“আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ”
এখন করোনাকাল। তখন ১৯৭১ সালে ১০ বৎসর বয়স। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। আমার সবকিছু বেশ পরিষ্কার মনে আছে। ৭০ সালে নির্বাচন। এলাকায় মিছিল হতো। হাটের দিন বাজারের বটতলা মাইক লাগিয়ে ছাত্ররা ভোট চাইতেন। ভোটের দিন বাড়ির ভোটাররা একসাথে ভোট দিতে যায়। চরগোবিন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র। মা’র আঁচল ধরে ভোট দেখতে যাই। ভোটে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। বাবা-চাচাদের ফিসফিস কথায় বুঝা যেত দেশে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। ৭১ সালের মার্চের শেষে পাক সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর হামলা করে। দেশকে স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।
স্কুল বন্ধ। গ্রামের ছেলেমেয়েরা একসাথে খেলাধূলা করি। আমরা বাঁশ দিয়ে বন্দুক বানিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করি। লাইন ধরে মিছিল করি। আমি শ্লোগান ধরি। অন্যরা আমার সাথে শ্লোগান ধরে। বীর বাঙালি অস্ত্র ধর / বাংলাদেশ স্বাধীন কর। তোমার আমার ঠিকানা / পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। — ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস মিছিল ও যুদ্ধ ছিল আমাদের প্রধান খেলা।
আমাদের এলাকা জোনাইল তখন প্রত্যন্ত অঞ্চল। নাটোর থেকে লক্ষ্মীকুল হয়ে গুরুদাসপুর পাকা রাস্তা। এ রাস্তায় মিলিটারি চলাচল করে। পাবনার চাটমোহরে মিলিটারি ক্যাম্প ছিল। জোনাইল মাঝখানে। উভয় ক্ষেত্রে দুরত্ব প্রায় ৬ মাইল। যোগাযোগ ব্যবস্হা অত্যন্ত খারাপ। এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে পাক বাহিনী আসেনি। আমাদের বাড়িতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা থাকতেন। তাদের কাছে বন্দুক ও গ্রেনেড ছিল। আমি বন্দুক ও গ্রেনেড ধরে নাড়াচাড়া করে দেখতাম। আমাদের বাড়িতে রেডিও ছিল। পাড়ার মানুষ সন্ধ্যায় খবর শুনতে আসেন। চরমপত্র ছিল প্রধান আকর্ষন। মানুষ রেডিওতে মধুমালা নাটক শুনতেন।
লক্ষ্মীকুল এবং চাটমোহরের বাবার পরিচিত কয়েকটি হিন্দু পরিবার আমাদের বাড়িতে অবস্থান নিয়ে ছিল। মিলিটারি আসার গুজবে পাড়ার হিন্দু পরিবার আমাদের বাড়িতে চলে আসে। যুদ্ধের শুরুতে ফাদার ক্যান্টন ইটালি ছিলেন। ছুটি শেষ না করেই তিনি মানুষকে রক্ষার জন্য এলাকায় ছুটে আসেন। একদিন শুনলাম মিলিটারি আসার খবর পেয়ে ফাদার মোটর সাইকেল নিয়ে লক্ষ্মীকুল চলে গেছেন। মিলিটারি প্রধানের সাথে কথা বলেছেন। জোনাইলে যেন মিলিটারি না আসে। ফাদার ক্যান্টন সক্রিয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন। অনেক হিন্দু পরিবার মিশনে আশ্রয় নেয়। তখন এলাকায় শুধু ফাদারের মোটর সাইকেল দেখেছি।
জোনাইলের বড় হাট। মঙ্গলবার ও শনিবার হাটের দিন। একদিন বাবা, জেঠা ও রবাট দাদার সাথে হাটে গিয়েছি। হাটে গুজব রটে, মিলিটারি আসছে। তখন হাটের লোকজন যে যেভাবে পারে ছুটাছুটি করে চলে যায়। আমরা ছুটে বাড়ি চলে আসি। তখন মানুষ বর্ষাকালে খেয়ানৌকায় নদী পার হতো। হাটে বড় বড় নৌকা আসতো। প্রায় হাটে এমন গুজব উঠতো । একদল দুষ্ট লোক পরিকল্পিত ভাবে এ ধরনের গুজব ছড়াতো। তখন হাটের দিন বিভিন্ন জায়গায় কেনাবেচা হতে দেখেছি।
একদিন সুবু কাকা ও বড়দাকে দেখি বাঁশের লাঠি হাতে ব্রিজ ভাঙতে যাবে। মা সকালে তাড়াতাড়ি গরম ভাত রেঁধে দেয়। তেবাড়িয়া ব্রিজ। বাড়ি থেকে ২০/২৫ মাইল দূর। এলাকার যুবকেরা লাঠি হাতে হেটে রওনা দিয়েছে। তারপর দেখছি সবাই ফিরে আসছে। শুনলাম আদগ্রাম থেকে ফাদার ও নেতারা তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে। কারণ তা বাস্তব সম্মত ছিল না। যুবকরা মারা যেতে পারে। এলাকায় মিলিটারি এসে ক্ষতি করতে পারে। আমাদের জোনাইলে কখনো পাক মিলিটারি আসে নাই। তাই তখন মিলিটারি দেখার সুযোগ হয়নি।
এভাবে ১৬ ডিসেম্বর চলে আসে। বিজয় দিবস। মিলিটারি বা পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। দেশ স্বাধীন হয়। বাজারে বিজয় উৎসব। বাড়ির সবার সাথে বাজারে যাই। অনেক মানুষ। কাউন্সিল ঘরের কাছে হাটে একটা বড় খেজুর গাছ ছিল। খেজুর গাছের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা লাইন করে দাঁড়ানো। সবার কাদে বন্দুক। রায় পরিবারের মুক্তিযোদ্ধা চার ভাইকে পাশাপাশি দাঁড়নো দেখেছি। মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের বরণ করে নিচ্ছে। আনন্দ করছে। বিজয়ের আনন্দ। তখন ১১ বৎসর বয়স। অটোপ্রমোশন নিয়ে ১৯৭২ সালে চতুর্থ শ্রেণীতে উঠেছি। স্কুলে নিয়মিত ক্লাস শুরু হয়ে গেছে।
এস এম আয়নুল হক রাজশাহী ব্যুরো 



















