বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বিএইসি) জিন গবেষণাগারের জন্য প্রায় ২৩ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রকল্প নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও দরপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একই টেন্ডার তিনবার বাতিল করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে, যাতে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব যন্ত্রপাতির সর্বোচ্চ মূল্য ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়, কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাদের প্রস্তাবিত মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্পটি মূলত ডিএনএ এক্সট্রাকশন সিস্টেম ও ডিএনএ সিকোয়েন্সার সরবরাহ, স্থাপন ও কমিশনিং-সংক্রান্ত। টেন্ডার ডাটা শিট অনুযায়ী, এ যন্ত্রপাতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থিত এস্টাবলিশমেন্ট অব জেনম সিকুয়েন্সিং ফ্যাসিলিটিস অ্যাট নিনমাস প্রকল্পে স্থাপন করার কথা রয়েছে। টেন্ডার নথি অনুযায়ী প্রকল্পে যেসব যন্ত্রপাতি কেনার কথা রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—অটোমেটেড ডিএনএ এক্সট্রাকশন সিস্টেম দুটি, ডিএনএ সিকুয়েন্সার (ক্যানসার, থ্যালাসেমিয়া, এমডিআরটিবি, শর্ট প্যানেল সফটওয়্যার দুটি, ডিএনএ সিকুয়েন্সার ফর এক্সোম-লার্জ প্যানেল-এনআইপিটি দুটি। এই যন্ত্রপাতির জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ২৩ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এসব যন্ত্রের মূল্য ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। এর আগে একই প্রতিষ্ঠান এসব যন্ত্র কিনেছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকায়। যেগুলো কখনই ব্যবহৃত হয়নি।
সূত্রগুলো জানায়, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে একই টেন্ডার প্রক্রিয়া এ পর্যন্ত তিনবার বাতিল করা হয়েছে। প্রথমবার দরপত্রের কারিগরি শর্ত একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মানদণ্ড অনুযায়ী না হওয়ায় টেন্ডার বাতিল করা হয়। এ সময় প্রকল্প পরিচালকের পরিবর্তনও করা হয়। দ্বিতীয়বার তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান তৃতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা হওয়ায় টেন্ডারটি বাতিল করা হয়। তৃতীয়বার বর্তমান পর্যায়ে ভিন্ন ধরনের সিপিটিইউ ফরম্যাট ব্যবহার করে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবকে ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণা করে একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘রেসপনসিভ’ দেখানো হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, ইনভেন্ট টেকনোলজি নামে একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে কমিশনের বিভিন্ন প্রকল্পে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে আসছে। গত প্রায় ১৭ বছরে প্রতিষ্ঠানটি ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার কাজ করেছে, তবে এর অনেক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের কারিগরি স্পেসিফিকেশন এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা সরবরাহকারী ছাড়া অন্যরা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কিছু ব্র্যান্ড (যুক্তরাষ্ট্রের থর্মফিশার) অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না।
দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালককে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, দরপত্র মূল্যায়নের সময় পিপিআর এর ১৪.২ এবং ২৪.২ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তাদের দেওয়া ক্যাটালগ ও ডাটা শিট যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই প্রস্তাবকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক হরিনারায়ণ দাস বলেন, প্রকল্পের কেনাকাটার জন্য সাত সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি রয়েছে। তারা দরদাতাদের মূল্যায়ন করে রেসপনসিবল কিংবা নন-রেসপনসিনল করে থাকে। এখানে আমাদের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। তিনি বলেন, অ্যাডভান্স বায়োমেড নামে এক সরবরাহকারী নন-রেসপনসিবল হয়েছে। কেন নন-রেসপনসিবল হয়েছে, তা আমরা টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে জানাব।
নিজস্ব প্রতিনিধি 

























