ঢাকা ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যে দুর্নীতির আগুনে ফায়ার সার্ভিস আত্রাইয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে তরুণের করুন মৃত্যু অনিয়ম-দুর্নীতিতে ডিএসইর ২২ ব্রোকারেজ হাউসে লেনদেন বন্ধ ভূমধ্যসাগরে ভাসতে থাকা নৌকা থেকে ২৯ বাংলাদেশি উদ্ধার, ১০ জনের মৃত্যু সাফল্যের সুতোয় স্বপ্ন বুনে বিশ্বজয়ের পথে উইন্ডি গ্রুপ যারা দেশে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তাদেরকে নজরদারিতে রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ডেমরায় বাড়ি থেকে ২ বোমা সদৃশ বস্তু উদ্ধার জাপানে ভারি বৃষ্টিতে ৮ জনের মৃত্যু, টোকিও বিমানবন্দরে আটকা হাজারো যাত্রী মোংলা নদীতে দশম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণ হবে : নৌপরিবহনমন্ত্রী যারা পালিয়ে যায়, তার আর দেশে ফিরতে পারে না: রিজভী

রাজনীতি যদি হয় সেবার হাতিয়ার, তবে ড. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু তার জীবন্ত উদাহরণ

এই ব্যতিক্রমধর্মী সামাজিক উদ্যোগ এলাকাবাসীর মাঝে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন আরও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সমাজকে বদলে দিতে হলে এমন নেতৃত্বই আজকের সময়ে সবচেয়ে প্রয়োজন। সমাজ পরিবর্তনের অনন্য দৃষ্টান্ত — নিজ হাতে রাস্তা পরিষ্কারে নেমে প্রমাণ দিলেন ড. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু, রাজনীতিকে সেবার মাধ্যম হিসেবেই দেখেন ঢাকা-১৯ আসনের বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী, জনপ্রিয় নেতা ড. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু। তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি তিনি নিজ হাতে ঝাড়ু ও শাবল নিয়ে রাস্তাঘাট পরিষ্কারের কাজে অংশ নেন। সঙ্গে ছিলেন তার দলীয় নেতা-কর্মী, নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের জনগণ।
সবুজ টি-শার্ট গায়ে, মুখে আন্তরিকতা ও চোখে দেশ ও মানুষের জন্য ভালোবাসা — এই ছবিগুলো বলছে, তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি একজন সত্যিকারের সমাজসেবক। কোনো প্রচার নয়, নয় কোনো লোক দেখানো কর্মসূচি — বরং সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থেকেই তার এই উদ্যোগ।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন,
“বাবু ভাই শুধু কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করেন তিনি মানুষের জন্য রাজনীতি করেন। এত বড় নেতা হয়ে তিনি যখন রাস্তা পরিষ্কার করেন, তখন আমরা অনুপ্রাণিত হই।”
নারী, পুরুষ, শিশু—সবাই তার সঙ্গে এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বলেন, আমরা একজন সৎ, মানবিক ও নিবেদিতপ্রাণ নেতার সঙ্গে পথ হাঁটছি। সমাজ পরিবর্তনের নেতৃত্ব ড. বাবু ভাই দিতে পারবেন, এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।”*
ড. সালাউদ্দিন বাবু বলেন,
“দেশের মানুষ যদি নিজেদের আশপাশটা পরিষ্কার রাখে, পরিবেশ ঠিক রাখে, তবেই একটি উন্নত সমাজ গড়ে উঠবে। নেতা হিসেবে আগে নিজে কাজ শুরু করতে হবে।”

মিডিয়াকর্মীরা প্রশ্ন করলেন আপনি তো একজন ডক্টর ছিলেন কিভাবে রাজনীতিতে এলেন, প্রশ্নের জবাবের ডঃ মুহাম্মদ দেওয়ান সালাউদ্দিন বাবু বলেন তার জীবন কাহিনী,তার বাবা এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কথা,

সালাউদ্দিন বাবু :- ভবিষ্যতে আমার ছোট ভাই বিপ্লবকে রাজনীতিতে আনার ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহ ছিল আব্বার। সে কারণেই বিপ্লবকে জিরাবো উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি ডাক্তারি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে নিজ এলাকায় বড় একটি প্রাইভেট হাসপাতাল নির্মাণ করে নিরীহ, দুস্থ রোগীর কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করব। এ রকম ভাবনাই ছিল আব্বার। কিন্তু আব্বার এই ভাবনা বাস্তবে মেলেনি। আব্বা হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়ায় পুরো সংসারের অনেক দায়িত্ব আমার হাতে ন্যস্ত হয়। মা তো আমাদের সর্বেসর্বা অভিভাবক আছেনই। কিন্তু আব্বার রেখে যাওয়া জমি রক্ষণাবেক্ষণ, জমি চিহ্নিতকরণ, জমির খাজনা দেওয়া, খারিজ করা, দলিল তোলা, পরচা তোলা ও আনুষঙ্গিক কাজকর্ম বিশাল এক যজ্ঞ। দুই-এক মাস বা দুই-তিন বছরে এগুলোর কাজ শেষ করা সোজা ব্যাপার নয়। আস্তে আস্তে তা গোছানোর কাজ চলল এবং আল্লাহর ইচ্ছায় অনেকের সহায়তায় তা ভালোভাবেই গুছিয়ে ফেলি।