ঢাকা ০৬:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দক্ষিণ লেবানন খালি করার নির্দেশ জারি ইসরায়েলের তারিক সিদ্দিকীর দুই সহযোগী তৃতীয় দফায় ৩ দিনের রিমান্ডে বৈরি আবহাওয়ায় সমুদ্র উত্তাল, জেলেদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ মাসুদের পরকিয়া প্রেমের বলি হয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে দশটি পরিবার । হত্যা, ধর্ষণ,সন্ত্রাস যার নিত্য দিনের কাজ। খুলনা প্রেসক্লাবে বহিরাগতদের হামলার প্রতিবাদে কয়রায় মানববন্ধন ডাকাতির সময় ডাকাতের গুলিতে আরেক ডাকাত নিহত মাথা নত করবে না হিজবুল্লাহ, সংঘাত নিরসনে নাইম কাশেমের ৫ দাবি বগুড়ায় খেজুরের গুদামে আগুন, নিয়ন্ত্রণে দুটি ইউনিট মেয়ের বিয়ের আগের দিন স্ত্রীকে মেরে ফেললেন স্বামী বড়লেখায় পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র সিটিজেন ডিপোজিট স্কিম বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ডিজি নেয়াজুর রহমানের যুক্তরাজ্যে সম্পদের পাহাড়

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস অনুবিভাগের কমিশনার মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমানের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ।
সূত্রমতে, মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান এখন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) মহাপরিচালক (ডিজি)। এর আগে তিনি ঢাকা উত্তর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। তার সন্তান ও স্ত্রী থাকেন যুক্তরাজ্যে। সেখানে তিনটি বাড়িসহ নেয়াজুর রহমান গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। দেশে নয়, ঘুষ নেন যুক্তরাজ্য ও দুবাইয়ে।
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিমের ‘খাস লোক’ হিসেবে পরিচিত মোহম্মদ নেয়াজুর। কাস্টমস গোয়েন্দার অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও মোংলা কাস্টম হাউসের কমিশনার থাকাবস্থায় কোটি কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে তিনি লন্ডনে পাচার করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানাগেছে।
২০২৩ সালের ২০ জুলাই মোংলা কাস্টম হাউস থেকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা উত্তরে নেয়াজুরকে বদলি করা হয়। মূলত মোংলা কাস্টম হাউসে কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর তাকে বাঁচিয়ে দিতে উত্তর কমিশনারেটে বদলি করেন এনবিআরের তৎকালীন চেয়ারম্যান রহমাতুল মুনিম।
নেয়াজুর যেখানে বদলি হতেন, সেখানে বড় প্রতিষ্ঠানের তালিকা করতেন। পরে ওসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারণে-অকারণে যোগাযোগ করতেন। পণ্য আটক করেই শুরু করতেন ঘুষের লেনদেন। চাহিদামতো ঘুষ না দিলে শুরু হতো হয়রানি। বিশেষ করে ভ্যাট কমিশনারেটে এই হয়রানি চলত। আর কথায় মিললে তার কয়েকজন এজেন্টের নাম ও মোবাইল নম্বর দিতেন, যারা দুবাই বা লন্ডনে নেয়াজুরের পরিবারের কাছে ডলার পৌঁছে দিতেন।
নেয়াজুরকে ঘুষ নিতে সহযোগিতা করতেন কমিশনারেটের একজন ইউডি, কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, দুইজন রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন উপ-কমিশনার। ঘুষ বিষয়ক ‘এই কমিটির’ মিটিং হতো কখনও ঢাকার উত্তরার রেস্টুরেন্টে, কখনও গাজীপুরের রিসোর্টে।
মোংলা কাস্টম হাউসেও নেয়াজুরের ছিল সিন্ডিকেট। সেই সিন্ডিকেটে কর্মকর্তা ছাড়াও কয়েকজন সিএন্ডএফ এজেন্ট ছিলেন। কর্মকর্তা ও সিএন্ডএফের সদস্যরা কখনও ঢাকায়, কখনও লন্ডনে বিভিন্ন মাধ্যমে নেয়াজুরের পরিবারের কাছে ঘুষের টাকা পৌঁছে দিতেন।
