ঢাকা ০৬:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করে সরকারি গাড়ি নেননি ১৫ প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা রাষ্ট্রপতি পদে অলি আহমদের মনোনয়ন দুটি কেন? গোয়াইনঘাটে বিএনপি নেতা স্বপন-মান্নানের থাবায় তছনছ পিয়াইন নদী ধামরাইয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ডের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ মহিলা দল সভাপতির বিরুদ্ধে রাজশাহী বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কালিহাতীতে জসিম খানের নিজ অর্থায়নে গাছের চারা বিতরণ নওগাঁয় মেয়েকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে বাবা গ্রেপ্তার, কারাগারে প্রেরণ প্রেসক্লাব গংগাচড়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে এমপির মতবিনিময়  ফরিদপুরে ছেঁড়া-ফাটা ও অতি পুরাতন টাকায় চরম ভোগান্তি  শাহরাস্তিতে দিনব্যাপী সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ কর্মশালা সম্পন্ন

জুলাই গণহত্যা মামলার ২ আসামি এখনো মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক

জুলাই গণহত্যা মামলার দুই আসামি এখনও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে সদস্য হিসেবে রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন কারাগারে থাকলেও বাকি দু’জন রাজধানীর মতিঝিল এলাকার এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার ছত্রছায়ায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। মামলার এজাহারনামীয় আসামি হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকের এই দুই পরিচালক নিয়মিত বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত হয় আলোচিত ‘জুলাই গণহত্যা’। ওইদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার মিছিলে হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন নিহত ও অনেকে গুরুতর আহত হন। আহতদের মধ্যে মামলার বাদী মো. মুজাহিদুল ইসলাম বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাধীন।
ঘটনার পর মো. মুজাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় সি.আর. মামলা নং-৭৯৮/২০২৪ দায়ের করেন। মামলাটি দায়ের হয় দণ্ডবিধির ১৪৩/১৪৭/১৪৮/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৪৩৫/২০১/৪২৭/৫০৬(২)/৩৪ ধারা অনুসারে।
মামলার আসামিরা :
মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের দুই পরিচালক
মো. শহিদুল ইসলাম (৬৪), পিতা-মৃত এটিএম ওবায়দুল্লাহ, ঠিকানা: বাড়ি নং ১৯, এফ-এ-৩, রাস্তা ১২০, গুলশান নর্থ সাউথ, ঢাকা। এই মামলার ২০ নম্বর আসামী।
অন্যজন আকরাম হোসেন হুমায়ুন (৭২), পিতা-সামসুল হক মিয়া, বর্তমান ঠিকানা: ১৯৯ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি (লেভেল-১৬), ফেনী। এই মামলার ৩৯ আসামি।
গত ৮ এপ্রিল রাতে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকা থেকে বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক মোরশেদ আলমকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরদিন ম্যাজিস্ট্রেট শাহিন রেজা শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি কারাগারে রয়েছেন।
বাংলাদেশের ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (সংশোধিত) অনুযায়ী, পরিচালনা পরিষদের কোনো সদস্য পরপর তিনটি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকলে তার পরিচালক পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়। এছাড়া, কোনো পরিচালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ গঠন হলে তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, মামলার দুই আসামি এখনও ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি একজন কারাগারে থাকা অবস্থাতেও তার নামে পরিচালকের আর্থিক সুবিধা ও প্রিভিলেজ বহাল রয়েছে। অন্য দুই পরিচালক নিয়মিত বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থিত না থাকলেও তাদের পদ বাতিলের কোনো প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি।
একজন ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের পদে বহাল রাখছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “যদি কোনো পরিচালক ফৌজদারি মামলার আসামি হয়ে যান এবং অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ তার পদ বাতিল করতে বাধ্য। আইন লঙ্ঘন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।”
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে জানানো হয়, “বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়াধীন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে থেকে গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামিদের বহাল থাকা শুধু আইনের পরিপন্থী নয়, বরং ব্যাংকিং খাতের নৈতিক সুশাসনের জন্যও বড় হুমকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, শেয়ারহোল্ডার নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
একজন ব্যাংক আইন বিশ্লেষক বলেন, “যদি বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চায়, তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের পরিচালক পদ বাতিল করা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সে চেষ্টাই বা কে করবে?”
জুলাই গণহত্যা মামলার আসামি দুই পরিচালক এখনো মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বোর্ডে রয়েছেন। একজন কারাগারে, দু’জন রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে বহাল।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা লঙ্ঘন করেও তাদের পদে টিকে থাকা—বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের জবাবদিহির এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রইল।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করে সরকারি গাড়ি নেননি ১৫ প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা

জুলাই গণহত্যা মামলার ২ আসামি এখনো মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক

আপডেট সময় ০৮:৫৫:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫

জুলাই গণহত্যা মামলার দুই আসামি এখনও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে সদস্য হিসেবে রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন কারাগারে থাকলেও বাকি দু’জন রাজধানীর মতিঝিল এলাকার এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার ছত্রছায়ায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। মামলার এজাহারনামীয় আসামি হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকের এই দুই পরিচালক নিয়মিত বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত হয় আলোচিত ‘জুলাই গণহত্যা’। ওইদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার মিছিলে হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন নিহত ও অনেকে গুরুতর আহত হন। আহতদের মধ্যে মামলার বাদী মো. মুজাহিদুল ইসলাম বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাধীন।
ঘটনার পর মো. মুজাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় সি.আর. মামলা নং-৭৯৮/২০২৪ দায়ের করেন। মামলাটি দায়ের হয় দণ্ডবিধির ১৪৩/১৪৭/১৪৮/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৪৩৫/২০১/৪২৭/৫০৬(২)/৩৪ ধারা অনুসারে।
মামলার আসামিরা :
মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের দুই পরিচালক
মো. শহিদুল ইসলাম (৬৪), পিতা-মৃত এটিএম ওবায়দুল্লাহ, ঠিকানা: বাড়ি নং ১৯, এফ-এ-৩, রাস্তা ১২০, গুলশান নর্থ সাউথ, ঢাকা। এই মামলার ২০ নম্বর আসামী।
অন্যজন আকরাম হোসেন হুমায়ুন (৭২), পিতা-সামসুল হক মিয়া, বর্তমান ঠিকানা: ১৯৯ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি (লেভেল-১৬), ফেনী। এই মামলার ৩৯ আসামি।
গত ৮ এপ্রিল রাতে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকা থেকে বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক মোরশেদ আলমকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরদিন ম্যাজিস্ট্রেট শাহিন রেজা শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি কারাগারে রয়েছেন।
বাংলাদেশের ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (সংশোধিত) অনুযায়ী, পরিচালনা পরিষদের কোনো সদস্য পরপর তিনটি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকলে তার পরিচালক পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়। এছাড়া, কোনো পরিচালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ গঠন হলে তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, মামলার দুই আসামি এখনও ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি একজন কারাগারে থাকা অবস্থাতেও তার নামে পরিচালকের আর্থিক সুবিধা ও প্রিভিলেজ বহাল রয়েছে। অন্য দুই পরিচালক নিয়মিত বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থিত না থাকলেও তাদের পদ বাতিলের কোনো প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি।
একজন ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের পদে বহাল রাখছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “যদি কোনো পরিচালক ফৌজদারি মামলার আসামি হয়ে যান এবং অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ তার পদ বাতিল করতে বাধ্য। আইন লঙ্ঘন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।”
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে জানানো হয়, “বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়াধীন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে থেকে গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামিদের বহাল থাকা শুধু আইনের পরিপন্থী নয়, বরং ব্যাংকিং খাতের নৈতিক সুশাসনের জন্যও বড় হুমকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, শেয়ারহোল্ডার নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
একজন ব্যাংক আইন বিশ্লেষক বলেন, “যদি বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চায়, তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের পরিচালক পদ বাতিল করা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সে চেষ্টাই বা কে করবে?”
জুলাই গণহত্যা মামলার আসামি দুই পরিচালক এখনো মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বোর্ডে রয়েছেন। একজন কারাগারে, দু’জন রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে বহাল।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা লঙ্ঘন করেও তাদের পদে টিকে থাকা—বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের জবাবদিহির এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রইল।