সংবাদ শিরোনাম ::
আর্জেন্টিনাকে দুঃসংবাদ দিলেন কেইনকে কালো জাদু করা ঘানার সেই তান্ত্রিক দেশের ৯ জেলায় বন্যার শঙ্কা করমুক্ত আয়সীমা ৬ লাখ টাকা করার প্রস্তাব প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর চীনের সঙ্গে সমঝোতায় বাংলাদেশের নিউ মিডিয়ায় গুণগত পরিবর্তন আসবে : তথ্যমন্ত্রী দুর্নীতি মামলায় টিউলিপসহ ২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন পেছাল এলপিজির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সিরাজুল ও জ্বালানি সচিব সাইফুলের সিন্ডিকেটে কোটি টাকা আত্মসাত মনোহরগঞ্জে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি, হাবিবসহ তিন পুলিশের মৃত্যুদণ্ড আত্রাইয়ে ১৯৩ কেন্দ্রে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন শুরু

বেপরোয়া ইকবাল-হাই-উল্লাস সিন্ডিকেট চক্র: সংকটে প্রবাসী শ্রমিক

বাংলাদেশে সমুদ্রপথে অবৈধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের ঘটনা বছরের পর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল কারণ হলো জনশক্তি রপ্তানি খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, অসাধু সিন্ডিকেট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে যে, এই খাতের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যার কেন্দ্রবিন্দু হলো মোঃ ইকবাল হোসেন, মোঃ আব্দুল হাই সিদ্দিকী এবং সৈয়দ উল্লাস। তারা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে বিদেশগামী শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা, ভুয়া নিয়োগপত্র, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং নিয়ম লঙ্ঘনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন পরিচালনা করছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) মূলত বিদেশগামী শ্রমিকদের নিরাপদ, বৈধ ও সুশৃঙ্খল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএমইটিতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর হওয়া এই শাখা একদল অসাধু সিন্ডিকেটের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। কর্মকর্তাদের সঙ্গে সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠতা এবং অফিস সময়ের বাইরে অবাধ প্রবেশের সুযোগ এদেরকে আরও শক্তিশালী করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সরকারি ‘রেস্ট্রিকটেড এরিয়া’ বা প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত এলাকা বিকেল এবং সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এজেন্সির মালিকরা অবাধে প্রবেশ করে ফাইল অনুমোদন করছেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ারে বসে এজেন্সির মালিকরা নিজেই কাজ সম্পন্ন করছেন। অফিসিয়াল সময়ের বাইরে এই প্রক্রিয়া চালু রাখায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কার্যত শূন্যে পরিণত হয়েছে।
মোঃ ইকবাল হোসেন, সহকারী পরিচালক পদে থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত। তিনি অফিসিয়াল অবস্থানকে ব্যবহার করে এজেন্সির স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোনিবেশ করেন এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে। মোঃ আব্দুল হাই সিদ্দিকী, সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর (পিও) পদে থাকা অবস্থায় সিন্ডিকেটের অপকর্মের মাধ্যমে বিদেশগামী শ্রমিকদের সঙ্গে অসাধু লেনদেনে যুক্ত। তিনি শ্রমিকদের গন্তব্যভিত্তিক তথ্য বিকৃত করে দেন এবং সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় তদারকি না করে সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেন। সৈয়দ উল্লাস, স্টেনোগ্রাফার কাম কম্পিউটার অপারেটর (পিএ), সিন্ডিকেটের তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সরকারি সার্ভার এবং ডেটাবেসে তার অবাধ প্রবেশের কারণে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন আকারে প্রকাশ পায়। ভুয়া নিয়োগপত্র প্রদান, শ্রমিকদের ভুল গন্তব্যে প্রেরণ, বৈধ প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সরকারি সার্ভারে অবৈধ প্রবেশ এসব প্রধান অনিয়মের মধ্যে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়মের ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগ ক্রমাগত বাড়ছে। স্বপ্ন দেখা প্রবাসীরা কখনও অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন, কখনও আবার ভুয়া চুক্তিপত্রের কারণে বিপদের মুখে পড়ছেন।