মোংলা কাস্টম হাউস থেকে কামানো ঘুষের টাকা দিয়ে লন্ডনে বাড়ি কিনতে ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ অক্টোবর নেয়াজুর ছুটি নিয়ে লন্ডনে যান। বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেছেন কর বিভাগে তারই একজন ঘনিষ্ঠ দুর্নীতিবাজ, যার স্ত্রী ও সন্তানও লন্ডনে আছেন।
জানাগেছে, ঘুষের টাকা নেয়াজুর রহমান দেশে রাখেননি। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে তা লন্ডনে নিয়ে গেছেন। মূলত টাকা রাখার মেশিন হিসেবে ব্যবহার করতে সন্তানদের পড়ালেখার নামে লন্ডনে নিয়ে গেছেন নেয়াজুর। অবাধে ঘুষ খাওয়া নেয়াজুর কেবল কাস্টমসে ঘুষের টাকা দিয়ে লন্ডনে তিনটি বাড়ি করেছেন। এ ছাড়া লন্ডনের ব্যাংকে জমা হয়েছে তার বিপুল টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এত কড়াকড়ির মধ্যেও অন্তত ১০টি বড় প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন তিনি। তবে ওই টাকা দুবাইতে ব্যবসায়ীরা পৌঁছে দিয়েছেন, যা লন্ডনে এরইমধ্যে পাচার হয়ে গেছে।
কমিশনার নেয়াজুরের ব্রিটিশ পাসপোর্ট আছে। সিলেট ভ্যাট কমিশনারেটে থাকাবস্থায় এক লন্ডন প্রবাসীর মাধ্যমে এই পাসপোর্ট নিয়েছেন নেয়াজুর। ওই প্রবাসীর আত্মীয়-স্বজনকে ভ্যাট ফাঁকিতে সুবিধা দিয়ে প্রবাসীর আস্থাভাজন হন তিনি। পরে কাস্টমস গোয়েন্দার অতিরিক্ত মহাপরিচালক থাকাবস্থায় সিলেট বিমানবন্দর দিয়ে দুবাই ও লন্ডন থেকে স্বর্ণ চোরাচালানে প্রবাসী ও তাদের আত্মীয়দের সহযোগিতা করেছেন নেয়াজুর। চোরাচালানের সেই টাকা দেশে নয়, নেয়াজুরের সন্তান ও পরিবারের কাছে লন্ডনে পৌঁছে দিতেন ওই প্রবাসী। শুধু সিলেট নয়, চট্টগ্রাম ও ঢাকার দুই বিমানবন্দর দিয়েও চোরাচালানে সিন্ডিকেট ছিল তার। আর চোরাচালান থেকে পাওয়া টাকা নেয়াজুর দেশে নিতেন না। ডলার হিসেবে তার পরিবারের কাছে লন্ডনে পৌঁছে দেওয়া হতো।
ডলার ঘুষ নেন বিধায় নেয়াজুরকে ব্যবসায়ীরা ‘ডলার নেয়াজুর’ নামে চেনেন। স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট থেকে বাংলাদেশি টাকায় অন্তত ১০০ কোটি টাকা নিয়েছেন নেয়াজুর। সরকার পরিবর্তনের পর ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের মালিক দিলীপ আগারওয়ালকে গ্রেফতারের পর নেয়াজুর দেশ থেকে পালাতে চেয়েছেন। কারণ স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের নাম ফাঁস করে দেবেন আগারওয়াল, সেই ভয়ে ছিলেন নেয়াজুর। সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগী কারা, কে, কোন দেশে চোরাচালানের টাকা পাঠান, তা জানতেন আগারওয়াল। এতে নেয়াজুরের নাম চলে আসবে। সে জন্য তিনি ব্রিটিশ পাসপোর্ট দিয়ে দেশ থেকে পালাতে চেয়েছিলেন। তবে সরকারের কড়াকড়ির কারণে পালাতে পারেননি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়ন করেছেন তিনি।
সিলেট ভ্যাট কমিশনারেটে থাকাবস্থায় এলসি স্টেশন দিয়ে চোরাই পণ্যের বাজার খুলে বসেন নেয়াজুর। কোনো ধরনের শুল্ককর দেওয়া ছাড়াই কেবল ‘ডলার’ ঘুষের বিনিময়ে নেয়াজুরের অনুসারী কর্মকর্তারা চোরাই পণ্য ভারত থেকে বাংলাদেশে পার করে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পাথর বোঝাই প্রতি ট্রাক থেকে নেয়াজুরকে ঘুষ দিতে হতো। এলসি স্টেশন দিয়ে আমদানি হওয়া ফলের ওজন কারসাজি করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ নিতেন নেয়াজুর। এছাড়া জিরাসহ বেশ কিছু পণ্য ভারত থেকে সিলেটের এলসি স্টেশন দিয়ে আমদানি হতো। কিন্তু নেয়াজুরকে ঘুষ না দিলে সেই জিরার ওপর বেশি কর আরোপ করা হতো। সিলেট শহরের বড় দোকান, শো-রুম থেকে প্রতিমাসে মোটা অংকের ঘুষ নিতেন তিনি। না দিলে বড় মামলা দিয়ে হয়রানি করা হতো। সিলেটে থাকাবস্থায় বিমানবন্দরকে স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে চোরাচালানীরা বেছে নেয়। তাদের সহযোগিতা করেন নেয়াজুর।
