বাংলাদেশে দুর্নীতির প্রসঙ্গ উঠলেই যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার আলোচনায় আসে, তার মধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অন্যতম। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন এই সংস্থাটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই লাইসেন্স প্রদান, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সনদ ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবাকে কেন্দ্র করে ঘুষ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ শোনা যায়। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। এমন প্রেক্ষাপটেই সম্প্রতি আলোচনায় এসেছেন বিআরটিএর এক মোটরযান পরিদর্শক, যাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পরিমাণ ও ব্যাপ্তি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।
অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা এই কর্মকর্তার নাম ইকবাল আহমদ, যিনি স্থানীয়ভাবে সোহেল ইকবাল নামেও পরিচিত বলে জানা যায়। তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের ১০ম গ্রেডভুক্ত একজন মোটরযান পরিদর্শক। সরকারি চাকরিতে তুলনামূলকভাবে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা হয়েও তার নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, পৈতৃক সূত্রে তার বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানায় হলেও রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে তার একাধিক স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রমতে, ইকবাল আহমদ একসময় সাভার বিআরটিএ কার্যালয়ে মোটরযান পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সাভারে কর্মরত থাকাকালীন অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়ে ওঠেন। স্থানীয়দের দাবি, এই সময়েই তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অবৈধভাবে কাজ করিয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন সেবা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতেই একপর্যায়ে তাকে সাভার বিআরটিএ অফিস থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্নীতির দায়ে তিনি প্রায় ছয় মাসের জন্য সাসপেন্ড ছিলেন। তবে এই শাস্তির পরও তার অনিয়ম বন্ধ হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সাভার ব্যাংক কলোনি এলাকায় ইকবাল আহমদের একটি বিশাল ও বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে, যাকে স্থানীয়রা ‘রাজপ্রাসাদ’ বলেও উল্লেখ করেন। বাইরে থেকে সাধারণ ভবনের মতো মনে হলেও ভেতরের সাজসজ্জা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ব্যয়বহুল নির্মাণসামগ্রী দেখে অনেকেই বিস্মিত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তার এক নিকটাত্মীয় দাবি করেন, শুধু বাড়ির একটি দরজা নির্মাণ করতেই কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ওই বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে যেন কোনো অভিজাত রাজপরিবারের বাসভবনে ঢুকছেন—এমন অনুভূতি হয় বলেও তারা মন্তব্য করেন।
সাভার থেকে বদলি হয়ে ইকবাল আহমদ পরবর্তীতে বরিশাল বিআরটিএ অফিসে যোগদান করেন। কিন্তু সেখানেও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল বিআরটিএ কার্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় তিনি তৎকালীন সরকারি পরিচালক শাহ আলম ও রেকর্ড কিপার আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগসাজশে ২০২৩ সালে অন্তত ২৫৫টি যানবাহন অবৈধভাবে রেজিস্ট্রেশনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এসব রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ফাইল নিষ্পত্তি, ভুয়া কাগজপত্র গ্রহণ এবং নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ইকবাল আহমদের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো তার জীবনযাত্রার মান ও ব্যয়ের সঙ্গে সরকারি বেতনের কোনো মিল না থাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, তার দখলে রয়েছে অর্ধকোটি টাকারও বেশি মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি। এছাড়াও তিনি রিসোর্টের মতো নিরাপত্তাবেষ্টিত একটি খামারবাড়ি গড়ে তুলেছেন বলে জানা যায়। ওই খামারবাড়িতে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল ও ব্যয়বহুল স্থাপনা রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হলো, সে বিষয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য।
শুধু পেশাগত জীবন নয়, ইকবাল আহমদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রী আর্জিনা বেগমের নামেও বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। বর্তমানে তিনি সাভার পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও তার নাম আলোচনায় এসেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ইকবাল আহমদের দুই কন্যা সন্তানের নামে—ইরিনা ও এলিনা—মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানার অন্তর্গত এলাকায় একটি ডেইরি ফার্ম পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ গড়ে তুলে তিনি প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার চেষ্টা করছেন।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একাধিক সূত্র দাবি করেছে, আর্জিনা বেগমের পরিবারে ইকবাল আহমদের বিয়ের পর থেকেই আর্থিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন আসে। শ্বশুরবাড়িতে বর্তমানে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব নির্মাণকাজে ব্যবহৃত অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রভাব খাটিয়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমেও তিনি অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন।
বিআরটিএর অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র দাবি করেছে, ইকবাল আহমদ তার ছোট ভাইকে বিআরটিএতে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন। এছাড়াও সাইফুল নামে একজন ব্যক্তিকে তিনি বিআরটিএ অফিসে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, আরও কয়েকজনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ পেতে সহযোগিতা করেছেন বলেও সহকর্মীদের একটি অংশ দাবি করেছে। এসব ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
বরিশালে কর্মরত অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ ঘনীভূত হওয়ায় ইকবাল আহমদ সেখানে বেশিদিন অবস্থান করতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। পরবর্তীতে তাকে বরিশাল বিআরটিএ অফিস থেকে বদলি করা হয়। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিআরটিএ অফিসে কর্মরত আছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, চট্টগ্রামেও তিনি একই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির জাল বিস্তার করছেন। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মনে করছেন, ইকবাল আহমদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যদি সঠিকভাবে তদন্ত করা হয়, তাহলে বিআরটিএর ভেতরে চলমান দুর্নীতির একটি বড় চিত্র সামনে আসতে পারে। তারা দাবি করছেন, শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; বরং তার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুবিধাভোগীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ইকবাল আহমদ বা তার পরিবারের পক্ষ থেকেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব অভিযোগ যাচাই করে, তবে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআরটিএকে দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে সংশ্লিষ্ট সব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ইকবাল আহমদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু একজন ব্যক্তির বিষয় নয়; বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন অনেকেই। এখন দেখার বিষয়, এসব অভিযোগ আদৌ তদন্তের আলো দেখবে কি না, নাকি আগের মতোই ধামাচাপা পড়ে যাবে।
আমাদের মার্তৃভূমি ডেস্ক : 



