বিএমইটির বহির্গমন শাখা মূলত বৈধ চুক্তিপত্র যাচাই করে শ্রমিকদের ক্লিয়ারেন্স প্রদান করে। এ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কেউ বিদেশে যেতে পারেনা। শাখার তদারকি, চুক্তির শর্ত বিশ্লেষণ এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এ শাখার মূল দায়িত্ব। এছাড়া তারা প্রত্যেক বিদেশগামী শ্রমিকের তথ্য ডেটাবেসে সংরক্ষণ করে যাতে ভবিষ্যতে সরকারের সহায়তা সহজ হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিন্ডিকেট এই নিয়ম মানে না। প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ এলাকা হলেও তারা অবাধে প্রবেশ করে এবং অফিস সময় শেষে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা তাদের কাজকে স্বাভাবিক মনে করিয়ে দেয়, যা তদারকি কার্যকর হয় না। এই পরিস্থিতিতে বিদেশগামী শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছে। জুলাই ও আগস্ট মাসে সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, টি-২০ ওভারসিজের (আর এল নম্বর ১৫১৫) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরজাহান আক্তার প্রবেশ নিষিদ্ধ বহির্গমন শাখা থেকে বের হচ্ছেন। নুরজাহানের বিরুদ্ধে বিএমইটিতে নানা অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগে দুদকে একাধিক মামলা রয়েছে। অন্য ভিডিওতে দেখা যায়, দি ইফতি ওভারসিজের (আর এল নম্বর ১৯৪) ব্যবস্থাপনা অংশীদার মোঃ রুবেল বহির্গমন শাখায় প্রবেশ করছেন এবং দরজা খোলা হচ্ছে।
বিএমইটিকেন্দ্রিক অসাধু সিন্ডিকেটের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত নুরজাহান আক্তার এবং মোঃ রুবেল। তারা শুধুমাত্র নিজের এজেন্সির কার্যক্রমে নয়, অন্তত ৫০টিরও বেশি এজেন্সির জন্য লেনদেন করে থাকেন। নুরজাহান আক্তার একসময় বিএমইটির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। চাকুরির সময় নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার পর দুদকের মামলায় চাকরি হারান। পরে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে ভয়ংকর মানব পাচার চক্র গড়ে তোলেন।
সরকারি তদারকির অভাব, সংবিধি লঙ্ঘন এবং সিন্ডিকেটের বেপরোয়া কার্যক্রমের ফলে বাংলাদেশে জনশক্তি রপ্তানি খাত অচলায়িত অবস্থায় পৌঁছেছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএমইটিতে আমূল সংস্কার না করা পর্যন্ত শ্রমিকদের দুর্ভোগ কমবে না। প্রতারণার শিকার হওয়া প্রবাসীরা প্রায়শই তাদের স্বপ্ন পূরণের পথ বন্ধ দেখতে পাচ্ছেন।
দুদক ইতোমধ্যে কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তবে সিন্ডিকেটের মূল খেলোয়াড়রা নিয়মভঙ্গ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারকে অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং বিএমইটিতে পুনর্গঠন আনা জরুরি। এছাড়া বিদেশগামী শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে নতুন নিয়ম এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া প্রবর্তনের দাবি তোলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিন্ডিকেটের কার্যক্রম বন্ধ না হলে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের সংকট আরও বাড়বে। বিদেশে পাড়ি জমানো শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার মুখে পড়বেন, আর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনশক্তি রপ্তানি খাতের স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।
বিএমইটিতে সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ড প্রমাণিত হওয়ার পরও, কিছু অসাধু কর্মকর্তা এখনও লুকানো উপায়ে এই চক্রকে সহায়তা করছেন। অফিস সময়ের বাইরে প্রবেশাধিকার, জাল ফাইল অনুমোদন এবং ভুয়া চুক্তিপত্র ছাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তারা সিন্ডিকেটের কার্যক্রমকে বহাল রাখছেন। এছাড়া, সরকারি সার্ভার ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের কারণে শ্রমিকদের তথ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
