একজন সাধারণ সরকারি কর্মজীবীর বেতন স্কেল এবং শতকোটি টাকার সম্পত্তির মালিকানা—এই দুইয়ের মাঝে যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, তা খাগড়াছড়ির মানিকছড়ির সিনিয়র স্টাফ নার্স সাহিদা বেগমের ক্ষেত্রে যেন এক ধ্রুপদী রূপকথা বা কোনো অদৃশ্য জাদুর কাঠি। এত বিশাল সম্পত্তির পাহাড় সাধারণ মানুষের মনে বিস্ময় এবং ক্ষোভের জন্ম দেওয়াটাই স্বাভাবিক। একজন সাধারণ সিনিয়র স্টাফ নার্স, যার মাসিক আয় নির্দিষ্ট, বাংলাদেশে সরকারিভাবে সিনিয়র স্টাফ নার্স পদের বেতন স্কেল জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী ১৬,০০০-৩৮,৬৪০ টাকা (১০ম গ্রেড) [১, ৪, ৮]। এই স্কেলে মূল বেতন ১৬,০০০ টাকা থেকে শুরু হয় এবং সর্বোচ্চ ৩৮,৬৪০ টাকা পর্যন্ত হয়।
কিন্তু খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স সাহিদা বেগমের ক্ষেত্রে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেতন বা বোনাসের টাকায় নয়, যেন জাদুর ছোঁয়ায় তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।
অভিযোগ উঠেছে, সাহিদা বেগম হাসপাতালের সকল দামি দামি ওষুধ বাইরে বিক্রি করে ও ৫০ বার হাসপাতালের রোগীদের খাদ্য সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। মানিকছড়ি বাজার থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম শহর পর্যন্ত বিস্তৃত তার এই বিশাল সাম্রাজ্যের খবর এখন টক অফ দ্য টাউন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাহিদা বেগম ও তার পরিবারের নামে-বেনামে থাকা সম্পদের পরিমাণ শতকোটিকোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তার সম্পদের একটি ভয়ংকর চিত্র পাওয়া গেছে:
১. মানিকছড়ি বাজারের প্রাণকেন্দ্রে বিশাল অট্টালিকা
মানিকছড়ি বাজারের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত পুরাতন সিনেমা হলের কাছে প্রায় ৩০ গন্ডা (১২০ শতাংশ) মূল্যবান জায়গার ওপর তিনি নির্মাণ করেছেন বিশাল আবাসিক ভবন। বাজারের মতো জায়গায় এত বড় ভূ-সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা।
২. বাজার সংলগ্ন বহুতল বাণিজ্যিক ভবন
মানিকছড়ি বাজারের আকাশ পুরি রহমানিয়া অটো রাইস মিলের সামনে রয়েছে তার নিজস্ব মালিকানাধীন চার তলা একটি ভবন। এই ভবনের বাণিজ্যিক মূল্য ও আয় নিয়েও জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
৩. লেমুয়ায় ৫০ একরের বাগানবাড়ি
১ নং মানিকছড়ি ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের লেমুয়া এলাকায় প্রায় ৫০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তুলেছেন এক বিশাল বাগানবাড়ি। পাহাড়ি জনপদে এত বিশাল পরিমাণ জমি একজন নার্সের পক্ষে কেনা কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে চলছে কানাঘুষা।
৪. পানজারাম পাড়ায় ফলজ বাগান
একই ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের পানজারাম পাড়ায় রয়েছে আরও প্রায় ৪০ একরের একটি বিশাল ফলজ বাগান। এই বাগানের পেছনে বিনিয়োগ করা হয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা।
৫. কালাপানি এলাকায় ১০০ একর দানীয় জমি
উপজেলার ৩ নং যুগ্যা ছোলা ইউনিয়নের কালাপানি এলাকায় প্রায় ১০০ একর ফসলি ও দানীয় জমি রয়েছে এই নার্সের দখলে। সাধারণ মানুষের কৃষি জমি থেকে শুরু করে সরকারি খাস জমিও তার এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
৬. থানা সংলগ্ন বিশাল আবাসিক কমপ্লেক্স
মানিকছড়ি থানা কম্পাউন্ডের ঠিক নিচেই প্রায় ৩ একর জায়গার ওপর নিজের জন্য বিলাসবহুল দোতলা ভবন নির্মাণ করেছেন সাহিদা বেগম। শুধু তাই নয়, সেখানে ভাড়াটিয়াদের জন্য তৈরি করেছেন প্রায় ৫০টি বাসা। এই আবাসন প্রকল্প থেকে প্রতি মাসে কয়েক লক্ষ টাকা ভাড়া আদায় করা হয়।
৭. চট্টগ্রাম শহরে ৫ তলা ভবন ও একাধিক ফ্ল্যাট
মানিকছড়িতেই ক্ষান্ত হননি তিনি। চট্টগ্রাম বিভাগীয় শহরের অভিজাত এলাকায় তার নিজস্ব একটি ৫ তলা ভবন এবং অন্তত ৫টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে তার বিপুল পরিমাণ স্থায়ী আমানত।
রহস্যময় ব্যাংক ব্যালেন্স: বেতন তোলেন না এক টাকাও!
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে সাহিদা বেগম দীর্ঘকাল ধরে তার সরকারি চাকরির এক টাকাও বেতন ব্যাংক থেকে উত্তোলন করেন না। যেখানে সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের মাস শেষে বেতন পেতে হাহাকার করতে হয়, সেখানে বেতনের টাকা স্পর্শ না করেই কীভাবে শতকোটি টাকার জমি ও ভবন কেনা সম্ভব? তবে কি এর পেছনে রয়েছে কোনো বিশাল সিন্ডিকেট বা দুর্নীতির অদৃশ্য হাত?
এলাকাবাসীর দাবি
মানিকছড়ির সচেতন নাগরিক সমাজ এই ‘অস্বাভাবিক’ সম্পদের পাহাড় দেখে হতবাক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, একজন সাধারণ নার্সের এত সম্পদের মালিক হওয়া অলৌকিক বিষয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
এই সমস্ত সম্পদ ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাহিদা ব্যাবহৃত নাম্বারে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সাদা চোখে যে পাহাড় দেখা যাচ্ছে, তার নিচে কী আছে তা বের করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং যথাযথ সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে এই সম্পদের উৎস এবং অর্থ লেনদেনের সঠিক হিসাব খতিয়ে দেখলেই ‘থলের বিড়াল’ বেরিয়ে আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















