বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের খুলনা সিন্ডিকেটের হোতা সেজে টেন্ডার বাণিজ্য, জালিয়াতি ও অনিয়মের পাহাড় গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে ২৮তম বিসিএসের প্রকৌশলী অমিত কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। খুলনার আলোচিত ‘শেখ বাড়ি’র আশীর্বাদপুষ্ট এই কর্মকর্তা সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলালের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন এবং দুর্নীতি ও লুটপাটের শত শত কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে নির্বিচারে গুলি চালাতে খুলনা মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহাজালাল সুজনকে কয়েক কোটি টাকা জোগান দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিসিএস ক্যাডার হিসেবে চাকরিতে যোগদানের পর অমিত কুমার বিশ্বাসের প্রথম পোস্টিং হয় খুলনায়। কর্মজীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় তিনি খুলনায় সহকারী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (গণপূর্ত বিভাগ-১) হিসেবে তিন বছরেরও বেশি সময় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। শেখ হেলালের আস্থাভাজন হওয়ায় তার ভয়ে খুলনায় অন্য কোনো কর্মকর্তা পোস্টিং নিতে সাহস পেতেন না। যার কারণে একাই খুলনা বিভাগ-১, বিভাগ-২ এবং বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন, যা নথিপত্র যাচাই করলেই প্রমাণ পাওয়া যায়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিশেষ বরাদ্দের সকল কাজ ওপেন টেন্ডার মেথড (OTM) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে তার পছন্দের ঠিকাদার ও যুবলীগ নেতা শেখ শাহজালাল সুজনকে পাইয়ে দিতেন অমিত। এছাড়া সাবেক এমপি সালাম মুর্শেদীকে দিঘলিয়া উপজেলা মডেল মসজিদের কাজ এবং শেখ হেলালের আরেক ঘনিষ্ঠ দাউদ সাহেবকে দিঘলিয়া টিটিসি নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেন তিনি। খুলনা মেডিকেল কলেজের ভেতর কয়েকটি নতুন ভবনের কাজ পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে ১০% কমিশন নিতেন অমিত কুমার বিশ্বাস, যার ৫% সরাসরি চলে যেত শেখ হেলালের পকেটে।
খুলনা ছাড়াও মাঝপথে গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন অমিত কুমার। ২০২০ সালে মুজিব শতবর্ষে শেখ মুজিবের সমাধিস্থলে ১০ কোটি টাকার কাজ পছন্দের ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজশ করে ভাগাভাগি করে নেন। এমনকি টুঙ্গিপাড়ায় শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাড়ির নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা দেওয়ার পেছনেও এই প্রকৌশলীর হাত ছিল।
গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতনের পর ৩ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে অমিত কুমার বিশ্বাসকে পটুয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হয়। তবে সেখানে গিয়েও তার দুর্নীতির চরিত্র বদলায়নি। প্রধান প্রকৌশলীর স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন অমান্য করে পটুয়াখালীতে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে লিমিটেড টেন্ডার মেথডের (LTM) পরিবর্তে ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। যার সুনির্দিষ্ট আইডি নম্বরগুলো হলো: 1082830, 1078462, 1078463, 1072870, 1072103, 1072880, 1072852, 1071872, 1070585, 1066538, 1067779, 1067780 এবং 1070581।
ভারতে ‘সেকেন্ড হোম’ ও দেশে সম্পদের পাহাড়
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই মহা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ‘সেকেন্ড হোম’ ভারতে। হুন্ডির মাধ্যমে শত কোটি টাকা পাচারের পাশাপাশি ভারতে তার দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশেও তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মধ্যে রয়েছে:
খুলনা শহরের সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় একটি ৬ তলা বাড়ি।
খুলনার ডুমুরিয়ায় ২০ বিঘার একটি বিশাল মাছের ঘের।
ঢাকার উত্তরায় ১২ নম্বর সেক্টরে ২টি ফ্ল্যাট।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সি-ব্লকের ১২ নম্বর রোডে ১টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
গাজীপুরে রিসোর্ট তৈরি করার জন্য ক্রয় করা ১০ একর জমি।
এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকা জমা রয়েছে।
ফ্যাসিবাদের এই দোসর ও অর্থ পাচারকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তার সমস্ত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন গণপূর্তের সাধারণ কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা। এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার বিশ্বাসের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















