ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারকারী এক কর্মকর্তাকে ঘিরে এখন তীব্র আলোচনা, অসন্তোষ ও অভিযোগের বিস্তার ঘটেছে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (এইচআর) মোহাম্মদ হাসনাত চৌধুরী। ডিপিডিসির ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সুবিধাভোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন, যার প্রভাব এখনো বহাল রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করার সুযোগ কাজে লাগিয়ে হাসনাত চৌধুরী প্রশাসনিক, আর্থিক ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি এবং প্রকল্প বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে নিয়মের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব ও আর্থিক লেনদেন বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, হাসনাত চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যারা ডিএসএস ও সিএসএস ঠিকাদার নিয়োগে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এতে করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেও অনেককে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে, অথচ নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দিলে দ্রুত সংযোগ পাওয়া গেছে। এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীদের একটি চক্র সক্রিয় ছিল, যারা সরাসরি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ সম্পন্ন করত।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো তথাকথিত ‘বদলি-বাণিজ্য’। ডিপিডিসির ভেতরে এটি একটি অনানুষ্ঠানিক কিন্তু প্রভাবশালী প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, কে কোন জোনে বা কোন পদে থাকবেন—এই সিদ্ধান্তগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে নয়, বরং অর্থ লেনদেনের ওপর নির্ভর করত। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন হাসনাত চৌধুরী এবং তার ঘনিষ্ঠজনরা।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত ‘বিকাশ রানা’র নাম। ডিপিডিসির অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন একই পদে বহাল থাকা এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করতেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বদলি-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম থেকে প্রাপ্ত অর্থ এসব অ্যাকাউন্টে জমা হতো।
অভিযোগ রয়েছে, হাসনাত চৌধুরীর টেবিলে বা ই-নথি ব্যবস্থায় ফাইল আটকে রাখা একটি নিয়মিত ঘটনা ছিল। কোনো ফাইল অনুমোদনের জন্য অযৌক্তিক বিলম্ব সৃষ্টি করা হতো এবং সেই বিলম্ব কাটাতে সংশ্লিষ্টদের অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ দিতে হতো। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয় এবং সেবা গ্রহণকারীরা ভোগান্তিতে পড়েন।
একজন কর্মকর্তা বলেন, “তার টেবিলে ফাইল গেলে সেটার গতি নির্ভর করে লেনদেনের ওপর। টাকা না থাকলে ফাইল পড়ে থাকে, আর টাকা থাকলে দ্রুত অনুমোদন হয়।” যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি, তবুও অভ্যন্তরীণভাবে এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ডিপিডিসির ভেতরের অনেকেই মনে করেন, এই প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, অতীতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি। কয়েকজন নির্বাহী পরিচালক ও ডিজিএম তার ঘনিষ্ঠজনদের বদলি করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এক ধরনের ‘অদৃশ্য ক্ষমতা কাঠামো’ তৈরি হয়, যা আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামোকেও ছাপিয়ে যায়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তার অবস্থান। অভিযোগ রয়েছে, অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে তিনি এখন নতুন ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে করে যারা প্রকৃতপক্ষে বঞ্চিত ও নির্যাতিত ছিলেন, তারা আবারও প্রান্তিক হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
ডিপিডিসির ভেতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই ধরনের সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিলম্ব, প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা এবং সেবার মানের অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহিতার অভাব থাকলে এই ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার উত্থান ঘটে। তখন নিয়ম-কানুনের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব ও সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়।
বর্তমানে ডিপিডিসির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, অতীতের সব অভিযোগ যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং প্রতিষ্ঠানটিকে একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনা হোক।
সব মিলিয়ে, মোহাম্মদ হাসনাত চৌধুরীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন ডিপিডিসির ভেতরে একটি বড় সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই কেবল এই সংকটের সমাধান সম্ভব—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদ শিরোনাম ::
ডিপিডিসিতে আওয়ামী দোসর মোহাম্মদ হাসনাত চৌধুরীর সিন্ডিকেট
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১২:৫৭:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬
- ৬০৪ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















