রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিকের বাড়িতে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাড়িতে ঢুকে সাংবাদিকের পরিবারের সদস্যদের ওপর নৃশংস হামলা চালায়। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে এবং অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন।
ভুক্তভোগী মোঃ রিয়াদুন্নবী জাতীয় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রতিনিধি। তিনি জানান, তিস্তা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ বালু উত্তোলনের চিত্র তুলে ধরে গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই একটি প্রভাবশালী চক্র তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাকে ও তার পরিবারকে বারবার প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ মার্চ ২০২৬ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সাংবাদিক বাড়ির বাইরে থাকাকালে একদল সন্ত্রাসী সংঘবদ্ধ হয়ে লাঠি, দা ও লোহার রডসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে। তারা বাড়ির উঠানে ঢুকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে এবং সাংবাদিককে বের হয়ে আসতে হুমকি দেয়।
এ সময় তার বাবা মোঃ ইলিয়াছ আলী, মা মোছাঃ মোসলেমা বেগম (৪৭) ও ফুফু কোকিলা বেগম (৪৫) এগিয়ে এসে বাধা দিলে সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা লাঠি ও লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করে।
বিশেষ করে সাংবাদিকের বাবার মাথা, কাঁধ ও পিঠে উপর্যুপরি আঘাত করে গুরুতর আহত করা হয়। অপরদিকে ফুফু কোকিলা বেগমকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথা লক্ষ্য করে আঘাত করা হলে তিনি আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে মুখ, কাঁধ ও বুকে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্তাক্ত হন। এক পর্যায়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করা হয় এবং তার সঙ্গে শ্লীলতাহানির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং গুরুতর আহত কোকিলা বেগমকে উদ্ধার করে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। অন্য আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
হামলাকারীরা যাওয়ার আগে বাড়ির টিনের বেড়া, গেটসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি সাধন করে। একই সঙ্গে পুনরায় এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ করলে সাংবাদিককে হত্যা, হাত-পা ভেঙে দেওয়া ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।
ঘটনার পর সাংবাদিক রিয়াদুন্নবী গঙ্গাচড়া মডেল থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে একটি এজাহার দায়ের করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, “এ ধরনের ঘটনা এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আমরা চাই, প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনুক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন দুঃসাহস দেখাতে না পারে।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য হুমায়ূন কবির লাল বলেন, “এই বালু ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে এবং একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্রে পরিণত হয়েছে। তারা শুধু পরিবেশ ধ্বংসই করছে না, মানুষের জানমালের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “একজন সাংবাদিক সত্য তুলে ধরায় তার পরিবারের ওপর এভাবে হামলা চালানো প্রমাণ করে তারা কতটা বেপরোয়া ও আইনকে তোয়াক্কা করে না।”
গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কমল কান্ত রায় বলেন, “এই হামলার মাধ্যমে একটি মহল সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে সত্য প্রকাশ বন্ধ করতে চাচ্ছে। কিন্তু কোনো হুমকি বা হামলায় সাংবাদিকরা পিছপা হবে না।”
প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল আলীম প্রামানিক বলেন, “সাংবাদিকদের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। আমরা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।”
গঙ্গাচড়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুর ছবুর বলেন, “ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত তদন্তপূর্বক জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। তারা অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মোছাদ্দেক সৈকত, নিজস্ব প্রতিবেদক রংপুর। 


















