সংবাদ শিরোনাম ::
পাঁচ কোটির সরকারি তহবিল গিলে খেলেন উপাচার্য ড. জুলহাস উদ্দিন ক্ষমতায় বসার পর বিএনপির সুর পাল্টে গেছে : ডা. শফিকুর রহমান ফেনী আলিয়ার বিতর্কিত অধ্যক্ষ কারাগারে জলবায়ু অর্থায়নকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আরো সহজলভ্য করার দাবি প্রধানমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যোগ দিতে রাতে বেইজিং যাচ্ছেন তথ্যমন্ত্রী বড়লেখায় ৩২ হাজার শিশু পাচ্ছে ভিটামিন ‘এ’প্লাস ক্যাপসুল ‘বিয়ের কাগজ দেখাতে পারলে যা চাইবেন তা-ই করব’ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন ববি সরকারের তিন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে ‘ব্যর্থ’ বললেন নাহিদ চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডিবি পুলিশের বড় অভিযান: ৩০০ গ্রাম হেরোইনসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার নওগাঁয় আদালতের নির্দেশে দুই শিশুর মৃত্যুর ১০ মাস পর কবর থেকে লাশ উত্তোলন

পাঁচ কোটির সরকারি তহবিল গিলে খেলেন উপাচার্য ড. জুলহাস উদ্দিন

দেশের টেক্সটাইল খাতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরির একমাত্র ও অন্যতম প্রধান বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)। তবে গৌরবময় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এখন আর তার অ্যাকাডেমিক সুনামের কারণে আলোচনায় নেই, বরং এটি ঘুরপাক খাচ্ছে নিয়োগ-বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের গুরুতর সব অভিযোগে। আর এই সমস্ত অনিয়ম ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. জুলহাস উদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি বড় অংশ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি—ভিসি পদে বসার আগের রাজনৈতিক তৎপরতা থেকে শুরু করে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিয়োগে অনিয়ম, প্রকল্পের অর্থ আটকে রাখা, পুরোনো আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং অনুমতি ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে অর্থ উপার্জন—সব মিলিয়ে বুটেক্সে বর্তমানে একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী ও দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একাধিক সূত্রও উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ইউজিসির একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার পরিবর্তনের আগেও অধ্যাপক জুলহাস নিজেকে ক্ষমতাসীনদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং প্রভাব খাটাতেন। পটপরিবর্তনের পরও তিনি একইভাবে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, যার ফলে রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগের মাত্রা এবং প্রশাসনের ভয়ভীতি এতটাই প্রকট যে, অনেকেই নাম-পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জানান, অভিযোগ থাকতেই পারে, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে এ বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। অন্যদিকে ইউজিসি সদস্য ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানালেও, ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মাকসুদুর রহমান স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, উপাচার্য জুলহাসের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের কোনো শেষ নেই। অভিযোগকারীদের মতে, বুটেক্সের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে কার্যত সিন্ডিকেটের করিডরে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক পরিবেশ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর।

অধ্যাপক জুলহাস উদ্দিন মূলত বুটেক্সের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত তিনি প্রকাশ্যে আওয়ামী ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বুটেক্সের ভিসি হওয়ার জন্য লবিং ও সক্রিয় তৎপরতা চালিয়েছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তবে সে সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকায় শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সরকার তাকে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়নি। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি দ্রুত নিজের অবস্থান বদলে ফেলেন এবং নিজেকে ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। এর ফলে গত ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবরে তিনি ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২৮ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিক্ষকরা দাবি করছেন, জুলহাস উদ্দিন ছাত্রজীবন থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক সুবিধাভোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চাকরিজীবনের প্রতিটি পর্যায়েই ক্ষমতাসীন রাজনীতির ছায়া ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন। আওয়ামী সরকারের সময় ভিসি হতে ব্যর্থ হয়ে তিনি ইউজিসির খণ্ডকালীন সদস্যপদ লাভ করেন এবং এই পদটিকে তিনি নিজের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেন।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের রয়েছে তীব্র ক্ষোভ। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়ছিলেন এবং শিক্ষকদের কাছে নৈতিক সমর্থন চাইতে গিয়েছিলেন, তখন অধ্যাপক জুলহাস শিক্ষার্থীদের পক্ষে কোনো দৃশ্যমান অবস্থান নেননি। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়িয়ে, সরকার পরিবর্তনের পর সেই আন্দোলনের আবেগকে চতুরতার সঙ্গে নিজের পক্ষে ব্যবহার করে তিনি ভিসি হওয়ার পথ মসৃণ করেন। শিক্ষার্থীদের ভাষায়, যে শিক্ষক সংকটের সময় ছাত্রদের পাশে ছিলেন না, তিনিই আজ আন্দোলনের আবেগকে পুঁজি করে ক্ষমতার শীর্ষ পদে বসেছেন।

