দুটি ভিন্ন করদাতা সনাক্তকরণ নম্বরের (টিআইএন) বিপরীতে তার তিনটি টিআইএন সার্টিফিকের্ট হাতে এসেছে। তিনটি আলাদা নামে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন বিভিন্ন ব্যাংকে।
নিজেকে জাপানি বিনিয়োগকারী হিসেবে দেখিয়ে অধিগ্রহণ করেছেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একাধিক কোম্পানি। ডিজিটাল যুগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, এনআইডি অনুবিভাগ, বিএসইসি ও আরজেএসসির চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি জালিয়াতির যে বিশাল জাল বুনেছেন, তার নজির বিরল।
এমন অভিনব জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন শেয়ারবাজারে নতুন করে সিন্ডিকেট গড়ে তোলা মিয়া মামুন। তিনি মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড নামক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান এমারয়েল্ডের শেয়ারেরও মালিক মিনোরি বাংলাদেশ।
মামুনের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে কাগজসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান, ভুয়া বিনিয়োগ ও জাল নথি এবং কাগুজে ঋণে কাল্পনিক সম্পদ দেখিয়ে শেয়ারবাজারে সিন্ডিকেট করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রতারণার অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন তিনি।
২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি নিবন্ধিত হয়। কোম্পানি নিবন্ধনের ১৪ দিন আগে ২৯ আগস্ট মো. মামুন মিয়া করদাতা হিসেবে নিবন্ধন নেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর অঞ্চল-৮, সার্কেল-১৫৮-এর অধীনে এই নিবন্ধন নেওয়া হয়।
তার মূল টিআইএন নম্বর ৪১***০৯০। সনদে নাম ছিল মো. মামুন মিয়া (MD. MAMUN MEAH)। এই নামেই মিনোরি বাংলাদেশের মেমোরেন্ডাম অ্যান্ড আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনে তার নাম রেকর্ডভুক্ত হয়।
২০১৯ সাল থেকে ব্যাংকের কাগজপত্রে তিনি নিজেকে জাপানি বিনিয়োগকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। ২০২১ সালে এমারল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও ২০২২ সালের ১৫ জানুয়ারি ফু-ওয়াং ফুডস লিমিটেড অধিগ্রহণের দলিলে তিনি জাপানি ভাষায় স্বাক্ষর করেন। নাম লেখেন মিয়া মামুন (MIYA MAMUN)।
২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি নিয়মবহির্ভূতভাবে মূল টিআইএন সনদে (৪১***০৯০) নাম পরিবর্তন করে করা হয় মামুন মিয়া (MAMUN MIYA)। একই সঙ্গে বাংলাদেশি স্থায়ী ঠিকানার জায়গায় জাপানি ঠিকানা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যদিও আইন অনুযায়ী, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন ছাড়া টিআইএন সনদে নাম পরিবর্তন সম্ভব নয়।
১৮ জানুয়ারি টিআইএনে নাম পরিবর্তনের চার মাস পর ২০২২ সালের ২৫ মে ইস্যু হওয়া বাংলাদেশি পাসপোর্ট নং ইকে ***২২৩ এবং ৮ জুন ২০২২-এ ইস্যু হওয়া এনআইডি কার্ডে তার নাম আগের মো. মামুন মিয়া (MD. MAMUN MEAH) ছিল।
২০২২ সালের ৬ জুন কর অঞ্চল-৪, সার্কেল-০৬৮-এর অধীনে ৪৪***১৩২ নম্বরে আরেকটি টিআইএন সনদ নেওয়া হয়। এখানে নাম ব্যবহার করা হয় মো. মামুন মিয়া (MD. MAMUN MEAH)। স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয় গুলশানের একটি ভাড়া অফিস।
এই দ্বিতীয় টিআইএন ব্যবহার করে ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ কোটি টাকায় ‘বেঙল মিট প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর ৫০ লাখ সাধারণ শেয়ার কেনার ফরম-১১৭ পূরণ করা হয়। একই বছর তিনটি নতুন প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি নিবন্ধনেও আরজেএসসির দপ্তরে এই নম্বর ব্যবহার করা হয়।
এদিকে দ্বিতীয় টিআইএন নম্বর ৪৪***১৩২ বহাল রেখেই মামুন মিয়া (MAMUN MIYA) নাম বসিয়ে সনদের আরেকটি ক্লোন সংস্করণ তৈরি করা হয়। তার দুটি নম্বরের বিপরীতে তিনটি টিআইএন সার্টিফিকের্ট হাতে এসেছে।
