সংবাদ শিরোনাম ::
ইডকলে এনামুলের বিরুদ্ধে লুটপাটের রাজত্বের অভিযোগ সওজ কর্মকর্তা শাহনুর রশিদ এখন শতকোটি টাকার মালিক জালিয়াতি করে কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ বাশার-মঞ্জুরুলের বিরুদ্ধে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের সিএন্ডএফ ক্লিয়ারিং বাণিজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দুই মাসে ৫০০ কোটি টাকা মুনাফা টিকে গ্রুপের দেশের ৯ অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়ার শঙ্কা ববিতে লাগামহীন লোডশেডিংয়ে তীব্র ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা- ব্যহত বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম  বড়লেখার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা থেকে ভারতীয় দুটি এয়ারগান জব্দ বাঘায় বিদ্যুত স্পৃষ্টে যুবক নিহত নওগাঁয় চু’রির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্বর্ণালংকার উদ্ধারসহ আ’টক-১

এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের সিএন্ডএফ ক্লিয়ারিং বাণিজ্য

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে সিএন্ডএফ (কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্ট লাইসেন্স পরীক্ষার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে। পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব, অতিরিক্ত প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করানোর অভিযোগ, মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত এবং পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজস্ব প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন বিতর্ক, কর প্রশাসনে তার ভূমিকা, সম্পদ বিবরণী এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগও আবার সামনে এসেছে।

চলতি মাসের ২৯ জুন পর্যন্ত আব্দুর রহমান খানের চাকরির মেয়াদ রয়েছে। সে অনুযায়ী অবসরের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি ১ জুন অবসরোত্তর ছুটির (এলপিআর) জন্য আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা রয়েছে, অবসরের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার আশায় তিনি বিভিন্ন মহলের প্রত্যাশা পূরণে তৎপর রয়েছেন। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রেক্ষাপটেই সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।

সিএন্ডএফ লাইসেন্স প্রদান একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এ-সংক্রান্ত বিধিমালার আওতায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা আয়োজনের দায়িত্ব এনবিআরের অধীনস্থ কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির ওপর ন্যস্ত। সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পরীক্ষার ধাপ, ফল প্রকাশ এবং মৌখিক পরীক্ষার সময়সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যানের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত সিএন্ডএফ লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষায় ২ হাজার ৫২১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে পরীক্ষার ফল মূল্যায়ন শেষে ২১০ জনকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই এনবিআর চেয়ারম্যান কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালকের কাছে ১১০ জনের একটি পৃথক তালিকা পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চেয়ারম্যান ওই তালিকাকে সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশ বলে উল্লেখ করেন এবং তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের উত্তীর্ণ করার জন্য চাপ দেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, তালিকার প্রার্থীদের উত্তীর্ণ করাতে ব্যর্থ হলে চেয়ারম্যানের নিজের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এমন বার্তাও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়। তবে পরীক্ষা কমিটি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিধিমালার বাইরে গিয়ে কাউকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর থেকেই ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া আটকে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

সিএন্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৬ অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার ফল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হয়নি। দীর্ঘদিন ফল আটকে থাকার ঘটনায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে ১ জুন ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ততদিনে প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়।

লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মৌখিক পরীক্ষা আয়োজন নিয়েও নতুন জটিলতা তৈরি হয়। বিধিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৬ জুনের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা শেষ করার নিয়ম থাকায় পরীক্ষা কমিটি গত বুধবার মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যান অসন্তোষ প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরীক্ষা কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশের ঘটনায় চেয়ারম্যান ক্ষুব্ধ হয়ে কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালকসহ পরীক্ষা কমিটির ছয় সদস্যকে বরখাস্ত করার হুমকি দেন। পরে বৃহস্পতিবার “অনিবার্য কারণ” দেখিয়ে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের আদেশ জারি করা হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় এনবিআরের চেয়ারম্যানের এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, এটি আসলে পরীক্ষা প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের একটি প্রচেষ্টা কি না। কারণ লিখিত পরীক্ষার ফল নিয়ে বিতর্কের পর মৌখিক পরীক্ষাও অনির্দিষ্টতার মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে পরীক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। গত বছর তার আয়কর রিটার্নে দেওয়া তথ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসে। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, তিনি ২০২০-২১, ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ করবর্ষের আয়কর রিটার্নে একাধিক সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন। এসব তথ্য প্রকাশের পর বিভিন্ন মহলে সম্পদের উৎস ও মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তার আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী, ঢাকার উত্তরখানে তিনি পৈতৃক সম্পত্তির অংশ পেয়েছেন। এছাড়া রাজধানীর লালমাটিয়া ও ধানমন্ডিতে তার দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি পূর্বাচলে সাড়ে পাঁচ কাঠার একটি সরকারি প্লট পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন, পৈতৃক সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তিনি সরকারি প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন এবং এ ক্ষেত্রে সব নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।