উপাচার্য ড. জুলহাসের বিরুদ্ধে অনিয়মের ইতিহাস বেশ পুরোনো। তিনি যখন বুটেক্সের টেক্সটাইল কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন ছিলেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয়সংক্রান্ত একাধিক কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভিযোগকারী ঠিকাদার ও অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, সে সময় টেন্ডার প্রক্রিয়া, ল্যাবের যন্ত্রপাতি গ্রহণ এবং বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেন ছিল একটি নিয়মিত ঘটনা। টাকা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ত না। এর চেয়েও বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭ সালে তৎকালীন টেক্সটাইল কলেজে থাকাকালীন। সে সময় ‘টেস্টিং অ্যান্ড কনসালট্যান্সি সার্ভিস’ খাতের সাড়ে ৯ লাখ টাকা আত্মসাতের সরাসরি অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রথমে অর্থের অবস্থান নিয়ে চরম বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেন, তবে তদন্তে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ প্রমাণিত হলে নিজের চাকরি বাঁচাতে তিনি ওই টাকা সরকারি তহবিলে ফেরত দিতে বাধ্য হন। বর্তমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে শিক্ষক-কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলছেন—যার বিরুদ্ধে অতীতে সরাসরি আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, তাকে কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ অভিভাবক বা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো?

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ভেঙে অধ্যাপক জুলহাস উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে বুটেক্সের নিয়মিত দায়িত্ব ও ক্লাসের বাইরে অনৈতিকভাবে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি), নর্দান ইউনিভার্সিটি এবং গ্রিন ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন ক্লাস নিয়ে তিনি প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। আইন অনুযায়ী, কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বাইরে পড়াতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট অনুমতি ও আর্থিক হিসাব প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যার ২৫ শতাংশ অর্থ মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিলে জমা দিতে হয়। কিন্তু অধ্যাপক জুলহাস এই নিয়ম সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে বুটেক্সের তহবিলে কোনো অর্থ জমা দেননি। তিনি কীভাবে এই ছাড়পত্র পেলেন বা ছাড়পত্র ছাড়া পড়ালেও কেন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

বুটেক্সের বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগটি হলো সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়োগ-বাণিজ্য। ভিসি এবং প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে একটি প্রভাবশালী নিয়োগ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। ডেপুটি registrar, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং পরিকল্পনা-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোকে কেন্দ্র করে ব্যাপক পক্ষপাত ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদের জন্য একটি সাক্ষাৎকার বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পাঁচজন যোগ্য প্রার্থী অংশ নেন এবং নিয়োগ বোর্ড একজন যোগ্যতম প্রার্থীকে সুপারিশও করে। কিন্তু উপাচার্যের সিন্ডিকেট সেই নিয়োগ অনুমোদন না করে ‘যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি’ বলে ভুয়া ব্যাখ্যা দাঁড় করায় এবং নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে। অভিযোগকারীদের দাবি, সিন্ডিকেটের নিজস্ব ও পছন্দের কোনো প্রার্থীকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ওই পদে বসানোর জন্যই এই নাটকীয়তা করা হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহার।

