বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) ও বারডেম হাসপাতাল দেশের ডায়াবেটিস চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে এলেও প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কার্যক্রমকে ঘিরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গত ১৭ বছর ধরে বাডাসের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. সাইফ উদ্দিন।
সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৭ বছর ধরে মহাসচিব থাকার সময়ে মো. সাইফ উদ্দিন রাজধানীর উত্তরার রাজলক্ষ্মীর দুই নম্বর রোডে পাঁচ কাঠা জমির ওপর একটি বহুতল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া গুলশানের প্রিন্স সিটিতে তার দুটি দোকান রয়েছে। তিনি দামি গাড়ি ব্যবহার করেন এবং স্ত্রী-স্বজনদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে সাইফ উদ্দিন বলেন, তিনি সরকারের সচিব এবং ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ছিলেন। উত্তরার বাড়িসহ সব সম্পদ তিনি বৈধ আয়ে অর্জন করেছেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তার বয়স ৮০ বছর এবং গত ১৭ বছর ধরে তিনি বাডাসে ভলান্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অনুদান, আর্থিক অনিয়ম ও তদন্ত
বাডাস প্রতি বছর সরকারি অনুদান পায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটি ২৮ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে, যার মধ্যে বেতন বাবদ ৫ কোটি ৬০ লাখ এবং পণ্য ও সেবা বাবদ ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা রয়েছে। এছাড়া দেশি-বিদেশি সংস্থা, জাকাত ফান্ড ও বিভিন্ন ব্যক্তি থেকেও অনুদান আসে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থের একটি বড় অংশ মনগড়া অডিট দেখিয়ে মহাসচিব ও তার সিন্ডিকেট আত্মসাৎ করেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুন মাসে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের হিসাব পর্যালোচনায় রিঅ্যাজেন্ট, ভোগ্যপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী খাতে এক মাসেই ১৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়, যা আগের ১১ মাসের গড় ব্যয়ের তিন গুণেরও বেশি। তদন্তে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সাইফ উদ্দিন বলেন, তদন্তে যারা অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কয়েকজনের চাকরিও চলে গেছে।
স্বজনপ্রীতি ও পারিবারিক প্রভাবের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, মহাসচিব হিসেবে সাইফ উদ্দিন নিয়োগ, বদলি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি করেছেন এবং সমিতির বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে পারিবারিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার মামা, ভাই, দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মীয়সহ পরিবারের একাধিক সদস্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর সুপারিশেও বহু নিয়োগ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে চাকরি হারানো, বদলি কিংবা পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, সাইফ উদ্দিন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম এ সামাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তার পদোন্নতি হয়নি।
প্রকল্পের অর্থ স্থানান্তর নিয়ে বিতর্ক
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর একটি প্রকল্পের ৫৮ লাখ টাকা অন্য প্রকল্পে সাময়িক ঋণ হিসেবে স্থানান্তর করা হয়, যা দাতা সংস্থার নীতিমালা ও অডিট বিধির পরিপন্থী। তবে সাইফ উদ্দিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এক প্রকল্পের অর্থ অন্য প্রকল্পে স্থানান্তর করা সম্ভব নয় এবং বাডাসের সব হিসাব সরকারি অডিটের আওতায় রয়েছে।
প্রকল্প ব্যয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, দাতা সংস্থাকে অর্থ ফেরত না দিতে প্রকল্পের মেয়াদ শেষে তড়িঘড়ি করে বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি ও একাধিক দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগত বিদেশ সফরের জন্য প্রকল্পের তহবিল থেকে ঋণ এবং ব্যক্তিগত ফ্ল্যাট কেনার জন্য বাডাসের তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
কর্মচারী ছাঁটাই ও মামলা
বারডেম পরিচালিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের (বিআইএইচএস) বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের কর্মচারীদের বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগে আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, কোনো নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট
অভিযোগ রয়েছে, হিসাব গোপন রেখে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা আড়াল করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বাডাসের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দেনা রয়েছে।
এ বিষয়ে সাইফ উদ্দিন বলেন, সরকারি অনুদান মূলত বারডেম হাসপাতাল পায়। হাসপাতালের ৩০ শতাংশ শয্যা দরিদ্র রোগীদের জন্য বিনামূল্যে রাখা হয় এবং ইনসুলিন ও ওষুধও বিনামূল্যে দেওয়া হয়। তার দাবি, গত বছরে বিনামূল্যে সেবা দিতে বাডাস ১১৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যদি লোকসানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে থাকেন, তবে সেখানে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য এবং প্রতিষ্ঠানকে লোকসানি দেখানোর পেছনে কোনো প্রতারণা আছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি তালিকাভুক্ত স্বাধীন অডিটরের মাধ্যমে নিরপেক্ষ অডিট করে তা জনসমক্ষে প্রকাশের সুপারিশ করেন।
সংবাদ শিরোনাম ::
১৭ বছর ধরে বাডাসের মহাসচিব সাইফ উদ্দিনকে ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০২:২৮:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
- ৫০৮ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ



