এভাবে দুটি টিআইএন নম্বরের বিপরীতে ভিন্ন কয়েকটি নামে টিআইএন সার্টিফিকের্ট বানিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি বা করদাতা একই সঙ্গে একাধিক টিআইএন ব্যবহার করতে পারবেন না। আয়কর আইন অনুযায়ী এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। আয়কর আইন, ২০২৩ এবং ফৌজদারি দন্ডবিধি বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী অনূর্ধ্ব ২ থেকে ৭ বছরের কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। এবিষয়ে এনবিআরের সাবেক সদস্য, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের সাবেক প্রধান খাইরুল ইসলাম বলেন, ২০১৪ সালের আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কর দেওয়ার কারণে যদি কারও একাধিক টিআইএন তৈরি হয়ে থাকে, তবে এনবিআরের নির্দেশনা হলো অতিরিক্ত বা অব্যবহৃত টিআইএনটি দ্রুত বাতিল করতে হবে। সেক্ষত্রে করদাতাকে তার সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে উপ-কর কমিশনার বরাবর লিখিত আবেদন করতে হবে। তিনি মনে করেন সতেচনভাবে কেউ যদি একাধিক টিআইএন ব্যবহার করে থাকেন। তাহলে ধরে নিতে হবে উক্ত ব্যক্তির উদ্দেশ্য ভালো না। মূলত সম্পত্তির তথ্য গোপন কিংবা অন্য অবৈধ কাজ করার জন্যই এমনটা করে থাকেন।
মামুন মিয়ার জালিয়াতি শুধু কর বিভাগেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০১২ সাল থেকে তার তিনটি বাংলাদেশি পাসপোর্টের তথ্য মিলেছে। এগুলোর নাম্বার হলো এডি ***০৮১, বিএন ***৫৮৫ এবং ইকে***২২৩
২০২২ সালের ৮ জুন মিরপুর সেনপাড়া পর্বতার একটি ঠিকানা ব্যবহার করে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র নেন। এনআইডি নম্বর ৯৫***১৬৪ গ্রহণ করেন। সনদে নাম ছিল মো. মামুন মিয়া (MD. MAMUN MEAH)।
২০২৩ সালের ৩০ মার্চ একই এনআইডি নম্বরে নাম পরিবর্তন করে করা হয় মামুন মিয়া (MAMUN MIYA)। তারপর একই এনআইডি নম্বরে মিয়া মামুন (MIYA MAMUN) নাম বসিয়ে তৈরি করা হয় আরেকটি ক্লোন ভার্সন।

একজন মানুষের একাধিক এনআইডি কার্ড ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে কিনা। জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলেন, কোনোভাবেই একজন নাগরিকের একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকতে পারে না। এবিষয়ে কোন অভিযোগ পেলেই সাথে সাথে ব্যবস্থা নেয়া হয়। আইনুযায়ী কোনো ব্যক্তি জালিয়াতি করে বা তথ্য গোপন করে একাধিক এনআইডি তৈরি করেন, তবে সেটি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। সেক্ষেত্রে ধারা অনুযায়ী অনূর্ধ্ব ১ বছর থেকে অনূর্ধ্ব ৭বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ হাজার টাকা থেকে অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
মো. মামুন মিয়ার তিনটি ভিন্ন নামে চারটি ব্যাংকে ছয়টি ব্যাংক হিসাবের প্রমাণ এসেছে হাতে। মো. মামুন মিয়া নামে সিটি ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট (–৫০০১) ও একটি অ্যামেক্স কার্ড (–৬৬৪৮) রয়েছে তার। একই নামে অন ব্যাংকে দুইটি অ্যাকাউন্ট (—০৫২৮ ও —২২৯৯) পরিচালনা করছেন। অন্যদিকে ঢাকা ব্যাংকে মিয়া মামুন নামে অ্যাকাউন্ট (—০৪০২) রয়েছে তার। আর আল আরাফাহ ব্যাংকে হিসাব (—৪৪৮২) পরিচালনা করছেন মামুন মিয়া নামে। এসব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করতে তিনি কেওয়াইসি ফর্মে ভিন্ন ভিন্ন নামের এনআইডি ও টিআইনও জমা দিয়েছেন।

জাপানি পাসপোর্ট ও দ্বৈত নাগরিকত্ব
২০১৮ সালে বৈবাহিক সূত্রে জাপানি পাসপোর্ট লাভ করেন মামুন মিয়া। পাসপোর্ট নম্বর টিএচ***২৯৮। ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট ওই জাপানি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রাইভেট ইনভেস্টর ভিসা (এ২৩***০৮) নেন। কিন্তু অনুসন্ধান বলছে, ২০১৯ সাল থেকেই তিনি বাংলাদেশি পরিচয় আড়াল করে জাপানি বিনিয়োগকারী সেজে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ লেনদেন ও চুক্তিপত্র সম্পাদন করেছেন।
জাপানের জাতীয়তা আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে কোনো ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিকত্ব পেলে দুই বছরের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে এবং অপরটি ত্যাগ করতে বাধ্য। তবে মামুন মিয়া জাপানি পাসপোর্ট পাওয়ার পরও বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও এনআইডি ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন। অর্থাৎ একই সঙ্গে দুই দেশের আইন লঙ্ঘন করে নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন তিনি।
