দেশের ব্যাংকিং ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতে আবারও অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একজন সচেতন নাগরিকের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ দায়ের করা এক লিখিত অভিযোগে সাউথইস্ট ব্যাংক এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়-এর বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য এবং তহবিল অপব্যবহারের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব অনিয়মের কারণে সাধারণ আমানতকারী, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পুরো ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম এ কাসেমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে এবং অপছন্দের কর্মকর্তাদের বিভিন্নভাবে সরিয়ে দিয়ে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এর ফলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এই সিন্ডিকেট ব্যাংকের নানাবিধ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করছে, যা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই অভিযোগে চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, ভাগ্নি জামাই হিসেবে পরিচিত মুশফিকুর রহমানের বিরুদ্ধেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি ব্যাংকের লজিস্টিক বিভাগে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরে নিজের প্রভাব বিস্তার করে নিয়োগ, সরবরাহ এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগকারী দাবি করেন, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যার মাধ্যমে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম প্রভাবিত হচ্ছে এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অভিযোগের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগসমূহ। সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি ক্রয় এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। বিশেষ করে ৩০৪ কোটি টাকা এবং ৪২০ কোটি টাকার দুটি জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল্য কারসাজির অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কম মূল্যের জমিকে অধিক মূল্যে দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা সরাসরি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে সংগৃহীত অর্থের অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এছাড়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল ব্যবহার করে বিলাসবহুল গাড়ি কেনা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ৮টি রেঞ্জ রোভার এবং একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ। এই ধরনের ব্যয়কে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ও অপচয়মূলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ এভাবে বিলাসবহুল খাতে ব্যয় করা শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার পরিপন্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে অভিযোগপত্রে। বলা হয়েছে, অপ্রয়োজনীয়ভাবে একাধিক কমিটি গঠন করে সেগুলোর মাধ্যমে সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণের একটি সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং স্বচ্ছতা ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগকারী মনে করেন, এসব কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং এগুলোর মাধ্যমে মূলত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল সাউথইস্ট ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা একটি সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করেছে। একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ ধরনের আর্থিক লেনদেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিযোগকারী মনে করেন। এতে করে উভয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম নিরপেক্ষতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে।
সাউথইস্ট ব্যাংকের শাখা পর্যায়ে নিয়োগ ও বদলি নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন হচ্ছে এবং প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। একইসঙ্গে অপছন্দের কর্মকর্তাদের বিভিন্নভাবে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা ব্যাংকের পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এই ধরনের অনিয়মের কারণে দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং ব্যাংকের সার্বিক সেবার মান নিম্নমুখী হচ্ছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ আমানতকারী ও শিক্ষার্থীদের ওপর। ব্যাংকের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তাদের প্রদত্ত টিউশন ফি যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে করে উভয় খাতেই আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিযোগকারী দুদকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান শুরু করার জন্য। তিনি সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন। একইসঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, এ ধরনের অভিযোগ পেলে কমিশন সাধারণত প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করে থাকে। অভিযোগের সত্যতা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান শুরু করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট এই অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি বা স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেট গড়ে উঠলে তা ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একইসঙ্গে তারা বলেন, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মতো অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো খাতের জন্যই ক্ষতিকর।
অন্যদিকে শিক্ষা খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে সংগৃহীত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে তা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়। বিলাসবহুল খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং জমি ক্রয়ে অনিয়মের মতো অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং সেগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর মতে, ব্যাংকিং ও শিক্ষা—এই দুটি খাত দেশের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খাতগুলোতে যদি দুর্নীতি ও অনিয়ম বিস্তার লাভ করে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এসব অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
অভিযোগকারী তার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি প্রয়োজন হলে আরও প্রমাণাদি এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে প্রস্তুত আছেন। এতে বোঝা যায়, তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছেন এবং তদন্ত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এই অভিযোগগুলো যদি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হয়, তাহলে ব্যাংকিং ও শিক্ষা খাতে বিদ্যমান অনিয়মের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। একইসঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা অন্যদের জন্য একটি বার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
এদিকে সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, এই ধরনের অনিয়ম বন্ধ না হলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে আস্থার সংকট আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে, সাউথইস্ট ব্যাংক ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগগুলো দেশের ব্যাংকিং ও শিক্ষা খাতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এখন নজর রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-এর ওপর—তারা কীভাবে এই অভিযোগগুলো তদন্ত করে এবং কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কাছে একটাই প্রত্যাশা—সত্য উদঘাটন এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















