সংবাদ শিরোনাম ::
সওজ কর্মকর্তা শাহনুর রশিদ এখন শতকোটি টাকার মালিক জালিয়াতি করে কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ বাশার-মঞ্জুরুলের বিরুদ্ধে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের সিএন্ডএফ ক্লিয়ারিং বাণিজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দুই মাসে ৫০০ কোটি টাকা মুনাফা টিকে গ্রুপের দেশের ৯ অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়ার শঙ্কা ববিতে লাগামহীন লোডশেডিংয়ে তীব্র ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা- ব্যহত বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম  বড়লেখার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা থেকে ভারতীয় দুটি এয়ারগান জব্দ বাঘায় বিদ্যুত স্পৃষ্টে যুবক নিহত নওগাঁয় চু’রির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্বর্ণালংকার উদ্ধারসহ আ’টক-১ সানভিউ টাওয়ার্সের দখলবাজি: শতকোটি টাকার সরকারি জমি বেহাত

সরকারি চাকরিতে প্রক্সি সিন্ডিকেটের নেপথ্যে জনস্বাস্থ্যের আনোয়ার ও কাস্টমসের সিপাহী আজিজ!

রাষ্ট্রীয় শুল্কায়নের অন্যতম সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এই স্পর্শকাতর দপ্তরের এক ‘সিপাহী’ যখন স্বীয় পদের গরিমা ও সততার নীতিকে বিসর্জন দিয়ে অর্থলিপ্সার বশবর্তী হয়ে অন্যের পরিচয়ে অবতীর্ণ হন, তখন তা কেবল নৈতিক স্খলন নয়, বরং মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার টুঁটি চেপে ধরার এক জঘন্যতম অপপ্রয়াস। মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম (৩০) নামের এই কাস্টমস সিপাহীকে কেন্দ্র করে উন্মোচিত হয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৫-এর এক নজিরবিহীন ও সুদূরপ্রসারী জালিয়াতির খতিয়ান। কক্সবাজার জেলাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত এই সংঘবদ্ধ চক্রের অপরাধের ব্যাপ্তি ও গভীরতা কতটা জটপাকানো, তা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

​অনুসন্ধানে প্রাপ্ত দালিলিক প্রমাণাদি ও তথ্যের পরম্পরা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কক্সবাজার জেলায় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া গ্রামের আদি বাসিন্দা ও পরীক্ষার্থী আমান উল্লাহ নাহিন (যার অনুক্রমাঙ্ক বা রোল নম্বর ছিল: ৪৬২১০৬৫) স্বশরীরে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হননি। তদপরিবর্তে, পরীক্ষা কক্ষে ছদ্মবেশে ছদ্মনাম ধারণ করে ‘প্রক্সি শুটার’ হিসেবে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কোরালখালী সাহারবিল এলাকার মোজাম্মেল হকের তনয় মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম।

​সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এটি কোনো আকস্মিক বিচ্যুতি বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। অপাঙক্তেয় ও অযোগ্য প্রার্থীকে বিপুল বিত্তের বিনিময়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার বৈতরণী পার করিয়ে দেওয়ার এই সমান্তরাল প্রক্রিয়াটি ছিল সুপরিকল্পিত এবং এক অর্থলিপ্সু চক্রের নিখুঁত নীল নকশা।

উক্ত কাস্টমস সিপাহীর দুঃসাহসের এখানেই ইতি ঘটেনি। শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার জালিয়াতি সুসম্পন্ন করার অব্যবহিত পরেই, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল (শুক্রবার) তিনি পুনরায় এক সমজাতীয় জালিয়াতিতে লিপ্ত হন। ওই দিন অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) যানবাহন শাখার ‘পরিদর্শক’ পদের নিয়োগ পরীক্ষাতেও তিনি অন্য এক প্রার্থীর ছদ্মনাম ধারণ করে ‘প্রক্সি শুটার’ হিসেবে লিখিত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। কাস্টমসের মতো একটি স্পন্দনশীল শুল্ক বিভাগে বহাল থেকে, একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী কীভাবে অবলীলায় দেশজুড়ে এভাবে ছদ্মবেশ ধারণ করে মেধা লুণ্ঠন করে বেড়াচ্ছেন, তা রাষ্ট্রীয় নিরপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সততার ভিত্তিমূলকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। (এই চসিক নিয়োগ জালিয়াতি সংক্রান্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণী পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে)।

এই সুবিস্তৃত অপরাধ নেটওয়ার্কের প্রধান নিয়ন্তা বা সূত্রধর হলেন মো. আনোয়ার হোসেন। কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলার এই বাসিন্দা বর্তমানে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) মেকানিক হিসেবে আসীন। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথিপত্র সাক্ষ্য দেয়, তিনিই এই পুরো চক্রের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক বা ‘মাস্টারমাইন্ড’।