সিন্ডিকেটের অপকর্ম বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। বৈধভাবে প্রেরিত শ্রমিকের সংখ্যা কমছে, প্রবাসী শ্রমিকদের আয় এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হচ্ছে। ফলে প্রবাসী কল্যাণ এবং মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের সুস্থতা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএমইটিতে সরাসরি নজরদারি, সিন্ডিকেটের মূল খেলোয়াড়দের বিচার এবং প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। যদি এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে সিন্ডিকেটের দাপট এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আর্জেন্টিনাকে দুঃসংবাদ দিলেন কেইনকে কালো জাদু করা ঘানার সেই তান্ত্রিক

বেপরোয়া ইকবাল-হাই-উল্লাস সিন্ডিকেট চক্র: সংকটে প্রবাসী শ্রমিক

আপডেট সময় ০১:৫৬:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে সমুদ্রপথে অবৈধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের ঘটনা বছরের পর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল কারণ হলো জনশক্তি রপ্তানি খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, অসাধু সিন্ডিকেট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে যে, এই খাতের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যার কেন্দ্রবিন্দু হলো মোঃ ইকবাল হোসেন, মোঃ আব্দুল হাই সিদ্দিকী এবং সৈয়দ উল্লাস। তারা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে বিদেশগামী শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা, ভুয়া নিয়োগপত্র, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং নিয়ম লঙ্ঘনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন পরিচালনা করছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) মূলত বিদেশগামী শ্রমিকদের নিরাপদ, বৈধ ও সুশৃঙ্খল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএমইটিতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর হওয়া এই শাখা একদল অসাধু সিন্ডিকেটের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। কর্মকর্তাদের সঙ্গে সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠতা এবং অফিস সময়ের বাইরে অবাধ প্রবেশের সুযোগ এদেরকে আরও শক্তিশালী করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সরকারি ‘রেস্ট্রিকটেড এরিয়া’ বা প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত এলাকা বিকেল এবং সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এজেন্সির মালিকরা অবাধে প্রবেশ করে ফাইল অনুমোদন করছেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ারে বসে এজেন্সির মালিকরা নিজেই কাজ সম্পন্ন করছেন। অফিসিয়াল সময়ের বাইরে এই প্রক্রিয়া চালু রাখায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কার্যত শূন্যে পরিণত হয়েছে।
মোঃ ইকবাল হোসেন, সহকারী পরিচালক পদে থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত। তিনি অফিসিয়াল অবস্থানকে ব্যবহার করে এজেন্সির স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোনিবেশ করেন এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে। মোঃ আব্দুল হাই সিদ্দিকী, সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর (পিও) পদে থাকা অবস্থায় সিন্ডিকেটের অপকর্মের মাধ্যমে বিদেশগামী শ্রমিকদের সঙ্গে অসাধু লেনদেনে যুক্ত। তিনি শ্রমিকদের গন্তব্যভিত্তিক তথ্য বিকৃত করে দেন এবং সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় তদারকি না করে সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেন। সৈয়দ উল্লাস, স্টেনোগ্রাফার কাম কম্পিউটার অপারেটর (পিএ), সিন্ডিকেটের তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সরকারি সার্ভার এবং ডেটাবেসে তার অবাধ প্রবেশের কারণে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন আকারে প্রকাশ পায়। ভুয়া নিয়োগপত্র প্রদান, শ্রমিকদের ভুল গন্তব্যে প্রেরণ, বৈধ প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সরকারি সার্ভারে অবৈধ প্রবেশ এসব প্রধান অনিয়মের মধ্যে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়মের ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগ ক্রমাগত বাড়ছে। স্বপ্ন দেখা প্রবাসীরা কখনও অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন, কখনও আবার ভুয়া চুক্তিপত্রের কারণে বিপদের মুখে পড়ছেন।
