সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের আশির্বাদপুষ্ট নারায়গঞ্জের ফতুল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুব আলমের কালো থাবায় সংখ্যালঘু পরিবারের পৈত্রিক জমি দখল করে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও দায়িত্ব পালনকালে ন্যায়ের পরিবর্তে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন এমন অভিযোগ সর্বত্র। নারায়ণগঞ্জ ডিবি পুলিশের ওসি থাকাকালীন সময়েই তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী একাধিক মামলার আসামিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় তিনি নিজেকে কখনো পুলিশ সুপারের ‘ক্যাশিয়ার’ পরিচয় দিয়ে নানা অনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতেন। একই সাথে কুমিল্লার সাবেক এমপি সুবিদ আলীর নাম ব্যবহার করে পুলিশ বিভাগে দাপট দেখিয়ে চালিয়েছেন অপকর্ম। এখন ভোল পাল্টে নিজেকে বিএনপি বলে দাবি করছেন।
এ ছাড়া তিনি এক বিএনপির স্থানীয় কমিটির সদস্য নাম ব্যবহার করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বিএনপির লোক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে জোর তৎপরতা শুরু করেছেন। কিন্তু ওই বিএনপির শীর্ষ নেতা বলেছেন, প্রমাণসহ অভিযোগ দিন ছাড় দেওয়া হবে না। এ বিষয় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভুক্তভগি পরিবারের সদস্যরা। ডিবির ওসি থেকে ফতুল্লা থানায় বদলি হলেও তার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি বরং আগের ধারাবাহিকতায় ডা. সোহেল নামের এক ব্যক্তির প্রভাবে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। ওসি মাহবুবের নেশা এখন দখল দারিত্ব আর টাকা। নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে তার টার্গেট এখন সংখ্যালঘুদের জমি। আর সেই সব জমিতে শুরু করবেন আবাসন ব্যবসার রাজত্ব। আর নাম নির্ধারন করেছেন মাহবুব আবাসন প্রকল্প। এমন অভিযোগ সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা লিখিত ভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ প্রধানের কাছে পৃথক অভিযোগ পত্র জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। ওসির ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেনি। যে সব সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা ৫ আগষ্টের পরে বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন তাদের সম্পদ টার্গেট করেন ওসি।
গত শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে নারায়গঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার শান্তি ধারা এলাকায় সংখ্যালঘু পরিবারের জমিতে ট্রাক দিয়ে বালু ফেলার অভিযোগ রয়েছে। ওই পরিবারে সদস্যরা প্রতিবাদ করলে তাদের ওসি মাহবুব ক্রসফায়ারের ভয় দেখান বলে স্বীকার করেন সংখ্যালঘু সদস্যরা। তারা বলেন, আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ওসি যে কোনো মুহুত্বে আমাদের বড় ধরনের বিপদে ফেলতে পারেন। অভিযোগ সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার ভূইঘর মৌজার সি.এস খতিয়ান ১৬৯ অনুযায়ী সি.এস ও এস.এ ৩৫ নং দাগের ৯১ শতাংশ জমিসহ আরো অনেক জমির মূল মালিক ছিলেন বিশ্বম্বর মন্ডল ও হলধর মন্ডল। পরবর্তীতে বিশ্বম্ভর মন্ডল ও হলধর মন্ডল তাহাদের নগদ টাকার প্রয়োজনে ১৯১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সি.এস ৩৫ দাগের পশ্চিম দিকের ৪০ শতাংশ ভূমি ৯০ টাকা মূল্য ধার্য্য করিয়া শ্রী প্রহল্লাদ চন্দ্র মন্ডল ও শ্রী অমর চাঁন মন্ডলের সাফ কবলায় বিক্রি করেন। শ্রী প্রহল্লাদ মন্ডলের নামে এস.এ ও আর.এস খতিয়ান রেকর্ড হয়। পরবর্তীতে অমর চাঁন মন্ডল আশাপূর্ণ মন্ডল ও পশুরাম মন্ডলকে ওয়ারিশ রাখিয়া মৃত্যুবরণ করেন। এবং তাহাদের নাম আর,এস রেকর্ডে লিপি হয়। অপরদিকে এস.এ ও আর.এস রেকর্ডীয় মালিক প্রহল্লাদ মন্ডল নিঃসন্তান ও বিপত্নীক অবস্থায় তাহার দুই ভ্রাতাসপুত্র আশাপূর্ন মন্ডল ও মশুরাম মন্ডলকে স্থলবর্তী ওয়ারিশ রাখিয়া মৃত্যুবরণ করেন। এ জমির ঘটনায় বাদী আশাপূর্ণ মন্ডল ও পশুরাম মন্ডল নালিশী ১৫ শতাংশ ভূমিতে নিজ নামে নামজারী করিয়া হালনাগাদ করে নিয়মিত খাজনা প্রদান করছেন। বর্তমানে বালু ভরাট করিয়া চর্তুদিকে টিনের চৌহদ্দি করে ভোগ দখলে আছেন। তবে বিবাদী রেহেনা আক্তার ও মোকবুল হোসেনের দাবি গত ২ জুন সাবকবলা দলিলে ১৫ শতাংশ জমি আব্দুর রহমান আকন্দের কাছ থেকে ক্রয় করেন। যার সাব-কবলা দলিল নং-২৬৫২।