রিটার্নে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, লালমাটিয়ায় তার ১ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। বসুন্ধরা-মৌচাক এলাকায় পাঁচ কাঠা জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ২০ লাখ টাকা। পাশাপাশি ধানমন্ডির রোড ১১/এ-তে গ্যারেজ, ইন্টেরিয়র ও রেজিস্ট্রেশনসহ ২ হাজার ৩৭৫ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

এসব সম্পদের ঘোষিত মূল্য বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। তবে এসব বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা ব্যবস্থা জনসমক্ষে আসেনি। বরং আয়কর রিটার্নের তথ্য ফাঁসের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার ঘটনা নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

অন্যদিকে, আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর-সুবিধা প্রদানের ঘটনাও আব্দুর রহমান খানের দায়িত্বকালকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে সমালোচকদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের সময় আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদের দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহির ভুয়া পে-অর্ডারের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কালো টাকা সাদা করার ঘটনায় এনবিআরের কিছু কর্মকর্তা বিশেষ সুবিধা দিয়েছিলেন।

গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এনবিআর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করে। তদন্ত প্রতিবেদনে রাষ্ট্রের প্রায় ৭৫ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাবও উঠে আসে। তবে সেই ঘটনার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

এ ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে যেসব কর্মকর্তার নাম সামনে আসে, তাদের মধ্যে যুগ্ম কর কমিশনার এ কে এম শামসুজ্জামানের নাম উল্লেখযোগ্য। ঘটনার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরে তার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তুলনামূলক লঘু শাস্তি দিয়ে পুনর্বহাল করা হয়। তার বেতন গ্রেড দুই ধাপ কমিয়ে দেওয়া হলেও তিনি আবার দায়িত্বে ফিরে আসেন।

সমালোচকদের অভিযোগ, এত বড় আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রশাসনিক নমনীয়তা দেখানো হয়েছে। এর ফলে কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এনবিআরের ভেতরে ও বাইরে অনেকের মতে, গত কয়েক বছরে কর-জিডিপি অনুপাত প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি পায়নি। রাজস্ব আহরণও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এর জন্য কর ফাঁকি রোধে ব্যর্থতা, বড় করদাতাদের প্রতি নমনীয়তা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাকে দায়ী করা হয়। সমালোচকরা বলছেন, এসব ব্যর্থতার দায় থেকে চেয়ারম্যানকে পুরোপুরি মুক্ত রাখা যায় না।

সাম্প্রতিক সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষার ঘটনাও সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একটি পেশাগত লাইসেন্স পরীক্ষার মতো স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক প্রক্রিয়ায় যদি প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা পুরো রাজস্ব প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরির শেষ পর্যায়ে থাকা কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক তদবির গ্রহণ বা পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় অনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় প্রশাসনের ওপর জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে প্রশাসনিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, অবসরের পরও দায়িত্বে থাকার জন্য আব্দুর রহমান খান চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছেন। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। তবে সমালোচকদের দাবি, এমন প্রত্যাশা থেকেই তিনি বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের চাহিদা পূরণে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

আরেকটি আলোচিত অভিযোগ হলো বিদেশে অর্থ পাচার। অভিযোগ রয়েছে, আব্দুর রহমান খানের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ায় অর্থ পাচারের কিছু তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের কাছে রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা সরকারি বক্তব্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ তিনি দেশের সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রশাসনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তার কর্মকাণ্ডের প্রভাব সরাসরি রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর পড়ে।

সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষার ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় কথিত মন্ত্রীর হস্তক্ষেপের অভিযোগ আদৌ সত্য কি না। যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু একটি পরীক্ষার নয়, পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। আর যদি অভিযোগ অসত্য হয়, তাহলে সেটিও স্পষ্টভাবে তদন্তের মাধ্যমে সামনে আনা প্রয়োজন।

পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত, ফল প্রকাশে বিলম্ব, অতিরিক্ত প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করার চাপ এবং পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের ওপর হুমকির অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে বিতর্ক এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। অবসরের প্রাক্কালে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না এলে রাজস্ব প্রশাসনের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে বিতর্ক থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে তার প্রশাসনিক ভূমিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং অতীতের নানা অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এখন নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দিকে—তারা এসব অভিযোগের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং রাজস্ব প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কী উদ্যোগ গ্রহণ করে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইডকলে এনামুলের বিরুদ্ধে লুটপাটের রাজত্বের অভিযোগ

এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের সিএন্ডএফ ক্লিয়ারিং বাণিজ্য

আপডেট সময় ১২:১৮:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে সিএন্ডএফ (কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্ট লাইসেন্স পরীক্ষার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে। পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব, অতিরিক্ত প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করানোর অভিযোগ, মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত এবং পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজস্ব প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন বিতর্ক, কর প্রশাসনে তার ভূমিকা, সম্পদ বিবরণী এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগও আবার সামনে এসেছে।

চলতি মাসের ২৯ জুন পর্যন্ত আব্দুর রহমান খানের চাকরির মেয়াদ রয়েছে। সে অনুযায়ী অবসরের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি ১ জুন অবসরোত্তর ছুটির (এলপিআর) জন্য আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা রয়েছে, অবসরের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার আশায় তিনি বিভিন্ন মহলের প্রত্যাশা পূরণে তৎপর রয়েছেন। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রেক্ষাপটেই সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।

সিএন্ডএফ লাইসেন্স প্রদান একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এ-সংক্রান্ত বিধিমালার আওতায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা আয়োজনের দায়িত্ব এনবিআরের অধীনস্থ কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির ওপর ন্যস্ত। সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পরীক্ষার ধাপ, ফল প্রকাশ এবং মৌখিক পরীক্ষার সময়সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যানের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত সিএন্ডএফ লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষায় ২ হাজার ৫২১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে পরীক্ষার ফল মূল্যায়ন শেষে ২১০ জনকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই এনবিআর চেয়ারম্যান কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালকের কাছে ১১০ জনের একটি পৃথক তালিকা পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চেয়ারম্যান ওই তালিকাকে সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশ বলে উল্লেখ করেন এবং তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের উত্তীর্ণ করার জন্য চাপ দেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, তালিকার প্রার্থীদের উত্তীর্ণ করাতে ব্যর্থ হলে চেয়ারম্যানের নিজের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এমন বার্তাও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়। তবে পরীক্ষা কমিটি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিধিমালার বাইরে গিয়ে কাউকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর থেকেই ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া আটকে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

সিএন্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৬ অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার ফল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হয়নি। দীর্ঘদিন ফল আটকে থাকার ঘটনায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে ১ জুন ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ততদিনে প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়।

লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মৌখিক পরীক্ষা আয়োজন নিয়েও নতুন জটিলতা তৈরি হয়। বিধিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৬ জুনের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা শেষ করার নিয়ম থাকায় পরীক্ষা কমিটি গত বুধবার মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যান অসন্তোষ প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরীক্ষা কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশের ঘটনায় চেয়ারম্যান ক্ষুব্ধ হয়ে কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালকসহ পরীক্ষা কমিটির ছয় সদস্যকে বরখাস্ত করার হুমকি দেন। পরে বৃহস্পতিবার “অনিবার্য কারণ” দেখিয়ে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের আদেশ জারি করা হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় এনবিআরের চেয়ারম্যানের এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, এটি আসলে পরীক্ষা প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের একটি প্রচেষ্টা কি না। কারণ লিখিত পরীক্ষার ফল নিয়ে বিতর্কের পর মৌখিক পরীক্ষাও অনির্দিষ্টতার মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে পরীক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। গত বছর তার আয়কর রিটার্নে দেওয়া তথ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসে। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, তিনি ২০২০-২১, ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ করবর্ষের আয়কর রিটার্নে একাধিক সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন। এসব তথ্য প্রকাশের পর বিভিন্ন মহলে সম্পদের উৎস ও মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তার আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী, ঢাকার উত্তরখানে তিনি পৈতৃক সম্পত্তির অংশ পেয়েছেন। এছাড়া রাজধানীর লালমাটিয়া ও ধানমন্ডিতে তার দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি পূর্বাচলে সাড়ে পাঁচ কাঠার একটি সরকারি প্লট পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন, পৈতৃক সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তিনি সরকারি প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন এবং এ ক্ষেত্রে সব নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।

