রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মিঠিপুর ইউনিয়নের লাট মিঠিপুর গ্রামের শিক্ষিত বেকার আলহাজ্ব ইউনুছ মিয়া এক সময় কৃষি কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। কৃষি সংসার জীবনে বিভিন্ন ফসল চাষ করেও তিনি কখনোই লাভের মুখ দেখেননি। ফলে এক পর্যায়ে আবাদ-বিশ্বাসে হতাশ হয়ে পড়েন।
অবশেষে বাড়ির পাশে থাকা একটি পরিত্যক্ত জমিতে শখের বশে পান চাষ শুরু করেন তিনি। শুরুতে একা একা কাজ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়লে দূরের গ্রাম থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই-একজন অভিজ্ঞ কৃষানকে তিনি কাজে নিয়োগ দেন। তাদের পরামর্শ, অভিজ্ঞতা ও লাগাতার শ্রমে গত তিন বছর ধরে তার পানের চাষে আসে অভাবনীয় সাফল্য।
বর্তমানে তার প্রায় ৩৫ শতক জমিতে পানের আবাদ রয়েছে। তিনি জানান, প্রতি সপ্তাহে বুধবার ও শনিবার মিঠিপুর ইউনিয়নের মাদারগঞ্জ হাট আড়তে তিনি পাইকারি পান বিক্রি করেন। প্রতি হাটে গড়ে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ বিরা পান বিক্রি হয়। এতে নিয়মিতভাবে ভালো আয় হচ্ছে, যা তার পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছে।
ওই বরজে কাজ করা কৃষকদের মতে, সাধারণত ফাল্গুন-চৈত্র মাস পানের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। বর্তমানে এলাকায় দেশি পান, হাইব্রিড পানসহ আরও দুই-একটি জাতের পান চাষ করা হচ্ছে। প্রতিটি জাতেরই বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে।
“উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামীণ সমাজে পান শুধু মুখরোচক অনুষঙ্গ নয়, এটি একটি প্রাচীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। অতিথি আপ্যায়ন, বিয়ে-শাদি, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক বৈঠকে পান খাওয়ানো সৌজন্য ও সম্মানের প্রতীক হিসেবে প্রচলিত। এ কারণে পান রসিক উত্তরবঙ্গে পানের চাহিদা অত্যন্ত ব্যাপক, বাজারজাতেও তেমন কোনো সমস্যা নেই। স্থানীয় হাট বাজারে এখনো দেশের নানা অঞ্চল থেকে উত্তরবঙ্গে পান আমদানি হয়। সরকারিভাবে এই খাতে সহায়তা বাড়ানো হলে নিজেদের চাহিদা পূরণ করে দেশের বাইরেও রপ্তানির মাধ্যমে স্বল্প পুঁজিতে, ঝুঁকিহীনভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব-এমনটাই জানান পান চাষি ইউনুছ হাজী।”
পান চাষী ইউনুছ হাজী আরও বলেন,পান চাষ খুব বেশি কঠিন না হলেও নিয়মিত যত্ন ও খাটুনির প্রয়োজন হয়। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার, পানি নিষ্কাশন, ছায়া ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সর্বদা ঘাম ঝরিয়ে কাজ করলে ফলন ভালো হয়। এই আবাদে ধারাবাহিকভাবে একাধিক শ্রমিকের প্রয়োজন হওয়ায় গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে।
আলহাজ্ব ইউনুছ মিয়ার পানের আবাদে দীর্ঘ তিন বছর ধরে দুর-দুরান্তের হিন্দু সম্প্রদায়ের কৃষানরা কাজ করছেন। এতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। তিনি আরো জানান গ্রাম অঞ্চলে এখনও এ ফসলের প্রতি ধর্মান্ধতা বা কুসংস্কার রয়েছে। যা মোটেই ঠিক নয় । ধর্মান্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে সকলের সম্মিলিত পরিশ্রমই যে উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি-তার জলজ্যান্ত প্রমাণ এই ইউনুছ হাজীর পান চাষ।
ইউনুছ মিয়া জানান, উত্তরাঞ্চলে বর্তমানে পানের চাহিদা খুবই বেশি। তাই বিক্রির জন্য কোনো বেগ পেতে হয় না। বাজারজাতকরণ সহজ হওয়ায় কৃষকেরা দ্রুত লাভবান হতে পারেন।
তবে এ ফসলের প্রতি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা নগণ্য । সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরও বিস্তার সম্ভব ।
তিনি আরও বলেন,“সরকারিভাবে যদি প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও কৃষি প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে গ্রামের বাড়ির আশপাশের অসংখ্য পরিত্যক্ত জমিতেও অনায়াসে পান চাষ করা যেত। এতে বহু বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হতো এবং তারা সংসারে স্বাবলম্বী হতে পারতো।
এ বিষয়ে এলাকার সচেতন মহলের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, এলাকায় ইউনুছ হাজীর পান চাষ একটা দৃষ্টান্ত । কৃষি বিভাগের সহযোগিতা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, উন্নত চারা সরবরাহ ও ন্যায্য বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে পীরগঞ্জসহ পুরো উত্তরাঞ্চলে পানের চাষ একটি লাভজনক অর্থকরী ফসলে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
তারিকুল ইসলাম তারিক পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি 






















