রাজধানীর বসিলা ব্রিজ সংলগ্ন ওয়াশপুরুহাজারীবাগ এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, নাসির নামে পরিচিত এক ব্যক্তির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই গ্যাস সিলিন্ডার সিন্ডিকেট এলাকায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত মূল্য আদায়, জোরপূর্বক সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেট সরকারি নীতিমালা ও নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালালেও কার্যকর প্রশাসনিক তদারকি না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, সিন্ডিকেট প্রধান নাসির দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একটি স্বনামধন্য এলপি গ্যাস কোম্পানির এজেন্ট পরিচয়ে ওয়াশপুর এলাকায় দোকান ও গুদাম পরিচালনা করছেন। এলাকাবাসীর দাবি, প্রকৃতপক্ষে তার কাছে প্রয়োজনীয় সব ধরনের লাইসেন্স ও অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত খুচরা মূল্য উপেক্ষা করে বাজারদরের তুলনায় প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডারে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। যারা নির্ধারিত দামে গ্যাস নিতে চান বা বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজার চেষ্টা করেন, তাদের নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়।
এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষ জানান, গ্যাস সিলিন্ডার ছাড়া রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন জীবন প্রায় অচল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেটটি প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, যাতে দাম আরও বাড়ানো যায়। দোকানগুলোতে গ্যাস মজুদ থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের জানানো হয় যে সিলিন্ডার নেই বা পরে আসতে হবে। পরে নির্দিষ্ট লোকজনের মাধ্যমে বেশি দামে সেই গ্যাস বিক্রি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে চাইলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। স্থানীয় কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, তারা অন্য কোম্পানির গ্যাস বিক্রি করতে চাইলেও নাসিরের নেতৃত্বাধীন চক্র বাধা দেয়। কেউ প্রতিবাদ করলে দোকান ভাঙচুর, হুমকি কিংবা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে ভয়ে অনেকেই মুখ বন্ধ করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই অনিয়ম ও জুলুমের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হন সাংবাদিক মোঃ শাফায়েত হোসেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশপুরুহাজারীবাগ এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায় অনিয়ম, অতিরিক্ত মূল্য আদায় এবং অবৈধ মজুদের অভিযোগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অনুসন্ধানের সময় তিনি সিন্ডিকেটের অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে তাকে একাধিকবার মৌখিকভাবে হুমকি দেওয়া হয়।
ঘটনার দিন ২১ জানুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যার পর, সাংবাদিক শাফায়েত হোসেন তার কাজ শেষে এলাকায় অবস্থান করছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা তাকে ঘিরে ধরে মারধর করে গুরুতর আহত করে ফেলে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যেই এমন নৃশংসতা চালানো হয়।
আহত অবস্থায় স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তার অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)-এ ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় তার একটি আঙুল ভেঙে গেছে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
সাংবাদিক শাফায়েত হোসেন জানান, তিনি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে নয়, বরং জনস্বার্থে গ্যাস সিলিন্ডার সিন্ডিকেটের অনিয়ম তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তার ভাষায়, “আমি শুধু সত্যটা সামনে আনতে চেয়েছিলাম। সাধারণ মানুষ যাতে ন্যায্য দামে গ্যাস পায়, সেটাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। কিন্তু এর ফল হিসেবে আমাকে ভয় দেখানো হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে।”
হামলার ঘটনার পর সাংবাদিক সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন সংগঠন ও সচেতন মহল এই হামলার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। পরবর্তীতে এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মামলার ৩ ও ৮ নম্বর আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে এলাকাবাসীর দাবি, মূল হোতাসহ সব জড়িত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে আরও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এদিকে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসার আইনগত দিক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশে এলপি গ্যাস এজেন্ট বা ডিলার হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা অনুমোদিত বিপণন কোম্পানির লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অগ্নি-নিরাপত্তা সনদ, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের স্টোরেজ ও মজুদ সংক্রান্ত অনুমতি, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃক প্রদত্ত ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন ও ভ্যাট নিবন্ধনসহ একাধিক অনুমোদন থাকা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি নির্ধারিত নিরাপত্তা দূরত্ব, গুদামজাতকরণ মানদণ্ড ও সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রমাণপত্র থাকতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নাসিরের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট এসব শর্ত যথাযথভাবে মানছে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে। অনেক গুদাম ও দোকানে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল, ঝুঁকিপূর্ণভাবে সিলিন্ডার মজুদ করা হয় এবং আশপাশের আবাসিক এলাকায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি না থাকায় এসব অনিয়ম বছরের পর বছর চলতে পারছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেট্রোলিয়াম আইন ২০১৬, বিস্ফোরক আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী গ্যাস সংক্রান্ত ব্যবসায় অনিয়ম প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত, মোটা অঙ্কের জরিমানা, অবৈধ মজুদের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড, গুদাম সিলগালা ও পণ্য জব্দসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকের ওপর হামলার মতো ঘটনায় ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তারা দাবি করছেন, গ্যাস সিলিন্ডার সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে বৈধ ব্যবসায়ীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হামলার শিকার সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
ওয়াশপুরুহাজারীবাগ এলাকার সাধারণ মানুষ আশা করছেন, এই ঘটনার মাধ্যমে অন্তত গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসার অনিয়ম ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন করে ভাববে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তারা।
সংবাদ শিরোনাম ::
অনুসন্ধানী সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ
নাসিরের নেতৃত্বে ওয়াশপুর-হাজারীবাগে গ্যাস সিলিন্ডার সিন্ডিকেট
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১০:৩২:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- ৬১৮ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