অনুসন্ধানে এই চক্রের অপরাধের স্তরভিত্তিক পরিচালনা পদ্ধতি বা মডাস অপারেন্ডি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নথিপত্র মিলেছে। মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ডাক বিভাগ, জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (DSHE), সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ১৬, ১৭ এবং ১৮তম গ্রেডের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলোকে কেন্দ্র করে এই সিন্ডিকেটের তৎপরতা আবর্তিত হয়।

​বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সমসাময়িক সময়েই এই চক্রের মাঠপর্যায়ের কুশীলবরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে কক্সবাজার জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরল অথচ দ্রুত ভাগ্য পরিবর্তনের মোহে অন্ধ উচ্চাকাঙ্ক্ষী চাকরিপ্রার্থীরা (বিশেষ করে মাদক ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত পরিবারের সদস্যরা)।

গ্রাহক শিকারের পর পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদিত হয় ৮ থেকে ১২ লাখ টাকার অংকে। পরবর্তীতে এই বিপুল অর্থের একটি লোভনীয় অংশ দ্বারা বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত মেধাবী ও বিচক্ষণ সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থীদের ‘প্রক্সি শুটার’ হিসেবে ভাড়া করা হয়। যেহেতু এই তরুণরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর বহনকারী, তাই তাদের মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত থাকে। এই মেধাবীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অযোগ্য ও মেধাশূন্য ব্যক্তিদের সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়া হতো।

সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বণ্টন করে নেন। কেউ পরীক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন, কেউ আর্থিক চুক্তি সম্পাদনে মধ্যস্থতা করেন, কেউ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘প্রক্সি শুটার’ নির্বাচন করেন, আবার কেউ পুরো প্রক্রিয়ার যোগাযোগ ও সমন্বয়ের গোপন স্তরগুলো দেখাশোনা করেন। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর স্তরভিত্তিক (layered) উপায়ে পরিচালিত হয়ে আসছে।

বছরের পর বছর ধরে দেশের মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাকে কলঙ্কিত করে এই চক্রের সদস্যরা হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। বৈধ আয়ের সাথে আকাশ-পাতাল অসঙ্গতি রেখে এই সিন্ডিকেটের হোতারা গড়ে তুলেছেন অঢেল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। তাদের দৈনন্দিন যাপিত জীবন অত্যন্ত বিলাসিতা, জাঁকজমক ও চাকচিক্যে ভরপুর।

​নীতিবহির্ভূত উপায়ে অর্জিত এই বিত্ত-বৈভবের সুনির্দিষ্ট বিবরণী, ব্যাংক হিসাবের খতিয়ান এবং বিভিন্ন স্থানে বেনামে ক্রীত জমির দলিল সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর নথিপত্র ইতিমধ্যেই হস্তগত হয়েছে, যা ধারাবাহিক প্রতিবেদনে বিস্তারিত উন্মোচন করা হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, মাত্র অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে এই অভিযুক্তদের আর্থিক অবস্থার যে চোখ ধাঁধানো এবং অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়েছে, তা স্থানীয় মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারি চাকরির সীমিত বেতনের সাথে তাদের দৃশ্যমান অঢেল সম্পদ ও রাজকীয় জীবনযাত্রার বৈপরীত্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে।

এই জালিয়াতি চক্রের আইনি পরিণতি নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, ​”অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা কেবল পরীক্ষা জালিয়াতির সাধারণ অপরাধ নয়; বরং দণ্ডবিধির আওতায় প্রতারণা, পরিচয় গোপন করে অবৈধ সুবিধা অর্জন, জালিয়াতি, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং দুর্নীতির মতো গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। প্রক্সির মাধ্যমে সরকারি চাকরি লাভের এই অপচেষ্টা রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার প্রতি সরাসরি আঘাত এবং মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার শামিল।”

​শিক্ষা ও সুশাসন-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগগুলোর ব্যাপারে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া জরুরি। অন্যথায় সরকারি চাকরির নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই ভয়াবহ জালিয়াতির বিষয়ে ডিপিএইচই-এর মেকানিক তথা সিন্ডিকেটের মূল হোতা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ​”এসব কাজ এখন আমি আর করি না। মান-সম্মান যা ছিল, তা নিউজের কারণে চলে গেছে। এখন বাকি জীবন আল্লাহ আল্লাহ করে কাটাতে চাই।”

​অন্যদিকে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সিপাহী ও প্রক্সি শুটার মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম তিনি নিজের দায় হালকা করার চেষ্টা করে বলেন, ​”আমাকে ধরে লাভ কী? আমি অল্প টাকা পাই, ছোট মানুষ। আপনি বড় ভাই আনোয়ারের সাথে কথা বলেন, তিনি সব জানেন।”

​সবশেষে এক রহস্যময় ইঙ্গিত দিয়ে আজিজুল বলেন, “আমাদেরকে না ধরে রাঘববোয়ালদের ধরেন।” তবে এই অপরাধের সাম্রাজ্যে তাদের মাথার ওপর থাকা সেই ‘রাঘববোয়াল’ আসলে কারা, সেই সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে এই ‘প্রক্সি শুটার’ আর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সওজ কর্মকর্তা শাহনুর রশিদ এখন শতকোটি টাকার মালিক

সরকারি চাকরিতে প্রক্সি সিন্ডিকেটের নেপথ্যে জনস্বাস্থ্যের আনোয়ার ও কাস্টমসের সিপাহী আজিজ!