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পতন হয়। নতুন সংসদ নির্বাচনের জন্য বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে আব্বা (দেওয়ান মোঃ ইদ্রিস) সাভার এলাকার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তখন কাশিমপুর ও কোনাবাড়ি ইউনিয়নসহ (বর্তমানে গাজীপুর জেলার অন্তর্গত) সাভার সংসদীয় আসনে মোট ইউনিয়ন ছিল ১৪টি। তখনও সাভার পৌরসভা গঠিত হয়নি। এরশাদ বিএনপিকে হটিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করল। প্রায় নয় বছর ছলেবলেকৌশলে ক্ষমতায় টিকে থাকল। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়েছে। আমরা পারিবারিকভাবে আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, আমার বড় বোন মিনি আপার স্বামী হুমায়ূন ভাইয়ের জন্য সাভার আসনে বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করি। আম্মা ওই সময়আব্বার ঘনিষ্ঠজন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর (সাবেক রাষ্ট্রপতি) নিকট হুমায়ূন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করেন। বদরুদ্দোজা চৌধুরী স্পষ্ট বলে দিলেন, ভাবি, আপনি মনোনয়ন চান কিংবা আপনার বড় ছেলে চান, আমি সরাসরি সুপারিশ করব, ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে অনুরোধ করব আপনার পরিবারের মধ্য থেকেই মনোনয়ন দেওয়ার।’ তিনি আরও বললেন, ‘শহীদ জিয়া দেওয়ান ইদ্রিস সাহেবকে পছন্দ করতেন। তিনি অনেক জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। আপনারা কেউ নির্বাচন করলে ফলাফল খারাপ হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। কিন্তু আপনার বড় মেয়ের জামাই মনোনয়ন পাবেন কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা আমি দিতে পারছি না। কারণ মেয়ের জামাই দেওয়ান পরিবারের ঐতিহ্য এবং উত্তরাধিকারের মধ্যে পড়ে না।’
মা নিরাশ হয়ে ফিরে এলেন। মা আরও দু-একজনের কাছে হুমায়ূন ভাইকে নিয়ে গেলেন কিন্তু সব জায়গায় মোটামুটি একই রকম বক্তব্য পাওয়া গেল। মনে মনে ধরে নিলাম, হুমায়ূন ভাই মনোনয়ন পাচ্ছেন না। আব্বা মারা যাবার পর আমরা ভাইবোন এতই চিন্তাযুক্ত এবং হতাশার মধ্যে ছিলাম যে, আমাকে দল মনোনয়ন দিলেও ওই সময় আমার বা আমার পরিবারের কোনো সাহস বা মনোবল ছিল না, সাভারের মতো জায়গায় এত বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদদের সঙ্গে নির্বাচন করার। যেহেতু আমার বা আম্মার কোনো মানসিক অবস্থা ছিল না নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার, তাই বাধ্য হয়েই আব্বার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আমাদের পুরো পরিবার হুমায়ূন ভাইয়ের পক্ষে অবস্থান নিলাম এবং হুমায়ূন ভাই মনোনয়নযুদ্ধে ভালোভাবে তদবির চালিয়ে যেতে লাগলেন। কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ধানমন্ডি লেকের পাশে একটি বাসায় বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু হলো। ঢাকা বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট দিনে সাভারের এই আসনের জন্য ১২/১৩ জন সাক্ষাৎকার দিলেন। ওই সময় বাজারে গুঞ্জন ছিল এলিগেন্ট টেইলারের মালিক জনাব নেয়ামতউল্লাহ সাবুকে নাকি সাভার আসনের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হবে। কারণ ওই সময় বিএনপির এক প্রভাবশালী স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেনেন্ট কর্নেল (অব.) মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সঙ্গে সাবু ভাইয়ের বিশেষ সম্পর্কের কথা অনেকেই শুনেছে। যদিও আমি বিশ্বাস করিনি, যতক্ষণ পর্যন্ত অফিসিয়ালি নাম ঘোষণা না হচ্ছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএসএম মুস্তাফিজুর রহমানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বেশ সমৃদ্ধ। ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালে বাগেরহাট ২ আসন থেকে তিনি সাংসদ নির্বাচিত হন। বিএনপির শাসনামলে বিভিন্ন সময় তিনি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৫-৮৬ সালে বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পরলোকগমন করেন ১৯৯৬ সালের ৩০ নভেম্বর।
নেয়ামতউল্লাহ সাবু ভাইয়ের বাড়ি আমিনবাজারের টেপুটির টেক, তার বাবার নাম ডা. শফিউল্লাহ। ডা. শফিউল্লাহর বর্তমান বাসা ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোডে। সাবু ভাই উঁচু-লম্বা। যে কেউ একবার দেখলে তাকে ভুলবে না। সব দিক ম্যানেজ করে অবশেষে নেয়ামতউল্লাহ সাবুই বিএনপির মনোনয়ন পেলেন আসন্ন সংসদ নির্বাচনে (১৯৯১) সাভার থেকে অংশগ্রহণ করার জন্য।
