সংবাদ শিরোনাম ::
অ্যাভিয়েশন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ ব্রিটিশ সরকারের ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করলো আমিরাত বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ বর্তমান সংসদের কোনো সদস্য ঋণখেলাপি নন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ নীলফামারীতে পার্টনার কংগ্রেস অনুষ্ঠিত, সম্মাননা দেয়া হলো তিনটি স্কুলকে আত্রাইয়ে ৫০ জাতের দেশীয় ফলের প্রদর্শনী নিয়ে ব্যতিক্রমী ফল উৎসব অনুষ্ঠিত নি’হ’ত নন্দিনীর বাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ছুটে গেলেন ত্রাণমন্ত্রী ঝালকাঠি পৌর প্রশাসক ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী খেলায় ৯নং ওয়ার্ডের জয় কালিহাতীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

নরসিংদী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কোটি কোটি টাকা লোপাট ১জন বরখাস্ত হলেও পদোন্নতি বাগিয়ে জেলা রেজিস্ট্রার সাব্বির

নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ভুয়া যোগফলের অভিনব কৌশলে সরকারি রাজস্বের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার নীহার রঞ্জন বিশ্বাসকে চূড়ান্তভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

দুদকের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, ২০২১ সালের ১১ মাসে এই কর্মকর্তা এককভাবে ২ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার ৯৮২ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।

মামলার এজাহার ও অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদনকালে উৎসে কর, স্থানীয় সরকার কর, রেজিস্ট্রেশন ফি ও স্ট্যাম্প ডিউটি ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব আদায় করা হতো। দিনভিত্তিক পৃথক রেজিস্টারে এগুলো লিপিবদ্ধও করা হতো।

কিন্তু দিনশেষে ফি বইয়ে আদায়কৃত অর্থের প্রকৃত যোগফল কৌশলে কম দেখিয়ে ব্যাংকে কম টাকা জমা দেওয়া হতো। ‘যোগ-বিয়োগের’ এই অভিনব জালিয়াতির মাধ্যমে ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১১ মাসেই ২ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার ৯৮২ টাকা আত্মসাৎ করেন বরিশালের উজিরপুরের বাসিন্দা নীহার রঞ্জন।

মাসভিত্তিক আত্মসাতের খতিয়ান:
দুদকের অনুসন্ধানে নীহার রঞ্জনের মাসভিত্তিক অর্থ আত্মসাতের যে চিত্র উঠে এসেছে তা নিম্নরূপ:

জানুয়ারি: ২০ লাখ ১৪ হাজার ৩৭৯ টাকা

ফেব্রুয়ারি: ২৫ লাখ ৫৫ হাজার ১৫২ টাকা

মার্চ: ২৭ লাখ ৭ হাজার ৫৪৩ টাকা

এপ্রিল: ১৩ লাখ ৮ হাজার ৭৫০ টাকা

মে: ১৭ লাখ ৪৭ Bound ৮২৫ টাকা

জুন: ৪৯ লাখ ৮৬ হাজার ৫৫০ টাকা

জুলাই: ১৫ লাখ ৩৯ …৪১০ টাকা

আগস্ট: ৩০ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৯ টাকা

সেপ্টেম্বর: ৩০ লাখ ৯৯ হাজার ৮২২ টাকা

অক্টোবর: ৩০ লাখ ৩৪…৫৮৮ টাকা

নভেম্বর: ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭৪ টাকা

২০২২ সালের ২৩ আগস্ট একটি অনলাইন পত্রিকায় ‘যোগ-বিয়োগের কারসাজিতে কোটি কোটি টাকা লোপাট!’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এর আগে ২০২১ সালের ৩০ মার্চ দুদকের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে একটি এনফোর্সমেন্ট টিম ওই কার্যালয়ে আকস্মিক অভিযান চালায়।

পরবর্তীতে দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ দুদকের গাজীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক মো. সাইদুজ্জামান বাদী হয়ে নীহার রঞ্জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা দায়ের করেন। তবে এই জালিয়াতির সাথে অফিসের নকলনবিশ শফিকুল ইসলামসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও অলৌকিকভাবে শফিকুলকে মামলার আসামি করা হয়নি।

দুর্নীতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় প্রথমে নীহার রঞ্জনকে সাময়িক বরখাস্ত করে নিবন্ধন অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে ‘০১/২০২২’ নম্বর বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (PSC) পরামর্শ অনুযায়ী, ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর বিধি ৪/৩ (ঘ) মোতাবেক আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ারের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়।

৩ কোটিতে বরখাস্ত, ৪ কোটিতে পদোন্নতি! জনমনে ক্ষোভ
এদিকে এই একই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নরসিংদী সদর অফিসের আরেক সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার সাব্বির আহমেদ একই কায়দায় প্রায় ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তাকে পুরস্কৃত করে জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতি দিয়ে ঝিনাইদহে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেওয়া হয়েছে।

এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন— ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করলে চাকরি থেকে বরখাস্ত, আর ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করলে কি পদোন্নতি ও পুরস্কার মেলে?” তদন্তের এই দ্বিমুখী নীতি নিয়ে খোদ সংশ্লিষ্ট দপ্তরেই চাপা গুঞ্জন চলছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অ্যাভিয়েশন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ ব্রিটিশ সরকারের

নরসিংদী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কোটি কোটি টাকা লোপাট ১জন বরখাস্ত হলেও পদোন্নতি বাগিয়ে জেলা রেজিস্ট্রার সাব্বির

আপডেট সময় ০৪:০৮:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ভুয়া যোগফলের অভিনব কৌশলে সরকারি রাজস্বের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার নীহার রঞ্জন বিশ্বাসকে চূড়ান্তভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

দুদকের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, ২০২১ সালের ১১ মাসে এই কর্মকর্তা এককভাবে ২ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার ৯৮২ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।

মামলার এজাহার ও অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদনকালে উৎসে কর, স্থানীয় সরকার কর, রেজিস্ট্রেশন ফি ও স্ট্যাম্প ডিউটি ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব আদায় করা হতো। দিনভিত্তিক পৃথক রেজিস্টারে এগুলো লিপিবদ্ধও করা হতো।

কিন্তু দিনশেষে ফি বইয়ে আদায়কৃত অর্থের প্রকৃত যোগফল কৌশলে কম দেখিয়ে ব্যাংকে কম টাকা জমা দেওয়া হতো। ‘যোগ-বিয়োগের’ এই অভিনব জালিয়াতির মাধ্যমে ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১১ মাসেই ২ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার ৯৮২ টাকা আত্মসাৎ করেন বরিশালের উজিরপুরের বাসিন্দা নীহার রঞ্জন।

মাসভিত্তিক আত্মসাতের খতিয়ান:
দুদকের অনুসন্ধানে নীহার রঞ্জনের মাসভিত্তিক অর্থ আত্মসাতের যে চিত্র উঠে এসেছে তা নিম্নরূপ:

জানুয়ারি: ২০ লাখ ১৪ হাজার ৩৭৯ টাকা

ফেব্রুয়ারি: ২৫ লাখ ৫৫ হাজার ১৫২ টাকা

মার্চ: ২৭ লাখ ৭ হাজার ৫৪৩ টাকা

এপ্রিল: ১৩ লাখ ৮ হাজার ৭৫০ টাকা

মে: ১৭ লাখ ৪৭ Bound ৮২৫ টাকা

জুন: ৪৯ লাখ ৮৬ হাজার ৫৫০ টাকা

জুলাই: ১৫ লাখ ৩৯ …৪১০ টাকা

আগস্ট: ৩০ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৯ টাকা

সেপ্টেম্বর: ৩০ লাখ ৯৯ হাজার ৮২২ টাকা

অক্টোবর: ৩০ লাখ ৩৪…৫৮৮ টাকা

নভেম্বর: ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭৪ টাকা

২০২২ সালের ২৩ আগস্ট একটি অনলাইন পত্রিকায় ‘যোগ-বিয়োগের কারসাজিতে কোটি কোটি টাকা লোপাট!’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এর আগে ২০২১ সালের ৩০ মার্চ দুদকের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে একটি এনফোর্সমেন্ট টিম ওই কার্যালয়ে আকস্মিক অভিযান চালায়।

পরবর্তীতে দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ দুদকের গাজীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক মো. সাইদুজ্জামান বাদী হয়ে নীহার রঞ্জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা দায়ের করেন। তবে এই জালিয়াতির সাথে অফিসের নকলনবিশ শফিকুল ইসলামসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও অলৌকিকভাবে শফিকুলকে মামলার আসামি করা হয়নি।

দুর্নীতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় প্রথমে নীহার রঞ্জনকে সাময়িক বরখাস্ত করে নিবন্ধন অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে ‘০১/২০২২’ নম্বর বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (PSC) পরামর্শ অনুযায়ী, ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর বিধি ৪/৩ (ঘ) মোতাবেক আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ারের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়।

৩ কোটিতে বরখাস্ত, ৪ কোটিতে পদোন্নতি! জনমনে ক্ষোভ
এদিকে এই একই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নরসিংদী সদর অফিসের আরেক সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার সাব্বির আহমেদ একই কায়দায় প্রায় ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তাকে পুরস্কৃত করে জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতি দিয়ে ঝিনাইদহে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেওয়া হয়েছে।

এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন— ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করলে চাকরি থেকে বরখাস্ত, আর ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করলে কি পদোন্নতি ও পুরস্কার মেলে?” তদন্তের এই দ্বিমুখী নীতি নিয়ে খোদ সংশ্লিষ্ট দপ্তরেই চাপা গুঞ্জন চলছে।