মোংলা কাস্টম হাউসে গাড়ি ও কসমেটিকস ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শত কোটি টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। মোংলা কাস্টম হাউসে সবচেয়ে বেশি নিলাম হয় গাড়ির। সবচেয়ে বেশি গাড়ি আমদানি হয় মোংলা দিয়ে। কয়েকজন অসাধু গাড়ি ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা নেয়াজুরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কোটি কোটি টাকার গাড়ি নামমাত্র মূল্যে নিলাম ডেকে নিয়েছেন। এতে লাভবান হয়েছেন নেয়াজুর। কয়েকজন কসমেটিকস আমদানিকারক মূল্য কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ কসমেটিকস ভর্তি কনটেইনার খালাস করে নিয়ে গেছেন। এতে নেয়াজুর তাদের কাছ থেকে পেয়েছেন কোটি কোটি টাকা। প্রতিটি নিলামে নেয়াজুরকে টাকা না দিলে সেই নিলাম বাতিল করা হতো।
নিলাম নিয়ে নেয়াজুর মোংলা কাস্টম হাউসে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। শেষে এক প্রভাবশালী এমপি শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর মোংলা থেকে তাকে সরিয়ে দেন তখনকার এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিম।
এনবিআরের প্রথম সচিব থাকাবস্থায় ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে পদোন্নতি নেন নেয়াজুর। দুর্নীতি ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে যুগ্ম কমিশনার থাকাবস্থায় তাকে এনবিআরে বদলি করা হয়। পরে এনবিআরের এক প্রভাবশালী ও দুর্নীতিবাজ সদস্যের সহযোগিতায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পার পেয়ে যান। সেই সদস্যের মাধ্যমে সে সময়ের চেয়ারম্যানকে ঘুষ দিয়েছেন নেয়াজুর। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নেয়াজুর চলতি দায়িত্ব থেকে কমিশনার হিসেবে পদোন্নতি পান।
উল্লেখ্য, মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পড়ালেখা করেছেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। ২০০৩ সালের ২৯ মে সহকারী কমিশনার (শুল্ক ও আবগারি) পদে যোগদান করেন নেয়াজুর রহমান। তিনি বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তা।
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান এর বক্তব্য জানার জন্যে চেষ্টা করেও তার টেলিফোনে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দক্ষিণ লেবানন খালি করার নির্দেশ জারি ইসরায়েলের

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ডিজি নেয়াজুর রহমানের যুক্তরাজ্যে সম্পদের পাহাড়

আপডেট সময় ০২:৪৫:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস অনুবিভাগের কমিশনার মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমানের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ।
সূত্রমতে, মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান এখন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) মহাপরিচালক (ডিজি)। এর আগে তিনি ঢাকা উত্তর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। তার সন্তান ও স্ত্রী থাকেন যুক্তরাজ্যে। সেখানে তিনটি বাড়িসহ নেয়াজুর রহমান গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। দেশে নয়, ঘুষ নেন যুক্তরাজ্য ও দুবাইয়ে।
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিমের ‘খাস লোক’ হিসেবে পরিচিত মোহম্মদ নেয়াজুর। কাস্টমস গোয়েন্দার অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও মোংলা কাস্টম হাউসের কমিশনার থাকাবস্থায় কোটি কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে তিনি লন্ডনে পাচার করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানাগেছে।