আর্থিক অনিয়মের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে ‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ শীর্ষক একটি সরকারি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। এই প্রকল্পের অধীনে নেটওয়ার্ক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ল্যাব-সংক্রান্ত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের একটি কাজ আড়াই বছর আগেই সম্পূর্ণ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক শরিফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আড়াই বছর আগে কাজ বুঝিয়ে দিলেও এখনো টাকা পাননি, যার কারণে তারা চরম আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, ঠিকাদারকে টাকা না দিয়ে কিংবা অব্যবহৃত এই বিপুল অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত না পাঠিয়ে, ভিসি ড. জুলহাস ওই টাকা ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে রেখে অবৈধভাবে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত মুনাফা ভোগ করছেন।

ইউজিসির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মাকসুদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, এই প্রকল্পের প্রতিটি কাজের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পিসিআর (Project Completion Report) দাখিল করার জন্য লিখিত ও মৌখিকভাবে কমপক্ষে ৫০ বার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির বৈঠকেও এক মাসের সময় দেওয়া হলেও উপাচার্য তা জমা দেননি। তিনি আরও জানান, প্রকল্পের খরচ শেষে বেঁচে যাওয়া টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিয়ে ব্যাংকে রেখে যা করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অনৈতিক, পুরোপুরি অবৈধ এবং কোনোভাবেই আইনসংগত নয়।

বুটেক্সের সাধারণ শিক্ষক ও কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে যোগ্যতার চেয়ে ভিসির সাথে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা, নিয়মের চেয়ে ভিসির নির্দেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত বলয় বা সিন্ডিকেট বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই তাকে কোণঠাসা করা হচ্ছে।

যেহেতু বুটেক্স একটি জাতীয় ও বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তাই এই সংকট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির যৌথ উদ্যোগে একটি স্বাধীন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে সাম্প্রতিক সব নিয়োগ প্রক্রিয়ার ফরেনসিক অডিট, ৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের বিশেষ আর্থিক নিরীক্ষা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির ক্লাস নেওয়ার অনুমতি ও আয়ের রাজস্ব নথি যাচাই এবং ২০০৭ সালের অর্থ আত্মসাতের পুরোনো ফাইলটি পুনরায় খোলার জোর দাবি উঠেছে।

এই সব গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য বুটেক্স উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. জুলহাস উদ্দিনের মোবাইল ফোনে গত কয়েক দিন ধরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি, যার ফলে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বুটেক্স এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মে চলবে নাকি সিন্ডিকেটের দখলে থাকবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পাঁচ কোটির সরকারি তহবিল গিলে খেলেন উপাচার্য ড. জুলহাস উদ্দিন

পাঁচ কোটির সরকারি তহবিল গিলে খেলেন উপাচার্য ড. জুলহাস উদ্দিন

আপডেট সময় ০১:১৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

দেশের টেক্সটাইল খাতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরির একমাত্র ও অন্যতম প্রধান বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)। তবে গৌরবময় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এখন আর তার অ্যাকাডেমিক সুনামের কারণে আলোচনায় নেই, বরং এটি ঘুরপাক খাচ্ছে নিয়োগ-বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের গুরুতর সব অভিযোগে। আর এই সমস্ত অনিয়ম ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. জুলহাস উদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি বড় অংশ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি—ভিসি পদে বসার আগের রাজনৈতিক তৎপরতা থেকে শুরু করে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিয়োগে অনিয়ম, প্রকল্পের অর্থ আটকে রাখা, পুরোনো আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং অনুমতি ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে অর্থ উপার্জন—সব মিলিয়ে বুটেক্সে বর্তমানে একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী ও দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একাধিক সূত্রও উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ইউজিসির একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার পরিবর্তনের আগেও অধ্যাপক জুলহাস নিজেকে ক্ষমতাসীনদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং প্রভাব খাটাতেন। পটপরিবর্তনের পরও তিনি একইভাবে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, যার ফলে রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগের মাত্রা এবং প্রশাসনের ভয়ভীতি এতটাই প্রকট যে, অনেকেই নাম-পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জানান, অভিযোগ থাকতেই পারে, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে এ বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। অন্যদিকে ইউজিসি সদস্য ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানালেও, ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মাকসুদুর রহমান স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, উপাচার্য জুলহাসের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের কোনো শেষ নেই। অভিযোগকারীদের মতে, বুটেক্সের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে কার্যত সিন্ডিকেটের করিডরে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক পরিবেশ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর।