আপডেট সময় ১২:৪৯:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

রাষ্ট্রীয় শুল্কায়নের অন্যতম সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এই স্পর্শকাতর দপ্তরের এক ‘সিপাহী’ যখন স্বীয় পদের গরিমা ও সততার নীতিকে বিসর্জন দিয়ে অর্থলিপ্সার বশবর্তী হয়ে অন্যের পরিচয়ে অবতীর্ণ হন, তখন তা কেবল নৈতিক স্খলন নয়, বরং মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার টুঁটি চেপে ধরার এক জঘন্যতম অপপ্রয়াস। মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম (৩০) নামের এই কাস্টমস সিপাহীকে কেন্দ্র করে উন্মোচিত হয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৫-এর এক নজিরবিহীন ও সুদূরপ্রসারী জালিয়াতির খতিয়ান। কক্সবাজার জেলাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত এই সংঘবদ্ধ চক্রের অপরাধের ব্যাপ্তি ও গভীরতা কতটা জটপাকানো, তা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

​অনুসন্ধানে প্রাপ্ত দালিলিক প্রমাণাদি ও তথ্যের পরম্পরা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কক্সবাজার জেলায় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া গ্রামের আদি বাসিন্দা ও পরীক্ষার্থী আমান উল্লাহ নাহিন (যার অনুক্রমাঙ্ক বা রোল নম্বর ছিল: ৪৬২১০৬৫) স্বশরীরে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হননি। তদপরিবর্তে, পরীক্ষা কক্ষে ছদ্মবেশে ছদ্মনাম ধারণ করে ‘প্রক্সি শুটার’ হিসেবে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কোরালখালী সাহারবিল এলাকার মোজাম্মেল হকের তনয় মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম।

​সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এটি কোনো আকস্মিক বিচ্যুতি বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। অপাঙক্তেয় ও অযোগ্য প্রার্থীকে বিপুল বিত্তের বিনিময়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার বৈতরণী পার করিয়ে দেওয়ার এই সমান্তরাল প্রক্রিয়াটি ছিল সুপরিকল্পিত এবং এক অর্থলিপ্সু চক্রের নিখুঁত নীল নকশা।

উক্ত কাস্টমস সিপাহীর দুঃসাহসের এখানেই ইতি ঘটেনি। শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার জালিয়াতি সুসম্পন্ন করার অব্যবহিত পরেই, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল (শুক্রবার) তিনি পুনরায় এক সমজাতীয় জালিয়াতিতে লিপ্ত হন। ওই দিন অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) যানবাহন শাখার ‘পরিদর্শক’ পদের নিয়োগ পরীক্ষাতেও তিনি অন্য এক প্রার্থীর ছদ্মনাম ধারণ করে ‘প্রক্সি শুটার’ হিসেবে লিখিত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। কাস্টমসের মতো একটি স্পন্দনশীল শুল্ক বিভাগে বহাল থেকে, একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী কীভাবে অবলীলায় দেশজুড়ে এভাবে ছদ্মবেশ ধারণ করে মেধা লুণ্ঠন করে বেড়াচ্ছেন, তা রাষ্ট্রীয় নিরপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সততার ভিত্তিমূলকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। (এই চসিক নিয়োগ জালিয়াতি সংক্রান্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণী পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে)।

এই সুবিস্তৃত অপরাধ নেটওয়ার্কের প্রধান নিয়ন্তা বা সূত্রধর হলেন মো. আনোয়ার হোসেন। কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলার এই বাসিন্দা বর্তমানে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) মেকানিক হিসেবে আসীন। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথিপত্র সাক্ষ্য দেয়, তিনিই এই পুরো চক্রের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক বা ‘মাস্টারমাইন্ড’।

অনুসন্ধানে এই চক্রের অপরাধের স্তরভিত্তিক পরিচালনা পদ্ধতি বা মডাস অপারেন্ডি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নথিপত্র মিলেছে। মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ডাক বিভাগ, জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (DSHE), সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ১৬, ১৭ এবং ১৮তম গ্রেডের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলোকে কেন্দ্র করে এই সিন্ডিকেটের তৎপরতা আবর্তিত হয়।

​বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সমসাময়িক সময়েই এই চক্রের মাঠপর্যায়ের কুশীলবরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে কক্সবাজার জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরল অথচ দ্রুত ভাগ্য পরিবর্তনের মোহে অন্ধ উচ্চাকাঙ্ক্ষী চাকরিপ্রার্থীরা (বিশেষ করে মাদক ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত পরিবারের সদস্যরা)।

গ্রাহক শিকারের পর পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদিত হয় ৮ থেকে ১২ লাখ টাকার অংকে। পরবর্তীতে এই বিপুল অর্থের একটি লোভনীয় অংশ দ্বারা বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত মেধাবী ও বিচক্ষণ সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থীদের ‘প্রক্সি শুটার’ হিসেবে ভাড়া করা হয়। যেহেতু এই তরুণরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর বহনকারী, তাই তাদের মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত থাকে। এই মেধাবীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অযোগ্য ও মেধাশূন্য ব্যক্তিদের সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়া হতো।

সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বণ্টন করে নেন। কেউ পরীক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন, কেউ আর্থিক চুক্তি সম্পাদনে মধ্যস্থতা করেন, কেউ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘প্রক্সি শুটার’ নির্বাচন করেন, আবার কেউ পুরো প্রক্রিয়ার যোগাযোগ ও সমন্বয়ের গোপন স্তরগুলো দেখাশোনা করেন। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর স্তরভিত্তিক (layered) উপায়ে পরিচালিত হয়ে আসছে।

বছরের পর বছর ধরে দেশের মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাকে কলঙ্কিত করে এই চক্রের সদস্যরা হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। বৈধ আয়ের সাথে আকাশ-পাতাল অসঙ্গতি রেখে এই সিন্ডিকেটের হোতারা গড়ে তুলেছেন অঢেল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। তাদের দৈনন্দিন যাপিত জীবন অত্যন্ত বিলাসিতা, জাঁকজমক ও চাকচিক্যে ভরপুর।

​নীতিবহির্ভূত উপায়ে অর্জিত এই বিত্ত-বৈভবের সুনির্দিষ্ট বিবরণী, ব্যাংক হিসাবের খতিয়ান এবং বিভিন্ন স্থানে বেনামে ক্রীত জমির দলিল সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর নথিপত্র ইতিমধ্যেই হস্তগত হয়েছে, যা ধারাবাহিক প্রতিবেদনে বিস্তারিত উন্মোচন করা হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, মাত্র অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে এই অভিযুক্তদের আর্থিক অবস্থার যে চোখ ধাঁধানো এবং অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়েছে, তা স্থানীয় মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারি চাকরির সীমিত বেতনের সাথে তাদের দৃশ্যমান অঢেল সম্পদ ও রাজকীয় জীবনযাত্রার বৈপরীত্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে।

এই জালিয়াতি চক্রের আইনি পরিণতি নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, ​”অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা কেবল পরীক্ষা জালিয়াতির সাধারণ অপরাধ নয়; বরং দণ্ডবিধির আওতায় প্রতারণা, পরিচয় গোপন করে অবৈধ সুবিধা অর্জন, জালিয়াতি, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং দুর্নীতির মতো গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। প্রক্সির মাধ্যমে সরকারি চাকরি লাভের এই অপচেষ্টা রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার প্রতি সরাসরি আঘাত এবং মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার শামিল।”

​শিক্ষা ও সুশাসন-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগগুলোর ব্যাপারে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া জরুরি। অন্যথায় সরকারি চাকরির নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই ভয়াবহ জালিয়াতির বিষয়ে ডিপিএইচই-এর মেকানিক তথা সিন্ডিকেটের মূল হোতা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ​”এসব কাজ এখন আমি আর করি না। মান-সম্মান যা ছিল, তা নিউজের কারণে চলে গেছে। এখন বাকি জীবন আল্লাহ আল্লাহ করে কাটাতে চাই।”

​অন্যদিকে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সিপাহী ও প্রক্সি শুটার মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম তিনি নিজের দায় হালকা করার চেষ্টা করে বলেন, ​”আমাকে ধরে লাভ কী? আমি অল্প টাকা পাই, ছোট মানুষ। আপনি বড় ভাই আনোয়ারের সাথে কথা বলেন, তিনি সব জানেন।”

​সবশেষে এক রহস্যময় ইঙ্গিত দিয়ে আজিজুল বলেন, “আমাদেরকে না ধরে রাঘববোয়ালদের ধরেন।” তবে এই অপরাধের সাম্রাজ্যে তাদের মাথার ওপর থাকা সেই ‘রাঘববোয়াল’ আসলে কারা, সেই সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে এই ‘প্রক্সি শুটার’ আর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।