২০২৩ সালের ২০ জুলাই মোংলা কাস্টম হাউস থেকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা উত্তরে নেয়াজুরকে বদলি করা হয়। মূলত মোংলা কাস্টম হাউসে কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর তাকে বাঁচিয়ে দিতে উত্তর কমিশনারেটে বদলি করেন এনবিআরের তৎকালীন চেয়ারম্যান রহমাতুল মুনিম।
নেয়াজুর যেখানে বদলি হতেন, সেখানে বড় প্রতিষ্ঠানের তালিকা করতেন। পরে ওসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারণে-অকারণে যোগাযোগ করতেন। পণ্য আটক করেই শুরু করতেন ঘুষের লেনদেন। চাহিদামতো ঘুষ না দিলে শুরু হতো হয়রানি। বিশেষ করে ভ্যাট কমিশনারেটে এই হয়রানি চলত। আর কথায় মিললে তার কয়েকজন এজেন্টের নাম ও মোবাইল নম্বর দিতেন, যারা দুবাই বা লন্ডনে নেয়াজুরের পরিবারের কাছে ডলার পৌঁছে দিতেন।
নেয়াজুরকে ঘুষ নিতে সহযোগিতা করতেন কমিশনারেটের একজন ইউডি, কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, দুইজন রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন উপ-কমিশনার। ঘুষ বিষয়ক ‘এই কমিটির’ মিটিং হতো কখনও ঢাকার উত্তরার রেস্টুরেন্টে, কখনও গাজীপুরের রিসোর্টে।
মোংলা কাস্টম হাউসেও নেয়াজুরের ছিল সিন্ডিকেট। সেই সিন্ডিকেটে কর্মকর্তা ছাড়াও কয়েকজন সিএন্ডএফ এজেন্ট ছিলেন। কর্মকর্তা ও সিএন্ডএফের সদস্যরা কখনও ঢাকায়, কখনও লন্ডনে বিভিন্ন মাধ্যমে নেয়াজুরের পরিবারের কাছে ঘুষের টাকা পৌঁছে দিতেন।
মোংলা কাস্টম হাউস থেকে কামানো ঘুষের টাকা দিয়ে লন্ডনে বাড়ি কিনতে ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ অক্টোবর নেয়াজুর ছুটি নিয়ে লন্ডনে যান। বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেছেন কর বিভাগে তারই একজন ঘনিষ্ঠ দুর্নীতিবাজ, যার স্ত্রী ও সন্তানও লন্ডনে আছেন।
জানাগেছে, ঘুষের টাকা নেয়াজুর রহমান দেশে রাখেননি। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে তা লন্ডনে নিয়ে গেছেন। মূলত টাকা রাখার মেশিন হিসেবে ব্যবহার করতে সন্তানদের পড়ালেখার নামে লন্ডনে নিয়ে গেছেন নেয়াজুর। অবাধে ঘুষ খাওয়া নেয়াজুর কেবল কাস্টমসে ঘুষের টাকা দিয়ে লন্ডনে তিনটি বাড়ি করেছেন। এ ছাড়া লন্ডনের ব্যাংকে জমা হয়েছে তার বিপুল টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এত কড়াকড়ির মধ্যেও অন্তত ১০টি বড় প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন তিনি। তবে ওই টাকা দুবাইতে ব্যবসায়ীরা পৌঁছে দিয়েছেন, যা লন্ডনে এরইমধ্যে পাচার হয়ে গেছে।
কমিশনার নেয়াজুরের ব্রিটিশ পাসপোর্ট আছে। সিলেট ভ্যাট কমিশনারেটে থাকাবস্থায় এক লন্ডন প্রবাসীর মাধ্যমে এই পাসপোর্ট নিয়েছেন নেয়াজুর। ওই প্রবাসীর আত্মীয়-স্বজনকে ভ্যাট ফাঁকিতে সুবিধা দিয়ে প্রবাসীর আস্থাভাজন হন তিনি। পরে কাস্টমস গোয়েন্দার অতিরিক্ত মহাপরিচালক থাকাবস্থায় সিলেট বিমানবন্দর দিয়ে দুবাই ও লন্ডন থেকে স্বর্ণ চোরাচালানে প্রবাসী ও তাদের আত্মীয়দের সহযোগিতা করেছেন নেয়াজুর। চোরাচালানের সেই টাকা দেশে নয়, নেয়াজুরের সন্তান ও পরিবারের কাছে লন্ডনে পৌঁছে দিতেন ওই প্রবাসী। শুধু সিলেট নয়, চট্টগ্রাম ও ঢাকার দুই বিমানবন্দর দিয়েও চোরাচালানে সিন্ডিকেট ছিল তার। আর চোরাচালান থেকে পাওয়া টাকা নেয়াজুর দেশে নিতেন না। ডলার হিসেবে তার পরিবারের কাছে লন্ডনে পৌঁছে দেওয়া হতো।
ডলার ঘুষ নেন বিধায় নেয়াজুরকে ব্যবসায়ীরা ‘ডলার নেয়াজুর’ নামে চেনেন। স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট থেকে বাংলাদেশি টাকায় অন্তত ১০০ কোটি টাকা নিয়েছেন নেয়াজুর। সরকার পরিবর্তনের পর ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের মালিক দিলীপ আগারওয়ালকে গ্রেফতারের পর নেয়াজুর দেশ থেকে পালাতে চেয়েছেন। কারণ স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের নাম ফাঁস করে দেবেন আগারওয়াল, সেই ভয়ে ছিলেন নেয়াজুর। সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগী কারা, কে, কোন দেশে চোরাচালানের টাকা পাঠান, তা জানতেন আগারওয়াল। এতে নেয়াজুরের নাম চলে আসবে। সে জন্য তিনি ব্রিটিশ পাসপোর্ট দিয়ে দেশ থেকে পালাতে চেয়েছিলেন। তবে সরকারের কড়াকড়ির কারণে পালাতে পারেননি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়ন করেছেন তিনি।