রিটার্নে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, লালমাটিয়ায় তার ১ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। বসুন্ধরা-মৌচাক এলাকায় পাঁচ কাঠা জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ২০ লাখ টাকা। পাশাপাশি ধানমন্ডির রোড ১১/এ-তে গ্যারেজ, ইন্টেরিয়র ও রেজিস্ট্রেশনসহ ২ হাজার ৩৭৫ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

এসব সম্পদের ঘোষিত মূল্য বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। তবে এসব বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা ব্যবস্থা জনসমক্ষে আসেনি। বরং আয়কর রিটার্নের তথ্য ফাঁসের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার ঘটনা নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

অন্যদিকে, আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর-সুবিধা প্রদানের ঘটনাও আব্দুর রহমান খানের দায়িত্বকালকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে সমালোচকদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের সময় আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদের দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহির ভুয়া পে-অর্ডারের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কালো টাকা সাদা করার ঘটনায় এনবিআরের কিছু কর্মকর্তা বিশেষ সুবিধা দিয়েছিলেন।

গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এনবিআর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করে। তদন্ত প্রতিবেদনে রাষ্ট্রের প্রায় ৭৫ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাবও উঠে আসে। তবে সেই ঘটনার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

এ ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে যেসব কর্মকর্তার নাম সামনে আসে, তাদের মধ্যে যুগ্ম কর কমিশনার এ কে এম শামসুজ্জামানের নাম উল্লেখযোগ্য। ঘটনার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরে তার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তুলনামূলক লঘু শাস্তি দিয়ে পুনর্বহাল করা হয়। তার বেতন গ্রেড দুই ধাপ কমিয়ে দেওয়া হলেও তিনি আবার দায়িত্বে ফিরে আসেন।

সমালোচকদের অভিযোগ, এত বড় আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রশাসনিক নমনীয়তা দেখানো হয়েছে। এর ফলে কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এনবিআরের ভেতরে ও বাইরে অনেকের মতে, গত কয়েক বছরে কর-জিডিপি অনুপাত প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি পায়নি। রাজস্ব আহরণও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এর জন্য কর ফাঁকি রোধে ব্যর্থতা, বড় করদাতাদের প্রতি নমনীয়তা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাকে দায়ী করা হয়। সমালোচকরা বলছেন, এসব ব্যর্থতার দায় থেকে চেয়ারম্যানকে পুরোপুরি মুক্ত রাখা যায় না।

সাম্প্রতিক সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষার ঘটনাও সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একটি পেশাগত লাইসেন্স পরীক্ষার মতো স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক প্রক্রিয়ায় যদি প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা পুরো রাজস্ব প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরির শেষ পর্যায়ে থাকা কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক তদবির গ্রহণ বা পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় অনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় প্রশাসনের ওপর জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে প্রশাসনিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, অবসরের পরও দায়িত্বে থাকার জন্য আব্দুর রহমান খান চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছেন। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। তবে সমালোচকদের দাবি, এমন প্রত্যাশা থেকেই তিনি বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের চাহিদা পূরণে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

আরেকটি আলোচিত অভিযোগ হলো বিদেশে অর্থ পাচার। অভিযোগ রয়েছে, আব্দুর রহমান খানের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ায় অর্থ পাচারের কিছু তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের কাছে রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা সরকারি বক্তব্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ তিনি দেশের সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রশাসনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তার কর্মকাণ্ডের প্রভাব সরাসরি রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর পড়ে।

সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষার ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় কথিত মন্ত্রীর হস্তক্ষেপের অভিযোগ আদৌ সত্য কি না। যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু একটি পরীক্ষার নয়, পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। আর যদি অভিযোগ অসত্য হয়, তাহলে সেটিও স্পষ্টভাবে তদন্তের মাধ্যমে সামনে আনা প্রয়োজন।

পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত, ফল প্রকাশে বিলম্ব, অতিরিক্ত প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করার চাপ এবং পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের ওপর হুমকির অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে বিতর্ক এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। অবসরের প্রাক্কালে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না এলে রাজস্ব প্রশাসনের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও আব্দুর রহমান খানকে ঘিরে বিতর্ক থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে তার প্রশাসনিক ভূমিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং অতীতের নানা অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এখন নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দিকে—তারা এসব অভিযোগের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং রাজস্ব প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কী উদ্যোগ গ্রহণ করে।