চেক জালিয়াতির একটি মামলায় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করে রাজধানীর বনানী থানা পুলিশ। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, জমির দলিল জালিয়াতি, প্রতারণা ও একাধিক চেক জালিয়াতির মামলা রয়েছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ২০২৫ সালের ১৭ মে গঠিত এক তদন্তে মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগের অবহেলা ও দীর্ঘসূত্রতায় এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি।
এছাড়াও বর্তমান সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে নতুন করে শেয়ারবাজারে কারসাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত জেড ক্যাটাগরির একটি কোম্পানি এমারল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আবারও কারসাজি চক্র সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোনো ধরনের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই বিগত কয়েক কার্যদিবস ধরে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ও লেনদেন অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
ডিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ২০ মে থেকে মাত্র সাত কার্যদিবসে শেয়ারের দর ১৬ দশমিক ৬০ টাকা থেকে বেড়ে গত ৪ জুন ২৪ দশমিক ৮০ টাকায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ এই স্বল্প সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারের দর বেড়েছে ৮ দশমিক ২০ টাকা বা ৪৯ দশমিক ৪০ শতাংশ।
ডিএসই-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো দৃশ্যমান ব্যবসায়িক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি বা ইতিবাচক খবর ছাড়াই এমন উল্লম্ফন ‘অস্বাভাবিক’।
এর আগে ২০২১ সালে জাপানভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে এমারল্ড অয়েল অধিগ্রহণ এবং ২০২৩ সালে জাপানি বিনিয়োগ ও জাপানে ব্রান অয়েল রপ্তানির মতো নানা চটকদার তথ্য ছড়িয়ে বড় ধরনের কারসাজি চালায় মিনোরি বাংলাদেশ।
মিনোরি বাংলাদেশের জালিয়াতি
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে বাংলাদেশি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন পায়। কোম্পানির উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুন মিয়া বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি টিআইএন, ঠিকানা, পাসপোর্ট ও ফোন নম্বর ব্যবহার করে নিবন্ধন নেন। অপর উদ্যোক্তা পরিচালক আবুল কালাম আজাদও বাংলাদেশি নাগরিক। কাজেই কাঠামোগতভাবে এই কোম্পানির সঙ্গে জাপানের কোনো পুঁজি বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিল না।
মিনোরি বাংলাদেশকে ‘জাপানি প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দেখাতে মো. মামুন মিয়া ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি এনসিসি ব্যাংকের গুলশান শাখায় একটি ব্যাংক হিসাব (হিসাব নম্বরের শেষ চার অক্ষর ২৬১২) খোলেন। অ্যাকাউন্ট খোলার ফরমে তিনি নিজের প্রকৃত নাম আড়াল করে জাপানি ভাষায় ‘মিয়া মামুন’ (MIYA MAMUN) হিসেবে স্বাক্ষর করেন।
নথি অনুযায়ী, জাপান থেকে মিনোরি বাংলাদেশের অ্যাকাউন্টে প্রথম রেমিট্যান্স আসে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি। অর্থাৎ ব্যাংক হিসাব খোলার সময় পরিশোধিত মূলধনে কোনো জাপানি বিনিয়োগ প্রদর্শনের আইনি সুযোগ ছিল না। তা সত্ত্বেও ব্যাংকের নথিতে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সংশ্লিষ্ট সব চুক্তি ও নথিতে মো. মামুন মিয়া তার প্রকৃত নাম গোপন করে জাপানি ভাষায় স্বাক্ষর করতে থাকেন।
২০২১ সালের জুনে দেশের একাধিক সংবাদপত্রে মিনোরিকে জাপানভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটির এমারল্ড অয়েল অধিগ্রহণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে মিনোরিকে একটি প্রকৃত জাপানি কোম্পানি হিসেবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালানো হয়।
ভুয়া বিনিয়োগ, জাল নথি
মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড এমারল্ড অয়েলের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ার কিনতে ৫ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করে। কিন্তু শুধু একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই (এনসিসি ব্যাংক) লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৯ ও ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৯ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিভিন্ন সিকিউরিটি হাউসে বিনিয়োগ করে। এই হিসাবে ৩ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার টাকার শেয়ার বিনিয়োগ বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে গোপন করা হয়েছে।
বিএসইসি তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে এমারল্ড অয়েলে মানি সার্কুলেশন ও বিভিন্ন জাল নথি তৈরি করে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মিনোরি পর্যায়ক্রমে মোট ৩১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার একটি ভুয়া বিনিয়োগ দেখায়। এর বিপরীতে বিএসইসি মিনোরির অনুকূলে ৩ কোটি ১৫ লাখ নতুন শেয়ার ইস্যু করে।
এই ভুয়া বিনিয়োগকে বৈধতা দিতে মিনোরির অডিট প্রতিষ্ঠান এস আর ইসলাম অ্যান্ড কোং-এর অনৈতিক সহায়তায় বানোয়াট দায়-দেনা ও শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়। অডিট রিপোর্টে ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে ১৩ কোটি ৪৮ লাখ ৯৮ হাজার ২১২ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে ২৪ কোটি ৯০ লাখ ৬৯ হাজার ৭০২ টাকা শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়েছে। বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের মধ্যে তা শেয়ার ক্যাপিটালে রূপান্তর করার কথা থাকলেও চার বছরেও তা করা হয়নি।
কাগুজে ঋণে কাল্পনিক সম্পদ
ভুয়া বিনিয়োগকে বৈধ দেখাতে মিনোরির অডিট রিপোর্টে ‘লোন ফ্রম সিস্টার কনসার্ন’ হিসাবে তিনটি কোম্পানি থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঋণ দেখানো হয়। কিন্তু ওই অর্থবছরে সেই তিনটি কোম্পানির কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
শুধু তা-ই নয়, শর্ট টার্ম লোন হিসেবে আরও ২৭টি প্রোপ্রাইটরশিপ ও তিনটি প্রাইভেট লিমিটেড ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ১ হাজার ৫৭১ টাকার বানোয়াট ঋণ দেখানো হয়েছে। এসব ঋণের স্বপক্ষে কোনো ঋণচুক্তি, ব্যাংক লেনদেন বা ঋণদাতার ট্যাক্স ডিক্লারেশন নেই। আইনিভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ দেওয়ার কোনো এখতিয়ারও নেই।
এ ছাড়া ঋণদাতা প্রোপ্রাইটরশিপ প্রতিষ্ঠান মেসার্স লাবিব করপোরেশনের মালিক মো. আফজাল হোসেন নিজেই মিনোরির শেয়ারহোল্ডিং পরিচালক ছিলেন। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও অডিট রিপোর্টে এ বিষয়ে কোনো রিলেটেড পার্টি ডিসক্লোজার দেওয়া হয়নি।
কাগজসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড মাত্র ১০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত টানা চার অর্থবছরে ব্যবসা থেকে মোট মুনাফা ছিল মাত্র ২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এই কাগজসর্বস্ব, দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানি কীভাবে এবং কাদের মদদে কথিত ‘জাপানি জায়ান্ট’ হিসেবে পরিচিতি পেল, তা জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এত সব জালিয়াতির পরেও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নাকের ডগায় বসে আবারও এমারল্ড অয়েলের শেয়ার নিয়ে মিনোরি তথা মিয়া মামুন চক্রের বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এই চক্রের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিনোরি বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুন মিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে চেষ্টা করে কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যবহৃত সাতটি দেশি ও বিদেশি নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একটি বাদে সবগুলো নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। একমাত্র সচল নম্বরটিতে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।
মোঃ মামুন হোসেন, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক 




















