গণপূর্ত অধিদপ্তরে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য চলে আসছে অনেকদিন ধরেই। এসব বন্ধের জন্য অনিয়ম দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারকে সরিয়ে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে প্রধান প্রকৌশলী করা হয়। কিন্তু শুধু চেয়ারের মানুষের বদল ছাড়া পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের সিন্ডিকেট ভেঙে নিজের সিন্ডিকেট তৈরী করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই সাথে জানা যায় টেন্ডার বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হওয়া প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামানকে টাকা ও আনুগত্যের বিনিময়ে পুনর্বহালের তদবির চলছে। এজন্যই তাকে ব্যাক ডেটে একটি আদেশের মাধ্যমে ঢাকায় রিজার্ভে বদলি করে আনা হয়েছে। সাইফুজ্জামান যদি বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর সকল শর্ত মেনে নেন তাহলে কয়েকদিনের মধ্যেই পুনর্বহাল হয়ে যাবেন বলে নির্ভোরযোগ্য সূত্রে জানায়।
ব্যাক ডেটে কিভাবে ঢাকায় বদলি করে আনা হয়েছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একজন জানান, সাইফুজ্জামানকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত ৩রা ফেব্রুয়ারি ২৫.০০.০০০০.০০০.১৩০.২৭.০০২.১৯-১৭ স্মারকের একটি আদেশের মাধ্যমে বরখাস্ত করেছে। সেই বরখাস্তের আদেশে সাইফুজ্জামানকে লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে আছেন বলে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু গত ১৫ই ফেব্রুয়ারির গণপূর্তের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১৯.১০৩.২৪-২১৭ স্মারকের একটি আদেশে দেখা যাচ্ছে সাইফুজ্জামানকে গত ২রা ফেব্রুয়ারি মানে বরখাস্তের একদিন আগে ঢাকায় রিজার্ভে বদলি করেছেন প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান। এখন যদি বরখাস্তের পরে সাইফুজ্জামানকে ব্যাক ডেটে বদলি না করা হয় তাহলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আদেশে সাইফুজ্জামানের পদবি কেনো লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী দেখানো হলো? শুধু তাই নয় ২রা ফেব্রুয়ারির বদলির আদেশে গণপূর্তের ওয়েবসাইটে এতো দেরি করে ১৫ই ফেব্রুয়ারি কেনো প্রকাশ করা হলো? ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে দেরি হলে দুই দিন বা সর্বোচ্চ পাঁচ দিন দেরি হতে পারে। তাই বলে ১৩ দিন দেরি হওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। তারিখ পিছিয়ে বদলির জন্যই এই বিষয়গুলো সাংঘর্ষিক হয়েছে। এখানে স্পষ্টই সাইফুজ্জামানকে ঢাকায় এনে তার বিরুদ্ধে হওয়া তদন্তে কারসাজি করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আর এরকম সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে মোটা অংকের টাকা ও আনুগত্য স্বীকার।
এছাড়াও খালেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে দরপত্র বাণিজ্যেরও ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। বড় অংকের পাঁচটি দরপত্রে কমিশন পছন্দ না হওয়ায় পুনর্মূল্যায়নের জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে জানা যায়। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এবং শেরে বাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২ এর অধীনের এইসব দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হয়। কারণ হিসেবে পিপিআর ২০২৫ অনুযায়ী দরপত্রের কাগজপত্রে ত্রুটি রয়েছে বলা হয়। দরপত্র আইডিগুলো ১১৬৩৯৩৪, ১১৬৩৯৫১, ১১৭৬৮৫০, ১১৭৬৮৫১, ১১২০৮৫৩। গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একজন জানান, পিপিআর ২০২৫ পাশ হওয়ার পর গণপূর্তের সকল প্রকৌশলীকে এর উপর বিস্তর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নথিতে ভুল করেছেন এটা মানা যায় না। এখানে কমিশনের ঝামেলাই হয়েছে। আর যদি নথিতে ভুল হয়েই থাকে তাহলে এই প্রশিক্ষণ দিয়ে লাভ কি? প্রশিক্ষণ পাওয়ার পরেও যদি কর্মকর্তারা ভুল করে থাকে তাহলে এসব কর্মকর্তা সরকারের এতো গুরুত্বপূর্ন অধিদপ্তরে চাকরি করার অযোগ্য।
উল্লেখ্য যে গত বছরের শেষের দিকে গণপূর্তে গুঞ্জন উঠেছিলো যে খালেকুজ্জামান শত কোটি টাকা নিয়ে নেমেছিলেন প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার মিশনে। তিনিও গণপূর্তের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা ব্যাক্তিগত সাক্ষাতে তাকে প্রধান প্রকৌশলী করা হলে গণপূর্ত ও দেশের কি কি উন্নয়ন করবেন তা প্রচার করছিলেন অনবরত। গুঞ্জন উঠার কয়েকদিনের মধ্যেই গত বছরের অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পান খালেকুজ্জামান চৌধুরী। এর তিনদিন পরেই রহস্যময়ভাবে তার নামে চলতি দায়িত্বের আদেশও জারি হয়। এই চলতি দায়িত্বে আদেশ হওয়ার পর থেকেই খালেকুজ্জামান উন্নয়নের বদলে নেমে পরেন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের সিন্ডিকেট বদলে নিজের সিন্ডিকেট তৈরীতে। একের পরে এক বদলি করে নিজের অনুগত লোকদের গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে শুরু করেন তিনি। কিন্তু পরে জানা যায় টাকার বিনিময়েই এই ঢালাও বদলি করছেন তিনি। পদ ভেদে চাহিত টাকা যে কর্মকর্তা দিতে পারছেন তাকেই সে পদে বহাল করছেন খালেকুজ্জামান।
এরই প্রেক্ষিতে গত ৩ মার্চ একই দিনে পৃথক পৃথক প্রজ্ঞাপনে অর্ধশতাধিক প্রকৌশলী বদলি করেন চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। অথচ এত বেশি সংখ্যক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী বদলির বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন না মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমনকি সচিবও। বিষয়টি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টিতে এলে প্রধান প্রকৌশলীকে ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি একসঙ্গে এত প্রকৌশলী বদলির বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে এসব বদলির আদেশ বাতিলের নির্দেশ দেন। গত ০৫ মার্চ একটি ও গত ০৮ মার্চ পাঁচটি পৃথক পৃথক প্রজ্ঞাপনে এসব বদলির আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হন চলতি দায়িত্বের প্রধান প্রকৌশলী।
কিন্তু তারপরেও বদলি থেমে থাকেনি। একসাথে এতো বদলি না করে এখন একজন দুইজন করে বদলি করে যাচ্ছেন বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী। এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, সিন্ডিকেট ভাঙা মুখ্য বিষয় নয়। খালেকুজ্জামান নিজের বলয়ের লোকদেরকেই এসব পদে বসাচ্ছেন। সাথে যারা তাকে টাকা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারছে তারাই থাকতে পারছেন। তিনি আরো বলেন, যদি সিন্ডিকেট ভাঙাই মুখ্য হতো তাহলে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার আসামীদেরকে তিনি স্ব-জায়গায় বহাল রাখতেন না। এখানে যে বাণিজ্য হচ্ছে এতেই তা বোঝা যায়। বাণিজ্যের সাথে আসামীরা শামীম আখতারকে ছেড়ে খালেকুজ্জামানের আনুগত্য স্বীকার করেছেন বলেই এখনও বহাল আছেন।
এসব বিষয়ে জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের চলতি দায়িত্ব থাকা প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে কয়েকবার তার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























