষয়টি স্বীকার করে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘ইস্টার্ন বনবিথি নিয়ে আপনি যেটা বললেন, এটি একটি বিচারাধীন বিষয়। এটা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে, সম্ভবত নামজারি সংক্রান্ত। সম্ভবত বলছি, কারণ আমি একশ পার্সেন্ট শিওর না। আমাকে একটু জেনে বলতে হবে। নামজারির ওই সমস্যাটা সমাধান হয়ে গেলে আমরা গ্রাহককে দলিল করে দিতে পারব।’

তিনি আরও বলেন, ‘২ নম্বর হচ্ছে হাউজিং প্রজেক্ট বিশাল এলাকা নিয়ে হয়। এখানে বহু লোকের জমি থাকে। এখন ইন্ডিভিজ্যুয়াল জমিগুলো নিয়ে কারও যদি অভিযোগ থাকে যে, তার জমি ইস্টার্ন হাউজিং দখল করেছে—সেটা কাগজপত্র দেখে আমাদের বলতে হবে। এমনকি আমরাও অনেক সময় দেখেছি, আমাদের কেনা জমি অন্যরা দখল করে নিয়েছে। এমনও হয়েছে, আমাদের কেনা জমি ভুলভাবে দাগ থেকে কেটে নিয়ে গেছে অন্য কেউ। জমির ব্যবসায় এ বিষয়টা হয়ে থাকে, যা আমরা সব সময় ফেস করি।