সিলেট ভ্যাট কমিশনারেটে থাকাবস্থায় এলসি স্টেশন দিয়ে চোরাই পণ্যের বাজার খুলে বসেন নেয়াজুর। কোনো ধরনের শুল্ককর দেওয়া ছাড়াই কেবল ‘ডলার’ ঘুষের বিনিময়ে নেয়াজুরের অনুসারী কর্মকর্তারা চোরাই পণ্য ভারত থেকে বাংলাদেশে পার করে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পাথর বোঝাই প্রতি ট্রাক থেকে নেয়াজুরকে ঘুষ দিতে হতো। এলসি স্টেশন দিয়ে আমদানি হওয়া ফলের ওজন কারসাজি করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ নিতেন নেয়াজুর। এছাড়া জিরাসহ বেশ কিছু পণ্য ভারত থেকে সিলেটের এলসি স্টেশন দিয়ে আমদানি হতো। কিন্তু নেয়াজুরকে ঘুষ না দিলে সেই জিরার ওপর বেশি কর আরোপ করা হতো। সিলেট শহরের বড় দোকান, শো-রুম থেকে প্রতিমাসে মোটা অংকের ঘুষ নিতেন তিনি। না দিলে বড় মামলা দিয়ে হয়রানি করা হতো। সিলেটে থাকাবস্থায় বিমানবন্দরকে স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে চোরাচালানীরা বেছে নেয়। তাদের সহযোগিতা করেন নেয়াজুর।
মোংলা কাস্টম হাউসে গাড়ি ও কসমেটিকস ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শত কোটি টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। মোংলা কাস্টম হাউসে সবচেয়ে বেশি নিলাম হয় গাড়ির। সবচেয়ে বেশি গাড়ি আমদানি হয় মোংলা দিয়ে। কয়েকজন অসাধু গাড়ি ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা নেয়াজুরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কোটি কোটি টাকার গাড়ি নামমাত্র মূল্যে নিলাম ডেকে নিয়েছেন। এতে লাভবান হয়েছেন নেয়াজুর। কয়েকজন কসমেটিকস আমদানিকারক মূল্য কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ কসমেটিকস ভর্তি কনটেইনার খালাস করে নিয়ে গেছেন। এতে নেয়াজুর তাদের কাছ থেকে পেয়েছেন কোটি কোটি টাকা। প্রতিটি নিলামে নেয়াজুরকে টাকা না দিলে সেই নিলাম বাতিল করা হতো।
নিলাম নিয়ে নেয়াজুর মোংলা কাস্টম হাউসে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। শেষে এক প্রভাবশালী এমপি শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর মোংলা থেকে তাকে সরিয়ে দেন তখনকার এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিম।
এনবিআরের প্রথম সচিব থাকাবস্থায় ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে পদোন্নতি নেন নেয়াজুর। দুর্নীতি ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে যুগ্ম কমিশনার থাকাবস্থায় তাকে এনবিআরে বদলি করা হয়। পরে এনবিআরের এক প্রভাবশালী ও দুর্নীতিবাজ সদস্যের সহযোগিতায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পার পেয়ে যান। সেই সদস্যের মাধ্যমে সে সময়ের চেয়ারম্যানকে ঘুষ দিয়েছেন নেয়াজুর। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নেয়াজুর চলতি দায়িত্ব থেকে কমিশনার হিসেবে পদোন্নতি পান।
উল্লেখ্য, মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পড়ালেখা করেছেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। ২০০৩ সালের ২৯ মে সহকারী কমিশনার (শুল্ক ও আবগারি) পদে যোগদান করেন নেয়াজুর রহমান। তিনি বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তা।
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান এর বক্তব্য জানার জন্যে চেষ্টা করেও তার টেলিফোনে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।