ঢাকা ০৯:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলাজট কমিয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব: আইনমন্ত্রী ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অনুমতি দেওয়া যাবে না : ট্রাম্প শিবগঞ্জ সীমান্তে ২৬ লাখ টাকার ভারতীয় ট্রাকের যন্ত্রাংশ জব্দ ভোলাহাটে সাংবাদিক রনি রজবের পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ বান্দরবান কৃষক দলের শীর্ষ পদে ‘হাইব্রিড’ নেতা অহিদুর! দেশের সব বন্দর ২৪ ঘণ্টা চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কেরালায় ‘যমজ’ বিয়ের আয়োজন, বর-কনে-পুরোহিত সবাই যমজ সমাজকে আলোকিত করতে যুব সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল লেখাপড়ার পাশাপাশি দক্ষতা অর্জনেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: প্রতিমন্ত্রী টুকু তুরাগে ৮০০ পিস ইয়াবাসহ তারার টেকের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী হৃদয় গ্রেপ্তার

নতুন পাকা ঘরের স্বপ্ন অপূর্ণই রইল শহীদ জাহাঙ্গীরের

অল্প অল্প টাকা জমিয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল একটি পাকা বাড়ি নির্মাণের। সেই বাড়িতেই বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সুখের সংসার গড়বেন—এমন স্বপ্ন বুকে নিয়ে দিন গুনছিলেন শান্তিরক্ষা মিশনে গিয়ে শহীদ জাহাঙ্গীর আলম।

বাড়িটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। ভেবেছিলেন, মিশন শেষে দেশে ফিরে অসমাপ্ত কাজ শেষ করে উঠবেন স্বপ্নের পাকা ঘরে। কিন্তু আর ফেরা হলো না তার। এক দুর্ঘটনায় তার সেই স্বপ্ন আজ স্বপ্নই থেকে গেল।

সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই সদস্য। স্বপ্নের পাকা বাড়িটি এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে শোক আর কান্নার প্রতীক হয়ে। নিহতের বৃদ্ধ বাবা-মা বারবার পাকা ঘরে ঢুকে কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, আমার বাবা আর এই ঘরে আসবে না।

নিহতের স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার বলেন, কত স্বপ্ন ছিল এই ঘর সাজাবো, আর টিনের ঘরে থাকতে হবে না। কিন্তু তুমি আর আসবে না। যদি জানতাম এই পোশাক আমার স্বামীকে কেড়ে নেবে, তাহলে কোনো দিনই মিশনে যেতে দিতাম না। এই কথা বলতে বলতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি।

নিহতের বাড়িতে শোক জানাতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পাকুন্দিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিফাত জাহান। স্বজনদের আহাজারি দেখে নিজেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন যে ক্যামেরার সামনে কথা বলতেও পারছিলেন না।

এ ছাড়া, খবর পেয়ে নিহতের বাড়িতে ছুটে আসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুপম দাস। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক খুদে বার্তায় জানায়, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘের একটি ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন শান্তিরক্ষী নিহত হন এবং অন্তত আটজন আহত হন। হামলার পরও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলমান রয়েছে। পুরো এলাকা এখনো অস্থিতিশীল রয়েছে।

নিহতদের মধ্যে একজন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামের আকন্দ বাড়ির হজরত আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (৩০)। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেসওয়েটার পদে কর্মরত ছিলেন। তার ব্যক্তিগত নম্বর (সিএস-২২০১০৯)।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিন ভাইয়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন মেজো। তার বড় ভাই মো. মোস্তফা প্রবাসে কর্মরত এবং ছোট ভাই মো. শাহিন মিয়া বাড়িতে কৃষিকাজ করেন।

প্রায় ১১ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের স্বপ্ন নিয়ে এক মাস সাত দিন আগে গত ৭ নভেম্বর—পরিবারের চোখের জল আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে তিনি সুদানে যান।