উল্লেখ করা যায় যে মূল মালিক এবং ওয়ারিশ গণ আব্দুর রহমান আকন্দের কাছে কখনোই বিক্রি করেন নাই। সেই মর্মে কোনো প্রকার প্রমাণ পত্র দেখাতে পারেননি। বিষয়টি নারায়নগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারে নজরে আসলে তিনি বিষয়টি মিমাংশার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব দেন। এর গত বৃহস্পতিবার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কার্যলয়ে উভয়ে উপস্থিতিতে শালিশি মিমাংশা করা হয়। সেই সময় আশাপূর্ণ মন্ডল ও পশুরাম মন্ডল নালিশী জমির সকল কাগজপত্র দেখাতে পারলেও বিবাদী রেহেনা আক্তার ও মোকবুল হোসেন একটি সাব-কবলা দলিল উপস্থাপন করলেও এর পক্ষে কোন প্রমাণাদি দেখাতে ব্যার্থ হন। এমনকি জমির মূল মালিকদের ওয়ারিশ সনদ ও এর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এর ফলে বিবাদী রেহেনা আক্তার ও মোকবুল হোসেনের সাব-কবলা দলিলটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিবাদীদেও দাবিকৃত জমিটির পূর্বের মালিক শামছুল আলম ২০০০ সালের ২৪ আগষ্ট নালিশী সম্পত্তি হিসেবে জমিটির মালিক হন। কিন্তু এস, এ রেকর্ডীয় মালিক রজনী কান্ত মন্ডলের দুই পত্র যোগেশ চন্দ্র মন্ডল ও মনিন্দ্র চন্দ্র মন্ডলের নিকট হইতে শামছুল আলম জমিটির মালিক দাবি করেন যার আম মোক্তার নামা দলিল নং ৩৯৪৪।
কিন্তু আম মোক্তার নামা দলিল অনুসন্ধান করিয়া উক্ত দলিলের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এই দলিলের প্রমাণ খুজে পাওয়া যায়নি। এ বিষয় ফতুল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুব আলম বলেন, জমিতে বালু ফেলা নিয়ে আমার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। আমি কেনো দখল করতে যাবো। ডা. সোহেল দলিল সূত্রে মালিক। আমি এতোটুকো জানি। আরেক পক্ষ দাবি করছেন তাদেরও দালিল আছে। এটা নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেছি। তিনি আরো বলেন, আমি কোনো দখল করবো। আমার কি স্বার্থে আছে। আপনি আওয়ামী লীগের সময় সাবেক এমপি সুবিদ আলীর দাপট দেখিয়েছেন এখন দেখাচ্ছেন বিএনপির এক প্রভাবশালী শীর্ষ নেতার এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি কারো দাপট দেখাই না। তবে আপনি বিএনপি নেতা ছেলেকে জিজ্ঞেস করবেন আমার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক। তাহলে বুঝবেন। তাছাড়া ওই বিএনপির নেতাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। সে বলবে আমার সঙ্গে কি সম্পর্ক আছে। এমন দম্ভ করে তিনি বলেন, আমার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো সবার।
এ ব্যাপারে নারায়গঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) মো. শামীম হোসাইন বলেন, এই জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। এর সমাধান আদালত করতে পারবে। জমি বিরোধের মিমাংশা আমাদের কাজ নয়। আদালতের বিষয়। দখল দারিত্বে ফতুল্লার ওসি সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে বিষয়টি ডিআইজি ও পুলিশ সুপার স্যার খোঁজ খবর নিবে। এছাড়া তিনি বলেন, ওই বিরোধী জমিতে গত শুক্রবার রাতে বালু ফেলা হয়েছে বলে জেনেছি। এর বাইরে আমি কিছু জানি না। এ বিষয় নারায়গঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মনিরুল ইসলাম রবী বলেন, ওসি নিজেকে অনেক ক্ষমতাধর মনে করেন। তিনি গায়ের জোরে জমি দখল করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এই জমির মালিক ডা. সোহেল গং নয়। এই জমির প্রকৃত ওয়ারিশ মূলে মালিক আশাপূর্ণ মন্ডল ও পশুরাম মন্ডল।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















