বিজয়-২৪ হলে লাগামহীন সাইকেল চুরি, প্রশ্নের মুখে বেরোবি প্রশাসন

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বিজয়-২৪ হলে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঘটছে সাইকেল চুরির ঘটনা। শুধু আবাসিক হলেই নয়, একাডেমিক ভবন ও অন্যান্য হলগুলোতেও চুরির ঘটনা বাড়ছে। তবে এসব চুরির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
গত সপ্তাহে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের ইসলামের সাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে। এর আগের সপ্তাহে আরেকটি সাইকেল চুরি হয়েছিল। সিসিটিভি ফুটেজে চোর শনাক্ত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল) আবারও সাইকেল চুরির ঘটনা ঘটেছে।
এবার ভুক্তভোগী ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী রেহানুল ইসলাম রনি। তিনি বলেন, গতকাল রাত ৯টায় আমি সাইকেল এনে তালা দিয়ে রাখি। সকাল ৮টায় গিয়ে দেখি সাইকেল নেই। অভিযোগ জানাতে হল অফিসে সকাল ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করি, কিন্তু কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে পাইনি। প্রভোস্ট স্যারকে একাধিকবার ফোন দিয়েছি, কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি।
সম্প্রতি কবি হেয়াত মামুদ ভবনের নিচতলা থেকে একটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন চুরি হয়। এছাড়া ঈদের ছুটির মধ্যে শহীদ মুখতার ইলাহী হল থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি নেটওয়ার্ক সুইচ চুরির ঘটনা ঘটে। ঈদের ছুটির পর ছেলেদের দুই আবাসিক হল থেকেও সাইকেল চুরির ঘটনা সামনে আসে।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন চুরির ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে এক কর্মচারীকে শনাক্ত করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাকে সাধারণ ক্ষমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে শহীদ মুখতার ইলাহী হলের চুরির ঘটনায় নিরাপত্তা প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলা ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সম্প্রতি ওই হলের সব নিরাপত্তা প্রহরীকে বদলি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শহীদ মুখতার ইলাহী হলের সুইচ চুরির তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, গত ১৬ মার্চ রাত পৌনে ১০টার দিকে হলের ইন্টারনেট সংযোগ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আবাসিক শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিরাপত্তা প্রহরীদের জানালে পরদিন আইসিটি সেলের টেকনিশিয়ান এসে দেখেন, দ্বিতীয় তলার সংযোগ বক্স থেকে একটি সুইচ চুরি হয়েছে। ঘটনার পরদিন সন্ধ্যায় হলের নিচতলার ১০২ নম্বর কক্ষের সামনে একটি পুরোনো লুঙ্গিতে মোড়ানো অবস্থায় সুইচটি উদ্ধার করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্বে থাকলেও কয়েকজন নিরাপত্তা প্রহরী নির্ধারিত স্থানে ছিলেন না। বিশেষ করে মো. শাহিন বেগ ডিউটির অনেক আগে হলে প্রবেশ করে বিভিন্ন তলায় ঘোরাঘুরি করছিলেন। অন্যদিকে মো. আব্দুর রাজ্জাক দায়িত্বের সময় অনুপস্থিত ছিলেন। প্রহরীদের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ভিডিও ফুটেজের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি ঘটনার সময় হলের প্রধান ফটকও অরক্ষিত ছিল।
তদন্ত কমিটি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার কারণে মো. শাহিন বেগ ও মো. আব্দুর রাজ্জাককে অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে দক্ষ নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, উন্নত মানের সিসিটিভি স্থাপন এবং ইন্টারনেট বক্সে নিরাপদ লকিং সিস্টেম নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।
যথাসময়ে হলে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয়-২৪ হলের সেকশন অফিসার মো. আতিকুজ্জামান সুমন বলেন, আমি তো অফিসে এসেছি, কিন্তু এখন নাই।
বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট মো. আমির শরিফ বলেন, আমি ইতোমধ্যে বিষয়টি খোঁজ নিয়েছি। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের জন্য বলা হয়েছে। এর আগে দুটি সাইকেল হারানোর ঘটনায় নিরাপত্তা প্রহরীদের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। এখন প্রতিনিয়ত এভাবে চুরি হওয়া আমাদের জন্য অ্যালার্মিং। এবার আমরা চুরি রোধে আরও কঠোর হব।
সিসিটিভি ফুটেজে চোরকে দেখা গেলেও কেনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, এভাবে অনেককেই দেখা যায় কিন্তু তাদের খুঁজে বের করা তো মুশকিল। আর এরা তোমাদের অর্থাৎ আবাসিক শিক্ষার্থীদের মতই তরুণ যার ফলে নিরাপত্তা প্রহরীও বুঝতে পারে না। শিক্ষার্থী না বহিরাগত।
হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাসময়ে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে ছিলেন, তবে নিজেদের রুমে ছিলেন না। তারা সম্ভবত নিরাপত্তা প্রহরীদের রুমে গিয়েছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না
Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিজয়-২৪ হলে লাগামহীন সাইকেল চুরি, প্রশ্নের মুখে বেরোবি প্রশাসন

আপডেট সময় ০১:০৫:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বিজয়-২৪ হলে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঘটছে সাইকেল চুরির ঘটনা। শুধু আবাসিক হলেই নয়, একাডেমিক ভবন ও অন্যান্য হলগুলোতেও চুরির ঘটনা বাড়ছে। তবে এসব চুরির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
গত সপ্তাহে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের ইসলামের সাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে। এর আগের সপ্তাহে আরেকটি সাইকেল চুরি হয়েছিল। সিসিটিভি ফুটেজে চোর শনাক্ত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল) আবারও সাইকেল চুরির ঘটনা ঘটেছে।
এবার ভুক্তভোগী ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী রেহানুল ইসলাম রনি। তিনি বলেন, গতকাল রাত ৯টায় আমি সাইকেল এনে তালা দিয়ে রাখি। সকাল ৮টায় গিয়ে দেখি সাইকেল নেই। অভিযোগ জানাতে হল অফিসে সকাল ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করি, কিন্তু কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে পাইনি। প্রভোস্ট স্যারকে একাধিকবার ফোন দিয়েছি, কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি।
সম্প্রতি কবি হেয়াত মামুদ ভবনের নিচতলা থেকে একটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন চুরি হয়। এছাড়া ঈদের ছুটির মধ্যে শহীদ মুখতার ইলাহী হল থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি নেটওয়ার্ক সুইচ চুরির ঘটনা ঘটে। ঈদের ছুটির পর ছেলেদের দুই আবাসিক হল থেকেও সাইকেল চুরির ঘটনা সামনে আসে।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন চুরির ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে এক কর্মচারীকে শনাক্ত করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাকে সাধারণ ক্ষমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে শহীদ মুখতার ইলাহী হলের চুরির ঘটনায় নিরাপত্তা প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলা ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সম্প্রতি ওই হলের সব নিরাপত্তা প্রহরীকে বদলি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শহীদ মুখতার ইলাহী হলের সুইচ চুরির তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, গত ১৬ মার্চ রাত পৌনে ১০টার দিকে হলের ইন্টারনেট সংযোগ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আবাসিক শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিরাপত্তা প্রহরীদের জানালে পরদিন আইসিটি সেলের টেকনিশিয়ান এসে দেখেন, দ্বিতীয় তলার সংযোগ বক্স থেকে একটি সুইচ চুরি হয়েছে। ঘটনার পরদিন সন্ধ্যায় হলের নিচতলার ১০২ নম্বর কক্ষের সামনে একটি পুরোনো লুঙ্গিতে মোড়ানো অবস্থায় সুইচটি উদ্ধার করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্বে থাকলেও কয়েকজন নিরাপত্তা প্রহরী নির্ধারিত স্থানে ছিলেন না। বিশেষ করে মো. শাহিন বেগ ডিউটির অনেক আগে হলে প্রবেশ করে বিভিন্ন তলায় ঘোরাঘুরি করছিলেন। অন্যদিকে মো. আব্দুর রাজ্জাক দায়িত্বের সময় অনুপস্থিত ছিলেন। প্রহরীদের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ভিডিও ফুটেজের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি ঘটনার সময় হলের প্রধান ফটকও অরক্ষিত ছিল।
তদন্ত কমিটি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার কারণে মো. শাহিন বেগ ও মো. আব্দুর রাজ্জাককে অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে দক্ষ নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, উন্নত মানের সিসিটিভি স্থাপন এবং ইন্টারনেট বক্সে নিরাপদ লকিং সিস্টেম নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।
যথাসময়ে হলে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয়-২৪ হলের সেকশন অফিসার মো. আতিকুজ্জামান সুমন বলেন, আমি তো অফিসে এসেছি, কিন্তু এখন নাই।
বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট মো. আমির শরিফ বলেন, আমি ইতোমধ্যে বিষয়টি খোঁজ নিয়েছি। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের জন্য বলা হয়েছে। এর আগে দুটি সাইকেল হারানোর ঘটনায় নিরাপত্তা প্রহরীদের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। এখন প্রতিনিয়ত এভাবে চুরি হওয়া আমাদের জন্য অ্যালার্মিং। এবার আমরা চুরি রোধে আরও কঠোর হব।
সিসিটিভি ফুটেজে চোরকে দেখা গেলেও কেনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, এভাবে অনেককেই দেখা যায় কিন্তু তাদের খুঁজে বের করা তো মুশকিল। আর এরা তোমাদের অর্থাৎ আবাসিক শিক্ষার্থীদের মতই তরুণ যার ফলে নিরাপত্তা প্রহরীও বুঝতে পারে না। শিক্ষার্থী না বহিরাগত।
হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাসময়ে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে ছিলেন, তবে নিজেদের রুমে ছিলেন না। তারা সম্ভবত নিরাপত্তা প্রহরীদের রুমে গিয়েছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না