অধ্যাপক জুলহাস উদ্দিন মূলত বুটেক্সের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত তিনি প্রকাশ্যে আওয়ামী ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বুটেক্সের ভিসি হওয়ার জন্য লবিং ও সক্রিয় তৎপরতা চালিয়েছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তবে সে সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকায় শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সরকার তাকে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়নি। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি দ্রুত নিজের অবস্থান বদলে ফেলেন এবং নিজেকে ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। এর ফলে গত ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবরে তিনি ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২৮ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিক্ষকরা দাবি করছেন, জুলহাস উদ্দিন ছাত্রজীবন থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক সুবিধাভোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চাকরিজীবনের প্রতিটি পর্যায়েই ক্ষমতাসীন রাজনীতির ছায়া ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন। আওয়ামী সরকারের সময় ভিসি হতে ব্যর্থ হয়ে তিনি ইউজিসির খণ্ডকালীন সদস্যপদ লাভ করেন এবং এই পদটিকে তিনি নিজের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেন।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের রয়েছে তীব্র ক্ষোভ। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়ছিলেন এবং শিক্ষকদের কাছে নৈতিক সমর্থন চাইতে গিয়েছিলেন, তখন অধ্যাপক জুলহাস শিক্ষার্থীদের পক্ষে কোনো দৃশ্যমান অবস্থান নেননি। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়িয়ে, সরকার পরিবর্তনের পর সেই আন্দোলনের আবেগকে চতুরতার সঙ্গে নিজের পক্ষে ব্যবহার করে তিনি ভিসি হওয়ার পথ মসৃণ করেন। শিক্ষার্থীদের ভাষায়, যে শিক্ষক সংকটের সময় ছাত্রদের পাশে ছিলেন না, তিনিই আজ আন্দোলনের আবেগকে পুঁজি করে ক্ষমতার শীর্ষ পদে বসেছেন।

উপাচার্য ড. জুলহাসের বিরুদ্ধে অনিয়মের ইতিহাস বেশ পুরোনো। তিনি যখন বুটেক্সের টেক্সটাইল কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন ছিলেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয়সংক্রান্ত একাধিক কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভিযোগকারী ঠিকাদার ও অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, সে সময় টেন্ডার প্রক্রিয়া, ল্যাবের যন্ত্রপাতি গ্রহণ এবং বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেন ছিল একটি নিয়মিত ঘটনা। টাকা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ত না। এর চেয়েও বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭ সালে তৎকালীন টেক্সটাইল কলেজে থাকাকালীন। সে সময় ‘টেস্টিং অ্যান্ড কনসালট্যান্সি সার্ভিস’ খাতের সাড়ে ৯ লাখ টাকা আত্মসাতের সরাসরি অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রথমে অর্থের অবস্থান নিয়ে চরম বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেন, তবে তদন্তে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ প্রমাণিত হলে নিজের চাকরি বাঁচাতে তিনি ওই টাকা সরকারি তহবিলে ফেরত দিতে বাধ্য হন। বর্তমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে শিক্ষক-কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলছেন—যার বিরুদ্ধে অতীতে সরাসরি আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, তাকে কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ অভিভাবক বা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো?