ওই নির্বাচনে আমাকে ইয়ারপুর ইউনিয়ন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক করা হলো। আমিও এই কঠিন দায়িত্ব পেয়ে কাজ শুরু করে দিলাম। দুই-একবার সাবু ভাইয়ের অনুরোধে অন্যান্য ইউনিয়নে নির্বাচনে প্রচারণার জন্য যেতে হলো, কোথাও কোথাও দেওয়ান ইদ্রিস সাহেবের ছেলে হিসেবে বক্তৃতাও দিতে হলো। দেওয়ান ইদ্রিস সাহেবের ছেলে একজন ডাক্তার আছেন, এটা জেনে অনেক ইউনিয়নের মুরুব্বি এবং বয়স্ক বিএনপি নেতা-কর্মী, যারা আব্বার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, তারা আমার সঙ্গে আগ্রহ নিয়ে দেখা করতে এলেন, আমাকে ধন্যবাদ জানালেন। আমি রাজনীতিতে আছি এটা দেখে তারা অনেকে খুশি হলেন। আমি ভালো বক্তৃতা দিতে পারি না, আবার মনে মনে যা অগ্রিম চিন্তা করি বক্তৃতার সময় উত্তেজনায়, ভয়ে, বিচলিত হয়ে অনেক কিছুই মনে থাকে না। আবার অন্য ইউনিয়নে গিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার চেয়ে নিজ এলাকায় গণসংযোগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের আগের সাত দিন আমি শুধু ইয়ারপুর ইউনিয়নে আমার যাবতীয় সময় দিলাম। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনের আগে ইয়ারপুর ইউনিয়নের ভোটারদের বিএনপি এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি যে আগ্রহ এবং উচ্ছ্বাস আমি দেখি, তাতে আমি নিশ্চিত
ছিলাম বিএনপির প্রার্থী নেয়ামতউল্লাহ সাবু বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। তা-ই হলো, ইয়ারপুর ইউনিয়নের নয়টি কেন্দ্রে বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেন আমাদের বিএনপি প্রার্থী নেয়ামতউল্লাহ সাবু। আমিও যারপরনাই খুশি, উৎফুল্ল। জীবনের প্রথম একটি রাজনৈতিক দায়িত্ব আব্বার অনুপস্থিতিতে
দক্ষতার সঙ্গে পালন করেই শতভাগ সাফল্য। ওই সময় অনেক পারিবারিক বিশ্বস্ত লোককে বলতে শুনেছি, ‘আজ যদি তুমি মনোনয়ন পেতে একই পরিশ্রমে তুমিও এমপি হতে। এই এলাকার মানুষ তোমাদেরই ভোট দিতে পছন্দ করে, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, অন্য কাউকে নয়। এরপর তুমি নির্বাচন করবে, অন্য কারো জন্য ভোট চাইতে আর আমাদের কাছে আসবে না।’ আমি মনে মনে ভাবি, এরা বলে কী? আমি এমপি হব, সেটা আবার কবে? এও কি সম্ভব? ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ নেয়ামতউল্লাহ সাবু প্রায় ৬৩ হাজার ভোট পেয়ে সাভারের সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের শামসুদ্দোহা খান মজলিশ। তিনি পান প্রায় ৩৭হাজার ভোট। খান মজলিশ সাহেব ১৯৮৬ সালে তৎকালীন ঢাকা ১২ আসনে (সাভার) সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি গরলোকগমন করেন ২০০২ সালের ৩১ জানুয়ারি। বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করে।
শুরু হয় নেয়ামতউল্লাহ সাবুর নেতৃত্বে সাভারে নতুনধারার রাজনীতি। নেয়ামতউল্লাহ সাবুর ওপরের লবিং খুব শক্ত ছিল, ভালো ছিল। কিন্তু যেহেতু জীবনে কখনো রাজনীতি করেননি, ন্যূনতম কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও ছিল না, কোথায় কী বলতে হয়, দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হয়, দলকে কীভাবে সুসংগঠিত করতে হয়, সাধারণ ভোটারদের এলাকাভিত্তিক সমস্যা কীভাবে দ্রুত সমাধান করা যায় এসব তিনি কিছুই জানতেন না। ফলে দ্রুত তার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রচণ্ডভাবে হ্রাস পায়। দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে তার নেতৃত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। সংগত কারণেই ২-১ বছরের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত লোপ পেতে থাকে। ভদ্রলোক সেটা হয়তো বুঝতেও পারলেন না। আমি ঢাকা জেলা বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হই। ১৯৯৩ সালে সাভার উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সাংগঠনিক সভা হয় এবং জেলা বিএনপির প্রতিনিধির সরেজমিন উপস্থিতিতে বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপি কমিটি গঠিত হয়। ইয়ারপুর ইউনিয়নে যেদিন সম্মেলন সেদিন আমিও উপস্থিত ছিলাম। তখন আমি দশম বিসিএস (স্বাস্থ্য) পাস করে ১১ ডিসেম্বর ১৯৯১ থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে চাকরিরত। ছুটিতে বাড়িতে এসেছি। ইয়ারপুর ইউনিয়নের বিএনপি নেতা-কর্মীরা স্থানীয় সংসদ-সদস্য নেয়ামতউল্লাহ সাবুর উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে আমাকে সভাপতি এবং নুরুল হক দেওয়ানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
গুমাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ইউনিয়ন বিএনপির সম্মেলন হলো। সাভার উপজেলা বিএনপির সম্মানিত সভাপতি আলহাজ ওমর আলী স্যার এবং সাধারণ সম্পাদক মো. জামালউদ্দিন সরকার এই কমিটি অনুমোদন দেন। আমি জানি না এমপি মহোদয়ের ভিন্ন কোনো ইচ্ছে ছিল কিনা, কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে তিনি কোনো প্রতিবাদ বা জনমতের বাইরে কিছুই বললেন না। আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি এলাকা ত্যাগ করলেন।
ইয়ারপুর ইউনিয়ন বিএনপির সব নেতা অনেক খুশি আমাকে এই পদে নির্বাচিত করে। ইয়ারপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতারা ভাবতে শুরু করলেন, এই পদের মাধ্যমে আগামী দিনে আমার রাজনীতির পথ চলা সুগম হলো এবং আব্বার মতো আমিও একসময় সাভারে নেতৃত্ব দেব। এই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির পদ তারই ধারাবাহিকতা।
১৯৯৩ সালে বলিয়ারপুর-হেমায়েতপুরের মধ্যবর্তী স্থানে (কফিল ভাইয়ের পেট্রোল পাম্প সনি ফিলিং স্টেশনের পাশে) সাভার উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটি হয়। এই সময় ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এবং সাধারণ সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান। সাভার উপজেলার নতুন কমিটির সভাপতি হলেন মো. জামালউদ্দিন সরকার (বাড়ি: তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন) এবং সাধারণ সম্পাদক মো. কফিলউদ্দিন (বাড়ি: আমিনবাজার ইউনিয়ন)। আমাকে সিনিয়র সভাপতি এবং হুমায়ূন ভাইকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। অনেক কম পরিশ্রমে একটি সম্মানজনক পদ আমি পেলাম। এই ব্যাপারে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেন ওমর আলী স্যার। স্যারের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। (ওমর আলী স্যার সাভার উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি)।
১৯৯২ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি আমি বিয়ে করি। ওই দিন রাতে সেনাকুঞ্জে আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। সাধারণত দু-তিন দিনের মধ্যে বউভাত অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু আগে থেকে বুকিং করা ছিল না বলে ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে লেডিস ক্লাবে বউভাত অনুষ্ঠান হলো। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ থেকে শুরু হলো নতুন জীবন, নতুনভাবে পথ চলা। আমি ১৯৯১ সালের ১১ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ ইটনা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করি (কিশোরগঞ্জের ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন এই তিনটি উপজেলা বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের নির্বাচনি এলাকা)। ঢাকা বিভাগের একটি জেলার একটি উপজেলা এতটা দুর্গম হতে পারে, তা কেউ চিন্তাও করতে পারবেন না। ঢাকা থেকে ১০-১২ ঘণ্টা সময় লাগে ইটনা পৌঁছাতে। জীবনে প্রথম চাকরি, নতুন এক অভিজ্ঞতায় সিক্ত হলাম। ইটনাতে ১৯৯১ সালে বিদ্যুৎ ছিল না। কিছুসময়ের জন্য হাসপাতালে এবং আমাদের থাকার জায়গাটায় (ডাক্তারদের জন্য নির্মিত হোস্টেল) জেনারেটর চলত। আমি সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি হওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৯৩ সালের পূর্ব মার্চ পর্যন্ত সেখানে বিদ্যুৎ ছিল না। স্ত্রী রিতার সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কখনো কখনো আলাপ হয়। মাঝে মাঝে আমিও মজা করি, যখন আমি এমপি হব তখন কিন্তু আমি তোমাকে এত সময় দিতে পারব না। তখন জনগণের অগ্রাধিকার।
একদিন আসাদ গেটের আড়ৎ থেকে কেনাকাটা করে রিকশায় ইন্দিরা রোডে যাচ্ছি মানিক মিয়া এভিনিউ সংসদ ভবনের পাশ দিয়ে। বাম দিকে আঙুল তুলে রিতাকে বলি, একদিন ওই ভবনের ভেতর আমাকে অনেক সময় কাটাতে হবে। রিতা হাসে কিন্তু আমি গম্ভীর হয়েই কথাটা বলি। এ রকম আরও অনেক স্মৃতি আছে যা ওই সময়ের জন্য মজা ছিল কিন্তু পরে তা সত্যে পরিণত হয়েছে। সাভার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে বদলি হয়ে আসি। ডাক্তারদের নিজ উপজেলায় বদলি হতে বা কাজ করতে সরকারি কোনো বাধানিষেধ নেই। শুরু হলো নিজ উপজেলার জনগণের স্বাস্থ্যসেবা। স্থানীয় এমপি নেয়ামতউল্লাহ সাবুর কিছু কিছু সিদ্ধান্ত ও অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাভারের বিএনপি নেতারা হতাশ। আগামীতে বিএনপিকে এই আসন ধরে রাখতে নতুন নেতা প্রয়োজন। বিএনপির এই আসনে জিততে পারবে যদি নেয়ামতউল্লাহ সাবু মনোনয়ন না পান। জনগণের এমনই ধারণা। বিএনপি নেতা-কর্মীরাও তাই বলেন।
জনগণের চাহিদা অনুযাই আমি হলাম ঢাকা ১৯ আসনের এমপি,আগামী আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে আমার সারাটা জীবন আপনাদের সেবায় উৎসর্গ করবো ইনশাল্লাহ,

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যে দুর্নীতির আগুনে ফায়ার সার্ভিস

রাজনীতি যদি হয় সেবার হাতিয়ার, তবে ড. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু তার জীবন্ত উদাহরণ

আপডেট সময় ০৪:৩৭:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

এই ব্যতিক্রমধর্মী সামাজিক উদ্যোগ এলাকাবাসীর মাঝে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন আরও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সমাজকে বদলে দিতে হলে এমন নেতৃত্বই আজকের সময়ে সবচেয়ে প্রয়োজন। সমাজ পরিবর্তনের অনন্য দৃষ্টান্ত — নিজ হাতে রাস্তা পরিষ্কারে নেমে প্রমাণ দিলেন ড. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু, রাজনীতিকে সেবার মাধ্যম হিসেবেই দেখেন ঢাকা-১৯ আসনের বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী, জনপ্রিয় নেতা ড. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু। তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি তিনি নিজ হাতে ঝাড়ু ও শাবল নিয়ে রাস্তাঘাট পরিষ্কারের কাজে অংশ নেন। সঙ্গে ছিলেন তার দলীয় নেতা-কর্মী, নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের জনগণ।
সবুজ টি-শার্ট গায়ে, মুখে আন্তরিকতা ও চোখে দেশ ও মানুষের জন্য ভালোবাসা — এই ছবিগুলো বলছে, তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি একজন সত্যিকারের সমাজসেবক। কোনো প্রচার নয়, নয় কোনো লোক দেখানো কর্মসূচি — বরং সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থেকেই তার এই উদ্যোগ।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন,
“বাবু ভাই শুধু কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করেন তিনি মানুষের জন্য রাজনীতি করেন। এত বড় নেতা হয়ে তিনি যখন রাস্তা পরিষ্কার করেন, তখন আমরা অনুপ্রাণিত হই।”
নারী, পুরুষ, শিশু—সবাই তার সঙ্গে এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বলেন, আমরা একজন সৎ, মানবিক ও নিবেদিতপ্রাণ নেতার সঙ্গে পথ হাঁটছি। সমাজ পরিবর্তনের নেতৃত্ব ড. বাবু ভাই দিতে পারবেন, এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।”*
ড. সালাউদ্দিন বাবু বলেন,
“দেশের মানুষ যদি নিজেদের আশপাশটা পরিষ্কার রাখে, পরিবেশ ঠিক রাখে, তবেই একটি উন্নত সমাজ গড়ে উঠবে। নেতা হিসেবে আগে নিজে কাজ শুরু করতে হবে।”

মিডিয়াকর্মীরা প্রশ্ন করলেন আপনি তো একজন ডক্টর ছিলেন কিভাবে রাজনীতিতে এলেন, প্রশ্নের জবাবের ডঃ মুহাম্মদ দেওয়ান সালাউদ্দিন বাবু বলেন তার জীবন কাহিনী,তার বাবা এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কথা,

সালাউদ্দিন বাবু :- ভবিষ্যতে আমার ছোট ভাই বিপ্লবকে রাজনীতিতে আনার ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহ ছিল আব্বার। সে কারণেই বিপ্লবকে জিরাবো উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি ডাক্তারি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে নিজ এলাকায় বড় একটি প্রাইভেট হাসপাতাল নির্মাণ করে নিরীহ, দুস্থ রোগীর কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করব। এ রকম ভাবনাই ছিল আব্বার। কিন্তু আব্বার এই ভাবনা বাস্তবে মেলেনি। আব্বা হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়ায় পুরো সংসারের অনেক দায়িত্ব আমার হাতে ন্যস্ত হয়। মা তো আমাদের সর্বেসর্বা অভিভাবক আছেনই। কিন্তু আব্বার রেখে যাওয়া জমি রক্ষণাবেক্ষণ, জমি চিহ্নিতকরণ, জমির খাজনা দেওয়া, খারিজ করা, দলিল তোলা, পরচা তোলা ও আনুষঙ্গিক কাজকর্ম বিশাল এক যজ্ঞ। দুই-এক মাস বা দুই-তিন বছরে এগুলোর কাজ শেষ করা সোজা ব্যাপার নয়। আস্তে আস্তে তা গোছানোর কাজ চলল এবং আল্লাহর ইচ্ছায় অনেকের সহায়তায় তা ভালোভাবেই গুছিয়ে ফেলি।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পতন হয়। নতুন সংসদ নির্বাচনের জন্য বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে আব্বা (দেওয়ান মোঃ ইদ্রিস) সাভার এলাকার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তখন কাশিমপুর ও কোনাবাড়ি ইউনিয়নসহ (বর্তমানে গাজীপুর জেলার অন্তর্গত) সাভার সংসদীয় আসনে মোট ইউনিয়ন ছিল ১৪টি। তখনও সাভার পৌরসভা গঠিত হয়নি। এরশাদ বিএনপিকে হটিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করল। প্রায় নয় বছর ছলেবলেকৌশলে ক্ষমতায় টিকে থাকল। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়েছে। আমরা পারিবারিকভাবে আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, আমার বড় বোন মিনি আপার স্বামী হুমায়ূন ভাইয়ের জন্য সাভার আসনে বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করি। আম্মা ওই সময়আব্বার ঘনিষ্ঠজন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর (সাবেক রাষ্ট্রপতি) নিকট হুমায়ূন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করেন। বদরুদ্দোজা চৌধুরী স্পষ্ট বলে দিলেন, ভাবি, আপনি মনোনয়ন চান কিংবা আপনার বড় ছেলে চান, আমি সরাসরি সুপারিশ করব, ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে অনুরোধ করব আপনার পরিবারের মধ্য থেকেই মনোনয়ন দেওয়ার।’ তিনি আরও বললেন, ‘শহীদ জিয়া দেওয়ান ইদ্রিস সাহেবকে পছন্দ করতেন। তিনি অনেক জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। আপনারা কেউ নির্বাচন করলে ফলাফল খারাপ হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। কিন্তু আপনার বড় মেয়ের জামাই মনোনয়ন পাবেন কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা আমি দিতে পারছি না। কারণ মেয়ের জামাই দেওয়ান পরিবারের ঐতিহ্য এবং উত্তরাধিকারের মধ্যে পড়ে না।’
মা নিরাশ হয়ে ফিরে এলেন। মা আরও দু-একজনের কাছে হুমায়ূন ভাইকে নিয়ে গেলেন কিন্তু সব জায়গায় মোটামুটি একই রকম বক্তব্য পাওয়া গেল। মনে মনে ধরে নিলাম, হুমায়ূন ভাই মনোনয়ন পাচ্ছেন না। আব্বা মারা যাবার পর আমরা ভাইবোন এতই চিন্তাযুক্ত এবং হতাশার মধ্যে ছিলাম যে, আমাকে দল মনোনয়ন দিলেও ওই সময় আমার বা আমার পরিবারের কোনো সাহস বা মনোবল ছিল না, সাভারের মতো জায়গায় এত বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদদের সঙ্গে নির্বাচন করার। যেহেতু আমার বা আম্মার কোনো মানসিক অবস্থা ছিল না নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার, তাই বাধ্য হয়েই আব্বার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আমাদের পুরো পরিবার হুমায়ূন ভাইয়ের পক্ষে অবস্থান নিলাম এবং হুমায়ূন ভাই মনোনয়নযুদ্ধে ভালোভাবে তদবির চালিয়ে যেতে লাগলেন। কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ধানমন্ডি লেকের পাশে একটি বাসায় বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু হলো। ঢাকা বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট দিনে সাভারের এই আসনের জন্য ১২/১৩ জন সাক্ষাৎকার দিলেন। ওই সময় বাজারে গুঞ্জন ছিল এলিগেন্ট টেইলারের মালিক জনাব নেয়ামতউল্লাহ সাবুকে নাকি সাভার আসনের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হবে। কারণ ওই সময় বিএনপির এক প্রভাবশালী স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেনেন্ট কর্নেল (অব.) মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সঙ্গে সাবু ভাইয়ের বিশেষ সম্পর্কের কথা অনেকেই শুনেছে। যদিও আমি বিশ্বাস করিনি, যতক্ষণ পর্যন্ত অফিসিয়ালি নাম ঘোষণা না হচ্ছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএসএম মুস্তাফিজুর রহমানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বেশ সমৃদ্ধ। ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালে বাগেরহাট ২ আসন থেকে তিনি সাংসদ নির্বাচিত হন। বিএনপির শাসনামলে বিভিন্ন সময় তিনি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৫-৮৬ সালে বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পরলোকগমন করেন ১৯৯৬ সালের ৩০ নভেম্বর।
নেয়ামতউল্লাহ সাবু ভাইয়ের বাড়ি আমিনবাজারের টেপুটির টেক, তার বাবার নাম ডা. শফিউল্লাহ। ডা. শফিউল্লাহর বর্তমান বাসা ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোডে। সাবু ভাই উঁচু-লম্বা। যে কেউ একবার দেখলে তাকে ভুলবে না। সব দিক ম্যানেজ করে অবশেষে নেয়ামতউল্লাহ সাবুই বিএনপির মনোনয়ন পেলেন আসন্ন সংসদ নির্বাচনে (১৯৯১) সাভার থেকে অংশগ্রহণ করার জন্য।
ওই নির্বাচনে আমাকে ইয়ারপুর ইউনিয়ন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক করা হলো। আমিও এই কঠিন দায়িত্ব পেয়ে কাজ শুরু করে দিলাম। দুই-একবার সাবু ভাইয়ের অনুরোধে অন্যান্য ইউনিয়নে নির্বাচনে প্রচারণার জন্য যেতে হলো, কোথাও কোথাও দেওয়ান ইদ্রিস সাহেবের ছেলে হিসেবে বক্তৃতাও দিতে হলো। দেওয়ান ইদ্রিস সাহেবের ছেলে একজন ডাক্তার আছেন, এটা জেনে অনেক ইউনিয়নের মুরুব্বি এবং বয়স্ক বিএনপি নেতা-কর্মী, যারা আব্বার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, তারা আমার সঙ্গে আগ্রহ নিয়ে দেখা করতে এলেন, আমাকে ধন্যবাদ জানালেন। আমি রাজনীতিতে আছি এটা দেখে তারা অনেকে খুশি হলেন। আমি ভালো বক্তৃতা দিতে পারি না, আবার মনে মনে যা অগ্রিম চিন্তা করি বক্তৃতার সময় উত্তেজনায়, ভয়ে, বিচলিত হয়ে অনেক কিছুই মনে থাকে না। আবার অন্য ইউনিয়নে গিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার চেয়ে নিজ এলাকায় গণসংযোগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের আগের সাত দিন আমি শুধু ইয়ারপুর ইউনিয়নে আমার যাবতীয় সময় দিলাম। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনের আগে ইয়ারপুর ইউনিয়নের ভোটারদের বিএনপি এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি যে আগ্রহ এবং উচ্ছ্বাস আমি দেখি, তাতে আমি নিশ্চিত
ছিলাম বিএনপির প্রার্থী নেয়ামতউল্লাহ সাবু বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। তা-ই হলো, ইয়ারপুর ইউনিয়নের নয়টি কেন্দ্রে বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেন আমাদের বিএনপি প্রার্থী নেয়ামতউল্লাহ সাবু। আমিও যারপরনাই খুশি, উৎফুল্ল। জীবনের প্রথম একটি রাজনৈতিক দায়িত্ব আব্বার অনুপস্থিতিতে
দক্ষতার সঙ্গে পালন করেই শতভাগ সাফল্য। ওই সময় অনেক পারিবারিক বিশ্বস্ত লোককে বলতে শুনেছি, ‘আজ যদি তুমি মনোনয়ন পেতে একই পরিশ্রমে তুমিও এমপি হতে। এই এলাকার মানুষ তোমাদেরই ভোট দিতে পছন্দ করে, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, অন্য কাউকে নয়। এরপর তুমি নির্বাচন করবে, অন্য কারো জন্য ভোট চাইতে আর আমাদের কাছে আসবে না।’ আমি মনে মনে ভাবি, এরা বলে কী? আমি এমপি হব, সেটা আবার কবে? এও কি সম্ভব? ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ নেয়ামতউল্লাহ সাবু প্রায় ৬৩ হাজার ভোট পেয়ে সাভারের সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের শামসুদ্দোহা খান মজলিশ। তিনি পান প্রায় ৩৭হাজার ভোট। খান মজলিশ সাহেব ১৯৮৬ সালে তৎকালীন ঢাকা ১২ আসনে (সাভার) সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি গরলোকগমন করেন ২০০২ সালের ৩১ জানুয়ারি। বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করে।
শুরু হয় নেয়ামতউল্লাহ সাবুর নেতৃত্বে সাভারে নতুনধারার রাজনীতি। নেয়ামতউল্লাহ সাবুর ওপরের লবিং খুব শক্ত ছিল, ভালো ছিল। কিন্তু যেহেতু জীবনে কখনো রাজনীতি করেননি, ন্যূনতম কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও ছিল না, কোথায় কী বলতে হয়, দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হয়, দলকে কীভাবে সুসংগঠিত করতে হয়, সাধারণ ভোটারদের এলাকাভিত্তিক সমস্যা কীভাবে দ্রুত সমাধান করা যায় এসব তিনি কিছুই জানতেন না। ফলে দ্রুত তার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রচণ্ডভাবে হ্রাস পায়। দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে তার নেতৃত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। সংগত কারণেই ২-১ বছরের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত লোপ পেতে থাকে। ভদ্রলোক সেটা হয়তো বুঝতেও পারলেন না। আমি ঢাকা জেলা বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হই। ১৯৯৩ সালে সাভার উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সাংগঠনিক সভা হয় এবং জেলা বিএনপির প্রতিনিধির সরেজমিন উপস্থিতিতে বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপি কমিটি গঠিত হয়। ইয়ারপুর ইউনিয়নে যেদিন সম্মেলন সেদিন আমিও উপস্থিত ছিলাম। তখন আমি দশম বিসিএস (স্বাস্থ্য) পাস করে ১১ ডিসেম্বর ১৯৯১ থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে চাকরিরত। ছুটিতে বাড়িতে এসেছি। ইয়ারপুর ইউনিয়নের বিএনপি নেতা-কর্মীরা স্থানীয় সংসদ-সদস্য নেয়ামতউল্লাহ সাবুর উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে আমাকে সভাপতি এবং নুরুল হক দেওয়ানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
গুমাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ইউনিয়ন বিএনপির সম্মেলন হলো। সাভার উপজেলা বিএনপির সম্মানিত সভাপতি আলহাজ ওমর আলী স্যার এবং সাধারণ সম্পাদক মো. জামালউদ্দিন সরকার এই কমিটি অনুমোদন দেন। আমি জানি না এমপি মহোদয়ের ভিন্ন কোনো ইচ্ছে ছিল কিনা, কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে তিনি কোনো প্রতিবাদ বা জনমতের বাইরে কিছুই বললেন না। আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি এলাকা ত্যাগ করলেন।