বিএমইটির বহির্গমন শাখা মূলত বৈধ চুক্তিপত্র যাচাই করে শ্রমিকদের ক্লিয়ারেন্স প্রদান করে। এ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কেউ বিদেশে যেতে পারেনা। শাখার তদারকি, চুক্তির শর্ত বিশ্লেষণ এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এ শাখার মূল দায়িত্ব। এছাড়া তারা প্রত্যেক বিদেশগামী শ্রমিকের তথ্য ডেটাবেসে সংরক্ষণ করে যাতে ভবিষ্যতে সরকারের সহায়তা সহজ হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিন্ডিকেট এই নিয়ম মানে না। প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ এলাকা হলেও তারা অবাধে প্রবেশ করে এবং অফিস সময় শেষে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা তাদের কাজকে স্বাভাবিক মনে করিয়ে দেয়, যা তদারকি কার্যকর হয় না। এই পরিস্থিতিতে বিদেশগামী শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছে। জুলাই ও আগস্ট মাসে সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, টি-২০ ওভারসিজের (আর এল নম্বর ১৫১৫) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরজাহান আক্তার প্রবেশ নিষিদ্ধ বহির্গমন শাখা থেকে বের হচ্ছেন। নুরজাহানের বিরুদ্ধে বিএমইটিতে নানা অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগে দুদকে একাধিক মামলা রয়েছে। অন্য ভিডিওতে দেখা যায়, দি ইফতি ওভারসিজের (আর এল নম্বর ১৯৪) ব্যবস্থাপনা অংশীদার মোঃ রুবেল বহির্গমন শাখায় প্রবেশ করছেন এবং দরজা খোলা হচ্ছে।
বিএমইটিকেন্দ্রিক অসাধু সিন্ডিকেটের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত নুরজাহান আক্তার এবং মোঃ রুবেল। তারা শুধুমাত্র নিজের এজেন্সির কার্যক্রমে নয়, অন্তত ৫০টিরও বেশি এজেন্সির জন্য লেনদেন করে থাকেন। নুরজাহান আক্তার একসময় বিএমইটির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। চাকুরির সময় নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার পর দুদকের মামলায় চাকরি হারান। পরে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে ভয়ংকর মানব পাচার চক্র গড়ে তোলেন।
সরকারি তদারকির অভাব, সংবিধি লঙ্ঘন এবং সিন্ডিকেটের বেপরোয়া কার্যক্রমের ফলে বাংলাদেশে জনশক্তি রপ্তানি খাত অচলায়িত অবস্থায় পৌঁছেছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএমইটিতে আমূল সংস্কার না করা পর্যন্ত শ্রমিকদের দুর্ভোগ কমবে না। প্রতারণার শিকার হওয়া প্রবাসীরা প্রায়শই তাদের স্বপ্ন পূরণের পথ বন্ধ দেখতে পাচ্ছেন।
দুদক ইতোমধ্যে কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তবে সিন্ডিকেটের মূল খেলোয়াড়রা নিয়মভঙ্গ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারকে অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং বিএমইটিতে পুনর্গঠন আনা জরুরি। এছাড়া বিদেশগামী শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে নতুন নিয়ম এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া প্রবর্তনের দাবি তোলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিন্ডিকেটের কার্যক্রম বন্ধ না হলে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের সংকট আরও বাড়বে। বিদেশে পাড়ি জমানো শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার মুখে পড়বেন, আর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনশক্তি রপ্তানি খাতের স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।
বিএমইটিতে সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ড প্রমাণিত হওয়ার পরও, কিছু অসাধু কর্মকর্তা এখনও লুকানো উপায়ে এই চক্রকে সহায়তা করছেন। অফিস সময়ের বাইরে প্রবেশাধিকার, জাল ফাইল অনুমোদন এবং ভুয়া চুক্তিপত্র ছাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তারা সিন্ডিকেটের কার্যক্রমকে বহাল রাখছেন। এছাড়া, সরকারি সার্ভার ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের কারণে শ্রমিকদের তথ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
সিন্ডিকেটের অপকর্ম বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। বৈধভাবে প্রেরিত শ্রমিকের সংখ্যা কমছে, প্রবাসী শ্রমিকদের আয় এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হচ্ছে। ফলে প্রবাসী কল্যাণ এবং মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের সুস্থতা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএমইটিতে সরাসরি নজরদারি, সিন্ডিকেটের মূল খেলোয়াড়দের বিচার এবং প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। যদি এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে সিন্ডিকেটের দাপট এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে।