* চেয়ারম্যানসহ চার পরিচালক ব্যাংকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হয়ে প্রত্যেকে ১৭ হাজার ২৫০ টাকা সম্মানী নেন।
* চেয়ারম্যান ব্যাংকের সব শাখায় নিজের ছবি ও বাণী টানানোর নির্দেশ দেন, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পরিপন্থী।
* ঋণ পুনরুদ্ধারে অভিজ্ঞতা ছাড়াই শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদকে হেড অব রিকভারি করা হয়।
* মো. মুজাহিদ কবিরের নিয়োগে পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্রের কপি পাওয়া যায়নি।
* হেড অব কার্ডস অ্যান্ড ডিজিটাল ব্যাংকিং পদে মো. জাকির হোসেনের নিয়োগে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বয়সসীমা অনুসরণ করা হয়নি।
* চেয়ারম্যান তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক্সিম ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক থেকে বরখাস্ত বা অনিয়মে অভিযুক্ত কয়েকজনকেও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
* আইএফআইসি ব্যাংক টানা দুই বছর লোকসানে রয়েছে।
আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ব্যাংকটিতে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সুশাসন লঙ্ঘনের অভিযোগ ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি হস্তক্ষেপ, নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত সম্মানী গ্রহণ, অহেতুক বোর্ড সভা আয়োজন, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, অনুমোদনহীন বিদেশ সফর এবং ব্যক্তিগত প্রচারণাসহ নানা অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে চেয়ারম্যানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এসব অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রভাবাধীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশ্নবিদ্ধ ঋণ অনুমোদন এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মো. মেহমুদ হোসেনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনিয়ম কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে চেয়ারম্যানের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্যও জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তকারী দল মনে করছে, ব্যাংকটিতে সুশাসন নিশ্চিত করতে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। প্রয়োজনে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতিবিভাগের (বিআরপিডি) সার্কুলার নম্বর-২-এর ১০.২(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো চেয়ারম্যান বা পরিচালক ব্যাংকের দৈনন্দিন প্রশাসনিক বা পরিচালনাগত কাজে অংশ নিতে বা হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন পর্ষদ এই নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে।
বিতর্কিত কয়েকটি ঋণের অনিয়ম তদন্তে পরিচালক কাজী মো. মাহবুব কাশেম ও স্বতন্ত্র পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হককে নিয়ে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি আটটি বৈঠক করে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী গ্রহণ করে। একইভাবে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (সিআরও) এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন বিভাগের প্রধান নিয়োগের সাক্ষাৎকার বোর্ডে অংশ নেওয়ার জন্য পরিচালকদের আরও ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হয়। দুই খাতে মোট অতিরিক্ত সম্মানীর পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এছাড়া চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন, সরকার মনোনীত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা, স্বতন্ত্র পরিচালক কাজী মো. মাহবুব কাশেম এবং সরকার মনোনীত পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হক ব্যাংকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে প্রত্যেকে ১৭ হাজার ২৫০ টাকা করে সম্মানী গ্রহণ করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৩৮ কার্যদিবসের মধ্যে ২২ দিন ব্যাংকের গুলশান, প্রিন্সিপাল ও নারায়ণগঞ্জ শাখাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় গিয়ে মেঘনা কর্পোরেশন, প্ল্যামি ফ্যাশন, সিলভার গ্রুপ এবং মার্স পলি অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজের মতো বড় করপোরেট গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এটি বিআরপিডির নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতায় অযাচিত হস্তক্ষেপের প্রমাণ।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং ও কমিউনিকেশন বিভাগকে ব্যবহার করে সব শাখা ও উপশাখায় নিজের ছবি ও বাণী টানানোর নির্দেশ দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে চেয়ারম্যানের এই আত্মপ্রচারে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী মাসে একটি সাধারণ বোর্ড সভা হওয়ার কথা থাকলেও চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন পর্ষদ প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচটি সভা আয়োজন করেছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বিভিন্ন সাব-কমিটির সভার নামে অতিরিক্ত সম্মানী প্রদান করা হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির মাত্র ছয়টি সভা করেই পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত সম্মানী নিয়েছেন। এছাড়া অডিট কমিটি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও নির্বাহী কমিটির নামে অসংখ্য অতিরিক্ত বৈঠক দেখিয়ে ব্যাংকের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন পর্ষদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের মূল ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ব্যাংকের অর্থে বিদেশ সফর করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও এসব ব্যয়ের অর্থ এখনো ব্যাংকের তহবিলে ফেরত দেওয়া হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার (ইউকে) লিমিটেডের নামে বোর্ড সভা, বিমান ভাড়া, ভাতা ও হোটেল ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে কয়েক কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। ২০১১ সালে কার্যক্রম শুরু করলেও প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো লভ্যাংশ দেশে আনতে পারেনি। অথচ ২০১১ সাল থেকে বোর্ড সভা ও অন্যান্য সভায় অংশ নিতে যুক্তরাজ্য সফরে ব্যাংকের ৯ কোটি ৫৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের দায়িত্ব গ্রহণের পর নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঋণ পুনরুদ্ধার বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে আসা শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদকে হেড অব রিকভারি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মো. মুজাহিদ কবিরের নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত ছাড়পত্রের কপি নথিতে পাওয়া যায়নি। হেড অব কার্ডস অ্যান্ড ডিজিটাল ব্যাংকিং পদে মো. জাকির হোসেনকে নিয়োগের সময় নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বয়সসীমাও অনুসরণ করা হয়নি।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলের কয়েকজন কর্মকর্তাকে আইএফআইসি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। এক্সিম ব্যাংক পিএলসি ও প্রাইম ব্যাংক থেকে বরখাস্ত হওয়া কিংবা অনিয়মে অভিযুক্ত কয়েকজনকেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত ২৩ জুলাই রাতে চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংক আইএফআইসি ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ বন্ধ, শাখা ও উপশাখা থেকে চেয়ারম্যানের ছবি ও ব্যক্তিগত প্রচারসামগ্রী অপসারণ, তদন্ত কমিটি ও প্রশিক্ষণের নামে নেওয়া অতিরিক্ত সম্মানী দ্রুত ব্যাংকের তহবিলে ফেরত দেওয়া এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আইএফআইসি ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ১৯২ কোটি ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪৭টি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের গত ৩০ জুনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের, ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের, ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এবং দশমিক ৬৪ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। টানা দুই বছর ধরে লোকসানে থাকা ব্যাংকটি ২০২৫ সালে ২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে।
অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্থিতিশীলতার জন্য সুশাসন, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আইএফআইসি ব্যাংকে যে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে, তার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান না হলে গ্রাহকদের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















