সংবাদ শিরোনাম ::
আগস্টে ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চালু হচ্ছে: রেলমন্ত্রী কুলির চরিত্রে পর্দায় ফিরছেন ওমর সানী প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে উসকানির আভাস পাচ্ছি : রিজভী গ্যালারিতে বসে দেশসেরা খুদে ফুটবলারদের খেলা দেখছেন প্রধানমন্ত্রী নওগাঁ টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন কমিশন গঠন সভা অনুষ্ঠিত মুকসুদপুরে জাল নোট প্রচলন প্রতিরোধে জন সচেতনতা বৃদ্ধিমুলক ওয়ার্কসপ কিশোর নিবিরের প্রেমের বিয়ে, ৮ মাস পর রহস্যজনক মৃত্যু  কোটালীপাড়ায় নিবন্ধিত জেলেদের মাঝে বকনা বাছুর বিতরণ দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির চট্টগ্রাম ব্যুরো চিফ মুরাদকে অব্যাহতি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে গঙ্গাচড়ায় হাজারো মানুষের মানববন্ধন

গংগাচড়ায় স্কুল মাঠে গাছ লাগিয়ে খেলাধুলা বন্ধের অভিযোগ।ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের মনিরাম দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠটি একসময় ছিল বিকেলের প্রাণকেন্দ্র।
স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজলেই মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত শিশু-কিশোরদের দৌড়ঝাঁপ, তরুণদের ফুটবল-ক্রিকেট আর প্রাণখোলা হাসির শব্দ। সেই মাঠ আজ নীরব। সবুজ ঘাসের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে গাছের সারি, আর ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে একটি প্রজন্মের প্রাণচাঞ্চল্য।
অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যালয়ের একমাত্র খেলার মাঠে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগিয়ে খেলাধুলা কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি এলাকার শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের জীবনে। স্থানীয়দের আশঙ্কা—খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ কমে যাওয়ায় তরুণদের একটি অংশ ঝুঁকে পড়ছে মাদক, অনলাইন জুয়া ও নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দিকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯৯৩ সালে এলাকার সচেতন ও শিক্ষানুরাগী মানুষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মনিরাম দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়। উদ্দেশ্য ছিল শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, বরং একটি মানবিক, সুস্থ ও সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলা। সেই বিদ্যালয়ের মাঠই ছিল আশপাশের সাত-আটটি গ্রামের তরুণদের একমাত্র খেলাধুলার ভরসা।
বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন,
“মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শৈশব, বন্ধুত্ব আর সুস্থ সংস্কৃতি।”
তাদের অভিযোগ, মাঠে আগের মতো খেলাধুলা চালুর দাবিতে একাধিকবার প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলা হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে কথা বলায় মামলার ভয় দেখানো হয়েছে বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে তিনি মাঠে লাগানো চারা গাছ সরিয়ে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই নির্দেশনার পরও মাঠ এখনও পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি। মাঠের বিভিন্ন স্থানে এখনও গাছ রয়ে গেছে।
এদিকে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের নানা অব্যবস্থাপনার কথাও তুলে ধরেছেন। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী—
দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ইংরেজি ক্লাস হয় না, ভোকেশনাল শাখায় ব্যবহারিক ক্লাসের পর্যাপ্ত উপকরণ নেই, টয়লেট ব্যবস্থাপনা দুর্বল, শিক্ষার্থীদের নিজ খরচে মার্কার কিনতে হয়, এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো টিনশেড ভবন নিয়েও নেই কার্যকর উদ্যোগ। এছাড়া জাতীয় দিবস পালন ও নিয়মিত সমাবেশ আয়োজন নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হিসেবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, স্কুলগেট তালাবদ্ধ থাকলেও মাঠে সবজি চাষ, তামাক শুকানো এবং গরু-ছাগল চরানোর দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। অথচ খেলাধুলার ক্ষেত্রেই কড়াকড়ি।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান শয়ন বলেন,
“একসময় এই মাঠ ছিল আমাদের স্বপ্নের জায়গা। এখানে খেলতে খেলতেই বড় হয়েছি। এখন মাঠ না থাকায় অনেক ছোট ভাই খারাপ সঙ্গ আর মোবাইল আসক্তির দিকে চলে যাচ্ছে। এটা শুধু মাঠের সংকট নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংকট।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল বাশার বলেন,
“ইউএনও স্যার মাঠ পরিদর্শন করেছেন। তিনি যে নির্দেশনা দেবেন, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রংপুর বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সদস্য ও যমুনা টেলিভিশন⁠�–এর সিনিয়র রিপোর্টার মাজহার মান্নান বলেন,
“খেলাধুলা শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি সুস্থ সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। মাঠ হারালে তরুণদের মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।”
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. আরিফ মাহফুজ জানিয়েছেন,
“বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সরেজমিনে গিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন,
“বিদ্যালয়ের মাঠে খেলাধুলা ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে মাঠটি খেলাধুলার উপযোগী রাখতে বলা হয়েছে।”
এলাকার সচেতন মহলের মতে,
একটি বিদ্যালয় শুধু ফলাফল তৈরি করে না, তৈরি করে মানুষ। আর সেই মানুষ গড়ে ওঠার অন্যতম জায়গা হলো খেলার মাঠ। কারণ মাঠে জন্ম নেয় শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিকতা।
তাদের দাবি—
একটি প্রজন্মকে বাঁচাতে মাঠ ফিরিয়ে দেওয়া হোক শিক্ষার্থীদের কাছে।
Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আগস্টে ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চালু হচ্ছে: রেলমন্ত্রী

গংগাচড়ায় স্কুল মাঠে গাছ লাগিয়ে খেলাধুলা বন্ধের অভিযোগ।ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ

আপডেট সময় ১২:২৮:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের মনিরাম দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠটি একসময় ছিল বিকেলের প্রাণকেন্দ্র।
স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজলেই মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত শিশু-কিশোরদের দৌড়ঝাঁপ, তরুণদের ফুটবল-ক্রিকেট আর প্রাণখোলা হাসির শব্দ। সেই মাঠ আজ নীরব। সবুজ ঘাসের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে গাছের সারি, আর ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে একটি প্রজন্মের প্রাণচাঞ্চল্য।
অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যালয়ের একমাত্র খেলার মাঠে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগিয়ে খেলাধুলা কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি এলাকার শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের জীবনে। স্থানীয়দের আশঙ্কা—খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ কমে যাওয়ায় তরুণদের একটি অংশ ঝুঁকে পড়ছে মাদক, অনলাইন জুয়া ও নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দিকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯৯৩ সালে এলাকার সচেতন ও শিক্ষানুরাগী মানুষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মনিরাম দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়। উদ্দেশ্য ছিল শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, বরং একটি মানবিক, সুস্থ ও সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলা। সেই বিদ্যালয়ের মাঠই ছিল আশপাশের সাত-আটটি গ্রামের তরুণদের একমাত্র খেলাধুলার ভরসা।
বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন,
“মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শৈশব, বন্ধুত্ব আর সুস্থ সংস্কৃতি।”
তাদের অভিযোগ, মাঠে আগের মতো খেলাধুলা চালুর দাবিতে একাধিকবার প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলা হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে কথা বলায় মামলার ভয় দেখানো হয়েছে বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে তিনি মাঠে লাগানো চারা গাছ সরিয়ে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই নির্দেশনার পরও মাঠ এখনও পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি। মাঠের বিভিন্ন স্থানে এখনও গাছ রয়ে গেছে।
এদিকে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের নানা অব্যবস্থাপনার কথাও তুলে ধরেছেন। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী—
দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ইংরেজি ক্লাস হয় না, ভোকেশনাল শাখায় ব্যবহারিক ক্লাসের পর্যাপ্ত উপকরণ নেই, টয়লেট ব্যবস্থাপনা দুর্বল, শিক্ষার্থীদের নিজ খরচে মার্কার কিনতে হয়, এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো টিনশেড ভবন নিয়েও নেই কার্যকর উদ্যোগ। এছাড়া জাতীয় দিবস পালন ও নিয়মিত সমাবেশ আয়োজন নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হিসেবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, স্কুলগেট তালাবদ্ধ থাকলেও মাঠে সবজি চাষ, তামাক শুকানো এবং গরু-ছাগল চরানোর দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। অথচ খেলাধুলার ক্ষেত্রেই কড়াকড়ি।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান শয়ন বলেন,
“একসময় এই মাঠ ছিল আমাদের স্বপ্নের জায়গা। এখানে খেলতে খেলতেই বড় হয়েছি। এখন মাঠ না থাকায় অনেক ছোট ভাই খারাপ সঙ্গ আর মোবাইল আসক্তির দিকে চলে যাচ্ছে। এটা শুধু মাঠের সংকট নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংকট।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল বাশার বলেন,
“ইউএনও স্যার মাঠ পরিদর্শন করেছেন। তিনি যে নির্দেশনা দেবেন, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রংপুর বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সদস্য ও যমুনা টেলিভিশন⁠�–এর সিনিয়র রিপোর্টার মাজহার মান্নান বলেন,
“খেলাধুলা শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি সুস্থ সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। মাঠ হারালে তরুণদের মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।”
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. আরিফ মাহফুজ জানিয়েছেন,
“বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সরেজমিনে গিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন,
“বিদ্যালয়ের মাঠে খেলাধুলা ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে মাঠটি খেলাধুলার উপযোগী রাখতে বলা হয়েছে।”
এলাকার সচেতন মহলের মতে,
একটি বিদ্যালয় শুধু ফলাফল তৈরি করে না, তৈরি করে মানুষ। আর সেই মানুষ গড়ে ওঠার অন্যতম জায়গা হলো খেলার মাঠ। কারণ মাঠে জন্ম নেয় শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিকতা।
তাদের দাবি—
একটি প্রজন্মকে বাঁচাতে মাঠ ফিরিয়ে দেওয়া হোক শিক্ষার্থীদের কাছে।