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ভেঙে অধ্যাপক জুলহাস উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে বুটেক্সের নিয়মিত দায়িত্ব ও ক্লাসের বাইরে অনৈতিকভাবে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি), নর্দান ইউনিভার্সিটি এবং গ্রিন ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন ক্লাস নিয়ে তিনি প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। আইন অনুযায়ী, কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বাইরে পড়াতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট অনুমতি ও আর্থিক হিসাব প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যার ২৫ শতাংশ অর্থ মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিলে জমা দিতে হয়। কিন্তু অধ্যাপক জুলহাস এই নিয়ম সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে বুটেক্সের তহবিলে কোনো অর্থ জমা দেননি। তিনি কীভাবে এই ছাড়পত্র পেলেন বা ছাড়পত্র ছাড়া পড়ালেও কেন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

বুটেক্সের বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগটি হলো সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়োগ-বাণিজ্য। ভিসি এবং প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে একটি প্রভাবশালী নিয়োগ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। ডেপুটি registrar, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং পরিকল্পনা-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোকে কেন্দ্র করে ব্যাপক পক্ষপাত ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদের জন্য একটি সাক্ষাৎকার বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পাঁচজন যোগ্য প্রার্থী অংশ নেন এবং নিয়োগ বোর্ড একজন যোগ্যতম প্রার্থীকে সুপারিশও করে। কিন্তু উপাচার্যের সিন্ডিকেট সেই নিয়োগ অনুমোদন না করে ‘যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি’ বলে ভুয়া ব্যাখ্যা দাঁড় করায় এবং নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে। অভিযোগকারীদের দাবি, সিন্ডিকেটের নিজস্ব ও পছন্দের কোনো প্রার্থীকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ওই পদে বসানোর জন্যই এই নাটকীয়তা করা হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহার।

আর্থিক অনিয়মের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে ‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ শীর্ষক একটি সরকারি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। এই প্রকল্পের অধীনে নেটওয়ার্ক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ল্যাব-সংক্রান্ত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের একটি কাজ আড়াই বছর আগেই সম্পূর্ণ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক শরিফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আড়াই বছর আগে কাজ বুঝিয়ে দিলেও এখনো টাকা পাননি, যার কারণে তারা চরম আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, ঠিকাদারকে টাকা না দিয়ে কিংবা অব্যবহৃত এই বিপুল অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত না পাঠিয়ে, ভিসি ড. জুলহাস ওই টাকা ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে রেখে অবৈধভাবে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত মুনাফা ভোগ করছেন।

ইউজিসির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মাকসুদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, এই প্রকল্পের প্রতিটি কাজের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পিসিআর (Project Completion Report) দাখিল করার জন্য লিখিত ও মৌখিকভাবে কমপক্ষে ৫০ বার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির বৈঠকেও এক মাসের সময় দেওয়া হলেও উপাচার্য তা জমা দেননি। তিনি আরও জানান, প্রকল্পের খরচ শেষে বেঁচে যাওয়া টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিয়ে ব্যাংকে রেখে যা করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অনৈতিক, পুরোপুরি অবৈধ এবং কোনোভাবেই আইনসংগত নয়।

বুটেক্সের সাধারণ শিক্ষক ও কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে যোগ্যতার চেয়ে ভিসির সাথে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা, নিয়মের চেয়ে ভিসির নির্দেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত বলয় বা সিন্ডিকেট বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই তাকে কোণঠাসা করা হচ্ছে।

যেহেতু বুটেক্স একটি জাতীয় ও বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তাই এই সংকট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির যৌথ উদ্যোগে একটি স্বাধীন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে সাম্প্রতিক সব নিয়োগ প্রক্রিয়ার ফরেনসিক অডিট, ৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের বিশেষ আর্থিক নিরীক্ষা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির ক্লাস নেওয়ার অনুমতি ও আয়ের রাজস্ব নথি যাচাই এবং ২০০৭ সালের অর্থ আত্মসাতের পুরোনো ফাইলটি পুনরায় খোলার জোর দাবি উঠেছে।

এই সব গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য বুটেক্স উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. জুলহাস উদ্দিনের মোবাইল ফোনে গত কয়েক দিন ধরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি, যার ফলে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বুটেক্স এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মে চলবে নাকি সিন্ডিকেটের দখলে থাকবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।