গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (জিসিসি) মাস্টার রোল, চুক্তিভিত্তিক ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জিসিসির যান্ত্রিক বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (চুক্তিভিত্তিক) মো. আমজাদ হোসেন। কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, চাকরি স্থায়ীকরণের নামে ইতোমধ্যে কয়েক দফায় লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, “চুক্তিভিত্তিক ও মাস্টার রোল কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ পরিষদ” নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সংগঠনটির নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা চাকরি স্থায়ীকরণ, নিয়োগ বিধিমালা অনুমোদন, গেজেট প্রকাশ এবং আদালতে দায়ের করা মামলার ব্যয় নির্বাহের কথা বলে অর্থ আদায় করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ২০২৪ সালে গঠিত ওই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন মো. আমজাদ হোসেন। এরপর থেকে বিভিন্ন জোন ও বিভাগের মাস্টার রোল এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের মধ্যে চাকরি স্থায়ীকরণ নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। চলতি বছরের ১০ মার্চ এ বিষয়ে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে বলে কর্মচারীদের জানানো হয়। রিট পিটিশন নম্বর ১৩৭৩/২০২৬ উল্লেখ করে মামলার খরচ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরের জন্য অর্থ প্রয়োজন বলে কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, ঈদুল ফিতরের আগে প্রায় ৫০০ কর্মচারীর কাছ থেকে জনপ্রতি ৩ হাজার টাকা করে প্রায় ১৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়। পরে ঈদুল আজহার আগে চাকরি স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, নিয়োগ বিধিমালা অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট আইনি কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলে আরও ৫ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। এ হিসেবে দ্বিতীয় দফায় প্রায় ২৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুই দফায় আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এই প্রতিবেদকের হাতে অর্থ সংগ্রহসংক্রান্ত একাধিক তালিকা ও তথ্য এসেছে। এছাড়া বিভিন্ন জোনে কর্মরত কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চাকরি স্থায়ী হওয়ার আশায় তারা অর্থ দিয়েছেন। তবে আদৌ চাকরি স্থায়ীকরণের কোনো আইনি ভিত্তি রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন। স্বাস্থ্য শাখায় কর্মরত চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী তসলিম খান অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “চাকরি স্থায়ীকরণসংক্রান্ত মামলার ব্যয় নির্বাহের জন্য কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে।” তবে সংগৃহীত অর্থ কোন ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা হচ্ছে এবং সেই হিসাব কার নামে পরিচালিত হচ্ছেড়এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, নগর ভবন ও আটটি জোনের কয়েকজন কর্মচারীও অর্থ সংগ্রহ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রয়েছেন। কর্মচারীদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে বদলি কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কাও দেখানো হয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে বর্তমানে প্রায় ১,২২৫ জনের বেশি মাস্টার রোল, চুক্তিভিত্তিক ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি প্রত্যেক কর্মচারীর কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে অর্থ আদায় করা হয়, তাহলে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে গাজীপুর নাগরিক কমিটির সভাপতি জুলীয়াস চৌধুরী বলেন, “সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী স্থায়ী বা রাজস্ব খাতের কোনো পদে নিয়োগের জন্য নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা, উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাভিত্তিক নির্বাচন বাধ্যতামূলক। মাস্টার রোল বা দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীদের সরাসরি স্থায়ীকরণের কোনো সাধারণ আইনি বিধান বর্তমানে বিদ্যমান নেই।” তিনি আরও বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিভিন্ন রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আইন বা বিধিতে সুনির্দিষ্ট সুযোগ না থাকলে প্রকল্প, মাস্টার রোল বা চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের সরাসরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত বা স্থায়ীকরণ করা যাবে না। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। ফলে চাকরি স্থায়ী করার নিশ্চয়তা দিয়ে অর্থ আদায় করা হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল হতে পারে।
আইনজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের একাধিক রায়ে বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার কারণে কোনো অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী স্থায়ী চাকরির আইনগত অধিকার অর্জন করেন না। বিধিবদ্ধ আইন বা অনুমোদিত নিয়োগ বিধিমালায় সুযোগ না থাকলে সরাসরি নিয়মিতকরণ বা স্থায়ীকরণের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে সম্প্রতি মো. আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অসঙ্গতি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। নতুন করে চাকরি স্থায়ীকরণের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. আমজাদ হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সংগৃহীত অর্থের হিসাব প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
মোঃ মামুন হোসেন, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক 



