ইয়ারপুর ইউনিয়ন বিএনপির সব নেতা অনেক খুশি আমাকে এই পদে নির্বাচিত করে। ইয়ারপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতারা ভাবতে শুরু করলেন, এই পদের মাধ্যমে আগামী দিনে আমার রাজনীতির পথ চলা সুগম হলো এবং আব্বার মতো আমিও একসময় সাভারে নেতৃত্ব দেব। এই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির পদ তারই ধারাবাহিকতা।
১৯৯৩ সালে বলিয়ারপুর-হেমায়েতপুরের মধ্যবর্তী স্থানে (কফিল ভাইয়ের পেট্রোল পাম্প সনি ফিলিং স্টেশনের পাশে) সাভার উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটি হয়। এই সময় ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এবং সাধারণ সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান। সাভার উপজেলার নতুন কমিটির সভাপতি হলেন মো. জামালউদ্দিন সরকার (বাড়ি: তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন) এবং সাধারণ সম্পাদক মো. কফিলউদ্দিন (বাড়ি: আমিনবাজার ইউনিয়ন)। আমাকে সিনিয়র সভাপতি এবং হুমায়ূন ভাইকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। অনেক কম পরিশ্রমে একটি সম্মানজনক পদ আমি পেলাম। এই ব্যাপারে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেন ওমর আলী স্যার। স্যারের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। (ওমর আলী স্যার সাভার উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি)।
১৯৯২ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি আমি বিয়ে করি। ওই দিন রাতে সেনাকুঞ্জে আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। সাধারণত দু-তিন দিনের মধ্যে বউভাত অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু আগে থেকে বুকিং করা ছিল না বলে ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে লেডিস ক্লাবে বউভাত অনুষ্ঠান হলো। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ থেকে শুরু হলো নতুন জীবন, নতুনভাবে পথ চলা। আমি ১৯৯১ সালের ১১ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ ইটনা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করি (কিশোরগঞ্জের ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন এই তিনটি উপজেলা বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের নির্বাচনি এলাকা)। ঢাকা বিভাগের একটি জেলার একটি উপজেলা এতটা দুর্গম হতে পারে, তা কেউ চিন্তাও করতে পারবেন না। ঢাকা থেকে ১০-১২ ঘণ্টা সময় লাগে ইটনা পৌঁছাতে। জীবনে প্রথম চাকরি, নতুন এক অভিজ্ঞতায় সিক্ত হলাম। ইটনাতে ১৯৯১ সালে বিদ্যুৎ ছিল না। কিছুসময়ের জন্য হাসপাতালে এবং আমাদের থাকার জায়গাটায় (ডাক্তারদের জন্য নির্মিত হোস্টেল) জেনারেটর চলত। আমি সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি হওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৯৩ সালের পূর্ব মার্চ পর্যন্ত সেখানে বিদ্যুৎ ছিল না। স্ত্রী রিতার সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কখনো কখনো আলাপ হয়। মাঝে মাঝে আমিও মজা করি, যখন আমি এমপি হব তখন কিন্তু আমি তোমাকে এত সময় দিতে পারব না। তখন জনগণের অগ্রাধিকার।
একদিন আসাদ গেটের আড়ৎ থেকে কেনাকাটা করে রিকশায় ইন্দিরা রোডে যাচ্ছি মানিক মিয়া এভিনিউ সংসদ ভবনের পাশ দিয়ে। বাম দিকে আঙুল তুলে রিতাকে বলি, একদিন ওই ভবনের ভেতর আমাকে অনেক সময় কাটাতে হবে। রিতা হাসে কিন্তু আমি গম্ভীর হয়েই কথাটা বলি। এ রকম আরও অনেক স্মৃতি আছে যা ওই সময়ের জন্য মজা ছিল কিন্তু পরে তা সত্যে পরিণত হয়েছে। সাভার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে বদলি হয়ে আসি। ডাক্তারদের নিজ উপজেলায় বদলি হতে বা কাজ করতে সরকারি কোনো বাধানিষেধ নেই। শুরু হলো নিজ উপজেলার জনগণের স্বাস্থ্যসেবা। স্থানীয় এমপি নেয়ামতউল্লাহ সাবুর কিছু কিছু সিদ্ধান্ত ও অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাভারের বিএনপি নেতারা হতাশ। আগামীতে বিএনপিকে এই আসন ধরে রাখতে নতুন নেতা প্রয়োজন। বিএনপির এই আসনে জিততে পারবে যদি নেয়ামতউল্লাহ সাবু মনোনয়ন না পান। জনগণের এমনই ধারণা। বিএনপি নেতা-কর্মীরাও তাই বলেন।
জনগণের চাহিদা অনুযাই আমি হলাম ঢাকা ১৯ আসনের এমপি,আগামী আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে আমার সারাটা জীবন আপনাদের সেবায় উৎসর্গ করবো ইনশাল্লাহ,