স্ত্রী ও তিন বছরের একমাত্র ছেলে ইরফানকে রেখে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। বাবার আদর কী—তা বোঝার আগেই চিরতরে পিতৃহারা হলো ছোট্ট ইরফান।
জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুর খবরে তারাকান্দি গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, শান্ত স্বভাবের এই মানুষটি দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেলেন। এলাকায় শোকের মাতম চলছে। সবাই এক কণ্ঠে শহীদ জাহাঙ্গীর আলমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন এবং তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলাজট কমিয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব: আইনমন্ত্রী

নতুন পাকা ঘরের স্বপ্ন অপূর্ণই রইল শহীদ জাহাঙ্গীরের

আপডেট সময় ০৭:৩৬:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

অল্প অল্প টাকা জমিয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল একটি পাকা বাড়ি নির্মাণের। সেই বাড়িতেই বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সুখের সংসার গড়বেন—এমন স্বপ্ন বুকে নিয়ে দিন গুনছিলেন শান্তিরক্ষা মিশনে গিয়ে শহীদ জাহাঙ্গীর আলম।

বাড়িটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। ভেবেছিলেন, মিশন শেষে দেশে ফিরে অসমাপ্ত কাজ শেষ করে উঠবেন স্বপ্নের পাকা ঘরে। কিন্তু আর ফেরা হলো না তার। এক দুর্ঘটনায় তার সেই স্বপ্ন আজ স্বপ্নই থেকে গেল।

সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই সদস্য। স্বপ্নের পাকা বাড়িটি এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে শোক আর কান্নার প্রতীক হয়ে। নিহতের বৃদ্ধ বাবা-মা বারবার পাকা ঘরে ঢুকে কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, আমার বাবা আর এই ঘরে আসবে না।

নিহতের স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার বলেন, কত স্বপ্ন ছিল এই ঘর সাজাবো, আর টিনের ঘরে থাকতে হবে না। কিন্তু তুমি আর আসবে না। যদি জানতাম এই পোশাক আমার স্বামীকে কেড়ে নেবে, তাহলে কোনো দিনই মিশনে যেতে দিতাম না। এই কথা বলতে বলতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি।

নিহতের বাড়িতে শোক জানাতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পাকুন্দিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিফাত জাহান। স্বজনদের আহাজারি দেখে নিজেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন যে ক্যামেরার সামনে কথা বলতেও পারছিলেন না।

এ ছাড়া, খবর পেয়ে নিহতের বাড়িতে ছুটে আসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুপম দাস। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক খুদে বার্তায় জানায়, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘের একটি ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন শান্তিরক্ষী নিহত হন এবং অন্তত আটজন আহত হন। হামলার পরও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলমান রয়েছে। পুরো এলাকা এখনো অস্থিতিশীল রয়েছে।

নিহতদের মধ্যে একজন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামের আকন্দ বাড়ির হজরত আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (৩০)। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেসওয়েটার পদে কর্মরত ছিলেন। তার ব্যক্তিগত নম্বর (সিএস-২২০১০৯)।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিন ভাইয়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন মেজো। তার বড় ভাই মো. মোস্তফা প্রবাসে কর্মরত এবং ছোট ভাই মো. শাহিন মিয়া বাড়িতে কৃষিকাজ করেন।

প্রায় ১১ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের স্বপ্ন নিয়ে এক মাস সাত দিন আগে গত ৭ নভেম্বর—পরিবারের চোখের জল আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে তিনি সুদানে যান।

স্ত্রী ও তিন বছরের একমাত্র ছেলে ইরফানকে রেখে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। বাবার আদর কী—তা বোঝার আগেই চিরতরে পিতৃহারা হলো ছোট্ট ইরফান।
জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুর খবরে তারাকান্দি গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, শান্ত স্বভাবের এই মানুষটি দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেলেন। এলাকায় শোকের মাতম চলছে। সবাই এক কণ্ঠে শহীদ জাহাঙ্গীর আলমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন এবং তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।